পবিত্র রমজানঃ ইসলামের সার্বিক চেতনাকে সঞ্জীবিত করার  মাস

পবিত্র রমজানঃ ইসলামের সার্বিক চেতনাকে সঞ্জীবিত করার মাস

মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী


মুসলিম জাতীয় ঐতিহ্য চেতনায় এবং ইসলাম ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনে রমজান অতি গুরূত্বপূর্ণ। রমজান রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। রমজান মাস ইসলামের প্রতিষ্ঠার মাস, বিজয়ের মাস। মুসলমানদের দ্বীন ও দুনিয়ার সমৃদ্ধি, প্রার্থীব ও আধ্যাত্মিক উন্নতি, দৈহিক ও মানসিক শ্রেষ্ঠত্ব আর গৌরর এবং মর্যাদার অবিস্মরণীয় স্মৃতি বয়ে নিয়ে আসে পবিত্র মাহে রমজান। সিয়াম সাধনার মধ্য দিয়ে মানব জাতিকে মহান আল্লাহ তায়ালার রহমত লাভের আহবান জানায় এ পবিত্র মাস। ত্যাগ-তিতিক্ষা, ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, মানবতাবোধ, মহত্ব ও ন্যায়পরায়নতার আদর্শে উজ্জীবিত হওয়ার প্রেরণাদীপ্ত পবিত্র মাহে রমজান রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের অশেষ সওগাত নিয়ে মহিমান্বিত পবিত্র মাহে রমজান আবারো আমাদের দ্বারে সমাগত।

রমজানের প্রথম দশ দিন রহমতের। দ্বিতীয় দশ দিন মাগফিরাতের। এবং শেষ দশ দিন নাজাতের। সিয়াম সাধনায় রত যেসব বান্দা রমজানের প্রথম দশ দিন মহান রাব্বুল আলামীনের অশেষ রহমতলাভে সমর্থ হন, তারাই দ্বিতীয় দশ দিন সর্বশক্তিমান আল্লাহর মাগফিরাত (ক্ষমা) প্রাপ্ত হন। আর আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত অর্জনে সক্ষম বান্দারাই শেষ দশ দিনে সর্বপ্রকার পাপ পঙ্কিলতা থেকে নাজাত লাভ করে সত্য, সুন্দর, শান্তি ও স¤প্রীতির ধর্ম ইসলামের কল্যাণ, উত্তরোত্তর সূখ, সমৃদ্ধি ও শান্তি অর্জন করে থাকেন এই মাসে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে।

পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান সম্বলিত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ঐশীগ্রন্থ পবিত্র কোরআন এই মাসেই অবতীর্ন হয়েছে। মুসলমানদের বিশ্বাস, আমল-আখলাক, আচার-ব্যবহার, জীবন ধারণ, জীবন-মনন, শাসন পদ্ধতি, জন্ম-মৃত্যু, রাজনীতি, অর্থনীত, সমাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, আইন-আদালত ইত্যাদি সব কিছুই সুস্পষ্ট ঐশীবিধান পবিত্র কোরআন এবং মহানবীর (সা.) সর্Ÿোত্তম জীবনাদর্শনুযায়ী পরিচালিত হয়ে থাকে।

এই মাসেই সংঘটিত হয়েছে ইসলামের প্রথম যুদ্ধ। মদীনা থেকে বহুদূরে বদর নামক স্থানে ১৭ রমজান কাফেরদের বিরূদ্ধে মুসলমানদের এই যুদ্ধ সংঘটিত হয় বলে ইতিহাসে এই যুদ্ধকে বদর যুদ্ধ বলা হয়। এই যুদ্ধের নেতৃত্বে ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদ (সা.)। এই রমজান মাসেই মক্কা বিজয় হয় বলে এই মাসকে বিজয়ের মাস ও বলা হয়। তাছাড়া রমজান মাসে যাকাত প্রদানের বিধান রয়েছে। ফলে এই মাসকে অর্থনৈতিক মাস হিসিবে ও অভিহিত করা হয়। এক সাথে ইফতার করা, সমাজের দরিদ্র লোকদের ছদকাহ-ফিতরা ও যাকাত প্রদানের মাধ্যমে মুসলমানরা মানবিক চেতনায় উজ্জীবিত হওয়ার অনুশীলন করার সুযোগ পায়।

