৪০ বছরে বিএনপির সাফল্য-ব্যর্থতা; ইনসাফের মুখোমুখি মুহিব খান

৪০ বছরে বিএনপির সাফল্য-ব্যর্থতা; ইনসাফের মুখোমুখি মুহিব খান

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | জামিল আহমদ


বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪০ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী গেলো গতকাল। এবারই প্রথম দলের প্রধান ছাড়াই প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করতে হয়েছে বিএনপিকে। বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া এখন কারাগারে বন্দী আছেন। এছাড়াও দলের দ্বিতীয় প্রধান ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও আছেন দেশের বাহিরে। বিশ্লেষকদের মতে ৪০ বছরে বিএনপি এখন সবচে খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করছে।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এ দলটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন প্রেক্ষাপট, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব ও দলটির বর্তমান অবস্থা নিয়ে আলাপ হয় সমাজ চিন্তক জাগ্রত কবি মুহিব খানের সাথে। আলাপ করেছেন ইনসাফের নিউজরুম এডিটর জামিল আহমদ।

অলঙ্করণ : জারাদা

বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন প্রেক্ষাপটের বর্ণনা দিতে গিয়ে মুহিব খান বলেন, বিএনপির শুরু বা প্রতিষ্ঠাকালীন সময়টা ছিলো ঐতিহাসিক, পাকিস্তানের জুলুম থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ স্বাধীণতা অন্য কোন বড় শক্তির গ্রাসে পরিণত হয় কিনা সেই ভয়টা মানুষের মধ্যে ছিলো।

স্বাধীনতা পরবর্তী  কয়েক বছরের শাসন আমলে একধরনের ‘ভয়’ এই জাতিকে খুবই দুশ্চিন্তাগ্রস্থ করে ফেলেছিলো,  সেই মুহুর্তে বাংলাদেশের গণ-মানুষের চিন্তা বা অনুভূতি অনুভব করতে পেরে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদীল দল-বিএনপি শুরু করেন।

শহীদ জিয়া বুঝতে পেরেছিলেন যে আমরা পাকিস্তান থেকে মুক্ত হয়েছি বলে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাইনি। পাকিস্তানের গোলামীর জিঞ্জির থেকে বের হওয়া বাংলাদেশ কোন ক্রমেই দিল্লির দাসত্বও যে মানবে না এবং বাংলাদেশ পূর্ণ  স্বাধীন এবং কারো দয়াদাস হয়ে বা অনুকম্পার উপর থাকবে না, তা জনগণের সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হোন শহীদ জিয়া। এবং সে কারনেই বাংলাদেশের শিংভাগ মানুষের দলে পরিণত হতে পেরেছিল বিএনপি।

বিনেপির সাফল্যের বিষয় মুহিব খান বলেন, বিনেপির সাফল্যের মধ্যে প্রথমেই হলো এ দেশের নাগরিকদেরকে বাংলাদেশী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া। বাংলাদেশীকে বাঙ্গালী বলে পূর্ণাঙ্গতা পায় না, কারণ বাংলা ভাষাভাষী ভারতে কলকাতা, আসাম ও ত্রিপুরাসহ আরো অনেক দেশেই আছে। এ দেশটি একটি আলাদা দেশ এটা নিশ্চিত করেছে বিএনপি।

মুহিব খান মনে করেন, বিএনপি যে চিন্তা চেতনা আদর্শ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো ক্রমান্নয়ে সে আদর্শ চিন্তা চেতনা থেকে তারা দূরে সরে গিয়েছিল।
তিনি বলেন, ২০০৮ সাল থেকে এ যাবত পর্যন্ত বিএনপির চরম অধঃপতন এটার জন্য আমি অন্য কাউকে দায়ী মনে করি না কারণ রাজনৈতিকভাবে একপক্ষ আরেকপক্ষকে খায়েল করার চেষ্টা করে বা করবে এটা বাস্তব। কিন্তু বিএনপি যে চিন্তা চেতনা আদর্শ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো ক্রমান্নয়ে সে আদর্শ চিন্তা চেতনা থেকে বিচ্যুত হয়েগেছে। এমনকি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানে আর্দশ যে নেতৃবৃন্দ তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে অপরিপক্ক নেতৃত্বের কারণে তারা বিএনপির শীর্ষস্থান থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের পর্যন্ত ত্যাগী প্রতিষ্ঠাতার আদর্শে আদর্শিত নেতাকর্মীরা দূরে সরে গেছে। আবার অনেক সময় দূরে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।

