ই’তিকাফ  আহকাম ও ফজিলত

ই’তিকাফ আহকাম ও ফজিলত

পবিত্র মাহে রমজানের শেষ দশদিন ই‘তিকাফ করা সুন্নাত। ই‘তিকাফের সবচেয়ে উপযোগী সময় হলো রমজান। একাগ্রচিত্তে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতের উদ্দেশে, ক্বদর রাত প্রাপ্তির নিশ্চিত প্রত্যাশায়, সুনির্ধারিত পন্থায় মসজিদে অবস্থান করাকে ই’তিকাফ বলে। ই’তিকাফ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। রাসূল সা. ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত রমজানের শেষ দশদিন নিয়মিত ই‘তিকাফ করতেন। পরবর্তীতে সাহাবায়ে কেরাম এ ধারা অব্যাহত রেখেছেন। সে হিসেবে রমযানের শেষ দশকে ই’তিকাফ করা সুন্নাত। যা কুরআন হাদীস ও ইজমায়ে উম্মাহ দ্বারা প্রমাণিত।

ই‘তিকাফের ফজিলত
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা ই‘তিকাফ সম্পর্কে বিভিন্ন আয়াতে নাযিল করেছেন। হযরত ইবরাহিম আ. ও ইসমাইল সা. প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে- আমি ইবরাহিম ও ইসমাইলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী ও রুকু-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র করো’। (সূরা বাকারা – ১২৫)
ই‘তিকাফের ফজিলত সম্পর্কে অসংখ্য হাদীস বর্ণিত হয়েছে। রাসূল সা. এর সহধর্মিণী হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসূল সা. প্রত্যেক রমজানে ই‘তিকাফ করতেন। (সহীহ বুখারী- ২০৪১)
হযরত আয়েশা আরো বর্ণনা করেন যে, রাসূল সা. রমজানের শেষের দশ দিন ইন্তেকাল পর্যন্ত ই‘তিকাফ করেছেন। এরপর তাঁর স্ত্রীগণ ই‘তিকাফ করেছেন’। (সহীহ বুখারী-২০২৪ ও মুসলিম -১১৭২)
হযরত আবু হুরাইরা রা. বর্ণনা করেন যে, ‘রাসূল সা. প্রতি রমজানে দশ দিন ই‘তিকাফ করতেন, তবে যে বছর তিনি ইন্তেকাল করেন, সে বছর বিশ দিন ই‘তিকাফে কাটান’। (সহীহ বুখারী – ২০৪৪)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন- যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে এক দিন ই’তিকাফ করে, আল্লাহ তা’আলা সেই ব্যক্তি ও জাহান্নামের মধ্যে তিন খন্দক পরিমাণ দূরত্ব সৃষ্টি করেন। প্রতিটি খন্দক পূর্ব ও পশ্চিমের দূরত্বের চেয়েও অনেক দূর। (তাবরানী ও হাকেম)
হযরত আলী বিন হোসাইন রা. পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন- যে ব্যক্তি রমজানে দশ দিন ই’তিকাফ করে, তা দুই হজ্ব ও ওমরার সমান। (বায়হাকী)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন- ই’তিকাফকারী গোনাহ থেকে বিরত থাকে। তাই, তাকে সব নেক কাজের কর্মী হিসেবে বিবেচনা করে বহুগুন সাওয়াব দেয়া হবে।( ইবনে মাজাহ)
ই’তিকাফের শর্ত
১. মুসলমান হওয়া, ২. আকেল হওয়া অর্থাৎ পাগল না হওয়া, ৩. বালেগ হওয়া, ৪. নিয়ত করা, ৫. ফরজ গোসল সেরে পবিত্র হওয়া, (মহিলারা হায়েজ-নেফাস থেকে পবিত্র হওয়) ৬. মসজিদে ই’তিকাফ করা, ৭. রোজা রাখা।

