বাইতুল মুকাদ্দাস যেভাবে ইহুদিদের দখলে [১ম পর্ব]

বাইতুল মুকাদ্দাস যেভাবে ইহুদিদের দখলে [১ম পর্ব]

আবদুস সাত্তার আইনী | তরুণ আলেম ও  লেখক


আল-কুদ্স, বাইতুল মুকাদ্দাস বা আল-বাইতুল মাকদিস—যে-নামেই ডাকি না কেনো, এই শহরের প্রেম আমাদের হৃদয়ে চিরকালের মতো মুদ্রিত হয়ে আছে। খ্রিস্টপূর্ব তিন হাজার বছরেরও আগে এই নগরের গোড়াপত্তন ঘটেছিলো। এটি মুসলমানদের প্রথম কিবলা; হারামাইন শারিফাইন (মক্কা ও মদীনা)-এর সঙ্গে বাইতুল মুকাদ্দাসও যুক্ত আছে তৃতীয় হারাম শরীফ হিসেবে। একইসঙ্গে ইহুদি ও খ্রিস্টধর্মাবলম্বীদের কাছেও এটি পবিত্র নগর; এই নগরী থেকেই তাদের ধর্মের সূচনা ও বিকাশ ঘটেছিলো। বাইতুল মুকাদ্দাসের বয়স মোটামুটি পাঁচ হাজার বছর। যে-আরব গোত্রসমূহ এই নগর গড়ে তুলেছিলো তাদেরকে বলা হতো ইয়াবুসি। এই নগর প্রত্যক্ষ করেছে বহু সভ্যতা এবং তাদের উত্থান ও পতন; প্রত্যক্ষ করেছে যুদ্ধের পর যুদ্ধ এবং জয় ও পরাজয়। চিরকাঙ্ক্ষিত প্রেয়সীর মতো তাকে দখল করতে চেয়েছে যুগের শাসকবৃন্দ; দুঃসাহসী সেনাপতিরা ও বীরযোদ্ধারা। চিরকাল সে একই প্রেমিকের আলিঙ্গনে আবদ্ধ থাকে নি; হিংস্র প্রেমিকের থাবার নিচেও তাকে বন্দি থাকতে হচ্ছে এবং তার পাথুরে বুক চিরে বয়ে যাচ্ছে রক্তের নদী।

খ্রিস্টপূর্ব ষোড়শ শতকে বাইতুল মুকাদ্দাস ছিলো কিনআনীদের শাসনে, তারা এই নগরের নাম রেখেছিলো উরো সালেম (أورو سالم), অর্থাৎ শান্তির শহর। এ শব্দ থেকেই উদ্ভব ঘটেছে أورشليم বা জেরুজালেম নামটির। অথচ ইহুদিরা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে দাবি করে থাকে যে, তারাই প্রথম বাইতুল মুকাদ্দাসের নাম রেখেছিলো জেরুজালেম। কিনআনীদের পর খ্রিস্টপূর্ব চতুর্দশ শতকে এই নগরে শাসন পরিচালনা করেছে মিসরীয় ফেরআউনরা; তারপর খ্রিস্টপূর্ব একাদশ শতকে হিব্রুভাষীরা; তারপর ৫৯৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ব্যাবিলনবাসীরা; তারপর ৫৩৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পারস্য শাসকরা; তারপর ৩৩২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রিকরা; তারপর ৬৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রোমান শাসকরা, তারা নগরটির নাম রেখেছিলো ইলিয়া; তারপর ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে আরব মুসলমানরা।

