শায়খুল হাদীস রহ. : জীবন ও কর্ম

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | নিজস্ব প্রতিনিধি 


অলঙ্করণ : জারাদা

উপমহাদেশের অন্যতম হাদিস বিশারদ, বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির অন্যতম দিকপাল, বোখারি শরিফের প্রথম বাংলা অনুবাদক, ৫০ বছরের অধিক সময় বুখারি শরিফ পাঠদানের বিরল কৃতিত্বের অধিকারী, ইসলামী ঐক্যজোটের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান বরেণ্য আলেম শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ -এর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১২ সালের আজকের দিনে রাজধানীর আজিমপুরে নিজ বাসায় তিনি ইন্তেকাল করেছিলেন।

জন্ম ও বংশ পরিচয় : নাম আজিজুল হক, উপাধি শাইখুল হাদিস, পিতার নাম আলহাজ এরশাদ আলী। মা হাজেরা বেগম। ১৯১৯ সালে তৎকালীন ঢাকা জেলার মুন্সীগঞ্জ মহকুমার বিক্রমপুর পরগনার লৌহজং থানার ভিরিচ খাঁ গ্রামের সম্ভ্রান্ত কাজী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

শৈশব : মাত্র ৪/৫ বছর বয়সে তিনি মাকে হারান। এরপর নানীর কাছে লালিত পালিত হন। তাঁর মাতুলালয় ছিল একই জেলার কলমা অঞ্চলে। এই সুবাদে শৈশবের কিছুটা সময় তাঁর এখানেই কেটেছে। এরপর ৭/৮ বছর বয়সে নিজ জেলা ছেড়ে বি.বাড়িয়া শহরে চলে আসেন। কারণ তাঁর  পিতা হাজী এরশাদ আলী রাহ. তখন ব্যবসার কাজে সেখানেই অবস্থান করতেন।

শিক্ষার জীবনের সূচনা : নানাবাড়ি কলমা এলাকার স্থানীয় মসজিদেই হযরত শায়খুল হাদীস রাহ.-এর লেখাপড়ার সূচনা হয়। সেখানে তিনি কুরআন মজীদের নাজেরা সমাপ্ত করেন। এরপর আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী রাহ.-এর বিশেষ নেগরানিতে জামিয়া ইউনুছিয়ায় আরবী শিক্ষা শুরু হয়। শায়খুল হাদীস রাহ.-এর বড় সৌভাগ্য ও তাঁর প্রতি আল্লাহ তাআলার বড় অনুগ্রহ এই যে, শিক্ষাজীবনের সূচনা থেকেই তিনি হযরত শামসুল হক ফরিদপুরী রাহ.-এর মতো শায়খ ও মুরবিবর সাহচর্য ও তত্ত্বাবধান লাভ করেছেন। যিনি ছিলেন ছাত্রদের তালীম ও তরবিয়তের বিষয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এমনকি হযরত ফরিদপুরী রাহ.-এর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শায়খুল হাদীস রাহ. তাঁর স্নেহের ছায়ায় থাকার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। প্রাতিষ্ঠানিক ছাত্রজীবন সমাপ্ত হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় তিনি তাঁরই তত্ত্বাবধানে তারাক্কির মঞ্জিলসমূহ অতিক্রম করতে থাকেন।

পরবর্তীতে হযরত ফরিদপুরী রাহ. জামিআ ইউনুসিয়া থেকে পৃথক হয়ে যান এবং তাঁর দুই সহকর্মী হযরত হাফেজ্জী হুজুর ও হযরত আবদুল ওয়াহহাব পীরজী হুজুর রাহ.কে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। এখানে তিনি বড় কাটারায় আশরাফুল উলূম নামে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন।

শায়খুল হাদীস রাহ. যেহেতু মূলত হযরত আল্লামা ফরিদপুরী রাহ.-এর শাগরিদ ছিলেন এজন্য তিনিও আশরাফুল উলূম মাদরাসায় চলে আসেন এবং এখানেই দাওরায়ে হাদীস সমাপ্ত করেন। হযরত ফরিদপুরী রাহ. ছাড়াও তিনি এখানে আল্লামা রফীক আহমদ কাশ্মিরী রাহ.-এর বিশেষ সান্নিধ্য লাভ করেন।

