বাবাকে নিয়ে ওয়ালি উল্লাহ আরমানের আবেগঘন ফেসবুক স্ট্যাটাস

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | সোস্যাল মিডিয়া ডেস্ক


এই উপাখ্যান একজন মুখলিস, ত্যাগী আর সংগ্রামীর


ওয়ালি উল্লাহ আরমান


গল্পটা ৭০ বছর পূর্বের৷ বড় সংগ্রাম, সংযম, ত্যাগ আর কষ্টে ভরা জীবন তার৷ ১২ বছরে মাকে হারিয়েছে৷ বাবা থাকেন চিংড়াখালী থেকে বহু দূরে মাদারীপুরের এক গ্রামের মসজিদ-মক্তবে৷

কোনো ভাই নেই৷ মা মারা যাবার পর ‘আদরের কালা ভাইটিকে’ মেজো বোন নিজ শ্বশুর বাড়ি নিয়ে যান৷ পরিধেয় বলতে একটা হাফপ্যান্ট আর পুরাতন একটা মাত্র শার্ট৷ সেগুলো পরেই প্রাইমারি স্কুলে যান৷

কিছুদিন পর গহরডাঙ্গা মাদরাসায় হেদায়া/জালালাইন জামাতের ছাত্র চাচাতো ভগ্নিপতি মরহুম মাওলানা ইউসুফ(পিরোজপুর টগড়া বাড়ি) এসে তাকে নিজের সাথে পড়ার জন্যে গহরডাঙ্গা নিয়ে যান৷ দেওবন্দী মাদরাসার চৌকাঠে সেই প্রথম পা রাখেন তিনি৷ যুগশ্রেষ্ঠ বুজুর্গদের কাছে যাবার সেই শুরু৷ গহরডাঙ্গায় পড়ার সাথে সাথে দক্ষিণবঙ্গের বিখ্যাত মুহাদ্দিস হজরত মাওলানা আবুল হাসান যশোরী রহঃ এর খেদমত করেন৷ সেখান থেকে ঢাকা বড় কাটারা, ফরিদাবাদ পড়ে লাহোর যান কেরাতের সনদ নিতে৷ তিনি লাহোর থেকে দেশে ফেরার পূর্বে ২২ বছর বয়সে তার বাবাও দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন৷

পূর্ব পাকিস্তান ফিরেই তার নতুন পথচলা শুরু হয় মাদরাসায় পড়ানো এবং টিপু সুলতান রোড জোড়পুল লেন মসজিদে ইমামতির মাধ্যমে৷ ঢাকা জামালুল কুরআন, খুলনা খালিশপুর, চট্টগ্রাম ষোলকবহর (অাশির দশকে বেশ ক’বছর ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ফরিদাবাদ মাদরাসায়ও খেদমত করেছেন) মাদরাসায় মুদাররিসির পাশাপাশি ১৯৭০ সালে মিরপুর হরিরামপুরে ছোট্ট পরিসরে আরজাবাদ মাদরাসা শুরু করেন৷ যা পরবর্তীতে মুজাহিদে মিল্লাত হজরত মাওলানা শামছুদ্দিন কাসেমী রহঃ এর হাত ধরে বিশাল দ্বীনি মারকাজের রূপ পরিগ্রহ করে৷ যাকে আজকের পূর্ণত্বে পৌঁছাতে অবদান রাখেন হজরত মাওলানা মোস্তফা আজাদ রহঃ৷

হজরত মাওলানা শামছুদ্দিন কাসেমী রহঃ এর সাহচর্য ও নৈকট্য তার জীবনের গতিপথ আমূল বদলে দেয়৷ তিনি উপমহাদেশের শতাব্দীর ঐতিহ্যে লালিত আকাবির ওলামায়ে কেরামের সংগঠন জমিয়তে শামিল হন৷ সেই ১৯৬৬ সালে সিলেটে জমিয়তে উলামা পূর্ব পাকিস্তানের কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হবার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রবীণতম জমিয়ত কর্মীদের মাঝে তিনি অন্যতম৷ যদিও বার্ধক্যজনিত দুর্বলতায় বেশ ক’বছর যাবত সাংগঠনিক কাজে তৎপর নেই৷

তাযকিয়ায়ে নাফসের মেহনতে শামিল হন শায়খুল ইসলাম সায়্যিদ হোসাইন আহমদ মাদানী রহঃ এর সিলসিলার সাথে৷ গত পাঁচদশক শায়খুল ইসলাম মাদানী রহঃ এর পরিবারের যারাই বাংলাদেশ এসেছেন, তিনি সরাসরি তাদের সফরের ব্যবস্থাপনায় ছিলেন৷ কিন্তু বয়স তাকে এখন আর সফর করার সাহস দেয় না৷ এখন তিনি হজরতদের সাথে ঢাকার বাইরে কোথায় যেতে পারেন না৷ একই কারণে গত চারটি বছর তিনি নিজ গ্রামেও যেতে পারেননি৷

