বিশ্বকাপ উন্মাদনা: কোন পথে মুসলিম উম্মাহ?

মুফতী তারেকুজ্জামান | শাইখুল হাদীস, হামিউস সুন্নাহ কাসেমুল উলূম চৌমুহনী


পুরো বিশ্ব আজ বিশ্বকাপ উন্মাদনায় মত্ত। মাসব্যাপী মাদকতার মতো সমগ্র বিশ্বকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। যেদিকে চোখ যায়, শুধু ভিনদেশের পতাকা উড়তে দেখা যায়। এতো পতাকার উড়াউড়ি দেখে পথিক হঠাৎ থমকে যায়। ভাবে, এ কোন দেশে এসে পড়লাম? এটা আমাদের বাংলাদেশ তো? পতাকা দেখে চেনার কোনো উপায় থাকে না। এভাবেই একটি মাস ফুটবল বিশ্বকাপ লক্ষ কোটি মানুষকে মাতিয়ে রাখে, জীবনের লক্ষ্য ভুলে সবাইকে চরম উদাসীন করে রাখে।

আসলে ফুটবলে এমন আছেটা কী, যদ্দরুন মানুষ এতে এমন মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে? অনেকে তো এমন প্রেমে পড়ে যায় যে, প্রিয় দল হারলে কেঁদে বুক ভাসায়, বারবার মূর্ছা যায়; এমনকি কেউ কেউ তো আত্মহত্যা পর্যন্ত করে বসে। অনেক এলাকায় বিভিন্ন দলের পক্ষ-বিপক্ষের মাঝে সংঘর্ষ হয়, মারামারি ও রক্তপাত পর্যন্ত হয়। আসলে এটা এতো জনপ্রিয় ও প্রসিদ্ধ হওয়ার পিছনে ফুটবলের কোনো কারিশমা নেই। এটা এমন আহামরি কোনো বিষয় নয়, যদ্দরুন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতে হবে, খেলোয়ারকে তারকাখ্যাতি দিতে হবে, এর জন্য কাড়িকাড়ি টাকা খরচ করতে হবে। খেলা তো আরো কতো আছে, যেগুলোতে অনেক কৌশল ও টেকনিক ব্যয় করতে হয়, সেগুলো কিন্তু অতোটা জনপ্রিয় নয়। এর পিছনে মূল যে কারণটি কাজ করছে তা হলো, এটা বাহ্যত খেলা হলেও এর কলকাঠি মাফিয়া চক্রের হাতে। তারাই এর পিছনে কাড়িকাড়ি অর্থ ঢেলে, আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোকে ব্যবহার করে, এর পক্ষে ব্যাপক প্রচার-প্রসার ঘটিয়ে মানুষের নিকট প্রিয় করে তুলেছে। এতে তাদের মহৎ কোনো উদ্দেশ্য নেই; বরং এতে রয়েছে ভিন্ন ধরনের এক খেলা, যে ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষই গাফেল।

বিশ্বের তাগুত শক্তিগুলো মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত ও দীনবিমূখ করা জন্য বিভিন্নমূখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। সামরিক, সাংষ্কৃতিক, চারিত্রিক সর্বক্ষেত্রেই তারা মুসলিম জাতিকে নামসর্বস্ব মুসলিম বানানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত আছে। যারা নামে মুসলিম হলেও কাজ-কর্ম, আচার-আচরণ ও মুআমালা-মুআশারা সকল ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিজাতীয় কালচারের অনুসারী হবে। তাদের এ অসৎ পরিকল্পনারই একটি অংশ হচ্ছে এসব জনপ্রিয় খেলা। এ খেলার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর সবচে ভয়াবহ যে ক্ষতিটি হচ্ছে, তা হলো, কাফেরদের প্রতি যে কঠোরতা ও শত্রুতা থাকা ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত তা পূর্ণমাত্রায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তাদের প্রতি ভালোবাসা, টান ও মুহাব্বত অবশ্যই একজন মুমিনের ঈমানের জন্য মারাত্মক হুমকি। অথচ এ ব্যাপারে কারো কোনো সচেতনতা নেই। একজন আর্জেন্টাইন ভক্ত, একজন ব্রাজিলিয়ান ভক্ত নিজ দলের ব্যর্থতায় কী কষ্টটাই না পাচ্ছে, কী কান্নাটাই না করছে, ক্ষেত্রবিশেষে কী অবলীলায়ই না নিজের জীবনকে পর্যন্ত বিসর্জন দিয়ে দিচ্ছে! নাঊযুবিল্লাহ।

