মুসলিম বিশ্বে ভারতবর্ষের প্রতিনিধি

মুসলিম বিশ্বে ভারতবর্ষের প্রতিনিধি

মূল: মানাজির আহসান গিলানী র.
ভাষান্তর: ইমরান রাইহান


পূর্বাভাস
আমরা এখানে ভারতবর্ষের এমন কজন আলেমের আলোচনা করবো যারা মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌছে সুনাম কুড়িয়েছেন। নিজের ইলমী শ্রেষ্ঠত্ব প্রমান করেছেন। ভারতবর্ষে জন্মগ্রহন করেছেন কিন্তু পড়াশোনা করেছেন অন্য অঞ্চলে এমন আলেমদের আলোচনা এখানে আসবে না। এখানে শুধু তাদের আলোচনাই আসবে যাদের শিক্ষাজীবনের পুরোটাই কেটেছে ভারতবর্ষে। চলুন এমন কজন আলেমের সাথে পরিচিত হওয়া যাক।

মিসরে এক ভারতীয় আলেম
হিজরী সপ্তম শতাব্দীর মিসর। মিসরে ইসলামের আগমনের পর থেকেই বড় বড় আলেমরা জন্ম নিয়েছেন মিসর ভূমিতে। বিশেষ করে আমরা যে সময়ের কথা বলছি অর্থাৎ হিজরী সপ্তম শতাব্দী, সেই সময়কাল সম্পর্কে আল্লামা ইবনে খালদুনের বক্তব্য হচ্ছে, ‘বর্তমান সময়ে (অর্থাৎ হিজরী সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দী) মিসর ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে সবার শীর্ষে অবস্থান করছে’।

(১) সেই সময়ের কথা। ভারতের একজন আলেম পৌছালেন মিসরে। তার নাম সিরাজ হিন্দী। আল্লামা তাশ কুবরাযাদাহ লিখেছেন, ‘সিরাজ হিন্দী পড়াশোনা করেছেন ভারতবর্ষে। তার উস্তাদদের মধ্যে ওয়াজিহ রাজি, সিরাজ সাকাফী ও রোকন বাদায়ুনি উল্লেখযোগ্য’।
(২)আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানীর বক্তব্য থেকে বোঝা যায় তিনি যখন কায়রোতে উপস্থিত হন তখনো তার বয়স চল্লিশ পূর্ণ হয়নি।

(৩) তাশ কুবরাযাদাহ তার মিসরে আগমনের যে সাল বর্ননা করেছেন তার সাথে জন্মসাল মিলিয়ে বুঝা যায় তখন সিরাজ হিন্দীর বয়স ছিল ছত্রিশ বছর।
ভারতবর্ষের এই আলেম, যার পড়াশোনা হয়েছে ভারতবর্ষের পাঠ্যক্রমেই তিনি আসকার অঞ্চলের কাজী নিযুক্ত হন। তার এই কাজী নিযুক্ত হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইমাম শাফেয়ী রহিমাহুল্লাহর আগমনের পর থেকেই মিসরে শাফেয়ী আলেমদের প্রভাব প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। সেকালে আলেমরা তরহা নামক একপ্রকার চাদর মাথায় বেধে নিতেন, যা ছিল তাদের সম্মান ও মর্যাদার প্রতিক। মিসরে শুধু শাফেয়ী মাজহাবের আলেমদেরই এই চাদর পরিধানের অধিকার ছিল। রাজধানী কায়রোতে যদিও হানাফী মাজহাবের আলেমদের কাজি নিযুক্ত করা হতো কিন্তু অন্যান্য অঞ্চলে শুধু শাফেয়ী আলেমরাই কাজি নিযুক্ত করার অধিকার রাখতেন। এছাড়া এতিমদের সম্পদের দেখভালের দায়িত্বও শুধু শাফেয়ী কাজিদের জন্য নির্দিষ্ট ছিল।সিরাজ হিন্দীই প্রথম হানাফী আলেম যিনি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই নিয়ম ভেংগে দেন। তার ইলম ও ব্যক্তিত্বে শাসকরাও প্রভাবিত হয়। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী লিখেছেন, ‘সিরাজ হিন্দী সকলের মনোযোগ আকর্ষন করেন, তিনিও শাফেয়ী আলেমদের মত মিসরের অন্যান্য অঞ্চল কাজি নিযুক্ত করা শুরু করেন, তিনি তরহা পরেন এবং এতিমদের সম্পদের দেখভাল শুরু করেন।