অবস্থা এমন হয়েছিলো যে এটা ব্যাণিজ্যিক দলে পরিণত হয়েছিল, বড় বড় শিল্পপতি ব্যবসায়ীরা টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন নিয়ে এমপি হওয়ার ঠিকানা ছিলো বিএনপি। দলটির হাইকমান্ডের নেতৃবৃন্দের কিছু অংশ টাকার বিনিময়ে এরকম কিছু লোককে স্থান দিয়েছে। এমন লোকও সংসদ সদস্য হয়েছে যারা শহীদ জিয়া আদর্শ চিন্ত-চেতনা জানেও না বুঝেও না আবার তারা বিএনপিও করেনা।

বিএনপির আজকের এই পরিণতির জন্য দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নেত্রীবৃন্দকে দায়ি করে মুহিব খান বলেন, মূলত দল প্রতিষ্ঠাতার যে চিন্তা চেতনা বা এর প্রতি মায়া-দরদ নাই এরকম নেতাকর্মীতে দলটি ভরে গিয়েছিল। এজন্য বিএনপি যখন বিপদে পড়ল তখনই এসব মানুষেরা দলকে আর সঙ্গ দিচ্ছে না। যদি তারা প্রকৃত অর্থে দল করতো তাহলে আন্দোলন সংগ্রামে মাঠে থাকতো। বিএনপির আজকের এই পরিণতি হওয়ার পিছনে কারণ হলো ওইসব লোকগুলো এবং নেতৃবৃন্দে অসংখ্য ভূল।

তবে তিনি মনে করেন বিএনপি কখনো বিলুপ্ত হবে না। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি বিএনপি হারিয়ে যাওয়া বা বিলুপ্ত হওয়ার মতো কোন দল নয়। কারণ এটি একটি বিশাল বড় দল। তারা ৪০ বছর অতিক্রম করেছে। আওয়ামী লীগের পর সবচেয়ে পুরনো দল যাদের কার্যক্রম তৃণমূল পর্যায়ে রয়েছে। যে দলটির মফস্বল এলাকার কৃষক মজুরসহ সমপর্যায়ের লোকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা রয়েছে। যখনই এই ঝড় থামবে এই অন্ধকার দূর হবে ভূলগুলো সংশোধন হয়ে যাবে, সঠিক ও যোগ্য ত্যাগী নেতৃবৃন্দ তৈরী হবে তখনই দলটি আবার বীরদর্পে দাড়াবে।

মুহিব খান মনে করেন, বিএনপিকে পূণঃপ্রতিষ্ঠিত করতে আরো পথ পরিক্রমা পাড়ি দিতে হবে এবং নেতৃবৃন্দের চিন্তা, ধ্যাণ-ধারণাকে আরো বিস্তৃতি করতে হবে। রাজনৈতিক পরিকল্পনা কর্মসূচি, পড়শী রাষ্ট্র রাজনীতি ও বিশ্ব রাজনীতি এবং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিষয়গুলো বিবেচনায় এগুতে হবে।

বিএনপির জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হিসেবে আধিপত্যবাদী ভারতের বিরোধিতাকে দেখেন মুহিব খান। তিনি বলেন, বিএনপির জনপ্রিয়তা, শক্তি-সামর্থ ও বিপুল জনসমর্থন পাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ভারত বিরোধীতা। এখনও যদি ভারত বাংলাদেশকে যেভাবে আধিপত্যের ভিতরে নিয়ে গেছে তিস্তার পানি না দেয়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, কয়লা, রেমিট্যিান্স এসব নিয়ে যাচ্ছে, এসব কাজগুলোর তালিকা করে এর বিরুদ্ধে মানুষকে জাগিয়ে বলে যে, আমরা এভাবে ভারতে দাসত্ব মেনে নিচ্ছি। তখন দমনপীড়ন হলে দেশের জনগণ ঘরে বসে না থেকে তাদের পক্ষে রাস্তায় নেমে আসবে।

আরেকটি বিষয় হলো, যেহেতু পুরো সীমান্ত জুড়ে প্রতিবেশী হিসেবে ভারতকে পেয়েছে, মিয়ানমারও অল্প কিছুটা পেয়েছে। ভারত আমাদের বৃহত্তম প্রতিবেশী। আর প্রতিবেশী দ্বারা একজন যেভাবে সাহায্য সহযোগিতা লাভ করে ঠিক তেমনি শত্রুতার কারণে ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এই ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার সময় থেকেই একটি ভারত বান্ধব দল। বিএনপি মাঝপথে হঠাৎ করে ভারতের সাথে সমঝোতা করে ক্ষমতায় যাওয়ার যে স্বপ্ন দেখছে তা কখনও সফল হবে না। ভারতও সে সুযোগটা দিবে বলে মনে হয় না, আর তা বিশ্বাস করারও কিছু নাই।