উপকূলীয় অঞ্চল হাতিয়ার বাসস্থানচ্যুত মানুষ গুলোর ঠাঁই কোথায়?

মো: আবদুল মন্নান


উপকূলীয় অঞ্চল হাতিয়ার এই মানুষগুলোর কানের কাছে গিয়ে কেউ বাসস্থান আর বসতি সংকটের আলাপ তুললে তারা একযোগে নাম লেখাতে চাইবেন। সংবাদকর্মী, সংবাদপত্র, সংবাদমাধ্যম তারা বোঝেন না। তারা বোঝেন যেটাই হোক না কেন; খাতায় নাম ওঠানোটাই জরুরি। নাম লেখানোর জন্য ভিড় করা তাদের কোন অপরাধ নয়। অপরাধ আমাদের; আমরা বড় বড় কথা বলেও উপকূলের ঘরহারা মানুষগুলোর জন্য একটু বাসস্থানের জায়গা করে দিতে পারিনি। কোন জায়গার কথা বলবো? নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার চর গুলোতে নি:স্ব মানুষদের ঠাঁই মিলছে না। ভাঙ্গন কবলিত নদীর পাড়ে মানুষেরা অতিকষ্টে দিন যাপন করছেন।
ঘরহারা মানুষের সঙ্গে আলাপে জানতে পারি, এক জীবনে সর্বোচ্চ ১৪ বার পর্যন্ত বাড়ি বদলেছেন। তবুও আসেনি স্থিতিশীলতা। নানামুখী দুর্যোগে বিপন্ন উদ্বাস্তু মানুষেরা এখন আর কোথাও যাওয়ার স্থান পাচ্ছেন না। যাদের কিছু অর্থকড়ি আছে, তারা জমি কিনে অন্যত্র বাড়ি করতে পারলেও যাদের সেই সামর্থটুকু নেই, তারা পড়ে আছেন এখানেই। বাপদাদার ভিটে হারিয়ে কেউ ভাঙ্গন কিনারে ক্ষুদ্র ব্যবসায় জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছেন। কেউবা বাড়িঘর হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন নৌকায়। ঘুমানো, খাওয়া-দাওয়া কিংবা জীবিকার তাগিদে মাছধরা চলে সেখানেই। পরিবেশের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় ৮-১০ বার বাড়ি বদল করেও এদের জীবনে আসেনি স্থিতিশীলতা। দূরে নতুন চরের খাসজমির দিকে চোখ এদের। কিন্তু সেখানে একখণ্ড জমি পেতে আরেক যুদ্ধে অবতীর্ন হতে হয়। হাতে জমির কাগজপত্র পেয়েও অনেকের ঠাঁই মেলে না নতুন চরে।

এসোসিয়েশন ফর ক্লাইমেট রিফিউজিস (এসিআর) এবং ইয়াং পাওয়ার ইন সোশ্যাল এ্যাকশন (ইপসা) পরিচালিত গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে ইতিমধ্যে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্থানচ্যুত হয়েছে। হাতিয়া এই উদ্বাস্তু মানুষেরা তাদেরই অন্তর্ভূক্ত। নদীভাঙ্গন, জলোচ্ছ্বাস, জোয়ারের পানি বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বহু মানুষ সব হারিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজছেন এখানে সেখানে।

বিশেষজ্ঞরা এদেরকে জলবায়ু স্থানচ্যুত বলে চিহ্নিত করেছেন। এমন জলবায়ু স্থানচ্যুত বহু মানুষের দেখা মেলে উপকূলের বিভিন্ন স্থানে। হাতিয়া চরকিং ইউনিয়ন,চর ঈশ্বর ইউনিয়ন,সোনাদিয়া ইউনিয়ন,তমরুদ্দি ইউনিয়ন গুলো। গত কয়েক বছরে এই এলাকার বহু মানুষ বাড়িঘর হারিয়ে নি:স্ব হয়েছেন। এলাকাটি ঘুরে চোখে পড়ে জোয়ারের পানি ঢুকছে বাড়িঘরে, নদীপাড়ের বহু ভিটে থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে বাড়ি। হাঁটাচলার রাস্তা, হাটবাজার, পুরানো গাছপালা, সান বাঁধানো পুকুর, স্বজনদের কবরস্থান সবই বিলীন হয়ে যাচ্ছে মেঘনায়। একটি বড় এলাকা বাইরে রেখে তৈরি হচ্ছে নতুন বেড়িবাঁধ। জীবনের ঝুঁকি নিয়েও কিছু অসহায় উদ্বাস্ত মানুষ বসবাস করছেন নদীর পাড়ে ।