(৪) এই ভারতীয় আলেম মিসরে হৈ চৈ ফেলে দেন। ইবনে হাজার আসকালানী লিখছেন, ‘সিরাজ হিন্দী জামে আহমাদ ইবনে তুলুনের দেখভালের বিষয়ে প্রশাসনের সাথে আলাপ করেন। তিনি নকীব আশরাফের কাছ থেকে এর ওয়াকফ দেখভালের দায়িত্ব ফিরিয়ে নেন’

(৫)। ইবনে হাজার আসকালানী আরো লিখেছেন, ৮৮১ হিজরীতে সিরাজ হিন্দী জামে আহমাদ ইবনে তুলুনে তাফসিরের দরস দেয়া শুরু করেন। সিরাজ হিন্দী আরবী ভাষায় কথা বলতে পারংগম ছিলেন। স্বয়ং ইবনে হাজার আসকালানী তার বাগ্মীতার প্রশংসা করেছেন। সিরাজ হিন্দী হেদায়ার একটি শরাহ লেখার কাজ শুরু করেন কিন্তু এটি শেষ করে যেতে পারেননি। এছাড়া বিভিন্ন শাস্ত্রে তিনি বেশকিছু বইপত্রে রচনা করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ইমাম মুহাম্মদ রচিত জামে কাবির ও জামে সগিরের দুটি শরাহ বা ব্যাখ্যাগ্রন্থ।

দামেশকে এক ভারতীয় আলেমের অবিস্মরনীয় কীর্তি
হিজরী সপ্তম শতকেরই কথা। তাতারী হামলায় বিপর্যস্ত মুসলিমবিশ্ব। পতন ঘটেছে দারুল খিলাফাহ বাগদাদের। বুখারা, সমরকন্দ, মার্ভের মতো ঐতিহ্যবাহী শহরগুলো লন্ডভন্ড। গোবী থেকে ধেয়ে আসা তাতারী ঝড় থেকে শুধু মিসর ও সিরিয়া নিরাপদ ছিল। সিরিয়া তখন ইলমের মারকায। শাইখুল ইসলাম হাফেজ তকিউদ্দিন ইবনে তাইমিয়া, আল্লামা তকিউদ্দিন সুবকি, হাফেজ শামসুদ্দিন যাহাভী, হাফেজ ইমাদুদ্দিন ইবনে কাসিরের মত বরেণ্য আলেমরা তখন দামেশকে ইলমের আলো ছড়াচ্ছেন। চারপাশে শুধু ইলমের চর্চায় নিমগ্ন সাধকদের দেখা মিলছে। এসময় এক ভারতীয় আলেম পৌছলেন দামেশকে। তার নাম শায়খ সফিউদ্দিন। জন্ম ৬৪৪ হিজরীতে। শিক্ষাজীবনের পুরোটাই কেটেছে ভারতবর্ষে। যার পাঠ্যক্রমে হাদিসের শুধু মিশকাত কিতাব পড়ানো হত। ফিকহে শরহে বেকায়া ও হেদায়া এবং তাফসিরে শুধু জালালাইন পড়ানো হত। ২২ বছর বয়সে শায়খ সফিউদ্দিন ভারতবর্ষ ত্যাগ করে ইয়ামানে পৌছান। ইয়ামানে তখন আল মালিকুল মুজাফফরের শাসন চলছে। তিনি শায়খ সফিউদ্দিনের যোগ্যতা ও ব্যক্তিত্ব দ্বারা প্রভাবিত হন। ইবনে হাজার আসকালানি লিখেছেন, আল মালিকুল মুজাফফর তাকে অনেক সম্মান করেন এবং নয়শো আশরাফী উপহার দেন।

(৬) ইয়ামান থেকে তিনি মক্ককায় যান। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করে কায়রোর পথ ধরেন। সেখান থেকে যান আনোতোলিয়া। এভাবে দীর্ঘ সফর শেষে তিনি দামেশকে আসেন এবং এখানেই স্থায়ী হন। একটু আগেই আমরা বলেছি দামেশকে তখন মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ আলেমরা অবস্থান করছেন, দরস দিচ্ছেন। শায়খ সফিউদ্দিন এতসব প্রতিভার ভীড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলেননি। বরং নিজের যোগ্যতায় সমুজ্জ্বল হয়েছেন। ইবনে হাজার আসকালানী লিখেছেন, তিনি দামেশকের জামে উমাভীতে দরস দিতেন। এছাড়া রওয়াজিয়া, আতাবেকিয়া, জাহেরিয়া ও জাওয়ানিয়া মাদরাসায় দরস দিতেন।

