ইফতার মাহফিল ইসলামী সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | জামিল আহমদ


মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী

মাহে রমযান বছরের বাকি এগার মাস অপেক্ষা অধিক মর্যাদাশীল ও বরকতপূর্ণ মাস। অনন্য ইবাদতের মাস রমযান। এ মাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য মাসব্যাপি রোযা পালন করা। মাসের প্রতিটি দিন উপবাস করে, সংযমের সঙ্গে কাটানো। এর সঙ্গে উতপ্রোতভাবে জড়িত সাহরী ও ইফতার আছে তারাবীহ। স্বভাবজাত ও বাস্তব নানা কারণে এ মাসটিতে মুসলমানদের জীবনে কিছু ব্যতিক্রমী রুটিন, প্রস্ত্ততি, উপলক্ষ ও প্রবণতা ফুটে ওঠে। এর প্রভাব মুসলিম প্রধান এ দেশটিতে অ-মুসলিমদেরও স্পর্শ করে যায়।

রমযান মাসে একটি আনন্দের সময় হলো ইফতারে সময় বা এর পূর্ব মুহূর্ত। দেখা যায়, সংস্কৃতিতে ইফতারের বিশেষ প্রভাব আছে। বহু অমুসলিম ইফতারের আয়োজন করে থাকেন। অনেক অমুসলিম ব্যবসার তাগিদে ইফতার সামগ্রী তৈরি করে থাকেন। হাট-বাজারে, অফিস-আদালতে ও সংঘবদ্ধ কোনো কোনো স্থানে অনেক অমুসলিম মুসলিমদের সঙ্গে ইফতারিতে অংশগ্রহণ করেন। এটি আমাদের দেশীয় ঐহিত্য ও ইসলামী সংস্কৃতি।

চলতি রমযান মাসে ইসলামী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পাশাপাশি সেকুলার রাজনৈতিক দলও ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেছে। এমন কি বামপন্থী দলও ইফতারের আয়োজন করেছে। এসব দেখে সমাজের সুশীল শ্রেণীর অনেককেই বলতে শুনা যাচ্ছে ইফতার পার্টি মাধ্যমে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করা হচ্ছে।

রমজানের ইফতার মাহফিল ও এর রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় দিক নিয়ে কথা হয় লেখক ও সমাজ চিন্তক মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভীর সাথে। তিনি বলেন, ইফতারকে যদি শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি তাহলে ইফতার হলো একটি ইবাদাত, ইফতার এককভাবে, পারিবারিকভাবে, সামাজিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার সাথে সম্মিলিতভাবেও করা যায়, মসজিদ মাদরাসায়ও করা যায়। সম্মিলিত ইফতারে অনেক সওয়াবও আছে। এ ব্যপারে অনেক উৎসাহও করা হয়েছে। হাদিসে এসেছে কোন ব্যাক্তি যদি একজন রোজাদারকে ইফতার করায় তাহলে সে তাহার রোজা পরিমাণ সওয়াবের অধিকারী হবে এবং রোজাদারের রোজার সওয়াব থেকে কোন অংশ কমানো হবে না।

মাওলানা নদভীর মতে ইফতার বা সাহরী যখন বৃহৎ মুসলিম জনগোষ্ঠী আয়োজন করে, তখন এটা ব্যাক্তিগত থাকে না, সেটা সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা জাতীয় অনুষ্ঠানের রুপ নেয়। তিনি মনে করেন, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ইফতার মাহফিল বা পার্টি খারাপ না বরং অনেক প্রসংশনীয়। এবং এভাবে ইফতারের আয়োজন করা ইসলামী ঐতিহ্য বা সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মাওলানা নদভী বলেন, এখন শুধু ইসলামী সংগঠন না বরং যারা ইসলাম পালন করে না, অন্যান্য ইজম তারাও এখন ইফতার মাহফিল বা ইফতার পার্টির আয়োজন করে। হোয়াইট হাউজেও ইফতার মাহফিল হয় মুসলমানদের সম্মানে।