গোটা বিশ্ববাসীর কাছে বাইতুল মুকাদ্দাসের অত্যন্ত ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক মর্যাদা থাকা ছাড়াও ভৌগলিক কৌশলগত অবস্থানের কারণে এর অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে। এই নগর কয়েকটি পাহাড়ের মধ্যস্থলে দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যাইতুন পাহাড় বা তুর পাহাড়। পবিত্র কুরআনে এই পাহাড়ের উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে জাবালে মাশহাদ বা সকুবিস পাহাড়, জাবালে দাউদ বা দাউদ পাহাড়, জাবালুল মুকাব্বির বা মুকাব্বির পাহাড় (হযরত উমর আল-ফারুক রা. বাইতুল মুকাদ্দাসের জয় দেখতে এসে এই পাহাড়ে দাঁড়িয়ে পবিত্র নগরী প্রত্যক্ষ করামাত্রই তিনবার ‘আল্লাহু আকবার’ উচ্চারণ করেছিলেন। কেউ মিসর থেকে সিরিয়ায় প্রবেশ করতে চাইলে কুদ্স হবে প্রবেশদ্বার; একইভাবে সিরিয়া থেকে মিসরে প্রবেশ করতে হলে কুদ্স হবে ফটক। মূলত কুদ্স হলো ফিলিস্তিনের চাবি।
ইসলামের ইতিহাসে বাইতুল মুকাদ্দাকে কেন্দ্র করে তিনটি পর্যায়ে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে।
১। হিজরি প্রথম শতকের শুরুতে (১৫ হিজরিতে/ ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে) হযরত আমর বিন আস রা. রোমের বাইজেন্টাইনীয় শাসকদের থেকে বাইতুল মুকাদ্দাসকে মুক্ত করেন।
২। হিজরি ষষ্ঠ শতকে (৫৮৩ হিজরিতে/১১৮৭ খ্রিস্টাব্দে) সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী ক্রুসেডারদের দখল থেকে বাইতুল মুকাদ্দাসকে উদ্ধার করেন।
৩। হিজরি চতুর্দশ শতকে, ১৩৬৭হিজরিতে / ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে প্রথমবার এবং ১৩৮৭ হিজরিতে / ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয়বার জায়নবাদী ইহুদি গোষ্ঠী কর্তৃক বাইতুল মুকাদ্দাস দখল।

রোমান-বাইজেন্টাইনীয় শাসকদের থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস উদ্ধার
জাযিরাতুল আরবে মুসলমানদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিতি হলো। হযরত আবু বকর রা. কঠোর হাতে রিদ্দার (ধর্মত্যাগের) ফিতনা দমন করলেন। অব্যবহিত পরেই তিনি ইরাক ও সিরিয়াকে ইসলামের ছায়াতলে আনতে চাইলেন। ইরাকের বিশাল ভূমিকে জয় করার জন্য হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. (৫৯২-৬৪২ খ্রি.), ইয়ায বিন গানাম রা. (মৃত্যু : ৬৪২ খ্রি.) এবং মুসান্না বিন হারিসা আশ-শাইবানি (মৃত্যু : ৬৩৫ খ্রি.)-এর নেতৃত্বে সেনাবাহিনী প্রেরণ করলেন। অন্যদিকে সিরিয়াকে জয় করার জন্য প্রেরণ করলেন ইয়াযিদ বিন আবু সুফয়ান রা. (মৃত্যু : ৬৩৯ খ্রি.), শুরাহবিল বিন হাসানা রা. (৫৮৩-৬৩৯ খ্রি.), আবু উবায়দাহ ইবনুল র্জারাহ রা. (৫৮৪-৬৩৯ খ্রি.) ও আমর বিন আস রা. (৫৯২-৬৮২ খ্রি.)-কে। আমর ইবনুল আস রা.-এর দায়িত্ব ছিলো ফিলিস্তিনে বিজয়ের পতাকা উড্ডীন করা। তাঁর নেতৃত্বে ছিলো সাত হাজার যোদ্ধার সেনাবাহিনী। আমার ইবনুল আসের প্রতি হযরত আবু বকর রা.-এর নির্দেশনা ছিলো নি¤œরূপ :
وإذا سرت بجيشك فلا تسر في الطريق التي سار فيها يزيد وربيعة وشرحبيل بل اسلك طريق ايليا حتى تنتهي إلى ارض فلسطين وابعث عيونك يأتونك بأخبار أبي عبيدة فإن كان ظافرا بعدوه فكن أنت لقتال من في فلسطين وأن كان يريد عسكرا فأنفذ إليه جيشا في أثر جيشৃ
“ইয়াযিদ, রবীয়া ও শুরাহবিল যে-পথে অভিযানে যাবে তুমি সেই পথে তোমার সেনাবাহিনী নিয়ে এগুবে না; বরং তুমি ইলিয়ার পথে ফিলিস্তিন পর্যন্ত যাবে। তুমি তোমার গুপ্তচরদের প্রেরণ করবে, তারা তোমার কাছে আবু ওবায়দাহর খবর পৌঁছে দেবে। সে যদি তার শত্রুদের বিরুদ্ধে জয়ী হয় তবে তুমি ফিলিস্তিনের শত্রু বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবে। আর যদি সে সৈন্য তলব করে তবে তার কাছে একের পর এক সেনাদল পাঠাবে।”

