ধর্ষণ নিয়ে সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি ও একজন তাসলিমা নাসরিন

ধর্ষণ নিয়ে সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি ও একজন তাসলিমা নাসরিন

 


আবদুল্লাহ আল ফারুক
লেখক, অনুবাদক ও শিক্ষক



আমরা একটা অসুস্থ পৃথিবীতে বাস করছি। সৃষ্টিকর্তা বসবাসের জন্যে আমাদেরকে একটি সুন্দর পৃথিবী দিয়েছিলেন। বাসযোগ্য পৃথিবীতে সুন্দরভাবে বসবাস করার প্রয়োজনীয় সকল উপাদানও তিনি দিয়েছেন; কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, সেই সুন্দর পৃথিবী খুব দ্রুত বসবাসের অযোগ্য হতে চলেছে।

আমরা এমন এক নষ্ট সময় পার করছি, যেখানে খুব কম লোকই নিজেকে নিরাপদ মনে করে। পত্রিকার পাতা মেললেই দেখা যায় শিশুর ওপর পাশবিক নির্যাতনের বিভৎস সংবাদ। সাম্প্রতিক সময়ে যে সংবাদটি আমাদেরকে ভীষণভাবে পীড়া দিয়েছে তা হলো, ভারত অধিকৃত কাশ্মিরের কাঠুরা গ্রামের ৮ বছর বয়সী শিশু আসিফাকে স্থানীয় মন্দিরের দেখাশুনার দায়িত্বরত কিছু লোক অপহরণ করে মন্দিরে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে অজ্ঞানের অষুধ খাইয়ে গণধর্ষণ করে। ওই লোকেরা শুধু এতটুকুতেই ক্ষ্যান্ত হয়নি; তারা মেয়েটিকে হত্যা করে মন্দিরের পাশের একটি ঝোঁপে ফেলে দেয়।

ঘটনাটি যদি এখানেই থেমে যেতো তাহলে হয়তো চলমান পৃথিবীর আরো আট-দশটি ধর্ষণ ও ধর্ষণ পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের মতো একসময় সবার স্মৃতির আড়ালে চলে যেতো। হয়তো ধর্ষক ও খুনীদের প্রচলিত আইনে বিচার হতো কিংবা হতো না। নিত্য নতুন ইস্যুর ডামাঢোলে বিষয়টি সর্বসাধারণের চাঞ্চল্য হারিয়ে অতীতের অংশ হতো।

কিন্তু এখানে তা হয়নি ভিন্ন এক কারণে। সেটা হলো শিশু আসিফার ওপর মন্দিরের বুড়ো পুরোহিত ও তার সহযোগীদের দিনের পর দিন গণধর্ষণ ও পরবর্তীতে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের এই ঘটনার পরপরই ভারতে এমন কিছু সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটেছে, যা দেখে বিশ্বের বিবেকমান মানুষেরা স্তম্ভিত ও উপর্যুপরি ক্ষুধ্ব।

যেহেতু ধর্ষণটি ঘটেছে একটি মন্দিরে এবং ধর্ষণের সঙ্গে সরাসরি মন্দিরের পুরোহিত ও তার আত্মীয়-স্বজন জড়িত; এজন্যে একটি বিশেষ মহল এই নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ওপর সাম্প্রদায়িকতার রং মাখতে চেয়েছে। তারা পদে পদে আইনি প্রক্রিয়ার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের বিশাল একটি কমিউনিটি এই বিচারপ্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে এসেছে। আগুন জ্বালিয়ে, শ্লোগানে শ্লোগানে প্রকম্পিত করে দেশে চরম অরাজকর পরিস্থিতি সৃষ্টির হুমকি দিচ্ছে। অন্যায়ের পক্ষে তাদের এই সাম্প্রদায়িক অবস্থান বিশ্বের বিবেকবান মানুষদেরকে আহত করছে।

আমরা যদি এই ঘটনার সমান্তরালে খুব অল্প কদিন আগে ঘটে যাওয়া আরেকটি ঘটনাকে তুলনা করি তাহলে হয়তো অবাক না হয়ে পারব না। মাসখানেক আগে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলে একটি একপক্ষীয় দাঙ্গা হয়েছে। সেই দাঙ্গায় সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের চারজনের মৃত্যুর সংবাদ আমরা পেয়েছি। সেই নিহতদের একজন হচ্ছেন সেখানকার স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম মুহাম্মদ ইমদাদুল্লাহ রাশিদির ছেলে। তিনি যখন দেখলেন, তার ছেলের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিহিংসার খেলা শুরু হতে পারে, তখন তিনি অসাধারণ উদারতা দেখিয়ে পুরো মুসলিম কমিউনিটিকে শান্ত থাকার আহ্বান জানালেন। তিনি মৃত্যুকে সাম্প্রদায়িক রূপ না দিয়ে বৃহত্তর স্বার্থে উন্মুক্ত ক্ষমার ঘোষণা জানিয়ে দিলেন। তার একটি মাত্র আহ্বান থামিয়ে দিলো আরেকটি রক্তগঙ্গা। তিনি ইচ্ছে করলে, ছেলের নৃশংস হত্যার বিচার চাইতে পারতেন। এটি তার আইনি অধিকারও বটে। কিন্তু তিনি সেই পথে যাননি; বরং শান্ত ভারত গড়ার বৃহত্তর স্বার্থে জলাঞ্জলি দিলেন নিজের প্রাপ্য অধিকার।

