খোশ আমদেদ মাহে রমজান

 এহসান বিন মুজাহির তরুণ আলেম, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক


এহসান বিন মুজাহির
তরুণ আলেম, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক


পাপী-তাপীদের পাপমুক্তির মাহেদ্রক্ষণ পবিত্র রমজানুল মোবারক সমাগত। এ মাসের কল্যাণ মুক্তিপাগল বিশ্বাসী মানুষদের শুদ্ধতার নির্ঝরনী ফোয়ারায় স্নিগ্ধ করে তাদের হৃদয়কে। প্রতিটি মুমিন হৃদয়ে এ মাসটি বয়ে আনে জান্নাতি সমীরণ। মাহে রমজান হলো মুমিনদের জন্য ইবাদতের বসন্তকাল। আল্লাহপাক এ মাসে দিনে-রাতে মুমিনদের উপর অবারিত রহমতের বারিধারা বর্ষণ করেন। ইবাদতপাগল মুমিনদের জন্য মাগফিরাতের সকল আয়োজন প্রস্তুত করে রাখেন। মহান আল্লাহ তায়ালা নিয়ম অনুযায়ী কোন মাসকে অন্য মাসের উপর, কোন দিবসকে অন্য দিবসের উপর শ্রেষ্টত্ব দান করেছেন। তেমনি পবিত্র রমজানুল মোবারক হলো উৎকৃষ্ট মাসের অন্যতম একটি মাস। এ মাসে রাত-দিন সর্বদা মুমিনদের উপর রহমত বর্ষিত হয়। আমলের সওয়াব বহুগুণে বর্ধিত হয়। জান্নাতের দুয়ার খুলে দেয়া হয়। জাহান্নামের দুয়ার বন্ধ করে দেয়া হয়। পাপিষ্ট শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়। রহমত, মাগফিরাত ও মহামুক্তি দেয়া হয় বান্দাদের। রমজানে রয়েছে শবে কদরের রাত, যা সহ¯্র মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। এসব বৈশিষ্ট্যের অপূর্ব সমাহার মাহে রমজান। রমজান মাসকে ইবাদতের বসন্তকাল বলা যায়। এককথায় এ মাসটি ইবাদতের উর্বর মওসুম।ইবাদতের এ উর্বর সময়কে বান্দা যথায ঐকান্তিকতার সাথে কাজে লাগাতে পারলে সামান্য সাধনা, ক্ষুদ্র পরিশীলনী ও অনুশীলনী দ্বারা প্রশান্তির বারিধারায় স্নাত হয়ে হাসিল করতে পারবে মহান আল্লাহর মহাসন্তুষ্টি।

রমজান শব্দটি আরবি। ‘রমজুন’ শব্দ থেকে উৎগত হয়েছে। শাব্দিক অর্থ হচ্ছে, জ্বালিয়ে দেওয়া, ভষ্মীভুত হওয়া। যেহেতু রোজা পালনের মাধ্যমে মানুষের মনের ক্রোধ, কু-প্রবৃত্তি, হিংসা-বিদ্বেষ সব কিছু ভষ্মীভুত হয়ে যায়, তাই রোজার এ মাসকে রমজান মাস বলা হয়।
রোজা হচ্ছে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম একটি স্তম্ভ। রোজার শাব্দিক অর্থ হচ্ছে, বিরত থাকা। পরিভাষায় রোজা বলা হয় মহান আল্লাহর ফরজ নির্দেশ পালনের উদ্দেশ্যে সওয়াবের প্রত্যাশায় সুুবহে ছাদেক থেকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাওয়া-দাওয়া ও যাবতীয় পানাহার, স্ত্রী সঙ্গে সহবাস তথা যৌনাচার ইত্যাদি প্রভৃতি হতে বিরত থাক।