হযরত আমর ইবনুল আস রা.-এর অভিযান শুরু হয়েছিলো ১৬ হিজরি/৬৩৩ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে; তিনি লোহিত সাগরের তীরবর্তী পথ ধরে এগিয়ে গেলেন এবং এবং জর্ডানের উপকূলীয় এলাকা আকাবা পার হয়ে মৃত সাগরের তীরে পৌঁছে গেলেন। এগিয়ে যাওয়ার সময় বিভিন্ন জায়গায় রোমান সৈন্যদের প্রতিরোধের মুখে পড়েন এবং প্রতিবারই তাদের পরাভূত করেন। এমনকি তিনি ফিলিস্তিনের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলীয় অংশও দখল করে নেন। এরপর কুদ্সের অভিমুখে অভিযান পরিচালনার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। কিন্তু এ-সময় সংবাদ আসে যে, রোমানরা এক বিশাল সেনাবাহিনী প্রস্তুত করেছে, যাদের মোকাবিলায় পেরে ওঠা সম্ভব নয়। তিনি শত্রুদের সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে জর্ডান উপকূলে চলে এলেন। তিনি আবু বকর রা.-এর কাছে নির্দেশনা চেয়ে পাঠালেন। আবু বকর রা. তাঁকে বসরায় তাঁর অন্য সঙ্গীদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার নির্দেশ দিলেন। রোমান বাইজেন্টাইনীয় শাসকদের সঙ্গে বিভিন্ন ছোট ছোট যুদ্ধ লেগেই ছিলো। অবশেষে ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে (১৩ হিজরিতে) সিরিয়ার রোমান সোনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মুসলমানদের এক চূড়ান্ত যুদ্ধ সংঘটিত হলো। ইয়ারমুকের যুদ্ধ নামে এই যুদ্ধ ইতিহাসবিখ্যাত। এই যুদ্ধে মুসলমানদের সেনাপতি হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রা.। ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে/১৩ হিজরিতেই (৭ই জমাদিউল উখরা) হযরত আবু বকর রা. মৃত্যুবরণ করেন।

