জানুয়ারি ২৩, ২০১৭

বাবা কোটিপতি, ছেলে বেকারিকর্মী!‌

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

এ যেন সাহিত্যিকের লেখা কোনো গল্প। বাস্তবতা শেখাতে বিত্তশালী বাবা একদম নিঃস্ব অবস্থায় ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন জীবনের কঠিন যুদ্ধে। গল্পে এমন বর্ণনা মিললেও বাস্তবে ঠিক এই কাজটিই করেছেন ভারতের গুজরাটের এক ধনী ব্যবসায়ী। জীবন যে কতো কঠিন তা বোঝাতে সাধারণ জীবনযাপনের আদেশ দিয়ে কেরালায় পাঠিয়েছিলেন ছেলেকে।

Big_Daddyগুজরাটের হীরা ব্যবসায়ী সাবজি ঢোলাকিয়ার অনেক অর্থ সম্পদ। সুরাটের এই ধনীর রয়েছে ৬ হাজার কোটি রুপির ব্যবসা। এজন্যে তাকে কম শ্রম দিতে হয়নি। তবে তার সন্তান কি সেই শিক্ষা পেয়েছে? এমনটা উপলব্ধির পর ছেলের জন্য অভিনব শিক্ষার উদ্যোগ নেন এই ধনী বাবা।

দ্রাভিয়া ঢোলাকিয়া নামের তার ২১ বছরের আদরের সন্তানকে পাঠিয়ে দেন কেরালায়। লক্ষ্য এক মাস সেখানে সাধারণ মানুষের কাতারে কাজ করবে সে। এজন্যে ছেলেকে পরার জন্য মাত্র তিনটি কাপড় এবং পকেটে মাত্র ৭ হাজার রূপি দিয়ে জীবনযুদ্ধে নামিয়ে দেন তিনি।

শর্ত ছিল এই এক মাস প্রয়োজন না হলে সেই অর্থও ছেলে খরচ করতে পারবে না। এই সময়টুকু তাকে নিজের উপার্জনেই চলতে হবে। আর তাই তো গেল ২১ জুন কেরালায় পৌঁছেই ছেলে কাজ খোঁজা শুরু করে দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রে এমবিএ পড়ে দ্রাভিয়া। ছুটিতে এবার ভারতে আসে। বাবার আদেশে ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জানতে পারে জীবনের কঠিন দিকগুলো। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মালেই যে দুনিয়ার সব জয় করা যায় না, কঠিন বাস্তবতায় শিক্ষা পাওয়া বাবা, ছেলেকে সেই শিক্ষাটাই দেন। অবশ্য ব্যাপারটি গোপন রাখা হলেও তারই এক ঘনিষ্ঠের মাধ্যমে তা প্রকাশ হয়ে পড়ে।

Big_Daddy2ছেলেকে এমন শিক্ষাদানের বিষয়ে টাইমস অফ ইন্ডিয়াকে সাবজি ঢোলাকিয়া জানান, ‘তাকে আমি তিনটি শর্ত দিই। এক, এই সময়টিতে তাকেই উপার্জন করে চলতে হবে। তবে একসপ্তাহের বেশি কোথাও কাজ করতে পারবে না। দুই, আমার পরিচয় কারও কাছে প্রকাশ করতে পারবে না। এজন্যে কারও সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগও করতে পারবে না। তিন, এই এক মাস বিপদে না পড়লে আমার দেয়া সেই ৭ হাজার রূপিও সে খরচ করতে পারবে না।’

ছেলের প্রতি শর্তারোপের বিষয়ে ঢোলাকিয়া বলেন, ‘এর মাধ্যমে আমি ছেলেকে শেখাতে চেয়েছি যে গরীব ও ভাগ্যবঞ্চিতরা কতো কষ্ট আর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে চাকরি করে এবং উপার্জন করে থাকে। বিশ্বের কোনো প্রতিষ্ঠানই তাকে এই শিক্ষা দিতে পারবে না।’

দুবছর আগেও অর্থাৎ ২০১৪ সালে ব্যতিক্রমী উদ্যোগের জন্য খবরের শিরোনাম হয়েছিলেন এই হীরা ব্যবসায়ী। কর্মচারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাদের গাড়ি, ফ্ল্যাট এবং হীরা উপহার দিয়ে আলোচিত হন ‘হরে কৃষ্ণ ডায়মন্ড এক্সপোর্ট’-এর স্বত্বাধিকারী। সেবার প্রতিষ্ঠানের ১ হাজার ২শ’ ৬৮ জন কর্মচারীকে উপহার স্বরূপ গাড়ি, ফ্ল্যাট কিংবা হীরা বেছে নিতে পরামর্শ দেন। কর্মচারীদের কেউ তখন গাড়ি, কেউ ফ্ল্যাট আবার কেউ হীরা উপহার হিসেবে বেছে নেয়। সেবার তিনি কর্মচারীদের পছন্দ মতো ৫ শতাধিক গাড়ি, ২ শতাধিক ফ্ল্যাট এবং হীরা বন্টন করে দেন। এসময় তাদের বেতন বোনাসও বাড়িয়ে দেন ঢোলাকিয়া।

Big_Daddy4এদিকে, বাবা পরীক্ষায় পাঠানোয় তা চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নেন ছেলে দ্রাভিয়া। ভাষা ও স্থানের দিক থেকে তুলনামূলক কঠিন হওয়ায় কোচিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সে। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম টাইমস অফ ইন্ডিয়াকে সংগ্রামী সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনাও দেয় দ্রাভিয়া।

জানায়, প্রথম ৫ দিন কোচিতে কোন কাজ জোটেনি তার। কেউ তাকে চিনতে না পারায় অন্তত ৬০টি জায়গায় ঘুরলেও তার কাজ মেলেনি। তাই বাধ্য হয়ে মিথ্যে পরিচয় দিতে হয়েছে তাকে। বলতে হয়েছে, সে গুজরাটের এক গরীব পরিবারের সন্তান। যে কিনা দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে।

এই কয়দিনের শিক্ষায় দ্রাভিয়া জেনেছে, প্রতিযোগিতার যুগে চাকরি পাওয়া কতো কঠিন। আবার সাক্ষাৎকারের পর চাকরি না হলে কেমন কষ্ট হয়। চাকরি অবশ্য ঠিকই জোটে তার। সবশেষ একটি বেকারিতে কাজ করে দ্রাভিয়া। এর আগে, একটি কল সেন্টারে, পরে জুতার দোকানে, এরপর ম্যাকডোনাল্ডে কাজ করে সে। কষ্টের দিনগুলোতে খাবারে প্রতিদিন তার খরচ হয়েছে ৪০ রুপি। আর থাকার জন্য রাত প্রতি আড়াইশ’ রুপি প্রয়োজন হয় তার। তবে এত কষ্টের পরও এই অভিজ্ঞতা জীবনের জন্য অনেক বড় করে দেখছেন দ্রাভিয়া।