কাঁচা চামড়ার দাম এখন গোবরের চেয়েও কম | শরীফ মুহাম্মাদ

মাওলানা শরীফ মুহাম্মাদ | রাষ্ট্র ও সমাজ চিন্তক


অলঙ্করণ : জারাদা

কাঁচা চামড়ার দাম এখন সমান ওজনের গোবরের চেয়েও কম।
আমার সামনে আজ বিকেলে গ্রাম এলাকার ৪০ হাজার টাকার একটি গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ২৩০ টাকায়। ওই চামড়ার সমপরিমান ওজনের গরুর গোবরের দাম ৩০০ টাকার উপরে।

এটা একদিনে হয়নি।
ঈদুল আযহার আগে আগে কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ করে চামড়া বিক্রির নিয়ম ছিল না। চামড়ার প্রথম বিক্রেতা বা জোগানদাতাকে চরমভাবে ঠেকানোর
এ প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে মাত্র ৫ বছর আগে থেকে। ২০১৪ সালে।

২০১৪ সালে কমিয়ে দিয়ে যে দাম ঠিক করে দেওয়া হয়েছিল, প্রতি বছর সেটা কমেছে।
এবছর সেটা লিখিতভাবে অর্ধেকে নেমে এলেও বাস্তবে এক চতুর্থাংশে এসে ঠেকেছে।

কোনো বোকাও বিশ্বাস করবে না যে, এর পেছনে কোনো কারসাজি নেই।

কাঁচা চামড়ার দামের এই কারসাজি বোঝার জন্য ‘বাণিজ্যমন্ত্রী’ হওয়ার দরকার নেই।
শুধু দেশীয় বাজারের চামড়াজাত জিনিসের দাম দেখুন।

৫ বছর আগে যে চামড়ার জুতাজোড়া আপনি ১০০০ থেকে ১২০০ টাকায় কিনতে পারতেন,
বর্তমানে সেটিই ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকার মধ্যে কিনতে আপনাকে বেগ পেতে হবে।
ব্যাগ আর জেকেটের দামচিত্রও একই রকম।

আর আন্তর্জাতিক বাজার? চামড়াজাত পণ্যের দাম আরো চড়া।

শুধু এবং শুধুমাত্র কাঁচা চামড়ার বিক্রেতা কিংবা চামড়ার প্রথম জোগানদাতাদের ঠকানোর জন্য এই আয়োজন। প্রসেসিং করা চামড়ার দামও অনেক বেশি। খোঁজ নিয়ে দেখুন।

এ দেশে কাঁচা চামড়ার বিক্রেতা কারা?

ক্ষুদ্র গরিব ব্যবসায়ী-ফড়িয়া এবং লাখো এতিমখানা ও গরিবদের ফান্ড পরিচালনাকারী মাদরাসাগুলোই হচ্ছে কাঁচা চামড়ার বিক্রেতা। হাতেগোণা বিত্তের কুমিরদের পেটের ক্ষুধা ভরার জন্য এই দুটি শ্রেণীকে ঠকাতে কারসাজির খেলাটা শুরু হয়েছে। উদ্দেশ্য দ্বিমুখী শিকার। এক, গরিব ঠকিয়ে ধনীর শোষণের দাঁতটাকে আরো ধারালো করা। দুই, এতিমখানা ও কওমী মাদরাসাগুলোর গরিব ছাত্র পালনের সামর্থ্য কমিয়ে দিয়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইসলামী শিক্ষা বিরোধী শক্তিগুলির সঙ্গে হাসি বিনিময় করা।

তাদের উদ্দেশ্যে তারা কি সফল?
বাহ্যিক চোখে তাদেরকে সফল মনে হলেও বাস্তবতা কিন্তু অন্যরকম।
চামড়ার সঙ্গে এতিমখানা ও মাদরাসাগুলোর আর্থিক সামর্থ্যের সম্পর্ক সর্বোচ্চ এক দশমাংশ কিংবা তার চেয়েও কম। সুতরাং চামড়ার কাঁচা বাজার নষ্ট করে তারা দীর্ঘ মেয়াদে নিজেদের ক্ষতিবৃদ্ধি ছাড়া আর কারো ক্ষতি করতে পারবে বলে মনে হয় না। গরিবের হতাশ চোখ তাদের কলিজার পানি শুকিয়ে ফেলবে ইনশাআল্লাহ।

আমরা বরং অন্যরকম কিছু বিষয় নিয়ে ভাবতে পারি।

এক, ২০০ টাকায় চামড়া বিক্রির (লুটেরা টেনারী মালিকদের পকেট মোটা করার আয়োজন) কথা না বলে সেই চামড়া মাটিতে পচিয়ে জৈবসার বানানোর জন্য দেশবাসীকে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করতে পারি। ট্যানারীর দুর্ভাগা মালিকদের হাত পর্যন্ত না পৌঁছে – চামড়ার এমন নতুন কিছু লাভজনক বিকল্পের পথ মানুষের সামনে খুলে দিতে পারি।
মাসআলার বাধ্যবাধকতা থাকলে ২০০ টাকা পকেট থেকে দিয়ে গরিবদের সহযোগিতার কথাও বলতে পারি। চামড়া যেন পর্যন্ত না যায় সে বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিত করতে হবে।

দুই, প্রক্রিয়াজাত করে চামড়া ঘরের কাজে পাটির মতো, বিছানার মতো, শোপিসের মতো ব্যবহারে প্রত্যেককে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করতে পারি। এতে মাসআলারও সমর্থন আছে। ফিকহ অনুযায়ী কুরবানির চামড়া নিজে ব্যবহার করা জায়েজ।

তিন, সম্মিলিতভাবে জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে বেশ কিছু আড়ৎ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে পারি। যে আড়ৎ বা গোডাউনগুলোর কাজ হবে শুধু পচন থেকে রক্ষার জন্য লবন ও সামান্য মেডিসিনের মাধ্যমে চামড়াকে ধরে রাখা। এভাবে প্রাথমিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কয়েক মাস পর চাইলে দেশে বা বিদেশে উপযুক্ত দামে বিক্রির ব্যবস্থা করা।

কিছুতেই কুরবানির কাঁচা চামড়া নিয়ে লুটেরাদের উল্লাস চালাতে দেওয়া যায় না। জৈব সারের জন্য চামড়া মাটির নিচে পচিয়ে ফেলার প্রেরণা দেওয়া ভালো। কিন্তু লুটেরা ষড়যন্ত্রকারী শোষকদের পেট মোটা হতে দেওয়া যায় না। আমাদের নৈতিক, মানবিকিরণ বোধ এ কথাই বলে।

ফেসবুক থেকে