ই’তিকাফের তাৎপর্য ও ফজিলত

ই’তিকাফের তাৎপর্য ও ফজিলত

মুফতী রহিমুল্লাহ শরীফইসলামিক রিসার্চ সেন্টার কক্সবাজার 


ই’তিকাফের অর্থ:
আরবী শব্দ ই’তিকাফ এর অর্থ অবস্থান করা ৷ ইসলামী পরিভাষায় ই’তিকাফ বলে পাক-পবিত্র হয়ে নিয়ত করে মসজিদে অবস্থান করা ৷ যেহেতু ই’তিকাফকারী পার্থিব সমস্ত ব্যাস্ততা থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেকে অাল্লাহর ঘরে আবদ্ধ রাখে, এজন্য তাকে মু’তাকিফ বলা হয় ৷

ইসলামী শরীয়তে ই’তিকাফের অবস্থান:
ই’তিকাফ মূলত তিন প্রকার ৷ ওয়াজিব ই’তিকাফ, সুন্নাতে মুয়াক্কাদা ই’তিকাফ ও নফল ই’তিকাফ ৷ আজকে শুধুমাত্র রমজানের শেষ দশদিনের ই’তিকাফের আচলোচনা করব আর এটি সুন্নাতে মুয়াক্কাদা কিফায়া ৷

নবীজি সা: এর ই’তিকাফ:
মদিনায় অবস্থানকালীন সময়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি বছরই ই‘তিকাফ পালন করেছেন। দাওয়াত, তরবিয়ত, শিক্ষা ও জিহাদে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও রমজানে তিনি ই‘তিকাফ ছাড়েননি। এগার হিজরী বার রবিউল আওয়াল তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন আর শেষ বছর তথা দশম হিজরীতে বিশদিন ই’তিকাফ করেছেন ৷

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহধর্মিণী আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের শেষের দশকে ই‘তিকাফ করেছেন, ইন্তেকাল পর্যন্ত। এরপর তাঁর স্ত্রীগণ ই‘তিকাফ করেছেন’।①

‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি রমজানে দশ দিন ই‘তিকাফ করতেন, তবে যে বছর তিনি পরলোকগত হন, সে বছর তিনি বিশ দিন ই‘তিকাফে কাটান’।②

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহ আনহা হতে বর্ণিত,তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি রমজানের শেষ দশদিন ই‘তিকাফ করতেন। তবে যে বছর পরলোকগত হন তিনি বিশ দিন ই‘তিকাফ করেছেন’।③

ই’তিকাফের ফজিলত:
ই‘তিকাফ একটি মহান ইবাদত, ই‘তিকাফরত অবস্থায় বান্দা নিজেকে আল্লাহর ইবাদতের জন্য দুনিয়ার অন্যান্য সকল বিষয় থেকে আলাদা করে নেয়। ঐকান্তিকভাবে মশগুল হয়ে পড়ে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের নিরন্তর সাধনায়।

ই’তিকাফকারি যদি মসজিদে কিছু না করে বসেও থাকে তবু সে ইবাদাতগুজার হিসেবে গণ্য হয় এবং সে মসজিদে বসে বসে অসংখ্য আমলের সওয়াব লাভ করে ৷
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসূল সা. ইরশাদ করেন, ‘ই’তিকাফকারি ব্যাক্তি গুনাহ থেকে মুক্ত এবং তাকে সে পরিমাণ সওযাবের বিনিময় দান করা হয় (যা ই’তিকাফে থাকার কারণে তার সুযোগ হয়নি) যা আমলকারি ব্যাক্তি পেয়ে থাকে’ ৷④

অন্য এক বর্ণনায় আছে, ‘ যে ব্যাক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একদিন ই’তিকাফ করে আল্লাহ তার এবং জাহান্নামের মাঝখানে তিন খন্দক পরিমাণ দূরত্ব সৃষ্ঠি করে দেন আর এক খন্দকের দূরত্ব জমিন থেকে আসমানের দূরত্বের সমান ৷⑤ আর রমজানের শেষ দশদিন ই’তিকাফে থাকলে সবে কদর পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে ৷

রসূল সা. বলেন, আমি (প্রথমে) এ রাতের সন্ধানে প্রথম দশে ই‘তিকাফ পালন করি। অতপর ই‘তিকাফ পালন করি মাঝের দশে। পরবর্তীতে ওহির মাধ্যমে আমাকে জানানো হয় যে, এ রাত শেষ দশে রয়েছে। সুতরাং তোমাদের মাঝে যে (এ দশে) ই‘তিকাফ পালনে আগ্রহী, সে যেন তা পালন করে। লোকেরা তার সাথে ই‘তিকাফ পালন করল। রাসূল বলেন, আমাকে তা এক বেজোড় রাতে দেখানো হয়েছে এবং দেখানো হয়েছে যে, আমি সে ভোরে কাদা ও মাটিতে সেজদা দিচ্ছি। অতপর রাসূল সা. একুশের রাতের ভোর যাপন করলেন, ফজর পর্যন্ত তিনি কিয়ামুল্লাইল করেছিলেন। তিনি ফজর আদায়ের জন্য দাঁড়ালেন তখন আকাশ ছেপে বৃষ্টি নেমে এল, এবং মসজিদে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পানি পড়ল। আমি কাদা ও পানি দেখতে পেলাম। ফজর সালাত শেষে যখন তিনি বের হলেন, তখন তার কপাল ও নাকের পাশে ছিল পানি ও কাদা। সেটি ছিল একুশের রাত।⑥


①[বুখারী : ২০২৪; মুসলিম : ১১৭২]
②[বুখারী : ২০৪৪]
③[বুখারী : ৩০৯]
④[মিশকাত: ১/১৮৩]
⑤[ আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব: ২/৯৬]
⑥[মুসলিম : ১১৬৭]