(৭) সে যুগে জামে উমাভীতে দরস দেয়া ছিল অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার বিষয়। এ থেকেই শায়খ সফিউদ্দিনের ইলম ও মেধার পরিচয় পাওয়া যায়। আল্লামা তাজ উদ্দিন সুবকি লিখেছেন, তিনি উসুলে ফিকহ ও ইলমে কালামে গভীর জ্ঞান রাখতেন। আরেকটু এগিয়ে তিনি লিখেন, শায়খ সফিউদ্দিন দামেশকের মানুষকে ইলমচর্চায় ব্যস্ত করে দেন। তিনি বেশকিছু কিতাব লেখেন। এরমধ্যে ইলমে কালামে যুবদা, উসুলে ফিকহে আন নিহায়া ও ওফায়েক উল্লেখযোগ্য। এছাড়া সাবইয়্যাহ নামেও তিনি একটি কিতাব লেখেন। দামেশকের আলেমরা তাকে কেমন সম্মানের চোখে দেখতেন তা সুবকির এই বক্তব্য থেকে প্রমানিত হয়। তিনি লেখেন, আমাদের উস্তাদ যাহাভী তার থেকে বর্ননা করেছেন।

তবে শায়খ সফিউদ্দিনের ব্যক্তিত্ব ও জ্ঞানের গভীরতা বুঝতে এটুকুই যথেষ্ট নয়। এজন্য এমন একটি ঘটনা উপস্থাপন করবো যা থেকে পাঠক অনুমান করতে পারবেন এই দুখী ভারতবর্ষের সামান্য পাঠ্যক্রমে পড়াশোনা করা এই আলেম কতটা যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন।

শায়খ সফিউদ্দিন যখন দামেশকে অবস্থান করছিলেন সে সময় শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া নিজের প্রতিভার আলো ছড়াচ্ছেন। বেশ কয়েকটি মাসআলায় নতুন মত দিয়ে বেশ হৈ চৈ বাধিয়ে ফেলেছেন। এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য মাসআলা হলো হামাভিয়্যার ফতোয়া। এই ফতোয়া দামেশকের ইলমি অংগনে বেশ বিতর্কের সৃষ্টি করে। দামেশকের উলামাদের একাংশ ইবনে তাইমিয়ার সাথে বিতর্কসভার আয়োজন করেন। দামেশকের বড় বড় সব আলেম একত্র হন। কিন্তু ইবনে তাইমিয়া তো ইবনে তাইমিয়াই, মুসলমানদের শাইখুল ইসলাম। কারো সাহস হচ্ছিল না তার সামনে কথা বলবে। তাজউদ্দিন সুবকি লিখেছেন, উপস্থিত উলামারা সিদ্ধান্ত নেন শায়খ সফিউদ্দিনকে ডাকা হবে। তিনি আলোচনা করবেন।

শায়খ সফিউদ্দিনকে ডেকে পাঠানো হয়। তিনি এসে উপস্থিত হন। আল্লামা সুবকি লিখেছেন, শায়খ সফিউদ্দিন উপস্থিত আলেমদের মধ্যমনি ছিলেন। তিনি আলোচনা শুরু করেন। তার আলোচনার ধরন বৈচিত্রময়। যেসব কথায় আপত্তি উঠতে পারে, আলোচনার ভেতরেই সেগুলোর জবাব দিচ্ছিলেন। কখনো বিস্তারিত বলছিলেন আবার কখনো শুধু ইশারা দিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছিলেন। শায়খ সফিউদ্দিনের আলোচনা শেষ হলে ইবনে তাইমিয়া আলোচনা শুরু করেন। তিনি স্বভাবজাত দ্রুততায় কথা বলছিলেন। এক প্রসংগ থেকে অন্য প্রসংগে চলে যাচ্ছিলেন।