ভারতের রাষ্ট্রীয় ইফতার মাহফিলে অংশগ্রহণের স্মৃতিচারণ করে উবায়দুর রহমান খান নদভী বলেন, ভারতের বর্তমান রাষ্ট্র প্রধান ও ক্ষমতাসীন দল বিজেপীর প্রধান নরেন্দ্র মোদিও একবার ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেছেন। আমার ছাত্রজীবনে একবার তো ভারতে এক ইফতার মাহফিলে বলিউড অভিনেতা অমিতাব বচ্চনের সাথে এক টেবিলে পাশাপাশি বসে ইফতার করেছি। তিনিও ইফতার করেছেন

তাঁর মতে ইফতার মাহফিলে কোন অমুসলিম শরীক হওয়াতে সমস্যা নেই, অমুসিলম কর্তৃক আয়োজিত ইফতারেও মুসলমানদের যেতে সমস্যা নেই।

আমাদের দেশে সাম্প্রতিককালে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলোর ইফতার মাহফিলের বিষয় তিনি বলেন, চলমান ইফতার মাহফিল বা পার্টি গুলোকে আমি কোনভাবেই মন্দ বা বর্জনীয় বলতে পারি না। কারণ এটাকে ইবাদত না বললেও মুসলিম প্রধান দেশে ইফতার মাহফিল বা পার্টি গুলোকে একটি মুসলিম সংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবেই ধরা যায়। আমি চাই ইফতার মাহফিল বা পার্টি দেশে সবখানে দলমত নির্বিশেষে সকলেই আয়োজন করুক সকলেই অংশগ্রহণ করুক।

মাওলানা নদভী বলেন, অনেকেই বলেন যে, এতো পরিমাণ ইফতার কেন? এখানে তো অনেক অপচয় হয়। রোজা না রেখেও ইফতার মাহফিলে শরীক হয়। আমাদের দেশে দুর্নীতি লুটপাট, অপচয় কোনটা না হচ্ছে সবই তো হচ্ছে সেখানে প্রতিবাদ নেই এখানে কেন?

মাওলানা মুসা বিন ইজহার

তিনি আরো বলেন, রমযান মাস এমন একটি মাস যেখানে সব দলের, সব চিন্তার, সকল শ্রেণীর লোক একত্রিত হয়। যাদের মুখ দেখাদেখি , সংলাপও হয়না, এরপর ইফতার মাহফিলে দাওয়াত করলে অনেকেই চলে আসেন, মানুষ সাধারণত কেউ কাউকে দিতে চায় না কিন্তু রমযানের মাসে ইফতারের নামে হলেও একজন অন্যজনকে দেয়। সেটাই তো অনেক কিছু।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্মমহাসচিব ও ঢাকা মহানগর সভাপতি মাওলানা মুসা বিন ইজহার বলেন, রমযান মাস কুরআন অবর্তীণের মাস যাতে সকলে মিলে মিশে থাকার শিক্ষা দেয়। ইফতার মাহফিল হলো একটি ইসলামিক সাংস্কৃতি বা ঐতিহ্য, আচার-আনুষ্ঠান, যেখানে দলমত নির্বিশেষে সকলেই অংশগ্রহণ করার সুযোগ থাকে। আর ইফতার হলো একটি ইবাদাত, সারা দিন উপবাস থেকে ইফতারের মাধ্যমে রোজার সমাপ্তি হয়।

ইসলামী দল ছাড়াও অন্যান্যদের ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠানগুলো আপনার কাছে কেমন লাগছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, একটা সময় দেখা যেত যারা ইসলামী সংগঠন করেন তারাই ইফতার মাহফিলে আয়োজন করতেন, কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে ইসলামী দল ছাড়াও অন্যান্যরাও আয়োজন করছে এবং সকল শ্রেনীর মানুষরাও অংশ নিচ্ছে। দিন দিন ইফতার মাহফিল বাড়ছে এবং আশাকরি আাগামীতে বাড়বে। সেটা ইসলামের এক সাংস্কৃতিক বিজয়।