সিরিয়া যুদ্ধের সাত বছর; কোন পথে নিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব মোড়লরা

সিরিয়া যুদ্ধের সাত বছর; কোন পথে নিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব মোড়লরা


আশরাফ মাহদী 
মিসর প্রতিনিধি : ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম



জাতিসংঘের হিসাবমতে সিরিয়া গৃহযুদ্ধে গত সাত বছরে মৃত্যুর সংখ্যা চার লক্ষ। যার এক তৃতীয়াংশই হচ্ছে বেসামরিক নাগরিক। এছাড়াও বিভিন্ন দেশে আশ্রয় গ্রহণ করা সিরিয়ান শরণার্থী আছে প্রায় ষাট লক্ষাধিক।

সিরিয়ার স্বৈরাচার সরকার বাশার আল আসাদ যখন নিজের পতন ঠেকাতে সেনাবাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি দাড় করিয়ে দিয়েছিল তখন থেকেই গৃহযুদ্ধের সূচনা। সিরিয়ার দক্ষিণের শহর দারায় জনগণের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের উপর সরকার সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে সশস্ত্রভাবে হামলা করানোর পরই সাধারণ জনগণ অস্ত্রের মাধ্যমে এর জবাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এবং ‘ফ্রি সিরিয়ান আর্মি’ গঠন করে সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। সে সময় সরকারী অনেক সেনারাও এসে যোগ দিয়েছিল বিদ্রোহীদের সাথে। সংঘর্ষে প্রথম তিনমাসেই নিহতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

বিদ্রোহীদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে এক বছর যেতে না যেতেই আসাদ সরকার দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রথমদিকে শান্তিপূর্ণ আন্দোলকে উস্কে দিতে সরকার যেই যুবকদের গ্রেফতার করে অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছিল তাদেরকে ছেড়ে দেয়। এক পর্যায়ে কোণঠাসা হয়ে পড়লে সর্বপ্রথম বিদেশী শক্তি হিসেবে আসাদ সরকারের পাশে এসে দাঁড়ায় ইরান। সাথে আসে ইরান সমর্থিত গেরিলাগ্রুপ লেবাননের হিযবুল্লাহ।
এবং ফিলিস্তিনের ইসরাইল বিরোধিতার ইস্যুতে সিরিয়া পাশে থাকায় ফিলিস্তিনের হামাসও তখন সমর্থন দিয়েছিল আসাদ সরকারকে।

পরবর্তীতে রাশিয়াও এগিয়ে আসে আসাদ সরকারের সমর্থনে। কারণ সিরিয়া মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার সবচেয়ে বন্ধুভাবাপন্ন দেশ। তাছাড়া আসাদ যদি যুদ্ধে হেরে যায় তাহলে ভূমধ্যসাগরে সিরিয়ার তারতুস নৌঘাঁটিও হাতছাড়া হয়ে যাবে। এ কারণেও রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা ও ইসরাইলের খবরদারি করার সুযোগ দিতে কোনভাবেই রাজি ছিল না।

অন্যদিকে সিরিয়ার বিদ্রোহিদের সশস্ত্র সমর্থন দেয় সৌদিআরব। মিত্র শক্তি হিসেবে সাথে ছিল আমেরিকা, ইসরাইল, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। এমনকি শুরুর দিকে তুরস্ক ও কাতারও বিদ্রোহীদের সমর্থন করেছিল।
তবে এই সমর্থনের পেছনে ইসরাইলের স্বার্থটাই একটু বড় ছিল। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের জবরদখলের পেছনে সিরিয়া ও ইরানই বড় বাধা হয়ে ছিল। কারণ আসাদ সরকার ছিল ইসরাইলের কট্টর বিরোধী।

২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারীতে সিরিয়া যুদ্ধে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে যোগ দেয় আইএস। ইরাকের বিশাল এলাকা দখল করে তারা সিরিয়ার দিকে অগ্রসর হয়। তারাও আসাদ সরকারের পতন চায়, তবে তাদের নিজস্ব তরিকায়। যার কারণে অন্যান্য বিদ্রোহীদের সাথে তাদের চরম বিরোধ হয়।

