হাইআতুল উলইয়া’র পরীক্ষায় প্রথমস্থান অর্জনকারী নাদিমের সাক্ষাৎকার

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | মোস্তফা ওয়াদুদ


আল হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতুল কওমিয়া বাংলাদেশের অধীনে অনুষ্ঠিত দাওরায়ে হাদীস পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হয়েছে গত ৫ জুলাই বৃহস্পতিবার। এতে সারাদেশের ১৪৭৪৭ জন ছাত্রের মাঝে মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করেছেন কুমিল্লায় জন্ম নেয়া, চাঁদপুরের মতলবে বেড়ে উঠা জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ মাদ্রাসার মেধাবী ছাত্র খলিল আহমদ নাদিম।

ফুটফুটে হাসিমাখা, আলোকিত এ মানুষটির জীবন খুবই বর্ণাঢ্য। গল্পে গল্পে ইনসাফের কাছে তুলে ধরেছেন তাঁর ঈর্ষণীয় ফলাফলের পেছনের ইতিহাস। বর্তমানে তিনি ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দে অধ্যয়ন রত আছেন। দেওবন্দ থেকে তাঁর সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ইনসাফের দেওবন্দ প্রতিনিধি মোস্তফা ওয়াদুদ।


ইনসাফ : আপনার পড়াশোনার শুরুটা কোথায় থেকে?
নাদিম : আমার জন্ম কুমিল্লায় হলেও আমার বেড়ে উঠা হয়েছে চাঁদপুরে। চাঁদপুরের মতলবে বাবার কর্মস্থল হওয়ায় সেখানেই বাবার কাছে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেছি। স্কুলে পড়েছি পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। আর হেফজ শেষ করেছি ২০১০ সালে। যে বছর হেফজ শেষ করি সে বছর রমজানে বাবার কাছে তাইসীরুল মুবতাদী কিতাবটি পড়ে সাইনবোর্ড জামিয়া আশরাফিয়ায় মিযান জামায়াতে ভর্তি হই।
সেখানে শরহেবেকায়া পর্যন্ত পড়ি। এরপর ফরিদাবাদ মাদরাসায় জালালাইনে ভর্তি হই।

ইনসাফ : পেছনের ক্লাসগুলোর রেজাল্টও কী এমন ঈর্ষনীয় ছিলো, যেমনটা এবার হলো।
নাদিম : আমি পঞ্চম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিলাম। তারপর নাহবেমীরে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় মেধা তালিকায় চতুর্থ স্থান ও শরহেবেকায়া জামায়াতে মেধা তালিকায় তৃতীয় স্থান লাভ করি। এরপর ফরিদাবাদ এসে মিশকাতে সারাদেশে প্রথম স্থান অর্জন করি। আর এবার হাইয়ার পরীক্ষায় আল্লাহর রহমতে, আল্লাহ তায়ালা পেছনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার তৌফিক দিয়েছেন।

ইনসাফ : সারাদেশে প্রথম স্থান অর্জনের পর পাঠকরা স্বাভাবিক ভাবেই আপনার অনুভূতি জানতে চাচ্ছেন। জানাবেন কি?
নাদিম : (একটু মৃদু হেসে) আসলে অনুভূতির কথাগুলো ঠিক কিভাবে ব্যক্ত করবো তা বুঝে উঠতে পারছি না। কারণ অনূভূতিতে প্রথম সাড়া পেয়েছিলাম নাহবেমীরের বছর। তখন মেধা তালিকায় নাম দেখে চোখে হালকা আনন্দাশ্রু বয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু তারপর থেকে এক জিনিস বারবার আশায় নতুন করে কোনো অনুভূতি জাগ্রত হয়নি। কারণ পুরাতন জিনিসে কি আর অনুভূতি হবে?