ই’তিকাফের উপকারিতা
০১. ইতেকাফকারী জামাতে নামাজ আদায়ে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। এক নামাজের পর আর এক নামাজের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন- যে ব্যক্তি এক নামাজের পর আর এক নামাজের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে ফেরেশতারা তার জন্য আল্লাহর নিকট দো’য়া করে, হে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিন, তার প্রতি দয়া করুন।
০২. ই’তিকাফকারী শবে কদরের তালাশে মগ্ন থাকে। শবে কদর রমজানের যে কোন বে-জোড় রাত্রিতে হতে পারে। তাই আল্লাহ তা’আলা সেই মহিমান্বিত রাতটিকে আমাদের কাছ থেকে গোপন রেখেছেন, যেন আমরা তাকে তালাশ করতে থাকি।
০৩. ই‘তিকাফের ফলে বান্দার সাথে আল্লাহ তা’আলার সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় মন ব্যকুল হয়ে পড়ে।
০৪. ই‘তিকাফের মাধ্যমে বান্দা তাহাজ্জুদে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। শেষ রাতে তাওবা করার সুযোগ লাভ হয় এবং কায়মনোবাক্যে দো’য়া কারণে অন্তরে প্রশান্তি লাভ করা যায়।।
০৫. বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াতের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
০৬. ইবাদতে সময়কে সুন্দরভাবে কাজে লাগানো যায়।
০৭. অহেতুক কথা, কাজ ও কুপ্রবৃত্তি থেকে সংযত থাকার অভ্যাস গড়ে ওঠে।
০৮. ই’তিকাফ অবস্থায় লাইলাতুল ক্বদর তালাশ করা সহজ হয়।
০৯. ই’তিকাফের মাধ্যমে মসজিদের ইবাদতের সম্পর্ক বৃদ্ধি হয় এবং মসজিদে থাকার অভ্যাস গড়ে ওঠে।
১০. ই’তিকাফকারী দুনিয়াবী কর্মকা- থেকে বিরত থাকার কারণে ইবদাত বন্দেগীর মাধ্যমে আধ্যাত্মিক উন্নতি হাসিল করতে সক্ষম হয়।
১১. খারাপ অভ্যাস ও কুপ্রবৃত্তি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রিত হয় এবং আল্লাহ ভীতি অন্তরে জাগ্রত হয়।
১২. মসজিদে ই’তিকাফের ফলে মানুষ কবর ও আখেরাতমূখী হয়ে গড়ে ওঠে। দুনিয়াবী পাপাচার থেকে মুক্ত থাকার অভ্যাস সৃষ্টি হয়।

ই’তিকাফে প্রবেশ
ই’তিকাফকারীর জন্য রমযানের বিশ তারিখের সূর্যাস্তের পূর্বেই ই’তিকাফস্থলে প্রবেশ করা উত্তম। কেননা ই’তিকাফের মূল লক্ষ্য লাইলাতুল ক্বদরের অনুসন্ধান করা, যা শেষ দশকের বে-জোড় রাতগুলোতে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আর একুশতম রাত হলো লাইলাতুল ক্বদরের অন্তর্ভুক্ত।

ই’তিকাফের বিধান
০১. বিনা ওযরে ই’তিকাফকারী যদি মসজিদ থেকে বের হয়ে যায় তাহলে ফকিহগণের সর্বসম্মতিক্রমে তার ই’তিকাফ বাতিল বলে গণ্য হবে। আর যদি শরীরের অংশ বিশেষ বের করে দেয়, তাহলে কোনো অসুবিধা হবে না। রাসূল সা. নিজেও ই’তিকাফ অবস্থায় নিজ মাথা বের করে দিতেন। মা আয়শা (রা) নিজ কক্ষে বসেই রাসূলুল্লাহর মাথা ধুয়ে সিঁথি করে দিতেন।
০২. অতি প্রয়োজনীয় বিষয় যেমন, অযু, গোসল, পানাহার, প্রশ্রাব-পায়খানা ইত্যাদি কাজের জন্যে বের হওয়া জায়েয। আর যদি উল্লেখিত বিষয়সমূহ মসজিদের ভিতরে থেকেই সম্পন্ন করা সম্ভব হয় তাহলে মসজিদ থেকে বের হওয়া জায়েয নয়।
০৩. ই’তিকাফ যদি এমন মসজিদে হয়, যেখানে জুমার নামায হয় না, তাহলে জুমার নামাজের জন্য জামে মসজিদে গমন করা ওয়াজিব।
০৪.ওয়াজিব নয় এমন ইবাদত যেমন জানাযায় অংশ গ্রহণ, অসুস্থ রোগীকে দেখতে যাওয়া ইত্যাদির উদ্দেশ্যে বের হওয়া জায়েয নেই।