অন্যায়ের বিরূদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলাসহ ইসলামের সার্বিক চেতনাকে সঞ্জীবিত করার অনুশীলন করার সুযোগ আসে এই মাসে পরম দয়াময় রাব্বুল আলামীনের দয়ায়। মানবতার মহান নেতা রাছুলুল্লাহ (সা.) ও তার বিপলবী সাহাবীরা মানুষের ওপর মানুষের প্রভূত্ব খতম করার মহান লক্ষে এ মহান মাসে লড়াই করেছিলেন, বাতিলের বিরূদ্ধে, অন্যায়-অসত্যের বিরূদ্ধে, জুলুম ও শোষণের বিরূদ্ধে। কেন না পৌত্তলিকতাবাদ ও সাম্রাাজ্যবাদের যুগ থেকে শুরূ করে আজ অবধি ইসলাম ও মুসলমানদের বিরূদ্ধে ষড়যন্ত্র অব্যাহত আছে। আর মুসলিম প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোয় ইসলামই সাহস জুগিয়ে আসছে। তাই এ মাস অন্যায়ের বিরূদ্ধে প্রতিবাদের চেতনাকে সঞ্জীবিত করার লক্ষ্যে অনুশীলনের তাগিদ দেয় । এই মাস ডাক দিয়ে যায় মুসলমানদের মানসলোক ও চেতনারাজ্য যেন বিজাতীয় চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতি দ্বারা আচ্ছন্ন না হয়। মুসলমানরা যেন ভ্রান্ত চেতনা, বিকৃতরূচিবোধ ও সংস্কৃতি অনুশীলনে স্বচেষ্ট না হয়। তারা যেন বৈশিষ্টমন্ডিত , পরিচ্ছন্ন ও নিজস্ব সংস্কৃতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

মহান আল্লাহর নির্দেশে প্রতি দিন ছোবহে সাদেক থেকে সূর্য অস্তমিত না হওয়া পর্যন্ত রোজাদাররা সর্বপ্রকার পানাহার থেকে বিরত থাকেন। বৈধ কাজ ও ঐ সময়টাতে অবৈধ হয়ে যায়। লোক চক্ষুর আড়ালেও কোন রোজাদার আললাহর এই নির্দেশকে অমান্য করার সাহস দেখান না। তাদের মনে এই ভয় থাকে যে, মহান আল্লাহ সর্বজ্ঞ এবং সর্বদ্রষ্টা। রোজার সময় নির্জনে ও কোন রোজা বিরোধী কাজ করলে, তা আল্লাহর নজর এড়ানো সম্ভব নয়। আল্লাহর এই ভয় সর্বদা তাদের মনে জাগরূক থাকে। আল্লাহার এই ভয় ধারণ, চর্চা ও অনুশীলন করা হয় এই মাসে বেশি বেশি। মহান আললাহর এই আদেশ মেনে চলার শিক্ষাই রমজান মাসে আমাদের চেতনাকে শাণিত করে। কর্তব্যবোধে উজ্জীবিত করে এবং দীপ্ত পথে বলিয়ান ও উদ্দিপ্ত করতে সহয়াতা করে।

বিগত ১১ মাসে মানুষের আমলে যে শিথিলতা দেখা দেয়। ইসলামী অনুশাসন মেনে চলার ক্ষেত্রে যে স্থবিরতা দেখা দেয়। রমজান মাসে সেই স্থবিরতা কাটিয়ে উঠে উন্নত চরিত্র অর্জনের পক্ষে অন্তরায় পাশবিক বাসনার প্রাবল্যকে পরাভূত করতঃ পাশবিক শক্তিকে আয়ত্বাধীন করার চেতনাকে সঞ্জীবিত করা হচ্ছে রমজানের তাৎপর্য। ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে সর্বত্র আল্লাহর দ্বীনের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠায় যাবতীয় প্রতিকূলতার মূখে টিকে থাকার জন্যে যে মান-মানসিকতার প্রয়োজন, সিয়াম সাধনার দ্বারাই তা অর্জিত হয়। তাছাড়া ইসলামী চিন্তা-ভাবনার জগতে বিরাজমান নৈরাজ্যের উন্নতি ঘটাতে, উন্নত মানবিক জীবন এবং সমাজের মনোভূমিতে শৃংখলা আনতে সিয়াম সাধনা সহায়তা করে।

ধনী-দরিদ্রের একত্রে ইফতার মানুষের অন্তরে পারস্পরিক ভালবাসা, সাম্য ও মৈত্রীর অনুভূতি জাগ্রত করে। রমজানের এই শিক্ষা সব সময়ই কাজে লাগাতে হবে। কেবল রমজানের মাস নয়। এতে আমাদের বিশ্বাস চেতনা ও উপলব্ধি প্রতিবিম্বিত হয়। এদেশের আদর্শিক শুন্যতা দূর করে সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক নাগরিক তৈরির লক্ষ্যে সুকুমার বৃত্তির বিকাশ, নৈতিক উৎকষূতা সৃষ্টি, সৃজনশীল প্রতিভার উন্মেষ ও তাদের স্বশিক্ষিত ও মার্জিত করে গড়ে তোলা ও প্রকৃত মানব সৃষ্টির ক্ষেত্রে রমজানের যথযথ অনুশীলনের গুরূত্ব অপরিসীম।