এটাই ইসলামের শিক্ষা। ইসলাম তো সারা পৃথিবীর মানুষকে ভালোবাসতে বলে। ইসলাম তো যুদ্ধের ময়দানেও নারী ও শিশুদের ওপর অস্ত্র প্রয়োগ করতে নিষেধ করে। আপনি বলুন, আসানসোলের ওই ইমাম সাহেব নৈতিকতা ও উদারতার এ শিক্ষা কোথায় পেয়েছেন? ইসলাম থেকেই পেয়েছেন। ইসলামই তাকে রক্তপাত এড়িয়ে সৌহার্দ্যমূলক সহাবস্থানের শিক্ষা দিয়েছে। আজ যদি তারাও আসিফার খুনীদের বেলায় সেই সাম্প্রদায়িক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বিবেকের মাপকাঠি দিয়ে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতো তাহলে নোংরা সাম্প্রদায়িকতাদুষ্ট রাজনীতির এমন বিভৎস দৃশ্য আমাদের দেখতে হতো না।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ধর্ষণ নিয়ে এমন নোংরা রাজনীতি যদি শুধু অনগ্রসর অশিক্ষিত ও উগ্র লোকেরাই করত তাহলে আমরা ওতোটা সংক্ষুধ্ব হতাম না। কিন্তু আমাদের সবাইকে অবাক করে আজ বাংলা ট্রিবিউন পত্রিকায় তাসলিমা নাসরিনের একটি কলাম পড়লাম। কলামটিতে তিনি ধর্ষণের এই ঘটনাটিতে মূল অপরাধী ও তাদের পক্ষে নেমে আসা সাম্প্রদায়িক শক্তির বর্বরতাকে লঘু করার চেষ্টা করেছেন। যেখানে একজন নাগরিক হিসেবে তার দায়িত্ব ছিল নিপীড়িতের পক্ষে বলা এবং অপরাধী যেই হোক, তার বিরুদ্ধে স্বরব হওয়া, সেখানে তিনি উল্টো নির্যাতিত আসিফার সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নেমে এসেছেন। এমনকি তিনি ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়ে মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ধর্ষক দাবি করেছেন। তিনি তার কলামে পরিষ্কার লিখেছেন, ‘পয়গম্বর মুহাম্মদ আরব দেশে ইহুদি পুরুষদের মেরে ইহুদি মেয়েদের নিজের জঙ্গি সঙ্গীদের মধ্যে ভোগ করার জন্যে বিতরণ করেছিলেন।’

প্রচণ্ড  দুঃখ লাগে, যখন তাসলিমা নাসরিনের মত ধর্মবিদ্বেষীরা এভাবে কাটা ঘায়ের ওপর লবণ ছিটাতে কলম তুলে নেয়। যেখানে তার দায়িত্ব ছিল, মূল অপরাধীর ওপর ফোকাস করা এবং অপরাধ পরবর্তী সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পের বিরোধিতা করা, সেখানে তিনি অপরাধীর অপরাধকে লঘু করার জন্যে নির্যাতিত ভিকটিমের ধর্ম ও ধর্মের মহান মনীষীদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করছেন। তিনি কী করেছেন,
১. বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরিত্রে কালিমা লেপন করলেন।
২. তিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহান সহচরদের সাহাবায়ে কেরামের প্রত্যেককে জঙ্গি বলেছেন।

তার এই মিথ্যা অপবাদ সারা দেশের বিবেকবান লোকদেরকে আহত করেছে। শুধু ধার্মিক মুসলমানই নন; সাধারণ জনগণও তার ইতিহাস নিয়ে এই কানামাছি খেলার কারণে কষ্ট পেয়েছে।

তাসলিমা নাসরিন বরাবরই ইস্যু নিয়ে খেলতে ভালোবাসেন। যেকোনো ইস্যুকে তিনি ইসলামধর্মের বিরুদ্ধে গোঁজামিল দিয়ে ছুড়তে ভালোবাসেন। এই নোংরা খেলায় তিনি তার বিবেক, নৈতিকতা ও নাগরিক দায়বদ্ধতাকে বিসর্জন দিতেও দ্বিধা করেন না। বড় ভালো হতো, তিনি যদি আট বছরের ছোট্ট শিশু আসিফার ওপর এই গ্যাংরেপ ওহত্যাকাণ্ডের ইস্যুটিকেও তার বিকৃত খেলার হাতিয়ার না বানাতেন।

তিনি এই নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে মুখ খুলবেন, কি খুলবেন না, তার ইচ্ছা। কিন্তু এই ইস্যুকে হাতিয়ার বানিয়ে চৌদ্দশ বছর আগের একজন মহান পয়গম্বরের নিষ্কলুষ চরিত্রের ওপর কালিমা লেপনের এই খেলা তিনি না খেললেও পারতেন।

একটু দেরিতে হলেও বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ বিতর্কিত লেখিকা তাসলিমা নাসরিনের এই অসৎ রচনার বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন। তারা ইতোমধ্যে সম্পাদকের কলমে বিষয়টির জন্যে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। আমরা পত্রিকাটির কর্তৃপক্ষের কাছে আশা করব, তারা ভবিষ্যতের জন্যে সতর্ক হবেন। বিতর্ককে উপজীব্য করে যারা সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিয়ে দেশে অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে চায়, সেই তাসলিমা নাসরিনরা যতদিন পর্যন্ত এ ধরনের অসততা পরিহার না করবে, ততদিন পর্যন্ত তারা তাদের পত্রিকায় এমন পতিত লেখকদের লেখা স্থান দেবে না।

আশা করি, দেশের প্রতি, দেশের নাগরিকদের বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধার জায়গা থেকে পত্রিকাটি এই সৎসাহস দেখাবে।