আসলে মুসলিম জাতি অনেক আবেগপ্রবণ এক জাতি। তাদের যে আবেগ আর উৎসাহ এটা যদি ইসলামের পক্ষে ব্যয় হতো তাহলে ইসলাম আজ সারাবিশ্বে বিজয়ীরূপে প্রতিষ্ঠিত থাকতো, যেমনটি ছিলো সাহাবা রাযি.-এর যুগে। সে জোশ ও জযবা আজও মুসলিম উম্মাহর মধ্যে আছে, কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, তা আজ ব্যয় হচ্ছে বিজাতীয় সংষ্কৃতি জীবত রাখার জন্য। আহ! এ আবেগ আর জযবার কিয়দাংশও যদি ইসলামের পক্ষে হতো তাহলে আজ এ মানুষগুলো হতো স্বর্ণের, দেশগুলো হতো স্বপ্নের আর পৃথিবী হতো শান্তিময় এক স্বর্গরাজ্য। সারাবিশ্বে আজ মুসলিমদের নির্যাতনের পরিবর্তে থাকতো তাদের গৌরবান্বিত শাসন। ইসলামের ইনসাফপূর্ণ শাসনে মুসলিমদের সাথে শান্তিপ্রিয় অমুসলিমরাও নিশ্চিন্তে জীবনযাপন করতে পারতো। অথচ দুঃখজনকভাবে মুসলিমদের এ আবেগ আজ কী জঘন্য খাতে ব্যয় হচ্ছে! কতো সস্তায় বিক্রি হচ্ছে মহামূল্যবান এ সম্পদ! তাদের ধারনাতেও নেই, কীসের বিনিময়ে কী মূল্যবান জিনিসটাকে তারা ধ্বংস করছে?

যে উম্মাহ আজ মুসলিম বীরদের বীরত্বগাঁথা ইতিহাস নিয়ে গর্ব করার কথা, যাদের আজ হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাওয়ার প্রচেষ্টায় ব্যস্ত থাকার কথা, সে জাতি আজ মেসি-নেইমারদের গল্পে তৃপ্তিবোধ করে, তাদের রেকর্ড আর দক্ষতা নিয়ে মারামারি-কাড়াকাড়ি করে, তাদের ভালোবাসায় নিজেদের সময়-অর্থ-জান সবকিছু বিলীন করে দেয়! কতোটুকু বিবেকশূন্য হলে মানুষ এমনটা করতে পারে? কতোটা বোকা আর বোধহীন হলে তারা এর পিছনে সর্বস্ব ব্যয় করে! এর জন্য তাদের না কোনো পার্থিব লাভ আছে আর না এতে আখিরাতের কোনো কল্যাণ আছে। বরং এতে যে নিজের মহামূল্যবান ঈমান পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে সে বিষয়ে তার কোনো পরওয়া নেই।
এ উন্মাদনা তো শুধু কাফেরদের জন্য, এ পাগলামী তো শুধু নির্বোধদের জন্য, এ খেলা তো শুধু তাদের জন্য, যাদের আখিরাতে কোনো কল্যাণ নেই। মুসলিম জাতি তো এমন হওয়ার নয়, তারা তো পার্থিব জগতের মোহে বিভোর নয়, তাদের রয়েছে আল্লাহ ও রাসূল, তাদের রয়েছে পবিত্র একটি শরীয়ত। তারা কীভাবে এমন ধোঁকায় নিপতিত হতে পারে? কক্ষনো নয়, সত্যিকারের মুসলিম জাতি কখনো এ থেকে উদাসীন হতে পারে না, পারে না কভু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশনার বাহিরে যেতে। সর্বক্ষেত্রেই সে শরীয়াহ খোঁজে, সর্বদাই সে শয়তানের ধোঁকার ব্যাপারে সতর্ক ও সজাগ থাকে। কখনো ভুল হয়ে গেলে পরক্ষণেই ভুল বুঝতে পারার পর অনুশোচনায় ভোগে। খাঁটি দিলে তাওবা করে আবারো আল্লাহর রহমতের কোলে ফিরে আসে।

হে মুসলিম উম্মাহ, কীসের নেশায় বিভোর তুমি? কোন পথের পথিক তুমি? তুমি কি জানো তোমার আত্মপরিচয়? তুমি কি জানো তোমার মূল্য কতো? হে প্রিয় জাতি, নিজকে চেনো, পূর্বসূরীদের ঐতিহ্য জানো। দ্বিগ্নীজয়ী বীরদের গৌরবান্বিত ইতিহাসের পাতা থেকে জেনে নাও, কে তুমি, কী তোমার পরিচয়? সোনালী অতীতের আলোতে অবগাহন করে চিনে নাও তোমার আত্মপরিচয়। ফিরে আসো হে প্রিয় ভাই আমার, নিজের ঘরে ফিরে আসো। ক্ষণিকের এ খেলাঘরে সত্যিসত্যি তুমি খেলায় বিভোর হয়ে যেও না। জীবনের মূল্য বোঝার চেষ্ট করো, ঈমানের দাম জানার চেষ্টা করো। কাফেরদের সাথে শত্রুতা আর মুসলিমদের সাথে হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে তোলো। একজন সত্যিকারের মুমিন হয়ে তবেই মৃত্যুর প্রস্তুতি গ্রহণ করো। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসা নিয়ে আখিরাত অভিমূখে যাত্রার প্রস্তুতি শুরু করো। আল্লাহ আমাদেরকে সে তাওফীক দান করুন!