শায়খুল ইসলাম যফর আহমদ উসমানী রাহ. তখন ঢাকায় থাকতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা আলিয়া মাদরাসা ছাড়াও তিনি আশরাফুল উলূম মাদরাসার শায়খুল হাদীস ও সদরুল মুদাররিসীন ছিলেন। এর সুবাদে ১৯৪০-৪১ ঈসায়ী সালে শায়খুল হাদীস রাহ. তাঁর নিকট তাফসীরে বায়যাবী, জামে তিরমিযী ও সহীহ বুখারী পড়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন।

শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে বিশে সফর : আশরাফুল উলূম মাদরাসা বড় কাটারায় দাওরায়ে হাদীসের বছর শায়খুল হাদীস রাহ. যেসব কিতাব ও শরাহ মুতালাআ করেছেন তার মধ্যে ‘ফাতহুল মুলহিম’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ কিতাব অধ্যয়নের সময়ই তিনি শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাববীর আহমদ উসমানী রাহ.-এর ভক্ত হয়ে যান। তাঁর নিকট দ্বিতীয়বারের মতো সহীহ বুখারী পড়ার ইচ্ছা তীব্র হয়ে ওঠে। আল্লামা উসমানী রাহ. তখন জামিআ ইসলামিয়া ডাভেলে ছিলেন এবং সেখানেই তাঁর বিখ্যাত দরসে বুখারী হত। তাই শায়খুল হাদীস রাহ. দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ডাভেল গেলেন এবং ১৩৬২-৬৩ হিজরীতে আল্লামা উসমানী রাহ.-এর নিকট বুখারী পড়ার গৌরব অর্জন করেন।

ডাভেল যাওয়ার পথে মাযাহিরুল উলূম সাহারানপুরে কয়েকদিন অবস্থান করেন। এ সময় হযরত থানভী রাহ.-এর খলীফা হযরত মাওলানা আসআদুল্লাহ রামপুরী রাহ.-এর সাথে তাঁর বিশেষ সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং হযরত তাকে মুসালসালাতের ইজাযতও প্রদান করেন।

দারুল উলূম দেওবন্দে :  আল্লামা শাববীর আহমদ উসমানী রাহ.-এর নিকট বুখারী শরীফ পড়ার সময় শায়খুল হাদীস রাহ. তাঁর বুখারীর তাকরীরগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে লিপিবদ্ধ করতেন। বছর শেষ হওয়ার পর লিখিত তাকরীরগুলো পরিষ্কার করে লেখা, উদ্ধৃতিসমূহের নিরীক্ষা ও সম্পাদনার জন্য উসমানী রাহ. আরো এক বছরের জন্য তাঁকে দেওবন্দে নিজের কাছে রেখে দেন। অবস্থানের সুবিধার্থে শায়খুল হাদীস রাহ. দারুল উলূম দেওবন্দের দাওরায়ে তাফসীরে ভর্তি হন। সেখানে তিনি শায়খুত তাফসীর আল্লামা ইদরীস কান্ধলভী রাহ.-এর নিকট পড়ার সৌভাগ্যও লাভ করেন।

শায়খুল হাদীস রাহ.-এর উল্লেখযোগ্য আসাতিযায়ে কিরাম : ১. শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাববীর আহমদ উসমানী রাহ.। ১৩৬২-৬৩ হিজরীতে শায়খুল হাদীস রাহ. তাঁর নিকট সহীহ বুখারী পড়েন। ২. হযরত আল্লামা যফর আহমদ উসমানী রাহ.। ১৯৪০-১৯৪১ ঈসায়ী সালে ঢাকার আশরাফুল উলূম বড় কাটারা মাদরাসায় হযরতের নিকট সহীহ বুখারী, জামে তিরমিযী ও তাফসীরে বায়যাবী পড়েছেন। ৩. হযরত মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী রাহ. (ছদর ছাহেব হুজুর)। শিক্ষার সূচনা থেকে তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর নিকট বিভিন্ন কিতাব পড়েছেন। এবং তাঁর সার্বক্ষণিক নেগরানি ও তরবিয়তে ছিলেন। ৪. শায়খুত তাফসীর মাওলানা ইদরীস কান্ধলভী রাহ.। দারুল উলূম দেওবন্দে হযরতের নিকট দাওরায়ে তাফসীর করেছেন। শিক্ষাবর্ষ : ১৩৬৩-১৩৬৪ হিজরী। ৫. হযরত মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রাহ.। প্রাথমিক স্তর থেকে দাওরায়ে হাদীস পর্যন্ত তাঁর নিকট বিভিন্ন কিতাব পড়েছেন। ৬. হযরত মাওলানা রফীক আহমদ কাশ্মীরী রাহ.। নাহবেমীর জামাত থেকে শরহে জামি জামাত পর্যন্ত বিভিন্ন কিতাব পড়েছেন। ৭. হযরত মাওলানা আসআদুল্লাহ রামপুরী রাহ.। প্রায় এক মাস হযরতের সোহবতে থাকেন এবং আহাদীসে মুসালসালার ইজাযত লাভ করেন। ১৩৬৩ হিজরী। ৮. মুহাদ্দিসে কাবীর হযরত আল্লামা হেদায়াতুল্লাহ রাহ.। তাঁর নিকট সহীহ মুসলিম ও অন্যান্য কিতাব পড়েছেন।

