ইসলামে শ্রমিকদের মর্যাদা ও অধিকার শতভাগ নিশ্চিত করা হয়েছে: জমিয়ত

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | ডেস্ক রিপোর্ট 


শায়খ আব্দুল মোমিন ইমামবাড়ি ও আল্লামা নুর হুসাইন কাসেমী

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ-এর সভাপতি আল্লামা আব্দুল মুমিন শায়েখে ইমামবাড়ি ও মহাসচিব আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী মে দিবস উপলক্ষে দেশের সকল শ্রমিকদের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছেন, মেহনতি শ্রমিকদের উপযুক্ত বেতন, স্বাস্থ্যসম্মত কাজের পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধাসহ তাদের সকল ন্যায্য অধিকারের প্রতি জমিয়তের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। কারণ, ইসলামে শ্রমিকদের মর্যাদা ও অধিকার শতভাগ নিশ্চিত করা হয়েছে। এই মেহনতি শ্রমিকদের হাড়ভাঙা ও ঘামঝরানো কঠোর পরিশ্রমের উপরই একটা দেশ ও সমাজ গড়ে ওঠে। সুতরাং শ্রমিকদেরকে অবহেলার চোখে দেখার এবং তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হবে চরম জুলুম ও অন্যায়ের শামিল।

১লা মে শ্রমদিবস উপলক্ষ্যে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের দুই শীর্ষ নেতা গণমাধ্যমে দেয়া এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেছেন।৫

জমিয়ত নেতৃদ্বয় আরো বলেন, ইসলামই কেবলমাত্র শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার দিয়েছে৷ ইসলাম ছাড়া অন্য কোন মতবাদ শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি৷ সুতরাং শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে ইসলামী শ্রমনীতি বাস্তবায়ন আমাদের অন্যতম দাবী। হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘাম শুকানোর আগেই শ্রমিকদের মজুরি আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। মালিক যা খাবেন-পরবেন শ্রমিকদেরও তা খেতে পরতে দিতে আদেশ দিয়েছেন। শান্তির ধর্ম ইসলাম এই বিধানের মাধ্যমে শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করেছে৷

জমিয়ত নেতৃদ্বয় বলেন, আজ বিশ্বব্যাপী শ্রমিকদেরকে নানাভাবে ঠকানো হচ্ছে। তাদের কাজের উপযুক্ত পরিবেশ ও নিরাপত্তার দিক আমলে নেয়া হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক কর্পোরেট বাণিজ্য শ্রমিকদেরকে আরো কোন কোন উপায়ে ঠকিয়ে অধিক কাজ আদায় করে নেয়া যায়, সেই নিয়ে গবেষণা করছে এবং দিন দিন শোষণের মাত্রা বাড়াচ্ছে।

তাঁরা আরো বলেন, শ্রমিকদের শ্রমের বিনিময়ে তিল তিল করে গড়ে উঠে শিল্প প্রতিষ্ঠান। একটি শিল্পের মালিক শ্রমিকদের শ্রম শোষণ করে অল্প সময়েই পাহাড় পরিমাণ অর্থ-বিত্তের মালিক হয়। শ্রমিকদের কম মজুরি দিয়ে, তাদের ঠকিয়ে গড়ে তোলে একাধিক শিল্প-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কারখানায় তাদের কোনো অংশিদারিত্ব থাকে না। এ ব্যাপারে মহানবী (সা.) বলেছেন, “মজুরকে তার কাজ হতে অংশ দান কর। কারণ, আল্লাহর মজুরকে বঞ্চিত করা যায় না।” কিন্তু মাসের পর মাস চলে যায় শ্রমিকরা বেতন পায় না। বেতনের দাবিতে শ্রমিককে মালিকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে হয়। শ্রমিকের বেতন-ভাতার ব্যাপারে বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, “শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তাদের প্রাপ্য মজুরি পরিশোধ কর।” শ্রমজীবী মানুষ বা কোনো শ্রমিক অবসর নেয়ার পর তার বাকি জীবন চলার জন্য অর্থনৈতিক সুবিধা বা পেনশনের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। এ ব্যাপারেও ইসলাম নীরব নয়। হযরত ওমর (রাযি.) বলেছেন, “যৌবনকালে যে ব্যক্তি শ্রম দিয়ে রাষ্ট্র ও জনগণের খেদমত করেছেন, বৃদ্ধকালে সরকার তার হাতে ভিক্ষার ঝুলি তুলে দিতে পারে না।