ইয়ারমুকের যুদ্ধ চলাকালে মদীনা থেকে দূত নতুন খলীফার পক্ষ থেকে একটি পত্র নিয়ে আসেন। পত্রে লেখা ছিলো খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) ইন্তেকাল করেছেন। হযরত উমর ইবনুল খাত্তান নতুন খলীফা হিসেবে আবু বকরের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। পত্রে একটি নির্দেশ ছিলো যে, খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে সেনাপতির পদ থেকে অপসারিত করা হয়েছে এবং আবু উবায়দাহ ইবনুল র্জারাহ (রা.)কে নতুন সেনাপতি মনোনীত করা হয়েছে। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.) এই পত্র পেয়ে কিছুটা মনঃক্ষুণ্ন হলেও নীরব থাকেন এবং আবু উবায়দাহকে বিষয়টি জানান। তিনি তাঁকে সতর্ক করে দেন যে, এই সংবাদ প্রচার করবেন না। কারণ তা যোদ্ধাদের মধ্যে বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি করতে পারে। আবু উবায়দাহর নেতৃত্বে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. ফহল ও দামেস্কের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
আজদানাইনের যুদ্ধ : ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে/১৫ হিজরিতে ফিলিস্তিনে আজদানাইনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে খ্রিস্টান বাহিনীর প্রধান ছিলেন রোমান সম্রাট হিরাক্লিায়াসের ভাই থিওডোর। (আরবিতে তাঁকে আরতাবুন বলা হয়, এটি রোমান শব্দ Tribunus-এর কাছাকাছি, যার অর্থ সম্রাটের পরে সবচেয়ে বড় নেতা।) আমর ইবনুল আসের নেতৃত্বে মুসলিম সেনাবাহিনীর কাছে থিওডোর ও সৈন্যরা চরমভাবে পরাজিত হয়। বাইরে টিকে থাকতে না পেরে বাইতুল মুকাদ্দাসের প্রাচীরসীমার ভেরতে গিয়ে অবস্থান গ্রহণ করে। আমর ইবনুল আস (রা.) বাইতুল মুকাদ্দাস অবরোধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। খ্রিস্টান বাহিনী ভেতর থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, অবরোধে প্রায় চারমাস কেটে যায়। চারমাসেও বাইতুল মুকাদ্দাস জয় করতে না পেরে আমর ইবনুল আস খলীফা উমর ইবনুল খাত্তাবের কাছে পরামর্শ ও নির্দেশনা চেয়ে পত্র পাঠান। এই পত্র পেয়ে উমর (রা.) তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি উচ্চারণ করেছিলেন : আমরা রোমের আরতাবুনের মোকাবিলায় আরবের আরতাবুনকে নিয়োজিত করেছি। সুতরাং দেখো কী ঘটে! এই কথা দ্বারা উমর (রা.) বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, আমর ইবনুল আস ও থিওডোর দু-জনই তাদের জাতির বীরপুরুষ।

বাইতুল মুকাদ্দাস অবরোধকালে আমর ইবনুল আসের সহযোদ্ধা অন্য সেনাপতিগণ সিরিয়ায় একের পর এক এলাকা জয় করছিলেন এবং সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। এ-সময়ের মধ্যে আবু উবায়দাহ ইবনুল র্জারাহ (রা.) খালিদ ইবনুল ওয়াদিল (রা.)কে সঙ্গে নিয়ে হিম্স, হুমা, কানাসিরিন ও আলেপ্পো জয় করেন। আগেই দামেস্কের পতন ঘটেছিলো। এরপর তাঁরা সমুদ্রতীরবর্তী পথ ধরে অভিযান চালিয়ে যান এবং ত্রিপোলি জয় করে বয়রুত পর্যন্ত এগিয়ে যান। ইয়াযিদ বিন আবু সুফ্য়ান (রা.) বয়রুত থেকে সায়দা (Sidon) পর্যন্ত সিরীয় উপকূল এলাকা জয় করে নিয়েছিলেন। এরপর তিনি সুর ও আক্কা অধিকারকারী মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। অন্যদিকে মুআবিয়া বিন আবু সুফ্য়ান (রা.) সিরীয় উপকূলের সর্বদক্ষিণের এলাকা কিসারিয়া অধিকার করেছিলেন।
অবরোধে বিপর্যস্ত জেরুজালেমের খ্রিস্টানরা প্রস্তাব দিলো যে, তারা সন্ধিচুক্তি করতে রাজি হবে। তবে স্বয়ং খলিফাতুল মুসলিমিনকে উপস্থিত থাকতে হবে এবং তিনি নিজেই সন্ধিপত্র সম্পাদন করবেন।

