মুসলমানরা কেন প্রতিযোগীতায় পিছিয়ে পড়ছে?

জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমান


 মেজর জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমান কলামিস্ট ও প্রাক্তন মহাপরিচালক বিডিআর


মেজর জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমান

কলামিস্ট ও প্রাক্তন মহাপরিচালক বিডিআর


বহুদিন ধরে শুনে আসছি জ্ঞান বিজ্ঞানে অগ্রসর না হবার কারণে মুসলমানরা বিশ্বে প্রতিযোগীতায় পিছনে পড়ে যাচ্ছে। এবিষয়ে অনেক চিন্তা ভাবনা করে দেখার পরে আমার কাছে মনে হয়েছে মুসলমানদের অনগ্রসরতার মূল কারণ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অনগ্রসরতা নয়। এর কারণ বহুবিধ। শুধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে মুসলমানদের জ্ঞানের অপ্রতুলতা নয়। আজকে মুসলমান বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যাবে ধনে সম্পদে মুসলমানরা উন্নত বিশ্বের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এখন ইচ্ছা করলে যে কোনো দেশ বিশেষ কিছু স্পর্শকাতর প্রযুক্তি ছাড়া অতি সহজেই উন্নত প্রযুক্তি অর্জন করতে পারে। বিজ্ঞানের দরজাও এখন সবার জন্য খোলা। তাহলে মুসলমানদের অনগ্রসরতার মূল কারণসমুহ কি?

আমার কাছে মনে হয়েছে মুসলমানদের অনগ্রসরতার মূল কারণ নিহত রয়েছে ধর্ম বিমুখতার মধ্যে। আমি ধর্ম বিমুখতা বলতে বুঝাতে চেয়েছি যা ধর্মীয় ভাবে সত্য মনে করে বিশ্বাস করার পরেও তার বিপরীতে নিজের ব্যক্তি এবং রাষ্ট্র জীবন পরিচালনা করা। অর্থাৎ কোরআনুল হাকিমের নির্দেশের বিরুদ্ধে নিজস্ব অথবা যারা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস করেনা তাদের প্রেসক্রিপ্সন অনুযায়ী ব্যাক্তি , রাজনৈতিক কর্মকান্ড ও রাষ্ট্র পরিচালনা করা। এটা কি যুক্তিসংগত আমি মক্কা যাব কিন্তু পথ ধরেছি ওয়াশিংটনের? তাতেতো আমি মক্কা পৌছবোনা। এর ফলশ্রুতিতে মুসলমানদের মধ্যে এবং সমাজ জীবনে জন্ম নিয়েছে নানা অসঙ্গতি। এই অসঙ্গতির কারণে অত্মকলহে মুসলমানরা যেমন পর্যুদস্ত অন্যদিকে এর পূর্ণ সুযোগ গ্রহন করছে ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রুরা। আজকে পরিহাসের বিষয় হচ্ছে মুসলমানের পরম বন্ধু হচ্ছে অমুসলিমরা যারা প্রতিনিয়ত এর সুযোগ গ্রহণ করে মুসলমানদের সম্পদ লুটেপুটে খাচ্ছে। শুধু খৃষ্টান বিশ্বের ষাট হাজার ধর্ম প্রচারক ইসলামের বিরুদ্ধে বিশ্বময় প্রতিদিন প্রচারনা চালাচ্ছে। গত একশত বছরে প্রায় ষাট হাজার বই লিখেছে অমুসলিমরা ইসলাম ও মুসলমানদের হেয় প্রতিপন্ন করতে। এখনও প্রতিদিন ইসলামের বিরুদ্ধে বিষোদগার করা হচ্ছে। কেন অমুসলিমরা এমন ইসলাম এবং মুসলিম বিরোধিতায় লিপ্ত? এর একমাত্র কারণ মুসলমানদের ইসলাম ধর্ম ও ধর্মীয় জীবন ব্যবস্থা থেকে ব্যাক্তি ও রাষ্ট্রকে অলাদা করে মুসলমানদের কন্ট্রাডিক্সনে ফেলে তাদের বিশ্বাসের মূল স্তম্ভকে নড়বড়ে ও দুর্বল করে পদতলে পিশে ফেলা। ফলশ্রুতিতে আজ কি আলেম কি আধুনিক শিক্ষিত উভয় কমিউনিটি একে অপরের প্রতি একটা চরম অবিশ্বাস ও মারমার কাটকাট অবস্থায় নিপতিত। এটাই মুসলমানের দুশমনরা চায়। এবং দম দেয়া পুতলের মতো আমরা কোন অজানা সুতোর টানে এবং সুরে কর্তার ইচ্ছায় কর্ম করে একটা চরম শর্বনাশের দিকে ধাবিত হচ্ছি। এখন আমরা তুলনামূলক আলোচনা করে দেখবো বিশ্বের মুসলমানরা তাদের ধর্ম অর্থাৎ ইসলামের উপরে পুর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত নাথাকার কারনে কি ঘটছে?