অন্যদিকে আমেরিকা আসাদ সরকারের পতন চাইলেও আইএসের সাথে তাদের যুদ্ধ বেশ পুরনো। তাই আইএসের সিরিয়ায় অনুপ্রবেশ যুদ্ধের সমীকরণ পাল্টে দেয়। এতদিন আমেরিকা আসাদ সরকারের পতনের জন্য বিদ্রোহকারীদের সহায়তা দিয়ে আসলেও এইবার তারা সরাসরি আইএস বিরোধী যুদ্ধ শুরু করে। এবং বিদ্রোহীদের মধ্যেও শুধুমাত্র তাদেরকেই অস্ত্র সরবরাহ করা শুরু করে যারা আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে রাজি হয়। আর আইএসের বিরুদ্ধে সে সময় যুদ্ধ করেছিল ‘সিরিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্স’। যাদের অধিকাংশই কুর্দি বাহিনী ওয়াইপিজির সদস্য ছিল।
এভাবেই সিরিয়ায় আইএসের আগমনে ত্রিমুখী সংঘর্ষের সূচনা হয়েছিল।

যে আসাদ সরকার বিদ্রোহীদের আন্দোলনে একসময় প্রায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল বিদেশী মদদকে পুজি করে নিজের দেশের বেসামরিক মানুষের উপর নির্মম নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। ক্যামিকাল অস্ত্র প্রয়োগ করে হাজার হাজার মানুষ হত্যা করতে থাকে। গত সাত বছরের যুদ্ধে ২১৫ টি রাসায়নিক হামলা চালিয়ে বেসামরিক জনগণকে হত্যা করেছে বলে জানিয়েছে ‘সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস’। এমনকি যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও আসাদ সরকারের রাসায়নিক হামলা অব্যহত ছিল।

২০১৬ সালের এই সংকট সমাধানে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল তুরস্ক, ইরান ও রাশিয়া জোট। সে বছরই ২৯ ডিসেম্বর যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে তারা। তবে আইএসের সাথে সাথে আলকায়দা, জাবহাতুল ফাতেহ ও কুর্দি ওয়াইপিজি বিদ্রোহীসহ আরো যাদেরকে আমেরিকা সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিল তারা এই যুদ্ধবিরতি চুক্তির বাইরে ছিল। যার ফলে তাদের উপর সরকার বাহিনীর হামলা অব্যাহত ছিল।

সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালের জানুয়ারীতে কাজাখস্তানের রাজধানী আস্তানায় বৈঠকের আয়োজন করা হয়। এতে আসাদ সরকার এবং বিদ্রোহীদের ‘ফ্রি সিরিয়ান আর্মি’সহ ১৪টি সশস্ত্র সংগঠন অংশ নিয়েছিল। এরপরও বেশ কয়েকবার তুরস্ক ইরান ও রাশিয়া জোট সিরিয়ায় টেকসইভাবে শান্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষে বৈঠক করেছে। এবং এখন পর্যন্ত জাতিসংঘসহ অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই জোটের উদ্যোগেই একটি স্থায়ী সমাধানের আশা করছে বলে শোনা যাচ্ছে।

তবে তুরস্ক ইরান রাশিয়া জোটের বিপরীতে আমেরিকা ও ইসরাইল এ সমাধানে সন্তুষ্ট নয়। কারণ এতে মধ্যপ্রাচ্যে এতদিন যুদ্ধ জিইয়ে রাখায় তাদের যে স্বার্থ ছিল তা চরমভাবে ব্যহত হবে। তাই কিছুদিন আগে তুরস্ক, ইরান জোটের যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে আমেরিকা ও ইসরাইল বিদ্রোহীদের সমর্থনে সরকার বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছে। এবং এই অভিযানে আমেরিকার সহযোগী ছিল যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স।

এর উপর ভিত্তি করেই ইসরাইল ও ইরানের বিরোধ চরমে পৌঁছেছে। সম্প্রতি সিরিয়ার ভেতরে থাকা ইরানী অবস্থানগুলোর উপর হামলা চালাচ্ছে ইসরাইল। কিছুদিন আগে ইসরাইলের এক মন্ত্রী বললেন, ‘ইরানকে যদি সিরিয়ায় তৎপরতা চালিয়ে যেতে দেওয়া হয় তাহলে ইসরাইল বাশার আল আসাদকেও হত্যা করতে পারে’।