আমর ইবনুল আস রা. উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর কাছে চিঠি লেখেন : “আমি প্রচণ্ড যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছি। তবে কিছু শহরের বিজয় আপনার জন্য রেখে দিয়েছি। এখন আপনার সিদ্ধান্তে যা হয়।” উমর রা. বুঝতে পারলেন যে, আমর রা. কোনো বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে তাঁকে এই চিঠি পাঠান নি। তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস জয়ের উদ্দেশ্যে সিরিয়ায় রওয়ানা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। সিরিয়ায় পৌঁছে তিনি মুসলিম সেনাপতিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। আবু উবায়দাহ রা. উমর রা.-এর সঙ্গে পায়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। উমর রা.-ও পায়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। আবু উবায়দাহ রা. উমর রা.-এর হাতে চুমু খেতে চাইলেন, তখন উমর রা. তাঁর পায়ে চুমু খেতে উদ্যত হলেন। উমর রা. আবু উবায়দাহ রা.কে তাঁর হাতে চুমু খেতে দিলেন না, ফলে আবু উবায়দাহ রা.ও তাঁকে তাঁর পায়ে চুমু খেতে দিলেন না। উমর রা. বাইতুল মুকাদ্দাসের কাছে পৌঁছে খ্রিস্টানদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করলেন। তিনি শর্ত দিলেন যে, তিন দিনের মধ্যে সকল রোমান নাগরিক বাইতুল মুকাদ্দাস ছেড়ে চলে যাবে। তিনদিন পর তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করলেন। এ-দরজা দিয়েই রাসূলুল্লাহ সা. মিরাজের রাতে প্রবেশ করেছিলেন।

সুলতান সালাহউদ্দিন কর্তৃক বাইতুল মুকাদ্দাস জয়
খ্রিস্টান-অধ্যুষিত ইউরোপ বহু প্রাচীন কাল থেকেই ইসলামের বিরুদ্ধে চরম বিদ্বেষাপন্ন ছিলো; পুরুষের পর পুরুষ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে আসছিলো। প্রাচ্যের পবিত্র স্থানগুলো এবং হযরত ঈসা মাসিহ আ.-এর জন্মস্থানও তাদের কর্তৃত্বাধীন চলে গিয়েছিলো। কয়েকটি শক্তিশালী ইসলামি সাম্র্রাজ্যের উপস্থিতি এবং তাদের পার্শ্ববর্তী খ্রিস্টান-অধ্যুষিত রাষ্ট্রসমূহে উপর্যুপরি আক্রমণের ফলে খ্রিস্টানরা শাম (সিরিয়া), ফিলিস্তিন বা কোনো ইসলামি রাষ্ট্রের দিকে চোখ তুলে তাকাতে সাহস পাচ্ছিলো না। তবে তারা সালজুক সাম্রাজ্যের পতন এবং ইসলামি সা¤্রাজের উত্তর সীমান্তের দুর্বলতা লক্ষ করে সাহসী ও প্রত্যয়ী হয়ে উঠলো। সেই সময় তারা পুরোহিত সেন্ট পিটার্সের ব্যক্তিত্বে এক অনলবর্ষী বক্তা ও প্রভাবসঞ্চারী ধর্মীয় উপদেশদাতা পেয়ে গেলো। তিনি তাঁর আগুনে ও গর্জানো বক্তৃতা দ্বারা খ্রিস্টান-বিশ্বের সাধারণ মানুষের রক্তে আগুন ধরিয়ে দিলেন এবং খ্রিস্টান দুনিয়ার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত ধর্মীয় মাতলামির এক উত্তাল তরঙ্গ সৃষ্টি করেন। আরো কিছু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ক্রুসেড যুদ্ধকে মানুষের কাছে শোভনীয় করে তোলে।
ক্রুসেডারদের প্রথম বাহিনী ৪৯০ হিজরিতে শামের (সিরিয়ার) দিকে অগ্রসর হয় এবং মাত্র দুই বছরের মধ্যে রিহা ও আন্তাকিয়া ও তাদের অধিকাংশ দুর্গে আধিপত্য বিস্তার করে। ৪৯২ হিজরিতে (১০৯৯ খ্রিস্টাব্দে) তারা বাইতুল মুকাদ্দাসও দখল করে নেয়। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে ফিলিস্তিনের বৃহৎ অংশ এবং সিরিয়ার উপকূলীয় এলাকা—আনতারাতুস, আক্কা, পূর্ব তারাবলুস (ত্রিপোলি) ও সাইদাও তাদের করতলগত হয়। বিখ্যাত ইংরেজি ইতিহাসবিদ স্ট্যানলি লেন পুল ইসলামি দেশগুলোতে ক্রুসেড যোদ্ধাদের অভিযানকে চিত্রিত করেছেন এভাবে : “ক্রুসেড যোদ্ধারা দেশগুলোতে ঢুকে পড়েছিলো যেভাবে কোনো লোক পুরনো জীর্ণ কাঠ ফেড়ে ফেলে। কিছুটা সময়ের জন্য হলেও মানুষের মনে এই ধারণার জন্ম হয়েছিলো যে, ক্রুসেডাররা অচিরেই ইসলাম-বৃক্ষের কা-কে দুমড়েমুচড়ে ফেলবে এবং তার শাখাপ্রশাখাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেবে।” [স্ট্যানলি লেনপুল, সালাদিন অ্যান্ড দ্য ফল অফ দ্য কিংডম অফ জেরুজালেম]

