আমি নিরাপত্তাহীন এক নাগরিক

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | সোশ্যাল মিডিয়া ডেস্ক


মাওলানা বাহাউদ্দিন জাকারিয়া  | পরিচালক: জামিয়া হুসাইনিয়া ইসলামিয়া আরজাবাদ


আমি নিরাপত্তাহীন এক নাগরিক। কর্মই আমাকে প্রতিদিন ঘর থেকে বেরুতে বাধ্য করে। রাজধানীর রাজপথ, অলিগলি আমাকে ঘুরে বেড়াতে হয়। আমার নিজস্ব কোন বাহন নেই। নিজস্ব বাহনের ব্যবস্থা করার আর্থিক সঙ্গতি নেই আমার। গণপরিবহন, রিক্সা ইত্যাদিকেই বাহন হিসেবে নির্বাচন করতে হয় আমাকে। কখনোবা গন্তব্যে পৌঁছতে হয় পদব্রজেই। অধিকাংশ সময় একাকি চলি আমি। লোকজন নিয়ে চলার মানসিকতা এখনো তৈরি করতে পারিনি।

আমি আজ আতঙ্কিত। মুফতি হুজাইফা আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা আমাকে আরো আতঙ্কিত করে তুলেছে। পুর্ব থেকেই দেশের আইন-শৃঙ্খলার যে দুরাবস্থা তাতেই সন্ত্রস্ত সময় পার করতে হয় আমাকে। নিরীহ হুজাইফার উপর পৈশাচিক হামলা আমার ভীতিকে আরো বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। হুজাইফার দেহের পোষাক আর আমার পোষাক অভিন্ন। তার চিবুকে যে সুন্নতি শ্মশ্রু, আমার চিবুকেও সেই শ্মশ্রু। সে যে বিদ্যার্জনে রত, আমিও সে বিদ্যার্জন করেছি। সে যে আদর্শের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে, আমিও সে আদর্শ লালন করছি। সে যে বিদ্যালয়ের শিক্ষানবিশ, আমি সে ধরনের একটি বিদ্যালয়েই কর্মরত।

দিন-দুপুরে রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকাতে প্রকাশ্যে কিছু দলীয় দস্যু হায়েনার ন্যায় হুজাইফার উপর হামলে পড়ার দৃশ্য দেখে আমি শিহরিত হয়ে উঠি। আমার দেহ ঘর্মাক্ত হয়ে যায়। ভয়ে আমার মুখে জড়তা অনুভব করি। তার বেকসুর হওয়ার আকুতি নরপিচাশদের হৃদয়ে কোন প্রভাব ফেলেনি। সে যতই নির্দোষ হওয়ার দাবি করছিল, হায়েনাদের হিংস্রতা ততই বৃদ্ধি পাচ্ছিল।
তার পরিধেয় বস্ত্র হিংস্র প্রাণীর ন্যায় ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে ফেলছিল ওরা। তার কোমল দেহে আঘাতের পর আঘাত করে যাচ্ছিল ওই পাষণ্ডরা। তাকে রক্ষা করার কেউ নেই। তাকে বাঁচানোর জন্য এগিয়ে আসছে না কেউ। হায়েনাদের তাড়িয়ে দেয়ার জন্য জনগণের রাজস্বে বেতনভুক্ত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কোন সদস্যকেও অগ্রসর হতে দেখা যায়নি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া হুজাইফার ছবি দেখে ভাবি- আমি রিকশা যোগে কোথাও যাচ্ছি। আচমকা দলীয় দস্যুরা আমার রিকশায় আক্রমণ করে বসেছে। আমার পোষাক টুকরো টুকরো করে ফেলছে। আমার দেহ রক্তাক্ত। আমি ক্ষতবিক্ষত। আমার মাথার টুপি, আমার হাতে থাকা কিতাবটি ওদের দ্বারা পদদলিত। ওরা বিজয় উল্লাসে মত্ত।
আমি ভাবছি, এই বুঝি আমার সন্তানরা এতিম হয়ে গেল। তারা আমার শিয়রে দাঁড়িয়ে পড়ছে, “রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বা ইয়ানি সাগিরা”৷ এই বুঝি আমার স্ত্রী বিধবা হয়ে গেল। এই বুঝি আমার মা-জননী সন্তান হারিয়ে জায়নামাযে বসে করুণাময়ের দরবারে ফরিয়াদ করছেন। আমার সহকর্মীরা সতীর্থ হারানোর বেদনায় অশ্রু বিসর্জন করছে। আমার ছাত্ররা কবরপাশে দাঁড়িয়ে ‘দারাজাত বুলন্দির’ জন্য কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করছে। এমন দৃশ্য এখন প্রতিনিয়ত আমার চোখে ভাসে। কেননা আমি একজন নিরাপত্তাহীন নাগরিক।