যেভাবে ফিলিস্তিনি শিশুর খুলি চূর্ণবিচূর্ণ করল ইসরাইলি সন্ত্রাসীরা

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | ডেস্ক রিপোর্ট


ইসরাইলি সন্ত্রাসীরা যখন সীমান্তবেষ্টনীর উল্টো দিক থেকে গাজা উপত্যকায় কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ও তাজা গুলি ছুড়ছিল, তখন কয়েক বন্ধুসহ ইয়াসের আবু আল নাজা একটি ডাস্টবিনের আড়ালে লুকিয়ে ছিল।

শুক্রবার ফিলিস্তিনিদের বসতবাড়িতে ফেরার বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ।

ইয়াসের বিক্ষোভ থেকে একটু দূরেই অবস্থান করছিল। কখন গোলাগুলি থামে তা দেখতে মাথা উঠিয়ে একটু উঁকি দিয়েছিল সে। তখনই একটি গুলি এসে লাগে তার মাথায়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, গুলির বিস্ফোরণে তার মাথার খুলি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। শরীরের একটি অংশ রক্তের মণ্ডের মতো হয়ে সে লুটিয়ে পড়ে।

মাত্র ১১ বছর বয়সের শিশু ইয়াসের। গত ৩০ মার্চ শুরু হওয়া ফিলিস্তিনিদের বসতবাড়িতে ফেরার বিক্ষোভে তাকে নিয়ে ১৬টি শিশুকে হত্যা করে দখলদার ইসরাইলি সেনারা।

এর কয়েক ঘণ্টা পর সূর্য ডুবে গেছে। ইয়াসেরের মা সামাহ আবু আল নাজাহ মোবাইলে ফেসবুক ঘাঁটছিলেন। তখন তার সামনে এক অজ্ঞাত বালকের ছবি চলে আসে। যার মাথা ও রক্তাক্ত শরীর অস্পষ্ট করে দেয়া। গায়ের জামাটা দেখে তাকে চেনা যাচ্ছিল।

তিনি বলেন, তার মুখমণ্ডল দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু তাকে নিজের সন্তান হিসেবে চিনতে কষ্ট হয়নি।

এক প্রতিবেশী ও আমার কন্যা পাশে বসেছিল। তাদের আমি ফোনের দিকে টেনে নিয়ে বললাম, এটি আমার সন্তান।

তাৎক্ষণিক বিভীষিকা তার ভেতর থেকে বেদনা বোধের যন্ত্রণা তাড়িয়ে দিয়েছে।

তরুণ বয়সে মা হয়েছিলেন তিনি। এখন তার বয়স ৩০। তিনি গাজার ইউরোপীয় হাসপাতালের দিকে গেলেন। তার প্রথম সন্তানটি গুলিতে নিহত হয়েছেন, এমনটি ভাবতে তাকে নিজের মনের সঙ্গে অনেক লড়াই করতে হয়েছে।

কান্নায় তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরছিল। তিনি বলেন, আমার ছেলে নিহত হবে, এমনটি কখনও আমার ভাবনায় ছিল না। আমি জানতাম, প্রতি শুক্রবার সে বিক্ষোভে অংশ নিতে যায়। মূলত অন্য বন্ধুদের সঙ্গে বিক্ষোভ দেখতেই তার আগ্রহ ছিল বেশি।

২০০৬ সালে জন্ম নিয়েছিল ইয়াসের। তার এক বছর আগে ইসরাইল ও মিসর গাজায় কঠোর অবরোধ আরোপ করেছিল।

তার বেড়ে ওঠার মধ্যে ইসরাইল গাজা উপত্যকায় তিনটি ভয়াবহ হামলা চালিয়েছিল। এ অল্প বয়সে সে নিজেদের বাড়িঘর দুবার ধ্বংস হতে দেখেছে। এ সময়ে তাদের অস্থায়ীভাবে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতে হয়েছে।শনিবার তাকে দাফন করা হয়েছে। তার জানায় বিপুল মানুষ অংশ নিয়েছে।

যারা তাকে চিনত, সবাই বলেছেন- সে সবার সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার করত। সবার আদরের ছিল সে। খেলাধুলা, ঘোড়ায় চড়া ও সাঁতার কাটতে ভালোবাসতো। ফুটবল ছিল তার প্রিয় খেলা।

ইহুদিবাদী ইসরাইলি সেনারা যেদিন তাকে হত্যা করে, তার আগের রাতে বন্ধুদের সঙ্গে মিলে সে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখে আনন্দ প্রকাশ করেছে।

তার মা বলেন, ছোট ভাইবোনদের যত্ন নিতে সে আমাকে সাহায্য করত। ইয়াসের খুবই সামাজিক ও বন্ধুবৎসল ছিল। বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে ফুটবল খেলা দেখতে পছন্দ করত সে।

ইয়াসের ছিল পরিবারের বড় সন্তান। তাই তার জন্ম নেয়া কেন্দ্র করে সংসারে আনন্দের শেষ ছিল না। তার বাবার প্রথম স্ত্রী নাইমাও আনন্দে মেতেছিলেন সেদিন।

নাইমার ঘরে ৯ মেয়েসন্তান জন্ম নেয়ার পর তিনি তার স্বামীকে দ্বিতীয় বিয়ে করতে পরামর্শ দেন। কারণ তার গর্ভে কোনো ছেলেসন্তান আসছিল না।ইয়াসের জন্ম নিলে ৪৮ বছর বয়সী নাইমা তাকে নিজের সন্তানের মতোই বড় করেন।

নাইমা বলেন, সূর্যের আলোর মতো সে সারাক্ষণ আমার ঘরের চারপাশে থাকত। আমার মেয়েরা তাকে আদর করত, ভালোবাসতো। তার মৃত্যুর শোক কোনো দিন শেষ হবে না।

তিনি বলেন, ইসরাইলিরা কেবল একটি ভাষাই বোঝে। হোক সেটা সশস্ত্র কিংবা নিরপরাধ মানুষের নিরস্ত্র প্রতিরোধ, তারা হত্যাকাণ্ড ছাড়া কিছুই বোঝে না।

জ্যেষ্ঠ হামাস নেতা খলির আল ইয়াহইয়া বলেন, ইয়াসেরের শহীদ হওয়া ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে ইসরাইলি দখলদারদের অপরাধেরই জ্বলন্ত প্রমাণ।


সূত্র: রয়টার্স