আমরা জানি, নদীতে জেগে ওঠা চরের ন্যায্য অংশীদার নদীভাঙ্গনের শিকার মানুষগুলোর। যার জমি ভেঙ্গে জেগে উঠেছে চর; সে-ই পাবে জেগে ওঠা চরের খাসজমি। কিন্তু বাস্তবে এর প্রতিফলন সামান্যই। উপকূলে প্রভাবশালী চক্র, সরকারের বন বিভাগ এবং স্থানীয় সরকারের মধ্যে চরের খাসজমি নিয়ে বিরোধ চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। ডুবোচর থেকেই জমির ওপর নজর পড়তে থাকে। চরের ভূমি গাছ লাগানোর উপযোগী হলে বন বিভাগ সেখানে বাগান করে। বাগানের গাছগুলো বড় হতে হতে চরের ভূমি বসবাসের উপযোগী হয়। এরপর চরের জমির দখল নিয়ে প্রভাবশালী চক্রের সঙ্গে বন বিভাগের বিরোধ শুরু হয়। কোথাও কোথাও এই বিরোধ সংঘাতে রূপ নেয়। কিন্তু জমি হারিয়ে ভূমিহীনে পরিণত হওয়া মানুষগুলো এখানে উপেক্ষিতই থেকে যায়। যদিও প্রভাবশালী চক্রটি ভূমিহীনের জন্য ভূমি বরাদ্দের নাম করেই আন্দোলনে নামে; তবুও ভূমিহীনের অংশীদারিত্ব সেখানে গৌণই থেকে যায়। বন বিভাগের সাথে বিরোধে জড়িয়ে কোথাও কোথাও খাসজমি প্রভাবশালীদের দখলে গেলেও ভূমিহীনদের সেই জমিতে বসতি স্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয় মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে।

যেমনটা হাতিয়ার বিচ্ছিন্ন ইউনিয়ন বয়ারচর, নঙ্গুঁলারচরের কথাই ধরা যাক। সেখানে এক সময় ছিল বন। বনে ছিল দস্যুদের আস্তানা। বন কেটে দস্যুরা দ্বীপের সকল খাসজমির দখল নেয়। এরপর সে জমিতে ভূমিহীনদের বসতির সুযোগ দেওয়া হয় টাকার বিনিময়ে। দস্যু বাহিনীর সদস্যদেরকে ৩-৪ দফায় মোটা অংকের টাকা দিয়েও অনেকে সেখানে বসবাস করতে পারছে না। তাদের চাই আরও টাকা। একই চিত্র লক্ষ্য করা যায় নোয়াখালীর হাতিয়ার বিভিন্ন চরে। সেখানে শক্তিশালী এক দস্যুবাহিনীর সঙ্গে বন বিভাগের সংঘাত হয়। এক পর্যায়ে দস্যুদের দখলে যায় চরের খাসজমি। অর্থের বিনিময়ে ভূমিহীন বসানো হয় গোটা চরে।