দ্বীনের তরে আজীবন মুখলিস ও ত্যাগী এই বুজুর্গ ৯জন সন্তানের পিতা৷ যাদের মাঝে ছোট দু’জন মারা গেছে৷ তিনি মাদরাসা-মসজিদ-দ্বীনি সংগঠনের খেদমতে জীবন কাটানোর সাথে সাথে সন্তানদের সবাইকে দ্বীনি শিক্ষা দিয়েছেন৷ পাঁচ ছেলের চারজন মাওলানা, একজন হাফেজ৷ একযুগ পূর্বে মারা যাওয়া ছোট মেয়েটি কুরআনের পূর্ণাঙ্গ হাফেজা ছিলো৷ মেজো মেয়েও আলেমা৷ দুই জামাতাই আলেম৷ চব্বিশ নাতি-নাতনির তিন/চারজন ব্যতীত সবাই মাদরাসায় পড়ছে৷ দুই আলেমা নাতনি বিয়ে দিয়েছেন হাফেজ মাওলানার কাছে৷

শৈশবের কথা স্পষ্টই মনে আছে, অনেকগুলো সন্তান৷ বিশাল বড় সংসার৷ উপার্জনক্ষম তিনি একা৷ জাগতিক বিবেচনায় আর্থিক টানাপোড়েন নিত্যসঙ্গী৷ কিন্তু মনের দিক দিয়ে তিনি বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি৷ পকেটে টাকা না থাকলেও মেহমানদারীর সুন্নাত পালনে তিনি কখনো পিছিয়ে থাকেননি৷ কারো সমস্যা অথবা বিপদে তিনি নিঃসঙ্কোচে তার পাশে দাড়িয়েছেন৷ নিজে রিক্তহস্তের হলেও বহু ব্যক্তি ও পরিবারের কাছে তার পরিচয় ‘পরম উপকারী৷’ রিকশা, ভ্যান, সেলাই মেশিন, ছোট্ট মূলধন প্রভৃতি সহায়তার মাধ্যম হয়ে তিনি বহু পরিবারকে স্বাবলম্বী হতে সরাসরি ভূমিকা রেখেছেন৷

ঢাকায় বসবাসের ৬০ বছর হয়ে গেলেও যে শূন্য হাতে এই শহরে এসেছিলেন, জাগতিক অর্থে এখনো সেখানেই রয়ে গেছেন৷ কিন্তু দ্বীনি বিবেচনায় অর্জনের পাল্লা বিশাল ভারী৷ আরজাবাদের পাশে ভাড়া বাসায় থাকেন এখনো৷ বিস্ময়কর ব্যাপার হলো প্রতিদিন ছয়তলা বাসার সিড়ি ভেঙ্গে ফজরের জামাতে যান৷ এভাবে দিনে চার/পাঁচবার হেটে হেটেও ছয়তলায় ওঠেন আবার নামেন৷ সকালে দুটি সবক পড়ান৷ এছাড়া এখন আর তেমন কোনো দৌড়ঝাঁপ করতে না পারলেও আরজাবাদ কর্তৃপক্ষ তাকে এখনো যথাযথ গুরুত্বের সাথেই মূল্যায়ন করেন৷ তারও একান্ত ইচ্ছা ওখানেই তিনি জীবনের শেষ মুহূর্তগুলি কাটাবেন৷

শৈশবে সন্তানদেরতে প্রায়ই তার কষ্টের অভিজ্ঞতা বলতেন৷ ফলে সন্তানরাও তার মতোই উচ্চাভিলাষমুক্ত মানসিকতায় বেড়ে উঠেছে৷
এটা ভুলিনি যে, তিনি প্রথম চামড়ার স্যান্ডেল কিনে দেন দশবছর বয়সে৷ সেকেন্ড হ্যান্ড হলেও জীবনে প্রথম চামড়ার জুতা পেয়ে কতোটা আনন্দিত হয়েছিলাম বলে বোঝাতে পারবো না৷
সেই দুনিয়াবিমুখ মহান ব্যক্তি চারদিন আগে ফোন দিয়ে বললেন, “তোমার জন্য এক জোড়া জুতা কিনেছি, মিরপুর এসে নিয়ে যেয়ো৷” কথাটি শোনার সাথে সাথে তার ত্যাগী, সংগ্রামমুখর জীবনেতিহাসের প্রতিটি বাঁকের কথা মনে পড়লো৷

১৯৮৫ সালে গুলিস্তান গোলাপ শাহ মসজিদ রক্ষা আন্দোলনে জুমার খুতবা দেয়ার সময় পুলিশের হিংস্র বেয়নেট চার্জে তিনি রক্ত ঝড়িয়েছেন৷ একই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে কারাবরণ করেন হজরত মাংলানা শামছুদ্দিন কাসেমী রহঃ৷

তার আরেকটি অর্জন সম্পর্কে কখনো লিখিনি৷ তা হলো, বেশ ক’বছর পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে দারুল উলূম দেওবন্দে ভর্তির জন্য যাওয়া ছাত্ররা আল্লামা কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ রহঃ কিংবা তার তাসদীকনামা নিয়ে যেতেন৷ এ প্রসঙ্গে একদিন লিখবো ইনশাআল্লাহ৷

এই ভূখণ্ডে ইসলাম, মুসলমান, আলেমওলামার নানা সন্ধিক্ষণ এবং মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালনকারী আমার প্রিয় বাবা কারী অাব্দুল খালিক আসআদী হাফিজাহুল্লাহর কথা বলছি৷ দীর্ঘদিন যাবত তিনি গুরুতর অসুস্থা তার সুস্থতা ও দীর্ঘ হায়াত কামনায় সবার দোয়া চাই৷