ই’তিকাফকারীর ইবাদত
সব ধরনের ইবাদতই ই’তিকাফকারীর জন্য অনুমোদিত। যেমন ঃ নামায, কুরআন তিলাওয়াত, যিকর, দোয়া, ইসতেগফার, সালামের উত্তর দেয়া, সৎকাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ, ফাতাওয়া প্রদান, ইলম শিক্ষা ইত্যাদি।
ই’তিকাফকারীর জন্য পর্দা টাঙ্গিয়ে লোকজন থেকে নিজকে আড়াল করে নেয়া মুস্তাহাব। কেননা রাসূল সা. ই’তিকাফ করেছেন একটি তুর্কি তাঁবুতে, যার প্রবেশ দ্বারে ছিল একটি পাটি।
ই’তিকাফকারী প্রয়োজনীয় বিছানা-পত্র, কাপড় ইত্যাদি সাথে নিয়ে নিবে, যাতে মসজিদ থেকে বেশি বের হতে না হয়।
ই’তিকাফকারীর জন্য মসজিদের ভিতরে পানাহার, ঘুমানো, গোসল, সুগন্ধী ব্যবহার, পরিবার-পরিজনের সাথে কথপোকথন ইত্যাদি সবই বৈধ। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন সীমাতিরিক্ত না হয়। রাসূল সা. ই’তিকাফস্থলে তাঁর পতিœগণের সাক্ষাত ও কথোপোকথন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।

যেসব কাজ থেকে ই’তিকাফকারী বিরত থাকা জরুরী
০১. অতিরিক্ত কথা ও ঘুম, অহেতুক কাজে সময় নষ্ট করা, মানুষের সাথে বেশি বেশি মেলা-মেশা ইত্যাদি ই’তিকাফের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে। তাই এ সব থেকে ইতিকাফকারী বিরত থাকবে।
০২. ইতিকাফ অবস্থায় ক্রয়-বিক্রয় জায়েয নয়। কেননা রাসূল সা. মসজিদে ক্রয়-বিক্রয় করতে নিষেধ করেছেন।
০৩. ই‘তিকাফ অবস্থায় যৌন স্পর্শ হারাম, এ ব্যাপারে সকল আলেমের ঐকমত্য রয়েছে।
০৪. বায়ূ নি:সরণ, বে-অজু থাকা মসজিদের আদবের পরিপন্থী। তাই পারতপক্ষে একাজ থেকে বিরত থাকা উচিত।

মহিলাদের ই’তিকাফ
মহিলারা ঘরের এক কোনায় যেখানে নিরিবিলি নামাজ আদায় করে সেই রকম অংশকে ই’তিকাফের জন্য নির্ধারণ করে ১০ দিন বা কম সময়ের জন্য ই’তিকাফের নিয়ত করে সেই জায়গায় বসে ইবাদত বন্দেগী শুরু করবেন। কোন ওযর ছাড়া সেই জায়গা থেকে অন্যত্র যাবেন না। দিন রাত সেখানেই থাকবেন, সেখানেই ঘুমাবেন। ই’তিকাফ অবস্থায় যদি মহিলাদের মাসিক শুরু হয় তাহলে ই’তিকাফ নষ্ট হয়ে যাবে।

ই’তিকাফ থেকে বের হওয়া
ঈদের রাতে সূর্যাস্তের পর ই’তিকাফ থেকে বেরিয়ে পড়া জায়েয। তবে উত্তম হলো ঈদের রাত মসজিদে অবস্থান করে পরদিন সকালে সরাসরি ইদগাহে চলে যাওয়া। তবে চাঁদ রাতে সূর্যাস্তের পর মসজিদ থেকে বের হয়ে গেলেও কোন সমস্যা নেই।