শুধু উপবাস থাকাই রমজানের সাফল্য অর্জনের শর্ত নয়। বরং উপবাসের সাথে যাবতীয় পাপ কাজ যেমন—মিথ্যা কথা বলা, গীবত করা, চোগলখোরী করা. মুনাফাখোরী করা, কালোবাজারী, প্রতারণা ও প্রবঞ্চনার মতো ইসলাম বিরোধী কাজ থেকে বিরত না থাকলে রমজানের ফল পাওয়া যাবে বলে মনে করার কারণ নেই। কারণ একদিকে দূর্নীতির মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা অন্যদিকে পবিত্র রমজান মাসে বড় বড় ইফতার মাহফিলের আয়োজন সমার্থক নয়। তাই রমজান মাসে মিথ্যা কথা বলা ত্যাগ করার অনুশীলন করতে হবে। এব্যাপারে যতœবান হতে হবে নামাজের ব্যাপারে। কারণ নামাজ বেহেস্তের চাবি। রমজান উত্তর মাস গুলোতে নামাজেও শিথিলতা আসে। তাই রমজান মাসে জামায়াতে নামাজ আদায়ে মুসল্লিরা তৎপর হন। নামাজের জন্যে যেসব উপাদান রয়েছে, তা সঠিকভাবে পালন করতে হবে। যেমন কাপড় পচ্ছিন্ন থাকা। তবে কাপড় শুধু পরিস্কার হলে চলবে না, বরং সেই কাপড় হালাল অর্থে কেনা কিনা তাও স্মরণ রাখতে হবে। কেন না অবৈধ টাকায় কেনা পোষাকে নামাজ আদায় কতটুকু শুদ্ধ হবে, তাও খেয়াল রাখতে হবে। এŸাদাৎ সহি-শুদ্ধ হওয়ার জন্যে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হালাল রুজি-রোজগার। কেন না রুজি-রোজগার হালাল না হলে, যত এবাদাত-বন্দেগি করা হোক না কেন, তা কোনো কাজে আসবে না। তাই উপার্জন হালাল করতে হলে, স্বভাবতই ঘুষ-দূর্নীতির সংস্পর্শ ত্যাগ করতে হবে। এই অভ্যাসের পরিবর্তন করার মাস হচ্ছে পবিত্র রমজান। ঘুষ-দূর্নীতি বর্জনের অনুশীলন সার্থক হলে, দেশের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। দেশের উন্নতি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি হবে দ্রুত। কারণ এক্ষেত্রে দূর্নীতি প্রধান বাধা।
রমজান আসলেই দেখা যায় নিত্যপ্রযোজনীয় দ্রব্যমূল্যের চরম উর্দ্ধগতি। এই পবিত্র মাসে অতি মুনাফাখোরী মনোভাব পরিত্যাগ করার মন-মানসিকতা অর্জন করা অপরিহার্য কর্তব্য। অথচ দুঃখের সাথে বলতে হয় যে, রমজান মাসে মসজিদে মুসল্লিদের ভিড় যেমন বেশি। ব্যবসায়-বাণিজ্যে অতিমুনাফাখোরী,কালোবাজারী, প্রতারণা ও প্রবঞ্চনার প্রবনতা ও বেশি লক্ষ্য করা যায়। এই মন-মানসিকতা রমজানের শিক্ষার পরিপন্থী। যারা পবিত্র রমজান মাসেও ঘুষ-দূর্নীতিতে লিপ্ত, অতিমুনাফা অর্জনের মানসিকতা ত্যাগ করতে পারেন না, তাদের উদ্দেশ্যেই মহানবী (সা.) বলেছেন ”যারা পবিত্র রমজান পেয়েও তাদের গুনাহ মাফ করাতে পারেন নি, তারা অভিশপ্ত”। কাজেই এব্যাপারে সকলেরই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

রমজানের আরেকট বৈশিষ্ট হচ্ছে স্বাস্থ্যের জন্যে উপকারিতা। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে রমজান মানুষের জন্যে বার্ষিক ওভারহয়েলিংয়ের মতো। কেন না প্রতিটি ইঞ্জিন প্রতি বছর ওভারহোয়েলিং করতে হয়। তাছাড়া রমজান মুসলমানদের জন্যে বার্ষিক মহড়া। দেখা যায় যে, প্রতিবছর বিভিন্ন বাহিনীর বার্ষিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।


লেখকঃ ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান ও নেজামে ইসলাম পার্টি মহাসচিব।