অধ্যাপনা :  প্রাতিষ্ঠানিক ছাত্রজীবন শেষে ১৩৬৪ হিজরী, মোতাবেক ১৯৪৪ ঈসায়ী সালে ঢাকা আশরাফুল উলূম বড় কাটারা মাদরাসায় শায়খুল হাদীস রাহ.কে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এর ২ দুই বছর আগে শায়খুল হাদীস রাহ. এই মাদরাসা থেকেই শিক্ষা সমাপন করেছিলেন। আকাবির ওলামা ও আসাতিযা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে উঁচু স্তরের কিতাব দেওয়া হয়। তিনি এখানে ৮ বছর তাদরীসের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৫২ সালে হযরত আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী রাহ. ঢাকার প্রসিদ্ধ লালবাগ এলাকায় জামিআ কুরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগ নামে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। অল্প সময়ে মাদরাসাটি খুব প্রসিদ্ধি ও মাকবুলিয়ত লাভ করে। হযরত শায়খুল হাদীস রাহ. তখন এই জামিআয় চলে আসেন। এখানে ১৯৫৫ সালে তার উপর বুখারীর দরসদানের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তিনি শায়খুল হাদীস হিসেবে বুখারী শরীফ ও অন্যান্য কিতাবের দরস দিতে থাকেন। একই সময়ে ঢাকার অপর প্রসিদ্ধ দ্বীনী প্রতিষ্ঠান জামিআ ইসলামিয়া তাতিবাজার ইসলামপুরেও শায়খুল হাদীস রাহ. তাদরীসের খেদমত আঞ্জাম দেন। ১৯৬৫ সালে হযরত মাওলানা হাফেজ্জী হুজুর রাহ.-এর প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা নূরিয়া ঢাকায় দাওরায়ে হাদীসের জামাত শুরু হলে দরসে বুখারীর জন্য হযরতকেই আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং তিনি তা সাদরে গ্রহণ করেন। এছাড়াও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক বছর বুখারী শরীফের দরস দিয়েছেন।

১৯৬৫ সালে হযরত ফরিদপুরী রাহ. ইন্তেকাল করেন। শায়খুল হাদীস রাহ. তখনও জামিআ কুরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগেই তাদরীসের দায়িত্ব পালন করছিলেন। কিন্তু কিছুদিন পর বিভিন্ন কারণে সেখান থেকে পৃথক হয়ে যান। এরপর ১৯৮৬ সালে ঢাকার পশ্চিমে মুহাম্মদপুরে ‘জামিআ মুহাম্মদিয়া আরাবিয়া’ নামে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে সেখানে বুখারী শরীফের দরস প্রদান করেন। এর দুই বছর পর জামিআটি একই এলাকার ঐতিহাসিক সাত মসজিদের পাশে নিজস্ব জমিতে স্থানান্তরিত হয়। এ সময় এর নামে কিছুটা পরিবর্তন এনে ‘জামিআ রাহমানিয়া আরাবিয়া মুহাম্মদপুর’ নাম রাখা হয়। ১৯৮৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এই জামিআই ছিল শায়খুল হাদীস রাহ.-এর দরসে বুখারী ও অন্যান্য তাদরীসী খেদমতের প্রধান কেন্দ্র। তবে তলাবাদের আগ্রহ ও অনুরোধে তিনি ঢাকার কয়েকটি বড় মাদরাসায়ও শায়খুল হাদীসের দায়িত্ব পালন করেন এবং বুখারীর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দরস প্রদান করেন। এর পাশাপাশি ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন মাদরাসার ছাত্ররাও বুখারী শরীফের প্রথম কয়েকটি পারা তাঁর নিকট পড়ার সৌভাগ্য লাভ করেন।

