ঈদের দিনের করণীয়-বর্জনীয়

ঈদের দিনের করণীয়-বর্জনীয়

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | তানভীর সিরাজ


ইসলাম স্বীকৃত আনন্দ বা খুশি যদি আমরা প্রকাশ না করি তাহলে আনন্দের মালিক আমাদের ছাড়বেন কি? প্রশ্নবিদ্ধ হব আমরা। ইসলামে সবকিছুর একটা সীমা বা প্রান্তসীমা আছে। যে সীমা বা প্রান্তে থেকেই আমাকে আপনাকে ইসলামের সৌন্দর্য উপভোগ করতে হবে , পালন করতে হবে তার হুকুম, আদায় করতে হবে তার আদেশ আর সরে থাকতে হবে তার নিষেধ থেকে। এই যে আসছে আনন্দমুখর একসময়, যাকে আরবিতে ঈদুল আয্হা, বাংলাতে কুরবানির ঈদ বলা হয়।
যে ঈদ বা আনন্দের বিষয়ে খুদ রাসূলে মাকবুল সা. আনন্দ প্রকাশ করে বলেন,
আল্লাহ তোমাদেরকে এদের পরিবর্তে উত্তম কিছু দিয়েছেন:
ইয়াওমুল আদ্বহা ও ইয়াওমুল ফিতর।
মূলপাঠ ;
قَدِمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَدِينَةَ وَلَهُمْ يَوْمَانِ يَلْعَبُونَ فِيهِمَا ، فَقَالَ : مَا هَذَانِ الْيَوْمَانِ ؟ قَالُوا : كُنَّا نَلْعَبُ فِيهِمَا فِي الْجَاهِلِيَّةِ . فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ( إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَبْدَلَكُمْ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا : يَوْمَ الْأَضْحَى ، وَيَوْمَ الْفِطْرِ )
অর্থ ;
আনাস ইবনে মালিক(রা.) বর্ণিত: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন [মদীনায়] আসলেন, তখন তাদের দুটো উৎসবের দিন ছিল। তিনি(সা.) বললেন, ‘এ দুটো দিনের তাৎপর্য কি?’ তারা বলল, ‘জাহিলিয়াতের যুগে আমরা এ দুটো দিনে উৎসব করতাম।’ রাসূলুল্লাহ(সা.) বললেন, ‘আল্লাহ তোমাদেরকে এদের পরিবর্তে উত্তম কিছু দিয়েছেন: ইয়াওমুল আদ্বহা ও ইয়াওমুল ফিতর।
[সূনান আবু দাউদঃ১১৩৪; সুনানে নাসায়ীঃ১৫৫৬-হাদিসটির মান সহীহ]

ঈদুল ফিতর আমরা গত করেছি আর আগত হয়েছে ঈদুল আযহা। এই ঈদের আনন্দ নবী আ. মদিনা শরীফে দীর্ঘ দশবছর করেছেন, যে কদিন বেঁচেছিলেন।
হাদীসে এসেছে ইবনে উমর র. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সা. দশবছর কুরবানি করেছেন। হাদীসটি নিচে উল্লেখ করা হল।
মূলপাঠ ;
عن ابن عمر (رض)قال اقام رسول الله صلى
الله عليه وسلم في المدينة عشر سنين يضحي. رواه الترمذي وقال الترمذي هذا حديث حسن.
অর্থ ;
হযরত ইবনে উমর(রা,)বলেন, রসূলুল্লাহ(সা.)মদিনাতে দশ বছর অবস্থান করেন,সেখানে তিনি প্রতি বছরই কুরবানী করতেন৷ (তিরমিজী)
আমাদের নবী মুহাম্মদ সা. যখন এই আমোদকাল অতিবাহিত করেছেন আমাদেরও তাই করতে হবে, অন্যতাই আমরা বিচারের সম্মুখীন হবো।
কী সুন্দর ইসলাম! আনন্দ প্রকাশ না করলেও ধরপাকড়! সুবহানআল্লাহ।
চলুন, এবার আমরা ঈদ’ শব্দটির সাথে পরিচিত হই।
তারপর আমরা করণীয় আর বর্জণীয় নিয়ে আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ।

