বেফাকের অধীনে ইফতার পরীক্ষা: সমস্যা ও সমাধান

বেফাকের অধীনে ইফতার পরীক্ষা: সমস্যা ও সমাধান


মুফতি মুহাম্মদ শরীফ মালিক
প্রধান মুশরিফ: দারুল ইফতা ওয়াল ইরশাদ
শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা


 

উপমহাদেশে পৃথকভাবে তাখাসসুস ফিল ইফতার সূচনা হয় ঊনবিংশ শতাব্দির মাঝামাঝির দিকে। এর আগে এ বিষয়টি পৃথকভাবে ছিল না; বরং তা দরসিয়াতের মধ্যেই সন্নিবেশিত ছিল। আকাবিরে দেওবন্দের মধ্যে যাদেরকে আমরা ফকীহ হিসাবে ফলো করি তারাও দরসিয়াতে সীমাবদ্ধ থেকেই ফকীহ হয়েছেন। সময়ের আবর্তনে ব্যস্তময় জীবনে দরসিয়াতে সীমাবদ্ধ থেকে বিশেষ দিকগুলোতে ছাত্ররা পাকাপোক্ত হচ্ছিল না দেখে আকাবিরে দেওবন্দ মানবীয় সবচে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তথা ফিকাহ কে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে তা পৃথকভাবে অধ্যয়নের ব্যবস্থা করেন। তখন থেকেই তাখাসসুসের ধারাবাহিকতার সূচনা হয়। আস্তে আস্তে এ ধারাবাহিকতা বাংলাদেশেও শুরু হয়।

বর্তমান বাংলাদেশে সাধারণত তিন ধরনের ইফতা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ১) দারুল উলুম দেওবন্দের আদলে ইফতা বিভাগ। ২) পাকিস্তানের আদলে দারুল ইফতা ওয়াল ইরশাদ। ৩) সাউদি আরবের কুল্লিয়ার আদলে কিসমুদ্দাওয়া ওয়াল ইরশাদ।

দারুল উলুম দেওবন্দের ইফতা কোর্স এক বছর। দারুল উলুম করাচিসহ পাকিস্তানের স্বনামধন্য দারুল ইফতা ওয়াল ইরশাদের মেয়াদকাল তিন বছর, তন্মধ্যে দুই বছর বাধ্যতামূলক ও এক বছর ঐচ্ছিক। সাউদি আরাবিয়ার কুল্লিয়ার মেয়াদ চার বছর। প্রত্যেকের মানহাজ (সিলেবাস) ভিন্ন ভিন্ন।

বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় সকল দারুল ইফতা ও মাঠ-ময়দান সার্ভে করে প্রমাণিত হলো, এক বছরের তুলনায় দুই বছরের কোর্সেই ছাত্ররা বেশি উপকৃত হচ্ছে। অনেকে বলছেন, এক বছরে এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রপ্ত করা দূরহ ব্যাপার। সিলেবাসের দিক থেকে কারো কারো মতে দারুল উলুম দেওবন্দের সিলেবাসই মাননীয়। আবার অনেকেই বলছেন, দারুল উলুম করাচি বা পাকিস্তানের সিলেবাসই আধুনিকায়নসমৃদ্ধ ও অধিকতর ফলপ্রসু। তবে সাউদি আরবের মানহাজকে কেউ ফলো করতে দেখা যাচ্ছে না।

তাছাড়াও প্রতিটি দারুল ইফতাতেই আমাদের দেশের ভাবধারা, ছাত্রদের মেধা ও জাতীয় চাহিদার প্রতি খেয়াল করত: উল্লিখিত তিন মডেলের মানহাজকে সংযোজন-বিয়োজন করা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো :
বেফাকের দশম কাউন্সিলে ইফতা বিভাগের সমাপনী পরীক্ষা বোর্ডের আওতায় নেয়ার সুপারিশ আনা হয়েছে। লক্ষণীয় হচ্ছে, তা কীভাবে সম্ভব! মডেল তো তিনটা, মানহাজ তো বে-শুমার। তাহলে বেফাক কাকে মডেল হিসাবে ধরবে কাকে ছাড়বে? কার মানহাজ কে ফলো করবে আর কারটা উপেক্ষা করবে? না-কি সবগুলোর আদলে নতুন মানহাজ বানাবে? না সবগুলো বাদ দিয়ে ভিন্ন মানহাজ তৈরি করবে?