আর এটা ঠিক অনুভূতি না। তবে এখানে অনুভুতির জবাবে বলতে চাই, আমার কাছে এ অর্জনগুলো মেহনতের ফসল মনে হয়না। বরং মনে হয় এগুলো আল্লাহর বিশেষ করুনা। আমার প্রতি উস্তাদদের অবদান ও সাথী ভাইদের অকৃত্রিম ভালবাসার ফল। বিশেষ করে উস্তাদদের বিশেষ নেক নজর ও উৎসাহ উদ্দীপনা এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমার জন্য অনেক সহায়ক হয়েছে।

তাছাড়া সবচে বড় কথা হলো, আমার ভিতরে এতটুকু ভরসা ছিলো। কারণ পূর্ব থেকেই এ জায়গার মানুষ ছিলাম আমি। তাছাড়া নতুন কিছু করলে অনুভূতির জায়গা থাকে। আমার জন্য এটা পুরাতনই মনে হয়। তাই তেমন কিছু না।

ইনসাফ : আপনার সফলতার পেছনে কার বেশি অবদান বলে মনে করেন?
নাদিম : আসলে সবার বড় হওয়ার পেছনে সবচে বড় অবদান থাকে বাবা-মায়ের। তাছাড়া আমার বাবাও একজন আলেম। নানুপুরের পীর সাহেব মাওলানা জমীরুদ্দীন রহ. এর খলীফা। আর চাঁদপুর জেলার মতলব থানার বড় মসজিদের খতীব ও সেখানে মেশকাত পর্যন্ত একটি মাদরাসার মুহতামীম। তিনি আমার পেছনে অনেক মেহনত করেছেন। তারপর আমি বলবো আমার পেছনে আমার উস্তাদগণের অবদান ছিলো সবচে বেশি।

ইনসাফ : আজকের এদিনে বিশেষ কয়েকজন উস্তাদদের কথা বলবেন কি?
নাদিম : আমিতো সবার নামই বলবো। কারণ কোনো উস্তাদের অবদানই কোনো অংশে কম ছিলো না। তবে বিশেষ করে
ফরিদাবাদের মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস সাহেব ও মাওলানা আব্দুল গণী সাহেব, আগের মাদরাসায় (সাইনবোর্ড) মুফতি মুণীরুজ্জামান সাহেব, মুফতি নাজমুল হাসান সাহেব প্রমুখ। উনারা আমার তালিমী মুরুব্বি ছিলেন। আমার প্রতি তাঁদের ইহসান সবচে বেশি।

ইনসাফ: ভালো রেজাল্টের পেছনে পড়া-শোনার জন্য অবশ্যই আপনার নির্দিষ্ট একটি রুটিন ছিলো। সে বিষয়ে কিছু বলবেন কী?
নাদিম: জি। আসলে আমার কাফিয়া জামাত পর্যন্ত মেহনতের ধারা ছিলো একটি। আর কাফিয়ার পরে ছিলো আরেকটি।
কাফিয়া পর্যন্ত পড়ার ধারা ছিলো এমন; খুব রাত জেগে পড়তাম। ধরে নিন প্রতিদিন ১ টা দেড়টা পর্যন্ত পড়তাম। তারপর সামান্য ঘুমিয়ে আবার রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়তাম। তখন আমি জামিয়া সাইনবোর্ডের ছাত্র ছিলাম। তারপর সেখানে আমার তালিমী মুরুব্বি মুফতি মুনীর সাহেব একদিন বললেন যে, রাত ন’টা বাজার আগেই সব সবক পড়ে নাও। তারপর অতিরিক্ত কোনো মোতালায়া থাকলে ১০ টার ভিতরে শেষ করে নাও। এরপর ঘুমিয়ে পড়ো। তখন আমি সেটাই করতাম। আর কাফিয়া জামায়াতের পর হুজুর আমার জন্য কিছু নেজাম তৈরি করে দিলেন। আমি হুজুরের বানানো সে নেজাম মতেই পড়াশুনা করতাম। আর তাকরারের প্রতি প্রচুর গুরুত্ত্ব দিতাম। অনেক সময় আছরের পরেও তাকরার করতাম। মিশকাতের বছর সব কিতাব একাই তাকরার করাতাম। কখনো দেখা গেছে আমার তাকরারে ১০০ উপরেও ছাত্র থাকতো।
পরীক্ষার রাতে বেশি পড়তাম না। বরং অন্য রাতের তুলনায় অনেক আগে ঘুমিয়ে পড়তাম।