তবে সিরিয়ার জনগণের এখন বক্তব্য হল আসাদ সরকার খারাপ ছিল, তবে বিদেশী শক্তির হস্তক্ষেপ দেশের পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তুলেছে। তাই বাশার সরকারের অধীনে হলেও একটা সমাধানে যেতে চায় তারা। কারণ অধিকাংশ শরণার্থীরাই নিজেদের দেশে ফিরতে চায়। আর তারা মনে করে না যে আমেরিকা ও ইসরাইলের সামরিক আক্রমণ কোনভাবেই বাশার সরকারকে হঠাতে পারবেনা।

অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে মোড়লগিরি টিকিয়ে রাখার খেলায় যে আমেরিকার পরাজয় হতে যাচ্ছে সেটা আফগানিস্তানের পরিস্থিতি থেকে কিছুটা বুঝা যায়। ১৬ বছর ধরে চলা এ যুদ্ধে আমেরিকা এখন বুঝতে পারছে যে এই যুদ্ধে তারা জিততে পারবেনা, যুদ্ধ থামাতেও পারবেনা, সেখান থেকে পালিয়েও আসতে পারবেনা।
গত আগস্টে ট্রাম্প আফগানিস্তানে “ফাইট টু ইউন” এর ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু সেখানে ট্রাম্পের বিচার বিবেচনাহীন হামলার ফলে গত বছর তিন হাজার মানুষ নিহত হয়েছে বলে জানা যায় জাতিসংঘের গত ফেব্রুয়ারীর এক রিপোর্ট থেকে। চরম ব্যর্থতার বুঝতে পেরে যে আফগানিস্তান থেকেও এখন কেটে পড়ার পথ খুজছে আমেরিকা সেটা রিপাবলিকান সিনেটর র‍্যান্ড পলের কথা থেকে বুঝা যায়। পল বলেছেন, “ট্রাম্প এ বিষয়ে একমত হয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের “ফাইট টু উইন” নীতি ভুলে যাওয়া উচিৎ। এবং যুদ্ধ সংক্ষেপ করে সেখান থেকে পালিয়ে আসা উচিৎ। তিনি আমাকে বারবার বলছেন আমরা সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে যাচ্ছি”

সিরিয়া যুদ্ধে এখন পর্যন্ত উভয়পক্ষেরই নিহতের সংখ্যা দুই লাখের উপরে। তাই এখন যদি কোন পক্ষ এই যুদ্ধে জিতে ক্ষমতায় এসেও যায় তাহলে তারা অপর পক্ষকে তারা টিকতে দেবেনা। তাছাড়া সিরিয়া নিয়ন্ত্রণের মত লোকবল না থাকায় বাশার এখন তুরস্ক, রাশিয়া ও ইরান জোটের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। অন্যদিকে বিদ্রোহীদের উপদলগুলোর কোন একক নেতা না থাকায় তাদের মধ্যে ঐক্যেরও অভাব রয়েছে।

যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি বলে, কুর্দিরা এখন পর্যন্ত বেশ ভাল অবস্থানে আছে। রাকা থেকে আইএসকে বিতাড়িত করে হাসাকা, মানবিজ ও আফরিনসহ বেশ বড় এরিয়া এখন কুর্দিদের দখলে। অন্যান্য বিদ্রোহীদের দখলে আছে দামেস্ক, ইদলিব আর আলেপ্পোর কিছু অংশ। তবে তুরস্ক কুর্দিদের স্বাধীনতার বিপক্ষে থাকায় আসাদ সরকারের পক্ষে গিয়ে কুর্দিদের দখল নেওয়া অঞ্চলগুলোতে অভিযান পরিচালনা করেছে।
সিরিয়ার এইযুদ্ধ ক্ষেত্রে আইএসের পরাজয় হয়েছে সবচেয়ে শোচনীয়ভাবে।

এভাবে ক্রমেই বিদেশী শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে সিরিয়ার এই গৃহযুদ্ধকে। যেকোন একটি পক্ষকে অবশ্যই এই সংকট নিরসনে নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে আসতে হবে। যদিও এই যুদ্ধের মূল উস্কানীদাতা আসাদ সরকার ও ইরান হলেও অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এই পরিস্থিতে তুরস্ক ইরান ও রাশিয়া জোট যদি চায় তাহলে তাদের পক্ষেই এর সমাধানের পথ বের করা সম্ভব।