যারা ইবনে তাইমিয়ার বইপত্র পড়েছেন তারা শাইখুল ইসলামের মেধা ও ইলমের গভীরতা সম্পর্কে কিছুটা অনুমান করতে পারবেন। তিনি যখন লিখতেন তখন একের পর এক বিষয় ও দলিলাদি একত্র করে ফেলতেন। একইসাথে আল্লাহ তাকে অসাধারণ বাগ্মীতা দান করেছিলেন। সন্দেহ নেই, তিনি বাগ্মীতার জোরে শায়খ সফিউদ্দিনকে প্রভাবিত করতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু শায়খ সফিউদ্দিন, যিনি এই ভারতবর্ষের পাঠ্যক্রমেই নিজের ছাত্রজীবন সমাপ্ত করেছেন, তিনি বিন্দুমাত্র প্রভাবিত না হয়ে বলেন, ইবনে তাইমিয়া, আপনি শুধু চড়ুই পাখির মত এ ডাল থেকে ও ডালে উড়ছেন।
আল্লাহই জানেন সেই মজলিসের অবস্থা কেমন ছিল, তবে সুবকির বর্ননা থেকে জানা যায়, ইবনে তাইমিয়া শেষপর্যন্ত শায়খ সফিউদ্দিনের সাথে এটে উঠতে পারেননি। সুবকি লিখেছেন, আমির সে মজলিসে উপস্থিত ছিলেন। তিনি শায়খ সফিউদ্দিনের পক্ষে ফয়সালা করেন। ইবনে তাইমিয়ার যে সকল ছাত্ররা প্রশাসনের কোনো পদে ছিলেন, তাদের অপসারন করা হয়। এমনকি এই মাসআলার কারনে ইবনে তাইমিয়াকে বন্দী করা হয়।

(৮) এই মাসআলায় কার মতটি সঠিক ছিল তা আলোচনা করা আমার উদ্দেশ্য নয়। আল্লাহ মাফ করুক, ইবনে তাইমিয়ার ব্যক্তিত্ব ও প্রতিভাকে খাটো করাও আমার উদ্দেশ্য নয়। আমার আলোচনার উদ্দেশ্য শুধু এটুকুই যে ভারতীয় পাঠ্যক্রমে পড়াশোনা করা একজন আলেমের জ্ঞানের গভীরতা তুলে ধরা।

ভারতীয় আলেম আরবভূমিতে
মক্কা ও মদীনায় সর্বযুগেই বড় বড় আলেমরা জন্ম নিয়েছেন। ইলমের চর্চা করেছেন। তাদের দরসে বসার জন্য মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছাত্ররা ছুটে এসেছে। ভারতবর্ষের অনেক আলেম আরবে গমন করে নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করতে গেলে একটি স্বতন্ত্র বইয়ের আকার ধারন করবে। এখানে সংক্ষেপে একটু ইশারা দেয়ার চেষ্টা করবো। শায়খ আলী মুত্তাকি রহিমাহুল্লাহ একজন ভারতীয় আলেম। ভারতবর্ষেই পড়াশোনা শেষ করেছেন। আল্লামা শারানি লিখেছেন, তিনি ৯৪৭ হিজরীতে মক্কায় গমন করেন এবং সেখানে বসবাস করতে থাকেন। আল্লামা শারানীর সাথে এই ভারতীয় আলেমের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তার সম্পর্কে আল্লামা শারানীর বক্তব্য হলো, মক্কাতে আমি তার মতো আর কাউকে দেখিনি।

(৯)
হিজরী অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে ভারতীয় আলেমদের এক জামাত মক্কা মদীনায় অবস্থান করে ইলমচর্চায় ব্যস্ত থাকেন। শায়খ আবদুল্লাহ বিন মোল্লা সাদুল্লাহ, শায়খ মোহাম্মদ বিন মোহাম্মদ আল হিন্দী, শায়খ আবুল হাসান সিন্ধী, শায়খ হায়াত সিন্ধী এই বরকতময় কাফেলারই সদস্য। শায়খ হায়াত সিন্ধী ছিলেন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক মাওলানা গোলাম আলী আজাদ বিলগ্রামীর উস্তাদ। মাওলানা বিলগ্রামী তার কাছ থেকে হাদিসের সনদ নেন। তার সম্পর্কে মাওলানা বিলগ্রামী লিখেছেন, মিসর ও সিরিয়া থেকে আগত শিক্ষার্থীরা তার দরসে বসতো।