জামিআ রাহমানিয়া আরাবিয়া ছাড়াও শায়খুল হাদীস রাহ. যেসব মাদরাসায় বুখারী শরীফের সবক পড়িয়েছেন সেগুলো হল, জামিআ শরইয়্যাহ মালিবাগ ঢাকা, মাদরাসা দারুস সালাম মিরপুর ঢাকা, জামিআ ইসলামিয়া লালমাটিয়া ঢাকা, জামেউল উলূম মিরপুর-১৪ ঢাকা।

শায়খুল হাদীস রাহ. ও দারসে বুখারী : শায়খুল হাদীস রাহ. তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকজীবনে বিভিন্ন শাস্ত্রের অনেক কিতাবের দরস দিয়েছেন। যার মধ্যে কুরআন মজীদের তরজমা ও তাফসীর এবং হাদীসের কিতাবসমূহ, মানতিক, নাহু, সরফ, আরবী সাহিত্য, ফিকহ, উসূলে ফিকহ অন্তর্ভুক্ত। তবে আল্লাহ তাআলা তাঁকে বিশেষভাবে বুখারী শরীফের দরস ও এর খেদমতের জন্য মনোনীত করেছিলেন। এ কারণে ১৯৫৫ সাল থেকে ২০১০ পর্যন্ত অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় তিনি এই কিতাবের সফল দরস দিয়েছেন। আর তাঁর এই দরস এতই সমাদৃত ছিল যে, বাংলাদেশে এর কোনো নজির খুঁজে পাওয়া যায় না। এ কারণেই তাঁর শিক্ষকজীবনের প্রায় শেষ বিশ বছর বিভিন্ন মাদরাসা থেকে বুখারী শরীফ পড়ানোর জোর আবেদন আসতে থাকে। এজন্য প্রতিদিন ৪/৫ মাদরাসায় তাঁকে বুখারী পড়াতে হত। ফলে তাঁর নিকট শুধু বুখারী শরীফ পড়েছে-এমন তালিবে ইলমের সংখ্যাও প্রায় ৫ হাজার পৌঁছে গেছে।

এখানে এ কথাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, শায়খুল হাদীস রাহ. ছাত্রজীবনেই আল্লামা উসমানী রাহ.-এর বুখারী শরীফের তাকরীর লিপিবদ্ধ করে কিতাবটির এক মূল্যবান উর্দূ শরাহ প্রস্ত্তত করে ফেলেন। আর কর্মজীবনে প্রবেশের পর তিনি বাংলা ভাষায় বুখারী শরীফের এমন শরাহ লেখেন, যা এ ভাষায় পূর্ণ বুখারীর সর্বপ্রথম শরাহ। যা সবচেয়ে বিশদ ও গ্রহণযোগ্য শরাহ। বৃহৎ দশ খন্ডে তা প্রকাশিত হয়েছে।

সহীহ বুখারীর এমন নানামুখী খেদমতের কারণে ‘শায়খুল হাদীস’ উপাধিটি তার নামের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। দেশের মানুষ তাঁকে ‘শায়খুল হাদীস’ উপাধিতেই স্মরণ করে। আর সাধারণভাবে ‘শায়খুল হাদীস’ বললে সকলের মনে তাঁর কথাই ভেসে উঠে।

