ধর্মীয় কর্মকান্ডে অন্যায্য হস্তক্ষেপ বন্ধ করুন: শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী

শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফীদারুল উলুম হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক হেফাজতে ইসলামের আমীর শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করবেন না। মানুষকে সাহসের সাথে তাদের পছন্দ অপছন্দের কথা নির্দ্বিধায় প্রকাশের সুযোগ দিন। ধর্মীয় কর্মকা-ে অন্যায্য হস্তক্ষেপ বন্ধ করুন। মুসলমানদের ঈমানী চেতনাবোধ বিলুপ্তকরণ ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সকল ষড়যন্ত্র বন্ধ করুন। গতকাল (শুক্রবার) হাটহাজারী মাদরাসার বার্ষিক মাহফিল ও দস্তারবন্দী সম্মেলনে সভাপতির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। সর্বস্তরের অগণিত মানুষের অংশগ্রহণে আখেরী মোনাজাতের মাধ্যমে এ মাহফিল শেষ হয়। এতে প্রবীণ আলেমে দ্বীন আল্লামা শফী আরও বলেন, ঈমানী চেতনাবোধের অভাব, আদর্শহীনতা, কথায় কথায় মিথ্যাচারের সংস্কৃতির কারণেই দেশ গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। সমাজের নেতৃত্বদাতা ও বিত্তশালীদের মধ্যে ভোগবাদী মানসিকতা, নীতি-নৈতিকতার অভাব ও শোষণ, অন্যদিকে শাসকশ্রেণীর মধ্যে ক্ষমতা লিপ্সা বেড়ে গেছে। এ কারণে দেশ ও জাতীয় স্বার্থের প্রতি চরম অবজ্ঞা পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাতে জনগণের মধ্যে চরম হতাশাবোধ তৈরি হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে সকল ক্ষেত্রে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, ব্যক্তি থেকে শুরু করে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মীয় অনুশাসন তথা ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল বর্তমান সংকট থেকে মুক্তি পেতে আল্লাহর সাহায্য আশা করা যায়। তিনি বলেন, ঈমানী দুর্বলতা ও অনৈক্যের সুযোগে দেশী-বিদেশী ইসলামের শত্রুরা নানা অপপ্রচার, ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়িয়ে মুসলমানদের ঈমানী চেতনা ধ্বংস করার গভীর ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, বেহায়াপনা, উলঙ্গপনা ও নারী-পুরুষের অবাধ চলাফেরার বিস্তারর ঘটিয়ে তরুণ সমাজকে বিভ্রান্ত ও ধর্মহীন করে তুলতে চাইছে। ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ওলামায়ে কেরাম, মাদরাসা শিক্ষা ও দাড়ি-টুপীধারীদের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার, কাল্পনিক তথ্য ও চক্রান্ত চালিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চলছে। মাহফিলে আরো বক্তব্য রাখেন হেফাজতে ইসলামের সিনিয়র নায়েবে আমীর আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী, মাওলানা তফাজ্জুল হক হবিগঞ্জী, মুফতীয়ে আযম মুফতী নূর আহমদ, বিশিষ্ট মুহাদ্দিস ও হেফাজতের মহাসচিব আল্লামা হাফেজ মুহাম্মদ জুনায়েদ বাবুনগরী, আল্লামা নূরুল ইসলাম ওলীপুরী, মাওলানা সালাহ উদ্দীন নানুপুরী, মুফতী মোজাফফর হোসাইন, মাওলানা সাজেদুর রহমান, মুফতী জসীম উদ্দীন, মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরী, মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া, মাওলানা আনাস মাদানী, মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম, মাওলানা নজির আহমদ, ড. আ ফ ম খালেদ হোসেন, মাওলানা আজিজুল হক মাদানী, মাওলানা নোমান মেখলী, মাওলানা মাহমুদুল হাসান প্রমুখ। আল্লামা আহমদ শফী তার বক্তব্যে কতিপয় মন্ত্রী, এমপি ও কর্তাব্যক্তির ওলামা-মাশায়েখ, কওমি মাদরাসা শিক্ষা, দাড়ি-টুপি, হিজাব, আযানসহ ইসলামী নিদর্শন ও বিধানের বিরুদ্ধে উক্তির তীব্র নিন্দা জানান। তিনি বলেন, দেশে তারা জনগণের স্বার্থ নিয়ে ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করার দাবি করছেন, অন্যদিকে তারা দেশের ৯০ ভাগ মুসলমানের ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের কথাবার্তায় মনে হয় তারা দেশের মুসলমানদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বিশেষ কোন গোষ্ঠিকে খুশী করতে চান। তিনি বলেন, ইসলামে অসত্য, অন্যায়, সন্ত্রাস ও ষড়যন্ত্রের স্থান নেই। ইসলাম ন্যায় ও শান্তির ধর্ম। ইসলামকে অনুসরণ করতে পারলে এদেশে কোন হানাহানি ও সন্ত্রাস থাকবে না। ইসলামী শিক্ষায়ও কোন প্রকার সন্ত্রাসের স্থান নেই। তিনি বলেন, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা নিজ নিজ ধর্ম পালন করলে এবং তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিলে কেউ মৌলবাদী, প্রগতিবিরোধী ও জঙ্গিবাদী হয় না। অথচ নামায আদায় ও দাড়ি-টুপী পরলে অথবা ইসলাম ধর্মীয় কোন আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নিলেই প্রগতি বিরোধী, দেশবিরোধী ও মৌলবাদীর রঙ লাগানো হয়। এটা চরম অন্যায় ও ইসলাম বিরোধী ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়। মাহফিলে জুনায়েদ বাবুনগরী দেশে নাস্তিকতা ও ইসলামবিদ্বেষকে পরিকল্পিতভাবে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে অভিযোগ এনে বলেন, সংবিধান থেকে আল্লাহর উপর আস্থা-বিশ্বাসের নীতি বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়ার শুরু থেকেই দেশের আলেম সমাজ ও তৌহিদী জনতা এমন আশংকা থেকেই এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল। অথচ সরকার কোটি কোটি তৌহিদী জনতার মতামতের প্রতি কোনরূপ তোয়াক্কা না করেই সংবিধান সংশোধন করে ধর্মনিরপেক্ষ নীতি চালু করে। যার কুফল হিসেবে শুধু নাস্তিক্যবাদীদের মুখে নয়, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কর্তাব্যক্তিরাও প্রকাশ্যে ইসলাম, ওলামা-মাশায়েখ ও মাদরাসা শিক্ষাবিদ্বেষী ও অবমাননাকর বক্তব্য দিতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, রাজনীতিতে এখন সত্যের মতো করে মিথ্যার চর্চা চালু হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে নেতৃত্বশূন্য করার পর ক্ষমতাসীন মহল এবার দেশের আলেম সমাজ ও কওমি মাদরাসার দিকে নজর দিয়েছে। কথায় কথায় তারা কওমি মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক ও আলেমদের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদের অভিযোগ এনে অপপ্রচার চালাচ্ছে। জনগণ থেকে আলেমদের বিচ্ছিন্ন করার নানা ষড়যন্ত্র করছে। শহর-বন্দর থেকে শুরু করে গ্রামগঞ্জ পর্যন্ত ইসলামী সম্মেলন, তাফসীর মাহফিল, ওয়াজ-মাহফিলসহ ধর্মীয় যে কোন অনুষ্ঠান আয়োজনে অনুমতির বিধান চালু করে ইসলামী কর্মকা- সংকুচিত করার চেষ্টা করছে। সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে জুমার খুতবা নিয়ন্ত্রণ, মসজিদের ইমাম-খতীব ও কওমি মাদরাসায় গোয়েন্দা নজরদারির কথা বলা হচ্ছে। প্রসঙ্গত, বার্ষিক মাহফিলের পাশাপাশি দস্তারবন্দী সম্মেলন বা বিশেষ সমাবর্তনে দারুল উলুম হাটহাজারী মাদরাসা থেকে দাওরায়ে হাদীস (টাইটেল) উত্তীর্ণ আড়াই হাজার তরুণ আলেমকে প্রতিষ্ঠানের নাম ও মনোগ্রাম খচিত বিশেষ সম্মানসূচক পাগড়ি প্রদান করা হয়। পাগড়ী প্রদান করেন হেফাজত আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফীসহ প্রতিষ্ঠানের মুহাদ্দিসবৃন্দ। এ মাহফিল ওলামা-মাশায়েখ ও তরুণ আলেমদের মিলন মেলায় পরিণত হয়।