ইনসাফ: পাঠ্যবই ছাড়া কোন বই বেশি পড়তেন?
নাদিম: আমি বাংলা বেশি পড়তাম না। বরং আরবি ইতিহাসের ছোটো কিতাব, উর্দূ রেসালা আমার ছোটোবেলা থেকেই পড়তাম। যেমন তখনকার মোতালায় ছিলো, ‘আলবিদায়া ওয়ান নেহায়া’, সিরাতে ইবনে হিশাম, সিরাতে মুস্তাফা প্রভৃতি কিতাবসমূহ। মোটকথা আরবির প্রতি আমার বিশেষ আগ্রহ ছিলো।

ইনসাফ: ছাত্রভাইদের কাছ থেকে কেমন রেসপন্স পেতেন?
নাদিম: আমার জীবনে ছাত্র ভাইদের মাঝে কাউকে হিংসুক মনে হয়নি। সবাই সবাইকে নিজের থেকে বেশি মর্যাদা দিতো। আর পড়াশুনার ব্যাপারে আমার সাথে কেউ কখনো প্রতিযোগীতা দেয়নি। আমি দিতে দেখিনি। বরং আমি যেটা দেখেছি সেটা হলো, ছাত্রভাইদের সবার প্রতিযোগীতা চলতো দ্বিতীয় স্থান থেকে। প্রথম স্থান অধিকার করার কোনো প্রতিযোগীতা কখনো দেখিনি। আর হ্যাঁ! আমার প্রতি সবার মুহাব্বাতের প্রতিযোগীতা দেখেছি। পরস্পরের মাঝে ভালবাসা (মুহাব্বাত) ছিলো।

দেখা গেছে আমরা এ বছর দাওরায়ে হাদীস পড়েছি ১০৫০ ছাত্রের মতো। তাঁদের মাঝে মজলিসে শূরা সদস্য ছিলাম। সবাই সবাইকে মানতো। কাউকে কখনো কারো মনোমানিল্য হতে দেখিনি।

ইনসাফ: হাইয়ার সফলতার পেছনে মূল মেহনতের ধারা কি ছিলো?
নাদিম: ফরিদাবাদের মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস সাহেবের তাকরীরে তিরমিজি ছিলো আমার প্রধান কিতাব। কিতাবটি পুরোটাই আমার মুখাস্থ ছিলো। আমি এটি মোতালার পাশাপাশি আরো দশ বারোটি কিতাব মুতালা করতাম। এবং এগুলোর হাশিয়া লিখতাম। তারপর সেগুলো মুখাস্থ করতাম। একেকটি ইখতেলাফী (মতানৈক্যপূর্ণ) মাসআলায় ২৫-২৬ টি দলীল মুখাস্থ করতাম। দেখা গেছে কোনো কোনো পরীক্ষায় আমি ১৫ টির মতো দলীল (হাদীস) উল্লেখ করেছি।

ইনসাফ: আপনি কোন বিষয়ে পড়তে সবচে’ বেশি আনন্দ পান?
নাদিম: ফিকহ পড়তে সবচে বেশি আনন্দ পাই। বিশেষ করে আমি যখনই যেখানে যেতাম। ফেকাহের কিতাব তালাশ করতাম। বাড়িতে বাবার ব্যক্তিগত মাকতাবা রয়েছে। সেখানেও বেশ আগ্রহের সাথে ফতোয়ার কিতাব বেশি মুতালায়া করতাম। ফতোয়ার কিতাবগুলো বেশ আনন্দ লাগে।

ইনসাফ: আপনি জীবনে কি হতে চান?
নাদিম: বিখ্যাত ফিকহবিদ ও মুহাদ্দিস হতে চাই। ইলমুল ফিকহ ও ইলমুল হাদীস নিয়ে গবেষণা করতে চাই।