জমিয়ত সভাপতি আল্লামা আব্দুল মুমিন শায়েখে ইমামবাড়ি ও মহাসচিব আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী আরো বলেন, ১৮৮৯ সালের সালের ১৪ জুলাই প্যারিসে অনুষ্ঠিত শ্রমিক প্রতিনিধি সম্মেলনের গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুসারে ১৮৯০ সালের ১লা মে থেকে শ্রমিক অধিকার দিবস তথা মহান মে দিবস বিশ্বব্যাপী উদযাপন শুরু হয়। মে দিবসে শ্রমিক সমাবেশ করে দুনিয়ার মজদুর এক হও এক হও বলে শ্লোগান দেয়া হয়৷ শ্রমিকের অধিকার আদায়ের কথা বলা হয়৷ কিন্তু দিন শেষে, মাস শেষে শ্রমিকদের পারিশ্রমিক পরিশোধ করা হয় না৷ শ্রমিকরা তাদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নামলে তাদের ওপর গুলি, হামলা-মামলা, ছাঁটাই ও বরখাস্ত করা হয়।

জমিয়ত নেতৃদ্বয় বলেন, ইসলামে শ্রমের মর্যাদা অত্যধিক। শ্রম দ্বারা অর্জিত খাদ্যকে ইসলাম সর্বোৎকৃষ্ট খাদ্য হিসেবে আখ্যা দিয়েছে এবং জীবিকা অন্বেষণকে উত্তম ইবাদত হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “ফরয ইবাদতের পর হালাল রুজি অর্জন করা একটি ফরয ইবাদত।” (বায়হাকী)। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে ইরশাদ করেছেন, “তিনি তোমাদের জন্য ভূমি সুগম করে দিয়েছেন। কাজেই তোমরা এর দিক-দিগন্তে বিচরণ কর এবং তার দেয়া রিযিক থেকে আহার কর।” (সূরা- মুলক, আয়াত-১৫)।

জমিয়ত শীর্ষ নেতৃদ্বয় বলেন, আমাদের প্রিয় নবী (সা.) শ্রমকে ভালোবাসতেন। তিনি নিজ হাতে জুতা মেরামত করেছেন, কাপড়ে তালি লাগিয়েছেন, মাঠে মেষ চরিয়েছেন। নবীজী ব্যবসা পরিচালনাও করেছেন। খন্দকের যুদ্ধে নিজ হাতে পরিখা খনন করেছেন। বাড়িতে আগত মুসাফির কর্তৃক বিছানায় পায়খানা করে রেখে যাওয়া কাপড় ধৌত করে মানবতা ও শ্রমের মর্যাদা সর্বোচ্চ স্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। শ্রমিকের মর্যাদা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, “শ্রমজীবী আল্লাহর বন্ধু।” রাসূল এ ব্যাপারে আরো বলেন, “নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য আর নেই। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজের হাতে কাজ করে খেতেন।” (বুখারী)।

জমিয়ত সভাপতি ও মহাসচিব আরো বলেন, ১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকার শিকাগো শহরের ‘হে’ মার্কেটে অধিকার বঞ্চিত শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজসহ বিভিন্ন দাবিতে সংগঠিত হয়ে আন্দোলন শুরু করে। বিক্ষোভ সমাবেশে নিরীহ শ্রমিকদের ওপর গুলী চালায় পুলিশ। নিহত হন অনেক শ্রমিক। শ্রমজীবী মানুষের আপোসহীন মনোভাব ও আত্মত্যাগের ফলে মালিক পক্ষ শ্রমিকদের দাবি অনুযায়ী, ৮ ঘণ্টা কাজের স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। ১ মে শ্রমিক আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়। হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.)এর হাদিস, শ্রমিকদের সাধ্যের অতীত কাজে কখনো খাটাবে না- এ নির্দেশনামূলক কথাটির কিছু অংশ হলেও ১ মে’র আন্দোলনে প্রতিফলিত হয়। আগামী দিনে বাংলাদেশসহ বিশ্ব শ্রমিকরা নিজেদের প্রয়োজনে ইসলামের দেয়া শ্রমের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসবেন, ইনশাআল্লাহ।