ওয়ায ও ইরশাদ এবং দাওয়াত ও তাবলীগ : দরস-তাদরীস, তালিবে ইলমদের তরবিয়ত এবং রচনা-গবেষণাই ছিল শায়খুল হাদীস রাহ.-এর প্রধান কাজ ও মূল ব্যস্ততা। কিন্তু চিন্তা ও স্বভাবের প্রশস্ততার কারণে শুধু এতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে পারেননি; বরং দ্বীনী শিক্ষা থেকে বঞ্চিত প্রায় কোটি কোটি সাধারণ মানুষের দ্বীনী জরুরতের প্রতি তাঁর সজাগ দৃষ্টি ছিল। তাদের সেই দ্বীনী প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে শায়খুল হাদীস রাহ. তাঁর ইলমী শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও জীবনের এক বিরাট অংশ ব্যয় করেছেন। যতদিন তিনি সুস্থ ছিলেন, শরীরে শক্তি ছিল ওয়ায-নসীহত, দাওয়াত-ইরশাদের মাধ্যমে তাদের মাঝে দ্বীনী বোধ সৃষ্টি করেছেন এবং দ্বীনী শিক্ষার প্রসারে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন।

এ লক্ষ্যে শায়খুল হাদীস রাহ. গোটা দেশেই দ্বীনী ও দাওয়াতী সফর করেছেন এবং সাধারণ মানুষকে দ্বীনী সেবা দান করেছেন। এর দ্বারা হাজার হাজার মানুষের মাঝে পরিবর্তন এসেছে। তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনীত দ্বীন সম্পর্কে পরিচিতি লাভ করেছে এবং সে আলোকে নিজেদের জীবন পরিচালনায় উৎসাহী হয়েছে।

আফসোসের বিষয় এই যে, শায়খুল হাদীস রাহ.-এর দ্বীনী ও দাওয়াতী এসব মূল্যবান বক্তৃতা-ভাষণ ও ওয়ায-নসীহত নিয়মতান্ত্রিকভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়নি। এর অতি সামান্য অংশেরই রেকর্ড বিদ্যমান আছে, যার এ পর্যন্ত দুটি খন্ড প্রকাশিত হয়েছে।

দায়িত্ব পালন :  ১৯৭৮ সালে কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক)-এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি লালবাগ কেল্লা জামে মসজিদ, মালিবাগ শাহী মসজিদ ও আজিমপুর স্টেট জামে মসজিদের খতিব ছিলেন। জাতীয় ঈদগাহেও ঈদের ইমামতি করেছেন কয়েক বছর। আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের শরীয়া বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৮৮ সালে ঢাকার মুহাম্মাদপুরে সাত মসজিদের পার্শ্বে জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া গড়ে তোলেন। এর আগে মালিবাগ জামিয়া শরইয়্যায়ও প্রিন্সিপাল হিসাবে কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেন।

১। শায়খুল হাদীস : জামিআ কুরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগ ঢাকা, জামিআ রাহমানিয়া আরাবিয়া মুহাম্মদপুর ঢাকা, জামিআ শরইয়্যাহ মালিবাগ ঢাকা, জামেউল উলূম মিরপুর-১৪ ঢাকা। এছাড়াও আরো কয়েকটি মাদরাসা। ২। মুহতামিম ও সভাপতি : জামিআ রাহমানিয়া আরাবিয়া ঢাকা, জামিআ শরইয়্যাহ মালিবাগ ঢাকা, জামিআতুল আজিজ মুহাম্মদপুর ঢাকা। ৩। খতীব : জাতীয় ঈদগাহ ঢাকা, লালবাগ কেল্লা জামে মসজিদ ঢাকা, আজিমপুর জামে মসজিদ ঢাকা। ৪। কার্য নির্বাহী কমিটির সদস্য : নেজামে ইসলাম পার্টি পাকিস্তান। ৫। সহ-সভাপতি : তাহরীকে খেলাফত বাংলাদেশ। ৬। সভাপতি ও চেয়ারম্যান : জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস বাংলাদেশ ও বেফাকুল জামাআ-তিল ইসলামিয়াহ বাংলাদেশ।