এক।
সুরা বাকারা আয়াত বিয়াল্লিশে আল্লাহ সোবহানাহু তায়ালা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করতে কঠোর ভাবে নিষেধ করেছন :
And cover not Truth with falsehood, nor conceal the Truth when ye know (what it is). (Al-Baqara 2:42, English – Yusuf Ali)


আজকে বিশ্বে সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশে ফেলে ব্যাক্তি লাভালাভকে সবচেয়ে প্রাধান্য দিচ্ছে মুসলিম সম্প্রদায়। ফলে মুসলমানদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে দুর্নীতির প্রতিযোগীতা। আর একটা দুর্নীতিগ্রস্ত সম্প্রদায় জ্ঞান বিজ্ঞানে অগ্রসর হয়ে কোনোদিনও সামাজিক ভাবে উন্নত হতে সক্ষম হবেনা।

দুই।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে সুরা মায়েদার আট নম্বর আয়াতে ন্যায় বিচার এবং ন্যায় ও সত্য প্রতিপাদনের নির্দেশ দিয়েছেন যাতে সমাজ অসত্য দ্বারা কলুষিত নাহতে পারে:
O ye who believe! stand out firmly for Allah, as witnesses to fair dealing, and let not the hatred of others to you make you swerve to wrong and depart from justice. Be just: that is next to piety: and fear Allah. For Allah is well-acquainted with all that ye do. (Al-Maeda 5:8, English – Yusuf Ali)


আজকে আমরা মুসলমানরা কি ন্যায় বিচার করছি বিচারকের আসনে বসে? নাকি হলফ করে সত্য স্বাক্ষ দিচ্ছি? কোনটাই না। এতে মুসলিম সমাজ কলুষিত হয়ে সবল দুর্বলের উপরে জুলুমবাজি করছে। এমন সমাজকে বিজ্ঞানের জ্ঞান কাভাবে উন্নত করবে?

তিন।
সুরা নিসার একশত বারো নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক এরশাদ করেছেন তোমরা অন্যায় ভাবে অন্যের উপরে দোষ চাপিয়ে দিওনা। কিন্তু এর লঙ্ঘন আমরা হরহামেশাই দেখছি। এই মিথ্যাচার মাথায় নিয়ে একটা সমাজ কেবল বিজ্ঞানকে অবলম্বন করে উন্নত হতে পারে? পারেনা:
But if any one earns a fault or a sin and throws it on to one that is innocent, He carries (on himself) (Both) a falsehood and a flagrant sin. (An-Nisa 4:112, English – Yusuf Ali)

চার।
সমাজে অসত্য ও অবিচার এবং বিচারহীনতার কারণে প্রসার লাভ করে ঘুষ , দুর্নীতি ও অবৈধভাবে অন্যের সম্পদ জবর দখলের প্রবনতা ফলে সমাজ রুগ্ন হয়ে ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হতে থাকে। সমাজের এই রোগতো বিজ্ঞানের প্রসক্রিপ্সনে সারবেনা:
And do not eat up your property among yourselves for vanities, nor use it as bait for the judges, with intent that ye may eat up wrongfully and knowingly a little of (other) people´s property. (Al-Baqara 2:188, English – Yusuf Ali)

পাঁচ।
উপরুল্লিখিত কারনে যখন সমাজে পঁচন ধরে তখন ক্ষমতাশীনরা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে। ফলে তারা ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে দেশে কিংবা বিদেশে সম্পদের পাহাড় জমা করতে থাকে। এর ফলে দেশ ধীরে ধীরে তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিনত হয়ে যায়। একটি অমিত সম্পদ ও সম্ভাবনার দেশের মানুষ অনুন্নত থেকে যায়। আফ্রিকার নাইজেরিয়া এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ:
On the Day when heat will be produced out of that (wealth) in the fire of Hell, and with it will be branded their foreheads, their flanks, and their backs, their flanks, and their backs.- “This is the (treasure) which ye buried for yourselves: taste ye, then, the (treasures) ye buried!” (At-Tawba 9:35, English – Yusuf Ali)

লেখার কলেবর বৃদ্ধি করে আপনাদের ধৈর্য্য চ্যুতি ঘটাতে চাইনা। এমন হাজারো প্রমাণ আমার চেয়ে আপনারা ভালো দিতে পারবেন যেখানে এই সব অপকর্ম হরহামেশাই হচ্ছে। তো এমন মুসলমান দেশ যেখানে এই সব ধর্মহীন কাজ ব্যাক্তি এবং রাষ্ট্রীয় ভাবে অনুষ্ঠিত হয় সেই সব দেশ কিভাবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্বারা উন্নত দেশে পরিনত হতে পারে? পারেনা। এটাই বাস্তবতা। তাহলে উপরে যা বলা হলো বিশ্বের মুসলমানরা যদি এই সব অপকর্মের বিপরীতে ধর্ম বিশ্বাসে বলিয়ান হয়ে ব্যাক্তি ও রাষ্ট্র জীবনে ইসলাম ধর্মের মূল্যবোধকে শক্ত ভাবে আকড়ে ধরে তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সক্ষম হতো তাহলেই আমি দৃঢ় ভাবে মনেকরি মুসলিম বিশ্ব সবাইকে ছেড়ে উন্নতির স্বর্ণযুগে প্রবেশ করতে সক্ষম হতো। অতএব প্রতিয়মান হচ্ছে মুসলমানদের অবনতীর মূল কারণ সামাজিক ও রাজনৈতিক। বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির অপ্রতূলতা নয়।