ইনসাফ: ইলমের এতোগুলো শাখা থাকতে ফিকহ ও হাদীসকে কেনো বেঁচে নিলেন?
নাদিম: আমি মনে করি, যামানার প্রেক্ষাপট ও মানুষের এ দুটি বিষয়ের প্রতি চাহিদা বেশি। তাছাড়া এ দুটি বিষয়ের খেদমাত যা হচ্ছে তা তুলনামূলক অনেক কম। আরো বাড়ানো প্রয়োজন মনে করি। আর অন্যান্য শাখা যেমন, ইলমে আদবসহ ইত্যাদির বিষয়ে খেদমাত করার চেয়ে দীনের লাইনে ফিকহ বিষয়ের খেদমাতটা বেশি যোক্তিক মনে করি।

ইনসাফ: ইলম অর্জনের পেছনে সবচে বেশি কোন বিষয়টা আপনাকে প্রেরণা দিতো?
নাদিম: আসলে সর্বপ্রথম আমি ইলম অর্জনের মাকসাদ কি ও তা কিভাবে অর্জিত হবে মনে সেটা নিয়ে বেশি চিন্তা করতাম। আর ছহীহ মাকসাদটা যেদিন বুঝেছি সেদিন এ মাকসাদ অর্জন করাটাই আমাকে সবচে বেশি প্রেরণা দিতো। আর সেটা হলো, “এ ইলমের মূল ভিত্তি হলো তাওয়াক্কুল আলাল্লাহ ও মেহনত”। আর আমি আলহামদুলিল্লাহ এ দুটোকে সমন্বয় করেই ইলম অর্জন করছি।

আর দ্বিতীয়ত কওমি মাদরাসার ইলমটা আসে সীনা বা সীনা। আর এটাই সবচে মূল বিষয়। আর উস্তাদের সাথে সম্পর্ক রাখা জরুরি মনে করেছি। অভিজ্ঞতায় দেখেছি উস্তাদের সাথে সম্পর্ক থাকলে সে সফলতা লাভ করতে পারে। আমার ছোট্ট জীবনে অনেক মেধাবী ছাত্র পেয়েছি। কিন্তু উস্তাদদের সাথে সম্পর্ক না রাখায় তারা ততটা সফলতা লাভ করতে পারেনি।
এক্ষেত্রে আমার কাছেও অনেক নতুন নতুন উদাহরণ রয়েছে। যেমন, সাইনবোর্ড আশরাফিয়া মাদরাসার নায়েবে মুহতামিম মুফতি মুফীজুল ইসলাম সাহেবের তালীমি মুরুব্বি আমার বাবা মাওলানা কবির আহমদ। তিনি প্রায় ২৩ বছর হয়েছে ফারেগ হয়েছেন। কিন্তু এখনো বাবার পরামর্শে চলেন। নিজেকে কখনো স্বয়ং সম্পন্ন মনে করেন না। আর ব্যক্তিজীবনে তিনি একজন সফল মানুষ। তাই আমিও তাঁদের এ বিষয়গুলো জীবনে বেশ ফলো করি।

ইনসাফ: কখনো কোনো প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছেন?
নাদিম: প্রতিযোগিতার প্রতি আমার বিশেষ আকর্ষণ ছিলো না। তবে হেফজ পড়ার সময় অনেক প্রতিযোগিতা দিয়েছি। যেমন হুফফাজুল কুরআন প্রতিযোগিতায় চাঁদপুর জেলায় দ্বিতীয় হয়েছিলাম। আর ইসলামিক ফাউণ্ডেশন কর্তৃক চাঁদপুর জেলায় ২ বার প্রথম স্থান অধিকার করেছিলাম। চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রতিযোগিতায় একবার ১ম স্থান অর্জন করেছিলাম। এগুলো সব হেফজ খানায় থাকতে। তারপর আর কখনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া হয়নি।


Notice: Undefined index: email in /home/insaf24cp/public_html/wp-content/plugins/simple-social-share/simple-social-share.php on line 74