ভালোবাসা দিবসের নামে বেহায়াপনাকে উস্কে দেয়া হচ্ছে

ভালোবাসা দিবসের নামে বেহায়াপনাকে উস্কে দেয়া হচ্ছে

মারজান হুসাইন চৌধুরী | সিনিয়র সহ-সম্পাদক : ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম 


মারজান হুসাইন চৌধুরী

‘ভালবাসা’ শব্দটাতে যেন লেগে আছে এক পবিত্রতার ছোঁয়া। ভালোবাসা একটি মানবিক অনুভূতি। বড় অদ্ভুত এক নিদর্শন।

ভালোবাসা বিষয়টি আল্লাহ প্রদত্ত, কেউ চাইলেই ভালোবাসা পান না, আবার কেউ না চাইতেই আশাতীতভাবে পেয়ে যান। ভালোবাসা থাকলেই কেবল জান্নাতে যাওয়া সম্ভব। মহান স্রষ্টা তো বলেছেন, তাঁকে যে ভালবাসবে এবং তাঁর সৃষ্টিকে যে ভালবাসবে কেবলমাত্র সেই চিরস্থায়ী জান্নাতে প্রবেশ করবে।

ভালবাসাকে যেমন নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় ফেলা যায় না, তেমনি এর কোন নির্দিষ্ট শ্রেণীবিভাগও নেই। উল্লেখযোগ্যভাবে বলতে গেলে স্রষ্টার প্রতি সৃষ্টির, সৃষ্টির প্রতি স্রষ্টার, সন্তানের প্রতি জন্মদাতার, জন্মদাতার প্রতি সন্তানের, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর, স্ত্রীর প্রতি স্বামীর ভালবাসা প্রভৃতি রয়েছে।

কিন্তু গভীর উদ্বেগের বিষয় হল, এই পবিত্র শব্দটিকে নোংরা-অপবিত্র করে ফেলা হচ্ছে দিন দিন।

এই পৃথিবীতে যেমন সত্যিকারের ভালবাসা আছে তেমনি আছে মেকি ভালবাসাও। রয়েছে লোক দেখানো ভালবাসা। অসৎ উদ্দেশ্যেও মানুষ ভালবাসে। আজকের তরুণ-তরুণীরা যেন মেকি ভালবাসাকেই সত্যিকারের ভালবাসা হিসেবে মেনে নিয়েছে। তারা সেই মাদকতায় ডুবে আছে যেখানে যৌনতাই মুখ্য।

অশ্লীলতা আর বেহায়াপনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে ষোড়শ শতাব্দী থেকে শুরু হওয়া ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’, যাকে আমাদের দেশে ‘বিশ্ব ভালবাসা দিবস’ নাম দেয়া হয়েছে। কথিত আছে, রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াসের নির্দেশ উপেক্ষা করেই খৃস্টান গীর্জার পুরোহিত ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’ যুগলদের বিয়ের কাজ সম্পাদন করতেন। ঘটনা জানতে পেরে সম্রাট ভ্যালেন্টাইনকে কারাগারে নিক্ষেপ করে। সেই কারাগারে থাকাকালে পুরোহিত এক যুবতীর প্রেমে আসক্ত হয়ে পড়ে। সেই অপরাধে ২৭০ খৃস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। ওই দিন পুরোহিত সেই যুবতীকে একটি চিরকুট লিখে যায়- যার শেষে লেখা ছিল ‘ফ্রম ইউর ভ্যালেন্টাইন’। সেন্ট ভ্যালেন্টাইন কারাগারে নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করেছিল খৃস্ট ধর্মের একটি বিধান বিবাহ পদ্ধতি রক্ষার জন্য। বলা হয়ে থাকে তার মৃত্যুর শত বছর পর এই দিনটিকে স্মরণ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত ছিল ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে কিন্তু এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী এটাকে ভালবাসা দিবস আখ্যা দিয়ে তাদের অবৈধ মাদকের ব্যবসা চাঙ্গা করতে চায়। তারা সফলও হয়।

পাশ্চাত্য ঘরানার এক মিডিয়া ব্যক্তিত্বের হাত ধরে বাংলাদেশে প্রবেশ করে তথাকথিত ‘বিশ্ব ভালবাসা দিবস’। এই দিবস ও দিবস কেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড শুধু আমাদের ধর্ম ও নৈতিকতা বিরোধী-ই নয়, এটি বাঙালি সংস্কৃতির সাথেও সাংঘর্ষিক। যে পাশ্চাত্য সমাজে জন্মদাতার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক ভঙ্গুর, যেখানে বার্ধক্যে উপনীত হওয়া মাত্র জন্মদাতাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেয় সন্তান সেই সমাজ থেকে আমদানি করা সংস্কৃতি কীভাবে আমাদের হয়ে যায়?

অশ্লীলতা আর বেহায়াপনা উস্কে দেয়ার মেকি ভালোবাসা দিবস উদযাপন করতে গিয়ে কতো অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে যাচ্ছে মিডিয়ার কল্যাণে তা কারো অজানা নয়।

এখন ড্রেনে-ডাস্টবিনে নবজাতক শিশু পাওয়া যায়। চাহিদা মেটার পর প্রেমিক প্রেমিকাকে অস্বীকার করছে। আর তাই প্রেমিকের বাড়ির সামনে প্রেমিকার অবস্থান-অনশন এমন খবরও আজকাল শোনা যায়। আত্বহত্যার ঘটনাও তো নতুন নয়।

আকাশ সংস্কৃতির এই যুগে প্রতিবছর ১৪ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ঘিরে কিছু সুবিধাভোগী মিডিয়া রসাত্মক গল্প বানায়। সেই সব তথাকথিত ‘কাছে আসার গল্প’ এর নায়ক-নায়িকারাই যখন দূরে যাওয়ার গল্পের নায়ক নায়িকা হয়ে উঠে তখন সেটাকে নিয়ে তারা আর নতুন করে গল্প বানায় না।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, আমাদের দেশের কথিত সংস্কৃতিমনা ও সুশীলরা এই ভূমিতে হাজার বছর ধরে যে রীতিনীতি চলে আসছে সেটাকে ভিনদেশি আখ্যা দিয়ে এর বিরোধিতা করে। তারা বোরকা, হিজাব, নেকাব, পাঞ্জাবি, পায়জামা, তুব, টুপি এসবকে আরবের পোশাক বলে থাকে। ইসলামী অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে সেকেলে আখ্যা দিয়ে তারা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে থাকে। অথচ তারাই পশ্চিমা দুনিয়া থেকে আমদানি করা তথাকথিত ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ বা ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’ নিয়ে মেতে উঠে! সত্যিই ‘সেলুকাস’! তারা বড়ই বিচিত্র!