রচনাবলী : শায়খুল হাদিসের অনন্য অবদান হল,  বাংলা ভাষায় ১০ খণ্ডে বুখারি শরিফের প্রথম বাংলা অনুবাদ। তাঁর ছাত্র জীবনেই রচিত ১৮০০ পৃষ্ঠার বুখারি শরিফের উর্দু ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘ফজলুল বারি শরহে বুখারি’ পরবর্তীতে পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত হয়। ‘মুসলিম শরিফ ও অন্যান্য হাদীসের ছয় কিতাব’ নামে অনবদ্য এক হাদিস গ্রন্থ সংকলন করেন। এছাড়া মছনবীয়ে রূমীর বঙ্গানুবাদ, পুঁজিবাদ, সমাজবাদ ও ইসলাম, কাদিয়ানি মতবাদের খণ্ডন, মাসনূন দোয়া সংবলিত মুনাজাতে মাকবুল, সত্যের পথে সংগ্রাম এসব বইয়ের রচয়িতাও তিনি। তার প্রতিষ্ঠিত বাংলা ভাষায় ধর্মীয় পত্রিকা ‘মাসিক রাহমানী পয়গাম’ দীর্ঘ দুই যুগ যাবত প্রকাশিত হচ্ছে।

জীবনের শেষলগ্ন : শায়খুল হাদীস রাহ. তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ইলম ও দ্বীনের খেদমতের জন্য ওয়াকফ করে রেখেছিলেন। এককথায় বললে তাঁর গোটা জীবন ছিল দ্বীনের জন্য এক অব্যাহত প্রচেষ্টা। আর তাই ফজরের নামাযের পর সকাল সকাল দরস-তাদরীসের জন্য মাদরাসায় উপস্থিত হওয়া এবং প্রায় দুপুর পর্যন্ত বিভিন্ন সবক পড়ানো। এরপর দুপুরে সামান্য সময় কায়লুলার পর রচনা-গবেষণার কাজে ডুবে যাওয়া, আসরের পর রাজনৈতিক ও জাতীয় বিভিন্ন কার্যক্রম ও মুসলমানদের সম্মিলিত কাজে অংশগ্রহণের জন্য ঘর থেকে বের হওয়া। এরপর সাধারণ মুসলমান পর্যন্ত দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছানের জন্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সফর করে ওয়ায-নসীহত করা এবং অর্ধ রাতের পর বাসায় ফেরা এবং সামান্য সময় আরাম করা। এরপর ফজরের পর পূর্ণ উদ্যমে বুখারী শরীফের সবক পড়ানো-এ ছিল তাঁর জীবনের এমন রুটিন, যা তিনি বছরের পর বছর মেনে চলেছেন। ইলম ও দ্বীন এবং দেশ ও জাতির কাজে জীবনভর এমন ডুবে ছিলেন যে, স্বস্তির সাথে আরাম করার ফুরসতও তাঁর হয়নি।

এরপর ধীরে ধীরে তিনি বৃদ্ধ হয়ে পড়েন। অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েন। গায়ে আর বল নেই। অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোও যেন আর সাড়া দেয় না। স্মরণশক্তিও কমে গেছে। আল্লাহর নাম ছাড়া সবকিছুই তিনি ভুলে গেছেন। মোটকথা, কুদরতই তাকে জীবনভর মেহনত-মুজাহাদার পর এখন বিছানায় শুয়ে থাকতে বাধ্য করেছে। কথাবার্তাও প্রায় বন্ধ। শুধু আল্লাহ নামটাই তাঁর মনে আছে।

অবশেষে ১৯ রমযান ১৪৩৩ হিজরী, মোতাবেক ৮ আগস্ট ২০১২ বুধবার প্রায় ৯৫ বছর বয়সে শায়খুল হাদীস রাহ. আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

জানাযা ও দাফন : ২০ রমযান ১৪৩৩ হিজরী, মোতাবেক ৯ আগস্ট বৃহস্পতিবার সকাল ১১ টায় জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে শায়খুল হাদীস রাহ.-এর নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। শায়খের ছাহেবযাদা মাওলানা মাহফুযুল হক নামাযের ইমামতি করেন।জানাযা শেষে কেরানীগঞ্জের আটিবাজার সংলগ্ন ঘাটারচর পারিবারিক কবরস্থানে শায়খুল হাদীস রাহ. সমাহিত হন।

মৃত্যুকালে তিনি তিনি পাঁচ ছেলে, আট মেয়ে, নাতি-নাতনিসহ আত্মীয়স¡জন ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। দেশ-বিদেশে তার হাজার হাজার ছাত্র রয়েছে। তার পরিবারের ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনিসহ ৭০জন হাফেজ ও ৩০ জন আলেম রয়েছে। তার মৃত্যুতে পরিবারসহ সারাদেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।