কনস্টান্টিনোপলে এক ভারতীয় আলেম
ইংরেজরা ভারতবর্ষের ক্ষমতা দখলের আগ থেকেই এ অঞ্চলে তাদের মিশনারীরা কাজ করে যাচ্ছিল। ইংরেজরা ক্ষমতা দখলের পর এ কাজ আরো জোরদার হয়। এসময় ইউরোপ থেকে ফান্ডার নামে একজন পাদ্রী ভারতবর্ষে আগমন করে। আরবী ও ফার্সী ভাষায় সে অত্যন্ত দক্ষ ছিল। ইসলাম ধর্ম ও খ্রিস্টধর্ম সম্পর্কে তার গভীর পড়াশোনা ছিল। সে বিভিন্ন এলাকায় সফর করে ইসলামের উপর বিভিন্ন আপত্তি তুলতো এবং খ্রিস্টধর্ম প্রচার করতো। শুরুর দিকে উলামায়ে কেরাম তাকে নিয়ে অত্যন্ত পেরেশান ছিলেন। ডা উযির খান নামে বিহারে একজন চিকিতসক ছিলেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ইউরোপে গমন করেন। ইংরেজি ও গ্রীক ভাষায় পান্ডিত্য অর্জন করেন। দেশে ফেরার সময় ইংরেজিতে রচিত খ্রিস্টধর্মের বিভিন্ন বইপত্র সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন। এই ডাক্তারের সাথে মাওলানা রহমতুল্লাহ কীরানভী নামে এক আলেমের সম্পর্ক হয়। মাওলানা সাহেব ডাক্তারের কাছে খ্রিস্টধর্ম সম্পর্কে কিছু পড়াশোনা করেন। তিনি এ পরিমান দক্ষতা অর্জন করেন যে ফান্ডারের সাথে একটি বিতর্ক সভার আয়োজন করে ফান্ডারকে পরাজিত করেন। ফান্ডার অপমানিত হয়ে ভারতবর্ষ ত্যাগ করে কন্সটান্টিনোপল গমন করে। এদিকে মাওলানা রহমাতুল্লাহ কীরানভী আরবে চলে যান এবং মক্কায় অবস্থিত সাওলাতিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। পাদ্রী ফান্ডার কনস্টান্টিনোপল পৌছে সেখানকার মুসলমানদের বিভ্রান্ত করতে থাকে। তখন খলীফা আবদুল আযিয খানের শাসনকাল (১৭৬০-১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দ)। খলিফা নিজেও ফান্ডারের কর্মকান্ডে বিচলিত হন। তুরস্কের কোনো আলেম তখন ফান্ডারের মোকাবিলা করার সাহস পাচ্ছিলেন না। খলীফা হেজাজের গভর্ণরকে পত্র লিখলেন, যদি আপনাদের ওখানে এমন কোনো আলেম থাকেন যিনি খ্রিস্টান পাদ্রীর মোকাবিলা করতে পারবেন তাহলে তাকে এখানে পাঠিয়ে দিন। মক্কার গভর্ণর লিখলেন, এখানে এমন একজন ভারতীয় আলেম আছেন যিনি কিছুদিন আগে ফান্ডারকে প্রকাশ্য বিতর্কসভায় পরাজিত করেছেন। খলিফা আদেশ দেন তাকে রাষ্ট্রীয় অতিথীর মর্যাদা দিয়ে কনস্টান্টিনোপল বা ইস্তাম্বুলে প্রেরণ করতে। ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দের শেষদিকে মাওলানা রহমাতুল্লাহ কীরানভী ইস্তাম্বুল পৌছেন। তার আগমনের সংবাদ শুনেই পাদ্রী ফান্ডার গোপনে ইস্তাম্বুল ত্যাগ করে। এই ঘটনায় খলীফা অত্যন্ত প্রভাবিত হন। তিনি মাওলানাকে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখেন। মাওলানাকে রাষ্ট্রীয় খেতাব ‘বিসাম মাজিদি’তে ভূষিত করা হয়। তার জন্য মাসিক ৫০০ তুর্কি স্বর্নমুদ্রা ভাতা নির্ধারণ করা হয়।


 

তথ্যসূত্র,
১। আল মুকাদ্দিমা, ৪৭৯ পৃষ্ঠা, মিসর।
২। মিফতাহুস সাআদাহ, ৫৯ পৃষ্ঠা।
৩। আদ দুরারুল কামিনা, ৩য় খন্ড, ১৫৪ পৃষ্ঠা।
৪। আদ দুরারুল কামিনা, ৩য় খন্ড, ১৫৫ পৃষ্ঠা।
৫। আদ দুরারুল কামিনা, ৩য় খন্ড, ১৫৫ পৃষ্ঠা।
৬।আদ দুরারুল কামিনা, ১ম খন্ড, ১১ পৃষ্ঠা।
৭।আদ দুরারুল কামিনা, ১ম খন্ড, ১১ পৃষ্ঠা।
৮।তবাকাতুশ শাফিয়াতিল কুবরা, ৯ম খন্ড, ১৬২-১৬৪ পৃষ্ঠা।
৯।তবাকাতুস সুফিয়াতিল কুবরা।