ঐতিহ্য বিলীনের পথে নোয়াখালী টাউনহল

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | অারিফ সবুজ (নোয়াখালী) প্রতিনিধি


নতুন প্রজম্মের অনেকে নোয়াখালী টাউন হল মোড় নাম শুনেছে, কিন্তু জানে না টাউন হল কি এবং কেন? টাউন হল যে কোন জেলার শিক্ষিত সমাজের অবসর বিনোদনের স্থান।এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডেরও স্থান।
বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার মত নোয়াখালী জেলার টাউন হলও নোয়াখালীর ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম। তবে এর ঐতিহ্য আজ হারিয়ে যেতে বসেছে সমাজের কিছু উচ্চ মানুষের কুটিলতার ভিড়ে।

মূলতঃ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর নিয়োজিত কর্মকর্তাদের সুবিধার্থে বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি এদেশের বিভিন্ন জেলায় টাউন হল প্রতিষ্ঠা করেন তারা। এটি ছিল তৎকালীন সময়ে ইংরেজ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের আনন্দ-বিনোদনের স্থান এবং সাম্রাজ্যবাদী শাসন ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করার এক কৌশল । নোয়াখালীর তৎকালীন প্রশাসক মিঃ আগাস্টি’র ঐকান্তিক চেষ্টায় ও তত্ত্বাবধানে ১৮৯৬ সালে গড়ে ওঠে নোয়াখালী টাউন হল ও পাবলিক লাইব্রেরী। ১৯৩৮ সালে নোয়াখালী শহরের একটি অংশ মেঘনার গ্রাসে বিলীন হলে নোয়াখালী টাউন হল ও পাবলিক লাইব্রেরী দক্ষিণ শ্রীপুর মৌজার ভুলুয়া জমিদারের কাছারী বাড়ির খাস জমিতে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৪৪ সালে নোয়াখালী শহর সম্পূর্ণ বিলীন হওয়ার পর জেলা শহর চলে আসে মাইজদীতে।আর নোয়াখালী টাউন হল ও পাবলিক লাইব্রেরীও মাইজদীতে টাউন হল মোড় সংলগ্ন পূর্ব পাশে মিলনায়তন ও পাবলিক লাইব্রেরি স্থানান্তরিত হয়। ১৯৬০ সালে যৌথ ব্যবস্থাপনা থেকে পৃথক করা হয় নোয়াখালী টাউন হল এবং নোয়াখালী পাবলিক লাইব্রেরী।

যে টাউন হলে চলতো বিভিন্ন সংস্কৃতিক বা সামাজিক সংগঠনের অনুষ্ঠান, নোয়াখালীর মানুষ ভুলেই গেছে শেষ কবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছিল এই টাউন হলে। যেখানে পার্শ্ববর্তী জেলার টাউন হল আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিচ্ছে সেখানে আমাদের টাউন হল কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে। বাস্তবিক অর্থে আমাদের নতুন প্রজম্মের অনেকে টাউন হল মোড় নাম শুনেছে, কিন্তু জানে না টাউন হল কি? কি জন্য এই টাউন হল? এই অজ্ঞতার জন্য দায়ী টাউন হলকে গ্রাস করা আমাদের উচ্চ মর্গীয় শ্রেনী।

একটা জেলাকে সমৃদ্ধ করে তার ইতিহাস চর্চা, তার সংস্কৃতি চর্চা। আর সেখানে টাউন হলের ভুমিকা গুরুত্বপূর্ন। মহান মুক্তিযুদ্ধে এই অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধ কন্ট্রোল রুম হিসেবে ব্যবহার করা হতো আমাদের এই টাউন হল । ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করা হয় এই টাউন হলে। আমরা যেভাবে আমাদের টাউন হলকে অকার্য করে ফেলছি, আমাদের নতুন প্রজম্ম সাংস্কৃতিমনা থেকে মাদকসেবী হয়ে উঠবে। চিত্তবিনোদনে সুযোগ না ফেলে তারা অসামাজিক কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হবে।

আরো দুঃখজনক বিষয় হলো আমাদের একটা ঐতিহাসিক টাউন হল থাকতে আমরা সোশ্যাল ওর্য়াকাররা হাজার হাজার টাকা খরচ করে হল ভাড়া করতে হয়। একটা হল ছিলো “পৌর হল” সেটাও ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে কারন পৌরসভা ভবন নতুন করে করেছে। আরেকটা হল বর্তমানে আছে “শিল্পকলা হল” কিন্তু ঐ হল সকল সংগঠনের জন্য নয়, সকল আম জনতার জন্য নয়, সকল সামাজিক সংগঠনের জন্য হচ্ছে টাউন হল।

সমাজ বিনির্মাণে ও সামাজিক কর্মকান্ডে অসামান্য অবদান রাখতে নোয়াখালী টাউন হল একটি অনন্য উদাহরণ। নোয়াখালী টাউন হল সূচনালগ্ন থেকেই সমাজ হিতৈষী কর্মকান্ডে ব্যস্ততম প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়ায়।নোয়াখালী টাউন হল বাংলাদেশের মধ্যে সর্বপ্রথম জাতীয় বীর সন্তান নোয়াখালীর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা দিয়েছিল এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক চিহ্নসংবলিত ক্রেস্ট বিতরণ করা হয়েছিল।আশির দশকের শেষভাগ থেকে নব্বই -এর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানটি তার উৎকর্ষের শীর্ষে অবস্থান করছিল সামাজিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে।

এদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে নোয়াখালীর এই টাউন হলটি মাদক ও অাগ্রাসনের কালো হাত থেকে মুক্ত করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহলকে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়ার অাহবান জানিয়েছে নোয়াখালীর সুশীল সমাজ।