রোযার ফজিলত:
মহান আল্লাহ তায়ালা কুরআন কারিমে ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রমজানের রোজা ফরজ করা হয়েছে যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের যঁঁঁউপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে করে তোমরা মুত্তাকি হতে পার’। (সুরা বাকারা-১৮৩)

এ প্রসঙ্গে আল্লাহপাক ইরশাদ করেন, রমজান মাস, যাতে কুরআন নাযিল হয়েছে, যা মানুষের জন্য হিদায়েত এবং সুপথ প্রাপ্তির সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ আর হক্ব-বাতিলের মধ্যে পার্থক্যকারী। সুতরাং তোমাদের যে কেউ এ মাস পাবে সেযেন অবশ্যই এর রোজা রাখে। (সূরা বাকারা ১৮৫
হাদসি কুদসিতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, ‘আসসাওমু-লী ওয়া আনা আজযী’ অর্থাৎ রোজা আমার জন্য এবং আমি তার প্রতিদান দেব।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, রমজান মাস শুরু হলেই রহমতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া , জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া এবং শয়তানদেরকে শিকলে আবদ্ধ করা হয়’। (বুখারি, হাদিস নং. ১৮৯৮)

হজরত আবু সাঈদ খুদরী রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আল্লাহ তাআলা রমযান মাসের প্রত্যেক দিবস ও রাত্রিতে অসংখ্য ব্যক্তিকে জাহান্নাম ে থেকে মুক্তি দান করেন। এবং প্রত্যেক মুমিন বান্দার একটি করে দুআ কবুল করেন। ( মুসনাদে আহমদ, হাদীস ৭৪৫০)

হযরত কা’ব ইবনে উজরা রা. হতে র্বর্ণত, তিনি বলেন- একদা রাসূলুল্লাাহ সা. আমাদেরকে বললেন, তোমরা মিম্বরের নিকট সমবেত হও। আমরা সকলেই তথায় উপস্থিত হলাম। যখন তিনি মিম্বরের প্রথম সিড়িঁতে পা রাখলেন,তখন বললেন, আমীন, যখন দ্বিতীয় সিঁড়িতে পা রাখলেন বললেন, আমীন, যখন তিনি তৃতীয় সিঁিড়তে পা রাখলেন বললেন, আমীন। হযরত কা’ব ইবনে উজরা (রা.) বলেন, যখন তিনি (মিম্বর থেকে) অবতরণ করলেন, আমরা জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আজ আমরা (মিম্বরে উঠার সময়)আপনাকে এমন কিছু কথা বলতেশুনেছি, যা ইতিপূর্বে কখনো শুনিনি। উত্তরে তিনি বললেন, জিবরাইল আ. আমার নিকট আগমন করেছিলেন, যখন আমি প্রথম সিড়িঁতে পা রাখলাম, তখন তিনি বললেন, ধ্বংস হোক ঐ ব্যক্তি যে রমযান মাস পেল, তবুও তার গুনাহ মাফ হলো না। আমি বললাম, আমীন। যখন দ্বিতীয় সিড়িঁতে পা রাখলাম তখন বললেন, ধ্বংস হোক ঐ ব্যক্তি যার নিকট আপনার নাম উচ্চারিত হল অথচ সে আপনার প্রতি দরূদ পাঠ করলো না। আমি বললাম আমীন। যখন তৃতীয় সিড়িঁতে পা রাখলাম, তখন বললেন, ধ্বংস হোক ঐ ব্যক্তি যে বৃদ্ধ পিতা-মাতা উভয়কে অথবা একজনকে পেল অথচ তারা উভয় তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারল না। অর্থাৎ তাদের খেদমতের মাধ্যমে নিজেকে জান্নাতবাসী করতে পারলো না। আমি বললাম, আমীন। (মুসলিম হাদীস নং-২৫৫১ ও তিরমিজি হাদীস-৩৫৪৫)