ক্রুসেডারদের হাতে বাইতুল মুকাদ্দাসের পতন মুসলিম জাহানের দুর্বলতা ও পতন এবং খ্রিস্টান বিশ্বের উত্থান ও ক্রমবর্ধমান শক্তির কথা ঘোষণা করছিলো। এটা ছিলো মুসলিম জাহানের জন্য ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের সতর্কবার্তা। সিরিয়া ও ফিলিস্তিনে চারটি খ্রিস্টান সা¤্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয় : জেরুজালেম, আন্তাকিয়া, তারাবলুস (ত্রিপোলি) ও রিহা। এটা ইসলামের কেন্দ্রভূমির স্বাধীনতার বিরুদ্ধে মূর্তিমান দুর্যোগ ও খোলা তরবারির আকার ধারণ করেছিলো। খ্রিস্টানদের ধৃষ্টতা ও দুঃসাহস এতটাই বেড়ে গিয়েছিলো যে, কির্ক-এর শাসনকর্তা রেজিনাল্ড পবিত্র মক্কা মুর্কারমা ও মদীনা মুনাওয়ারায় অভিযান চালানোর অভিপ্রায় ব্যক্ত করে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রওজা শরিফের ব্যাপারেও ধৃষ্টতাপূর্ণ মনোভাব ব্যক্ত করে।

ক্রুসেডাররা দীর্ঘ ৮৮ বছর বাইতুল মুকাদ্দাসের ওপর কর্তৃত্ব করে। অবশেষে সালাহউদ্দিন আইয়ুবী হিত্তিনের যুদ্ধজয়ের মধ্য দিয়ে বাইতুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধার করেন। হিত্তিনের যুদ্ধে মুসলমানদের জয়ের ফলে ফিলিস্তিনের খ্রিস্টান সা¤্রাজ্যের পতন ঘটে এবং ক্রুসেডারদের চূড়ান্ত পরিণাম নিশ্চিত হয়। ৫৮৩ হিজরি ২৪ই রবিউস সানি শনিবার (৪ জুলাই, ১১৮৭) এই যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে প্রকাশ্য বিজয় দান করেন।

ইতিহাসবিদ স্ট্যানলি লেনপুল যুদ্ধক্ষেত্রের চিত্র অঙ্কিত করেন এভাবে :
“এটা ছিলো মূলত চূড়ান্ত ব্যাপার। ফিরিঙ্গিরা কূপের উদ্দেশে রাস্তা তৈরির চেষ্টা করতে গিয়ে তাদের শেষ শক্তিটুকু নিঃশেষ করেছিলো। ‘সত্য ক্রুশকাষ্ঠ’—যা ক্লেশদীর্ণ অভিযাত্রা ও আশাহীন যুদ্ধে তাদের পতাকাসমূহের মাঝে ছিলো—অবিশ্বাসীদের (মুসলমানদের) হস্তগত হয়েছিলো। আক্কার যে-বিশপ এই ক্রুশকাষ্ঠ ঊর্দ্ধে তুলে ধরে রেখেছিলেন তিনি তাঁর দেহে বর্ম থাকা সত্ত্বেও নিহত হয়েছিলেন। মনে হচ্ছিলো, আল্লাহ তাআলা নিজেই তাদের পরিত্যাগ করেছেন। তারা তৃষ্ণায় পীড়িত এবং গরম ও কঠোর পরিশ্রমে বিধ্বস্ত হয়ে তাদের ঘোড়াগুলোকে ত্যাগ করেছিলো এবং নিজেদেরকে চরম হতাশায় তাপ-ঝলসানো ঘাসের ওপর নিক্ষেপ করেছিলো। এমন মুহূর্তে আরবরা তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো এবং তাদের পক্ষ থেকে কোনো রকম প্রতিরোধের চেষ্টা করা হয় নি। অশ্বারোহীরা প্রচ- ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো যে তাদের জীবনগুলো বিকিয়ে দিতে পারছিলো না : তারা তাদের অস্ত্র ত্যাগ করেছিলো।”