উপকূলের চরের খাসজমি নয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সঙ্গেও রয়েছে বিরোধ। নিয়ম অনুযায়ী, নতুন জেগে ওঠা চরে বন বিভাগ গাছের চারা লাগায়। একদিকে তারা ঘন বাগান গড়ে তোলে; অন্যদিকে বনের ভূমি বসবাস ও চাষাবাদের উপযোগী হতে থাকে। চরের ভূমি অনেক উঁচু হয়ে গেলেও, বসবাসের বা চাষাবাদের উপযোগী হয়ে গেলে ওই জমি বন বিভাগের দখলেই থেকে যায়। দ্বীপ ঘুরে দেখেছি, কোথাও কোথাও চরের জমি মূল ভূখণ্ডের মত শক্ত হয়ে গেলেও বন বিভাগ সেখান থেকে নিজেদের দখল ছাড়ছে না। বন বিভাগের দখল থেকে খাসজমি স্থানীয় সরকারের কাছে গেলেই সেখান থেকে ভূমিহীনদের নামে বরাদ্দ হতে পারে।

দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার বিভিন্ন চর ঘুরে দেখেছি, সেখানে অন্তত দুই হাজার একর খাসজমি রয়েছে বন বিভাগের অধীনে। এই জমির বয়স হয়েছে প্রায় ৩০-৩৫ বছর। নদী থেকে ভূমি অনেক উঁচু হয়ে গেছে। সেখানে বসতি এবং চাষাবাদ করা যায় অনায়াসেই। বন বিভাগ এক সময় এই জমিতে বাগান করলেও সে বাগানে এখন আর কোন গাছপালা চোখে পড়ে না। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা যে গুটি কয়েক গাছপালা রয়েছে; তাও পানির অভাবে মরে যাচ্ছে। কিন্তু বন বিভাগ ভূমিহীনের জন্য এ জমি ছাড়ছে না। তারা বলেছে, কিছু জমিতে গাছপালা নেই; কিন্তু এই জমি বন বিভাগ থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগে নিতে হলে আন্ত:মন্ত্রণালয়ের বৈঠকের প্রয়োজন। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে চরের খাসজমি নিয়ে বন বিভাগের সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের মামলা-পাল্টা মামলা হতে থাকে। এখনও কোন ফয়সালা হয়নি। অথচ নদী ভাঙ্গনের কারণে ক্রমেই ছোট হয়ে যাওয়া দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার বহু ভূমিহীন পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন অথবা নদীর পাড়ে মানবেতন জীবন কাটাচ্ছেন।

উপকূলের মানুষের স্থানচ্যুতির এই বিষয়গুলো জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূল জুড়ে এই যে ওলটপালট; এর ফলেই নি:স্ব মানুষের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। দেশে বিদেশে বিশেষজ্ঞ মহলে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। সে আলোচনায় বাংলাদেশকে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসাবে তুলে ধরা হয়। আর এই বাংলাদেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসাবে বিবেচিত হয় উপকূল এলাকা। প্রশ্ন আসে, উপকূল এলাকার জলবায়ু উদ্বাস্তু মানুষগুলোর জন্য আমরা কি করতে পেরেছি?
নি:স্ব মানুষগুলোকে মাথাগোঁজার ঠাঁই করে দিতে হলে সবার আগে আমাদেরকে ক্ষতিগ্রস্থদের সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করতে হবে। এরপর এদের পুনর্বাসনের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। জমি নিয়ে বন বিভাগ, স্থানীয় সরকার ও প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যে বিরোধ রয়েছে; তা নিস্পত্তি করতে হবে। যে মানুষটি বাপদাদার ভিটে হারিয়েছিল; সাজানো গোছানো বাড়িঘর হারিয়েছিল; তাকেই ভূমিপ্রাপ্তির তালিকায় রাখতে হবে সবার আগে। সর্বোপরি আইনের যথাযথ প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। প্রকৃত ভূমিহীনদের খাসজমি পাওয়ার বিষয়টি আইনেই উল্লেখ রয়েছে। তাহলে তারা কেন মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবে না? কেন তাদেরকে এখানে সেখানে ঘুরতে হবে? আর কেনইবা বাইরে থেকে আগন্তুক কাউকে দেখলেই নাম লেখানোর জন্য লাইনে দাঁড়াতে হবে?