নোয়াখালীর হাতিয়ায় খুন, ধর্ষণ ও নির্যাতন মামলার পাহাড়

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | মো: আবদুল মন্নান, হাতিয়া


নোয়াখালীর হাতিয়ায় সরকারি দলের এমপির পৃষ্ঠপোষকতায় নির্যাতনের শিকার আওয়ামী লীগের কর্মীরাই, ব্যবস্থা না নিলে আগামী নির্বাচনে ভয়াবহ সংকট দাঁড়াতে পারে নোয়াখালীর হাতিয়ায়।

নোয়াখালীর হাতিয়ায় আয়েশা ফেরদৌস এমপির স্বামী ও সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলীর বাহিনীর হাতে গত দুই বছরেই আটজন দলীয় নেতা-কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন বলে অভিযোগ স্থানীয় আওয়ামী লীগের। আয়েশা ফেরদৌস এমপির স্বামী ও সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলী নিজের পদ-পদবি, আধিপত্য ধরে রাখা, ব্যবসা-বাণিজ্য, টেন্ডার ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় অভ্যন্তরীণ খুনোখুনিতে জড়িয়ে পড়ছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দলের ভিতরে থেকে দলের ক্ষতি সাধনকারীদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান না নেওয়া হলে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সর্বনাশ হবে আওয়ামী লীগকে দিয়েই।

নোয়াখালীর হাতিয়ায় চলছে সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলীর শাসন। তার বিরুদ্ধে গেলে এলাকায় ঢুকতে বাধাসহ বিভিন্ন মামলায় জড়ানো হচ্ছে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের। মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী আয়েশা ফেরদৌস সংসদ সদস্য। মোহাম্মদ আলীর বাহিনীদের তাণ্ডবে গত দুই বছরে কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতাসহ অন্তত আওয়ামী লীগের আট নেতা-কর্মী খুন হয়েছেন। তার বাহিনীর সশস্ত্র হামলা থেকে রেহাই পায়নি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ও। হাতিয়া পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি ছাইফ উদ্দিন আহমদ “দৈনিক ভোরের সূর্যকে” বলেন, ‘হাতিয়ায় মোহাম্মদ আলীর শাসন খুলনার খুনি এরশাদ শিকদারকেও হার মানায়। তার অর্ডার ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না। তার অন্যায়ের বিরোধিতা করলেই হামলা-মামলার শিকার হচ্ছেন দলীয় নেতা-কর্মীরা। দল মনোনীত ছয়জন ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে হত্যাসহ ৮-১০টি করে মামলা দায়ের করেছেন তিনি। এ উপজেলায় কমপক্ষে ২০০ দলীয় নেতা-কর্মী হুলিয়া নিয়ে ঘুরছেন।’ তিনি বলেন, আয়েশা ফেরদৌস এমপি হলেও মূলত মোহাম্মদ আলীই শাসন করেন এ এলাকায়। গত চার বছর ধরে কোনো হাটবাজারের টেন্ডার হয় না। নাম মাত্র টোকেন মানি সরকারকে দেওয়া হচ্ছে, যা সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।

গত বছরের ৩০ মার্চ চরকিং ইউনিয়নের আফাজিয়া বাজারে কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা আশরাফ উদ্দীন আহমেদ খুন হন। সেদিন মোহাম্মদ আলীর সমর্থন নিয়ে রবীন্দ্র বাহিনীর কয়েকজন প্রকাশ্যে তাকে গুলি করে বলে অভিযোগ আছে। পরে ৯ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। গত বছরের ১৩ এপ্রিল উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে এমপি আয়েশা ফেরদৌসের কর্মী ও সমর্থকদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। ঘটনাস্থলে গুলিতে নূর আলম নামের এক যুবলীগ কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। ১৮ এপ্রিল চরকিং ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দা দক্ষিণ শুল্লকিয়া গ্রামের আলী আহাম্মদের ছেলে বাহার ডাকাতের অর্ধগলিত লাশ মেঘনা নদী থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় উপজেলা আওয়ামী লীগের শত শত নেতা-কর্মীকে জড়ানো হয়েছে। একই বছরের ২১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুল হালিম আজাদের মুক্তির দাবিতে মিছিল করলে মোহাম্মদ আলীর সমর্থকরা মিছিলে এলোপাতাড়ি গুলি করে। এতে গুলিবিদ্ধ হন চরঈশ্বর ইউনিয়নের পূর্ব গামছাখালী গ্রামের মো. ইব্রাহীমের ছেলে মো. মুরাদ উদ্দিন। উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেলে আনা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি তিনি মারা যান। ৩০ আগস্ট সকালে হাতিয়ার সোনাদিয়া ইউনিয়নের পূর্ব সোনাদিয়া গ্রামের বাসিন্দা ইউনিয়ন যুবলীগ নেতা ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান হাজী নুরুল ইসলামের ব্যক্তিগত সহকারী রিয়াজ উদ্দীনকে প্রকাশ্যে পায়ের রগ কেটে ও গুলি করে হত্যা করে। এতে ঘটনাস্থলে তিনি নিহত হন।

জানা গেছে, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যাপক ওয়ালী উল্যাহ, সাধারণ সম্পাদক ও চরকিং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আলহাজ মহিউদ্দিন আহাম্মদ, পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট ছাইফ উদ্দিন আহমদ, ছাত্রলীগ সভাপতি নাজমুল ইসলাম রাজুসহ প্রতিটি আওয়ামী লীগের নেতার বিরুদ্ধে ২০-২৫টি করে মামলা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতারা নির্যাতিত হয়ে থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মোহাম্মদ আলীর অনুমতি ছাড়া কোনো মামলা নেন না বলে অভিযোগ উপজেলা আওয়ামী লীগের।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আরও ৯ মাস সময় বর্তমান সরকারের হাতে রয়েছে। এই সময়ের মধ্যেই দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন এবং ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতা-কর্মীদের পাশে দাঁড়াতে হবে। লাগাম টানতে হবে ওইসব এমপি-, যারা বিনাভোটে এমপি হয়ে নিজ দলের নেতা-কর্মীদের দমন-নিপীড়নেই বেশি মনোযোগী হয়েছেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনের মতো পরিস্থিতি পুনরায় ঘটনার সম্ভাবনা খুবই কম। এসব এমপি কারণে দলের চরম দুর্দিনে দলের হাল ধরে থাকা নেতা-কর্মীরা অভিমান করে বা কেউ কেউ হামলা-মামলার শিকার হয়ে দল থেকে দূরে সরে গেছে। তাদেরকে ভোটের আগে দলের সক্রিয় করতে হবে। তা না হলে নির্বাচনে ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করেন তারা।


Notice: Undefined index: email in /home/insaf24cp/public_html/wp-content/plugins/simple-social-share/simple-social-share.php on line 74