ঈদ’ শব্দটির পরিচয়;
শব্দটি যেহেতু আরবি তাই আরবি অভিধান থেকে চয়ন করা হয়েছে তার হদীস।
عيد :
(اسم)
1- عيد : كل يوم يحتفل فيه بتذكار أحد الصالحين أو أحد الأبطال أو حدث وطني أو حادثة هامة : « عيد الاستقلال ، عيد الأضحى ، عيد الميلاد »
2- عيد : موسم
3- عيد : ما يعود المرء من هم أو مرض أو حزن أو نحو ذلك. (معجم الرائد)
ঈদ একটি বিশেষ্য। তার নানারকম অর্থ দাঁড়ায় যার কিছু এখানে প্রদান করা হল।
১, প্রত্যেকটা দিন ভালোমন্দ ব্যক্তির স্মৃতিচারণ নিয়ে বা দেশীয় কোনো বিষয় নিয়ে অথবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনা দিয়ে উদযাপিত হয় : ( স্বাধীনতা দিবস, কুরবানির দিন আর জন্মবার্ষিকী ইত্যাদি)।

২, মৌসুম,ঋতু, সময়, উৎসবকাল আর পর্ব ইত্যাদি।
৩, অসুখবিসুখ, দুঃখ পেরেশানি ইত্যাদি থেকে ফিরে আসার নামও ঈদ।
(মু’জামুদ দায়ের)

ঈদের দিনে করণীয় বিষয়সমূহ ;
ঈদের দিনে করণীয় বিষয়ে আমরা প্রায় জানি, তবে সময়ের দাবি হিসেবে আমরা তা নিয়ে আলোচনা করতে পারি।
করণীয় –
১, জামাতের সাথে ফজরের নামাজ আদায় করা যাতে সারারাত ইবাদতের নেকি পায়। হাদিসের কথা। এই দুইরাতকে যে ব্যক্তি জীবিত রাখবে কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তাকেও জীবিত রাখবেন। তাই ঈদের রাতের মাগরিব এশা আর ফজর যদি জামাতের সাথে আদায় করে তাহলে সেই রাতকে জীবিত রাখার মতই হবে অন্য হাদিস থেকে আমরা তাই বুঝতে পারি। তা সুন্নত।

২, মিসওয়াকসহ সকাল সকাল গোসল করা। সাধ্যমত ভালো বস্তু দিয়ে গোসল করা। বিশেষভাবে হালাল খুশবো জাতীয় সাবান দিয়ে ভালোমত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হওয়া। যাতে শরীর থেকে খুশবো আসে। মানুষ আর ফেরেশতাসকল কষ্ট না পান। তা সুন্নত।

৩, শরীয়তের ভেতর থেকে তাওফিক অনুযায়ী ভালো পরিষ্কার কাপড় পরিধান করা। সাজসাজ রবরব আর সুসজ্জিত হয়ে ঈদের খুশি প্রকাশ করা। আমরা তো এতিম বালকের কাহিনী সবাই জানি। রাসূল সা. যাকে সমাদর করে বাড়ি নিয়ে আয়েশার র. হাতে সুন্দর পোশাক পরিধান করিয়েছেন।
৪, আতর, খুশবো ইত্যাদি ব্যবহার করা। হাদিসে খুশবো ব্যবহারের বেশ তাকীদ এসেছে। সৃষ্টিকুলের সেরামানব মুহাম্মদ সা. যেদিকে যেতেন সেদিকে খুশবো বুঁ বুঁ করতো। তাই তা সুন্নত। তবে আমাদের খিয়াল রাখতে হবে এলকোহল যেন এতো বেশি না থাকে যাতে তার ব্যবহার হারামের পর্যায়ে চলে যায়।

৫, ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে মিষ্টি জাতীয় কিছু খাওয়া। ঈদুল আযহাতে কিছু না খাওয়া মুস্তাহাব, তবে খিয়াল রাখতে হবে যে, মুস্তাহাব পালন করতে গিয়ে যেন আমার ফরজ ওয়াজিব ছুটে না যায়। আর এ হল মুস্তাহাব। খালি পেটে থাকতে পারলে ভালো আর না পারলে নামাযের আগে ঈদুল ফিতরের মত কিছু খেয়ে যাবেন। কারণ মুস্তাহাব পালনে নেকি আর না পারলে বদি নেই।

৬, ঈদগাহে যাওয়া। ঈদুল ফিতর বা রমাজানের ঈদে ছোট আওয়াজে তাকবীর বলা আর ঈদুল আযহা বা কুরবানির ঈদে বড় আওয়াজে তাকবীর বলে বলে যাওয়া। এত বড় নয়, যাতে পাশের জনের কষ্ট হয়।

৭, ঈদগাহে যাওয়ার সময় একরাস্তা দিয়ে যাওয়া আর আসতে আরেক রাস্তা দিয়ে ফিরে আসা। মুস্তাহাব বা সুন্নতে যায়েদাহ।
এ সুন্নত শহরে পালন করা কঠিন বলে সুন্দর একটি সমাধান এই।
যাওয়ার সময় যাবে রাস্তার একপাশ দিয়ে আর আসার সময় আসবে আরেক পাশ দিয়ে। আরো সহজে বলি, যাওয়ার সময় যাবে রাস্তার ডান দিয়ে আসার সময় আসবে ডান দিয়ে তাহলে সহজে সুন্নতটি আদায় হবে। এবং শহরনগর সবাই পারবে।