এছাড়াও জটিল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় মুফতিদের মধ্যে যারা নিজেদেরকে সার্বক্ষণিক তাখাসসুসের খেদমতের সঙ্গে নিয়োজিত রেখেছেন বা যারা আজ জাতীর প্রতিক্ষিত মুফতি হিসাবে মনোনীত হয়েছেন তারাও কিন্তু তিনভাগে বিভক্ত। তারা নিজ নিজ আইডল ও মানহাজকে ফলো করেই ইফতার কাজ আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন। এদের অনেকেই বেফাকের বিশেষ কোনো পদে নেই। আবার যে বা যারাই বেফাকের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে রয়েছেন তাদের কোনো উল্লেখযোগ্য দারুল ইফতা নেই বা মুফতি হিসাবে খ্যাত নন।

তাহলে কারা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ করবেন? কাকে মডেল হিসাবে চয়ন করবেন? কোন মানহাজকে ফলো করবেন? এটা জাতির জিজ্ঞাসা।

বাংলাদেশের ফতোয়া বিভাগগুলো অনেকটাই মুফতি কেন্দ্রিক। প্রত্যেক মুফতি নিজ নিজ অভিরুচি, মতাদর্শ ও সুদূরপ্রসারী চিন্তাধারার আলোকে তা পরিচালনা করে থাকেন। শিক্ষার্থীরাও নিজেদের রুচি ও পছন্দসই মুফতি থেকে বিশেষ পি.এইচ.ডি অর্জন করার ইখতিয়ার লাভ করে থাকে। একে একীভূত করলে বা এক শিকলে বাঁধলে যত্রতত্র মানহীন ইফতার পথরুদ্ধ হলেও (যা করাও দরকার) বিশেষ কিছু মনীষীর হৃদয়গ্রাহী, চেতনাশীল ও বিপ্লবী তরয-তরীকা থেকে এদেশের ছাত্ররা মাহরুম হবে। এটাও কাম্য নয়।

সমাধান কোন পথে:
এ সকল সমস্যার সহজ সমাধান হলো, প্রথমে একটি স্বাতন্ত্র্য ও সার্বভৌম ইফতা বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা। যেখানে দেশের শীর্ষস্থানীয় মুফতিগণের মধ্যে যারা নিজেদেরকে সার্বক্ষণিক তাখাসসুসের খেদমতের সঙ্গে নিয়োজিত রেখেছেন তারা প্রতিনিধিত্ব করবেন। পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সকল দারুল ইফতার মুশরিফদের সমন্বয়ে ইফতার কাঠামোগত সকল বিষয় শুরাহা করেই পরীক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। বাংলাদেশের সকল দারুল ইফতা উক্ত ‘ইফতা বোর্ডে’র সদস্য হতে হবে। সদস্য হওয়ার জন্য নির্ধারিত শর্তারোপ করা হবে। ইফতা বোর্ডের অধীনে সকল দারুল ইফতা হতে প্রণীত ফতোয়াগুলো উক্ত বোর্ডের সীল মোহর দ্বারা সত্যায়িত হতে হবে। বোর্ড কতৃপক্ষ মাসিক কিংবা বাৎসরিক সকল দারুল ইফতা মনিটরিং করবে। কোর্স শেষে উত্তীর্ণদের মাঝে বোর্ড কর্তৃক সনদ প্রদান করবে।

আমি আশাকরি, এভাবে একটি স্বাতন্ত্র্য ও সার্বভৌম ‘ইফতা বোর্ড’ গঠন ইফতা বিভাগকে উচ্চ ধারায় উন্নীত করার পাশাপাশি বাংলার জমিনে শরয়ী বিধান কায়েম করতে সহায়ক হিসাবে ভুমিকা রাখবে।
আল্লাহ সংশ্লিষ্ট সকলকে বুঝার ও মানার তাওফীক দান করুন। আমীন ॥


Notice: Undefined index: email in /home/insaf24cp/public_html/wp-content/plugins/simple-social-share/simple-social-share.php on line 74