হযরত আবু হুরয়রা (রা.) বলেন, রমযান মাস লাভকারী ব্যক্তি-যে উত্তমরূপে সিয়াম ও কিয়াম (রোযা, তারাবী ও অন্যান্য আমল) পালন করে-তার প্রথম পুরস্কার এই যে, সে রমযান শেষে গুনাহ থেকে ঐ দিনের মতো পবিত্র হয় যেদিন মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল। (-মুসলিম, হাদীস-৮৯৬৬)
হযরত সালমান ফারসী (রা:) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, মহানবী (সা:) শা’বান মাসের শেষ দিন আমাদেরকে সম্বোধন করে ইরশাদ করেন, ‘হে লোক সকল! তোমরা মনযোগ দিয়ে শোনে রাখ, তোমাদের সামনে এমন একটি মাস সমাগত। যে মাস মহা পবিত্র, রহমত-বরকত ও নাজাতে ভরপুর। এই মাসের রোযাকে আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপর ফরজ করেছেন। যে লোক এই মাসে আল্লাহর সন্তুষ ও তার নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে রোযা রাখবে আল্লাহ তার পূর্ববর্তী সমস্ত গোনাহ মাফ করে দিবেন। (- বুখারি শরীফ)

যে ব্যক্তি এ মাসে একটি ফরজআদায় করবে সে সত্তর টি ফরযের সওয়াব পাবে, আর যে ব্যক্তি একটি সুন্নাত আদায় করবে সে একটি ফরযের সওয়াব পাবে, আর যে একটি নফল আদায় করবে সে একটি সুন্নাতের সওয়াব পাবে। এই মাসে আল্লাাহ তা’য়ালা পূণ্যকে বর্ধিত করতে থাকেন। এই মাসে যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে ইফতার করাবে আল্লাহ তায়ালা তার গুনাহ মাফ করে দিবেন, আর সে ব্যক্তিকে রোযাদারের সওয়াব দিবেন। কিন্তু সে জন্য প্রকৃত রোযাদারের সওয়াবের মধ্যে কোন কমতি করা হবে না। (বুখারি)

মহনবী সা:) ইরশাদ করেন, ‘আসসাওমু জুন্নাতুন মিনাননার’ অর্থাৎ রোযা প্রকৃত ঈমানদারের জন্য ঢাল সরূপ। (মিশকাত শরীফ)।
মহানবী (সা:) ইরশাদ করেন, ‘রমজান মাসের প্রথম রাত উপনীত হলেই মহান আল্লাহ তা’য়ালা শয়তানও দুষ্ট জ্বিনগুলোকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন। জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেন এবং জান্নাতের দরজা খুলে দেন’। (- তিরমিযি শরীফ)
হযরত আবু হুরায়রা (রা:) হইতে বর্ণিত নবী করিম (সা:) ইরশাদ করেন, রোযাদারের মুখের দূর্গন্ধ আল্লাহর নিকট মেশকে আম্বরের সুগন্ধের চেয়েও অনেক উৎকৃষ্ট’। (-বুখারি শরীফ)

হজরত সাহল (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা:) ইরশাদ করেন কিয়ামতের দিন রোযাদারদের জন্য বেহেশতের একটি দরজা ‘রাইহান’ যা দিয়ে তাদেরকে সর্ব প্রথম প্রবেশ করতে দেওয়া হবে। রোযাদার ছাড়া আর কেউ উক্ত দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। (-তিরমিযি শরীফ)
হযরত যায়েদ ইবনে খালেদ আলজুহানী রা. হতে বর্ণিত, রাসুল (সা.) আলাইহি ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি কোনো রোযাদারকে ইফতার করাবে, সে তার (রোযাদারের) অনুরূপ প্রতিদান লাভকরবে। তবে রোযাদারের প্রতিদান হতে বিন্দুমাত্রও হ্রাস করা হবে না। (তিরমিজি, হাদীস-৮০৭)
আল্লাহপাক আমাদেরকে মাহে রমজান ও রোজার যথাযথ হক আদাযের তাওফিক দান করুন।