৮, ঈদগাহে যাবে পায়ে হেটে তবে তা যদি সম্ভব না হয় তাহলে অন্যভাবেও যাওয়া যাবে।
৯, নামাযে যাওয়া। সূর্য উদিত হয়েই সাথে সাথে ঈদের নামায পড়ে ফেলা ভালো। আর না পারলে বেশি দেরী না করা ভালো। যথাসাধ্য তাড়াতাড়ি পড়ার চেষ্টা করা। যাতে যোহর বা জুমার নামাযের কোনো সমস্যা না হয়।

১০, ঈদের নামাজের পূর্বে ফিতরা
আদায় করা। এবছর ফিতরার জন্য জন
প্রতি সর্বনিম্ন ৬৫ টাকা নির্ধারন করা হয়েছে।

বর্জণীয় নিয়ে আলোচনা ;

প্রতিটা বিষয়ের কিছু পালনীয় যেমন থাকে তেমনি থাকে কিছু বর্জণীয়। ঈদুল আযহাও এর ব্যতিক্রম নয়।
আমরা এবার ঈদুল ফিতর ও আযহার বর্জণীয় কিছু বিষয় নিয়ে আপনাদের সামনে আলোচনা করব,ইন,শা,আল্লাহ।
বর্জণীয়-
১, ঈদের দিনে রোজা রাখা। ঈদের দিনে রোজা রাখা হারাম।
মূলপাঠ;
لِحَدِيثِ أَبِي هُرَيْرَةَ مَرْفُوعًا ” نُهِيَ عَنْ صَوْمِ يَوْمَيْنِ يَوْمِ فِطْرٍ وَيَوْمِ أَضْحَى ” مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ]،
অর্থ ; আবু হুরাইরা র. থেকে (মারফুয়ান) একটি হাদিস আছে। তাকে দুইদিন রোজা রাখা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। এক: রমজানের ঈদে, দুই: কুরবানির ঈদের দিন। (বুখারী, মুসলিম)

২, বিজাতীয় সংস্কৃতি ; বিজাতীয় সংস্কৃতিতে ঈদ উদযাপন করা। যেমন, নাচ-গান, নানাধরণের ফৌকফেস্টিভাল করা ইত্যাদি।

৩, অবাধ মেলামেশা ; যেখানে সেখানে যত্রতত্র অবাধ মেলামেশা করা। না আছে ছেলেমেয়ের অনুভূতি আর না আছে তাদের অভিভাবকদের! আমি মুসলিম। আমার একটা ইতি ঐতিহ্য আছে আমরা যেন ঈদের আনন্দেমেলা তা ভুলে না যাই।

৪, ঈদ উৎসব পালন করা। ঈদী পালনের নামে বেহায়াপনার সয়লাবে আজ দেশ যে কোথায় যাচ্ছে, তা নিয়ে গত ইন্টারের বইয়ে হুময়ূন আহমদ ভালোই বলেছেন।

৫, ঈদী ; অর্থাৎ বড় ভাইবোন, আত্মীয় সজনের কাছ থেকে ঈদ সালামী নেয়া। যা অনেকসময় আনন্দের স্থানে লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সবার অর্থনৈতিক অবস্থা এক নয়, ভিন্ন। যে আনন্দে পেরেশানি আছে তা আনন্দের মরিচিকা।

৬, নামায কাযা করা বা না পড়া ; ঈদের আনন্দে পড়ে আমরা অনেকে নামায-কালাম বাদ দিয়ে দিই, তা মস্তবড় মূর্খতা। যে আল্লাহ্‌ আনন্দ দান করেছেন আমরা তাকেই ভুলে গেলাম!
বিশেষভাবে কুরবানির ঈদে যোহরের নামায নামাযী বেনামাযীর মাঝে ফারাকটা কমে যায়!

৭, বনভোজন ; বনভোজনের নামে আজ দেশে যে রীতি রেওয়াজ চালু হয়েছে তাতে বেশ অনৈতিক কাজ চলে আর এক্সিডেন্টের কথা কী বলব! আপনারা নিজের ছেলেমেয়েকে ফালতো এই আনন্দ থেকে বাঁচান! যদি ঘরোয়াভাবে হয় ভিন্ন কথা, তাও পর্দার বিষয় লক্ষণীয়।


Notice: Undefined index: email in /home/insaf24cp/public_html/wp-content/plugins/simple-social-share/simple-social-share.php on line 74