উপকূলীয় অঞ্চল হাতিয়ার মানুষের কাছে একটি আতঙ্কে নাম ২৯ এপ্রিল

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | মো: আবদুল মন্নান, হাতিয়া


আজ ভয়াল ২৯ এপ্রিল। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলবর্তী মানুষের জন্য দুঃসহ স্মৃতিময় একটি দিন। ঘূর্ণিঝড় ‘ম্যারি এন’-এ মারা যায় প্রায় দেড় লাখ মানুষ আর ২০ লাখ গবাদিপশু। ১৯৯১ সালের এ ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের পর ২৫ বছর অতিবাহিত হলেও উপকূলীয় এলাকাগুলোতে আজও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়নি। ফলে আতঙ্কে দিন কাটছে উপকূলীয় এলাকার লাখো মানুষের।
১৯৯১ সালের এই দিনে উপকূলে আঘাত হানে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস ‘ম্যারি এন’। সেই ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ৩৮ হাজার ২৪২ জন। তবে বেসরকারি হিসাবে এর সংখ্যা আরও বেশি। ওইদিন মারা যায় ২০ লাখ গবাদিপশু। গৃহহারা হয় অসংখ্য পরিবার। ক্ষতি হয়েছিল পাঁচ হাজার কোটি টাকারও বেশি সম্পদ। উপকূলবাসী আজও ভুলতে পারেনি সেই রাতের দুঃসহ স্মৃতি ।

ঘূর্ণিঝড়ের পরবর্তী এক মাসে দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির প্রভাবে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় আরও লক্ষাধিক মানুষ। উপকূলজুড়ে ছিল শুধু লাশ আর লাশ। নিহতের তিন-চতুর্থাংশই ছিল নারী ও শিশু। হাতিয়ার নিঝুমদ্বীপের সব মানুষই জলোচ্ছ্বাসে ভেসে গিয়েছিল। পুরো দ্বীপাঞ্চল ঘূর্ণিঝড়ের ছোবলে বিরাণভূমিতে পরিণত হয়। সরকারি হিসাব মতে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ১০ হাজার মানুষ। বেসরকারি হিসাবে এর সংখ্যা দ্বিগুণ।

উপকূল ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে এমন বহু মানুষের সাক্ষাত পেয়েছি, যারা ২৯ এপ্রিলের সেই ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ে সব হারিয়েছিলেন। চরম বিপর্যয় মোকাবেলা করে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিলেন তারা। সেই কালো রাতে ঝড়ের ছোবলে মায়ের কোল থেকে হারিয়েছিল দুধের শিশু, ভাই হারিয়েছিল অতি আদরের বোন, স্বামী হারিয়েছিল প্রিয়তমা স্ত্রীকে, স্বজন হারানোর কান্না আর লাশের স্তুপে পরিণত হয়েছিল সমুদ্রপাড়সহ উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর নদীর তীর- অভিজ্ঞতা থেকে এমনটাই জানচ্ছিলেন জানাচ্ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। টগবগে তারুণ্যের সব হারানো সেই সব মানুষদের অনেকেই বার্ধক্যে ন্যূয়ে পড়েছেন। অনেকে আবার দুঃসহ সেই স্মৃতি নিয়ে চিরদিনের জন্য বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু, সেই শোকগাঁথা এইসব এলাকার মানুষদের জীবনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। সেই ভয়াল রাতের ভয় এখনও এইসব এলাকার মানুষদের তাড়িয়ে ফেরে।

হাতিয়া উপজেলার চেয়ারম্যান মাহবুব মোরশেদ লিটন বলেন, ‘সামুদ্র্রিক জলোচ্ছ্বাসে প্রায় প্রতি বছরই হাতিয়ার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে ১৯৯১ ও ‘৯৭ সালের জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধগুলো আজও পূর্ণাঙ্গভাবে মেরামত করা হয়নি।
‘ নোয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম জানান, হাতিয়ার নলছিড়া এলাকাসহ ১০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য একটি বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। যা চলতি অর্থবছরে একনেকে অনুমোদন হয়ে জুন-জুলাইয়ে কাজ করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।

হাতিয়ার সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের আহ্বানের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলি, শুধু হাতিয়াকে নয়, সমগ্র উপকূলকে নিরাপদ রাখতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ চাই। আসুন, এ পর্যন্ত উপকূলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়গুলো থেকে আমরা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, আগে সেটুকুই কাজে লাগাই।