সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধদের কবলে বাঙালির প্রাণের নববর্ষ

মুহিব খান | সভাপতি, জাতীয় সাংস্কৃতিক জোট


পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন। এটি আমাদের নববর্ষ। এ সন মুসলিম শাসকদের দ্বারা প্রণীত, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালির জন্য।
বাংলা নববর্ষে বাংলার গ্রামে-গঞ্জে বৈশাখের মেলা ও নবান্নের আনন্দ উৎসবের অনানুষ্ঠানিক প্রচলন ছিলো। প্রচলন ছিলো সারাবছরের হিসাব নিকাষ মেটানো হালখাতার।
কৃষির দেশে নতুন ফসল তুলে কৃষকদের খুশি এবং কিছুটা স্বচ্ছলতার সুযোগে নারী পুরুষ ও শিশুদের বছরের দু’একটি করে নতুন কাপড়-চোপড় কেনা, আত্মীয় স্বজনের বাড়ীতে বেড়ানো, আইওরি নাইওরি, আর সন্দেশ বাতাসা জিলাপি গজা লাড্ডু মিষ্টি গুড় চিনি মুড়ি মুড়কি আর চূড়ি মালা দুল বালা শাড়ী লুঙ্গি খেলনার মেলা আর হাডুডু, দোলনা, চড়কির খেলা ছিলো গ্রামবাংলার বর্ষবরণের নির্মল পরিধি। এই বৈশাখ ছিলো সার্বজনীন। বর্ষবরণ ছিলো অসাম্প্রদায়িক।
সাম্প্রতিককালে কোটি কোটি বাঙালির এই প্রাণের উৎসব কিছু বিশেষ সাম্প্রদায়িক অপশক্তির রাহুর গ্রাসে তার অসাম্প্রদায়িক অবস্থান ও সার্বজনীন ঐতিহ্য হারাতে চলেছে।

তারা হিন্দু মুসলমানের সম্মিলিত জাতীয় উৎসবের ভেতর বিশেষ হিন্দুয়ানী রথযাত্রা দোলযাত্রা সাদৃশ্য ধর্মাচারের আদলে প্রতিমা মুখোশ ও আল্পনাবাহী মঙ্গলশোভাযাত্রার অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে একে সাম্প্রদায়িক রূপ দিয়েছে। ওরা বর্ষবরণে হিন্দুদের পূজা আরাধনায় বিশেষভাবে ব্যবহৃত মঙ্গল প্রদীপ, হিন্দুদের সংস্কৃতিতে পালিত রাখিবন্ধন, ভাইফোঁটা, ঢাক-ঢোলের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে বাঙালির এই প্রাণের মেলার সার্বজনীনতাকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে।
রাষ্ট্রের ছায়ায় মিডিয়ার সেবায় একে আনুষ্ঠানিকতায় বড় করে তুললেও ঐতিহ্য ও নিরপেক্ষতায় ক্ষুদ্র করে তুলেছে।

ইলিশ-পান্তার ভণ্ডামি রেওয়াজ চালু করে বাংলার দরিদ্র কৃষকসমাজ ও খেটেখাওয়া মানুষের সাথে বছরের পর বছর ইয়ার্কি তামাশা করেছে। বাংলা ও বাঙালিত্বের ঐতিহ্যের এই দিনে হিন্দি ও পশ্চিমা স্টাইলের মিউজিক কনসার্ট আয়োজন করে বাঙালির সংস্কৃতিকে অপমানিত করেছে। জাতীয় পতাকার লাল সবুজকে বাঁয়ে ফেলে, হিন্দু সংস্কৃতির বিশেষ উপাদান- সিঁদুরের লাল আর শাখার সাদা রঙকে বাংলা বর্ষেবরণের প্রতিপাদ্য রংয়ে প্রতিষ্ঠিত করার গোপন অশুভপ্রয়াস চালিয়েছে।
অথচ এদেশের মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব ঈদের মতো এদেশের হিন্দুদেরও ধর্মীয় উৎসব পূজো রয়েছে। যার যার ধর্মীয় ঐতিহ্য সংস্কৃতি পালনের আলাদা আলাদা আয়োজন রয়েছে। বৈশাখের উৎসবটি সকলের। সেক্ষেত্রে সার্বজনীন এ বৈশাখ পালনে এদেশের নব্বই ভাগেরও বেশি মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় সংস্কৃতির কোনোরূপ প্রভাব ফেলার কোনো চিন্তা বা চেষ্টা কখনও কেউ করেনি অথচ একটি সাম্প্রদায়িকচক্র দেশের ৬/৭ ভাগ হিন্দু জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় সংস্কৃতির নানা অনুসঙ্গকে বৈশাখের আবশ্যিক রীতি রেওয়াজে প্রতিষ্ঠিত করতে রাষ্ট্রকে অপব্যবহার করে এবং অসত মিডিয়ার শতভাগ সঙ্গ নিয়ে গোটা জাতিকে ব্যাপকভাবে এতে অভ্যস্ত করার দূরভিসন্ধিতে লিপ্ত হয়েছে।

বাঙালির চিরায়ত সম্প্রিতির বাঁধনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, নববর্ষের অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ ধ্বংস করে, একটি জাতীয় উৎসবের সার্বজনীনতাকে নষ্ট করে জাতিকে বিভক্ত করার এ সুদূরপ্রসারী নিগুড় ষড়যন্ত্রের পৃষ্ঠপোষক সাম্প্রদায়িক মহলটিকে এই অশুভ প্রয়াস থেকে এখনই নিবৃত করতে রাষ্ট্র ও সরকারের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। দেশবাসীর প্রতি এই সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ অপশক্তিকে চরমভাবে বয়কট করার আহবান জানাচ্ছি।
বৈশাখ বাঙালির, বৈশাখ সকলের।
সব পথ রুখে দাও জোর করে দখলের।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম -এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখকের মতামতের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না ইনসাফ কর্তৃপক্ষ।