“খ্রিস্টান বাহিনীর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ বন্দি হয়েছিলেন। জেরুজালেমের রাজা গাই, তাঁর ভাই (দ্বিতীয় আমালরিক), কির্ক-এর শাসনকর্তা রেজিনাল্ড, জোসেলিন, হামফ্রে, নাইটস টেম্পলার ও নাইটস হসপিটার্লাস এবং আরো অনেক সম্মানিত ব্যক্তি বন্দি হয়েছিলেন। কাউন্ট র‌্যামন্ড আরবদের ব্যূহ ভেদ করে গিয়ে যখন দেখতে পেলেন যে, রাজা গাই বন্দি হয়েছেন,—যতদিন তিনি সুরে (Tyre) নিরাপদ ছিলেন লাগাম ছাড়েন নি—তখন তাঁর দুঃখ ও লজ্জায় মৃত্যুবরণ করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না। রূপকথাগুলো তাঁর স্মৃতির প্রতি তেমন সুবিচার করেনি। তিনি জুদাসে পরিণত হয়েছিলেন, যে-জুদাস খ্রিস্টান-জগতের সঙ্গে প্রতারণামূলক আচরণ করেছিলো। ভ্রাম্যমাণ অভিনেতা ও গীতিকারেরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বলে বেরিয়েছে যে, কীভাবে র‌্যামন্ড রাজা গাইয়ের বিরুদ্ধে হীন ষড়যন্ত্র করেছিলেন এবং ‘সত্যক্রুশ’ অবিশ্বাসীদের হাতে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। বালিয়ানও—যিনি অগ্রবর্তী সেনাপ্রহরায় ছিলেন—সাইদার রাজপুত্রের সঙ্গে পালিয়েছিলেন।”
“ফিলিস্তিনের অন্যান্য নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি মুসলমান রক্ষীদের হাতে ছিলেন। সাধারণ সৈন্যদের যারা জীবিত ছিলো তাদের সবাই বন্দি হয়েছিলো। একেকজন আরবকে দেখা যাচ্ছিলো তিরিশজন করে খ্রিস্টানকে বন্দি করে তাঁবুর রশি দিয়ে বেঁধে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। ভেঙে-যাওয়া ক্রুশকাষ্ঠ ও কর্তিত হাত-পাসমূহের মাঝে পাথরের ওপর পাথরের মতো মৃতদেহের স্তূপ পড়ে ছিলো। আর ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন মাথাগুলো পর্যাপ্ত তরমুজশস্যের মতো মাটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিলো। ময়দানে দীর্ঘদিন যাবৎ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের চি‎হ্ন থেকে গিয়েছিলো। বলা হয়ে থাকে, এই যুদ্ধে তিরিশ হাজার খ্রিস্টান নিহত হয়েছিলো। এক বছর পরও ধূসর হাড়গোড়ের স্তূপ দূর থেকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছিলো। পাহাড় ও উপত্যকাগুলোতে বন্য জন্তু-জানোয়ারের ভয়ঙ্কর ভোজনোৎসবের উচ্ছিষ্ট ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিলো।” [স্ট্যানলি লেনপুল, সালাদিন অ্যান্ড দ্য ফল অফ দ্য কিংডম অফ জেরুজালেম]


চলবে…