করুণার দান নয়, যাকাত গরীবের পাওনা

করুণার দান নয়, যাকাত গরীবের পাওনা

মোহাম্মদ আবদুল বাসিত


ইসলাম মানুষকে দুনিয়ায় শান্তি ও পরকালে মুক্তির ঘোষনা দিয়েছে। মানব জীবনের অন্যতম প্রধান বিষয় হলো অর্থনীতি, ইসলাম এক্ষেত্রেও সর্বোত্তম ব্যবস্থা দিয়েছে। ইসলামী সমাজব্যবস্থাই সুষ্ঠু অর্থনীতির জীবনীশক্তি। ইসলামী অর্থ ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হচ্ছে সম্পদের মালিকানা মহান আল্লাহ তা’লার। মানুষ সম্পদের মালিকানা আল্লাহর মেনেই সেই সম্পদের ব্যবহার করবে, ব্যবসা বানিজ্য করবে, আয়-ব্যয় করবে, সঞ্চয় করবে। এক্ষেত্রে মানুষ যা ইচ্ছা সঞ্চয় করতে পারে কিন্তু এই সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে রয়েছে আল্লাহর সুস্পষ্ট নির্দেশ, অর্থাৎ আল্লাহ নির্ধারিত বন্টন ব্যবস্থা মেনেই সঞ্চয় করতে হবে। আর সেই বন্টন ব্যবস্থার নাম হলো যাকাত।

যাকাত ইসলামী অর্থনীতির প্রাণ। পবিত্র কোরআনের শুরুতেই হেদায়েতপ্রাপ্ত সফল মুত্তাকী গণের পঞ্চস্ততির দ্বিতীয়টিই উল্লেখ করা হয়েছে যাকাত। হাদিস শরীফে ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের ৩য় টি বলা হয়েছে যাকাত। যাকাত অর্থ পবিত্রতা ও প্রবৃদ্ধি। যেহেতু যাকাত প্রদানে স¤পদ পবিত্র হয় এবং বরকত হয় তাই এর নাম যাকাত। পরিভাষায় যাকাত হলো “নির্দিষ্ট পরিমান স¤পদের মালিক হলে বিশেষ শর্তে নির্ধারিত খাতে নির্দিষ্ট পরিমান সম্পদে ব্যয় করা।”

যাকাত করুণার দান নয়, যাকাত হলো গরীবের পাওনা; যা আল্লাহ ধনীর স¤পদের মধ্যে রেখেছেন। যেহেতু পাওনাদারকে তার স¤পদ বুঝিয়ে দেওয়া, সুতরাং তা সসম্মানে দেওয়াই বাঞ্চনীয়। ইসলামের বিধান অনুযায়ী সাড়ে সাত তুলা সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন তুলা রোপা অথবা এর সমপরিমাণ অর্থ স¤পদের মালিক হলে এর চল্লিশ ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ শতকরা ২.৫% হরে যাকাত প্রদান করা ফরজ।

যাকাত প্রদানের খাত : পবিত্র কোরআনের ঘোষনা অনুযায়ী মুলত ফকির, মিসকিন, যাকাত সংগ্রহকারী কর্মী, অনুরক্ত ব্যক্তি, কৃতদাস, ঋণগ্রস্থ ব্যক্তি, আল্লাহর পথে জিহাদরত মুজাহিদ ও বিপদগ্রস্থ মুসাফির। এ খাতগুলোর মধ্যে যুগচাহিদা ও গুণাগুণ বিবেচনায় রেখে নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশীদের মধ্যে অগ্রাধিকারভিত্তিতে যাকাত প্রদান করতে হবে।

যাকাত প্রদানের উপকারিতা : পবিত্র কোরআনুল কারীমে ঘোষনা হয়েছে “আল্লাহ সুদকে নিঃশেষ করে দেন, সাদাকাতকে প্রবৃদ্ধি ঘটান; আর আল্লাহ অপরাধী কাফেরদের পছন্দ করেন না।” হাদিস শরীফে এসেছে, “দাতা আল্লাহর কাছে, মানুষের কাছে, জান্নাতের কাছে; জাহান্নাম থেকে অনেক দূরে। সাধারন দাতা কৃপণ আবেদ অপেক্ষা আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়।”

যাকাতের সামাজিক অনেক সুফল রয়েছে। যেমনঃ- যাকাত প্রদানে নগদ অর্থ হাত বদল হয়। এতে সম্পদে গতিশীলতা আসে। যাতে প্রচুর লোক ক্রয় ক্ষমতা অর্জন করে। নতুন চাহিদা বা ভোক্তা সৃষ্টি হয়। ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা হয়, কর্মসংস্থান হয়। জনগনের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পায়। সঠিক ভাবে যাকাত আদায় করলে সমাজে দারির্দ্য দূরীভূত হবে, অপরাধ প্রবণতা কমবে এবং আর্থ- সামাজিক বিপর্যয় থেকে জাতি রক্ষা পাবে। সর্বোপরি সুদের নাগপাশ থেকে মুসলমানরা রক্ষা পাবে। যাকাত আদায়ের মাধ্যমে খাই খাই মানসিকতার অবসান হয়, দাতার তালিকায় নাম উঠে ও আত্মসম্মান সৃষ্টি হয়। ধনী- গরীবের বিভেদ দূর হয়ে শ্রদ্ধাবোধ, ভালবাসা- সম্প্রীতি তৈরি হয়, সহমর্মিতা ও সামাজিক নিরাপত্তা বলয় গঠিত হয়; এতে দাতা-গ্রহীতা উভয়ের আর্থ- সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার হয়। সমাজ থেকে কার্পণ্য, লোভ-মোহ, হিংসা, পরশ্রীকাতরতাসহ নানাবিধ দুষ্ঠু উপসর্গ দূরীভূত হয়। যাকাতের উদ্দেশ্য হলো দারির্দ্য বিমোচন, তাই এমনভাবে যাকাত দেওয়া উচিৎ, যাতে যাকাত গ্রহীতা স্বাবলম্বী হতে পারে।