‘দেশে বর্তমানে কোন ফকির-মিসকিন নেই’ বিটিভির বিজ্ঞাপনের তীব্র সমালোচনা

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | সোস্যাল মিডিয়া ডেস্ক 


 

সম্প্রতি বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত একটি সরকারি প্রচারণামূলক বিজ্ঞাপন ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বিজ্ঞাপনটির একটি জায়গায় বলা হয়, বাংলাদেশের বর্তমানে কোন ফকির মিসকিন নেই। বিজ্ঞাপনের শুরুতেই দেখা যায় হামিদ নামে এক ব্যক্তি গ্রামের রাস্তা দিয়ে প্রাণপণে ছুটছেন। এবং তাকে হৈ হৈ করে তাড়া করছেন গ্রামের একদল নারী পুরুষ। সেই গ্রামেরই এক প্রবীণ ব্যক্তি দুই পক্ষের পথরোধ করে এই তাড়া করার কারণ জানতে চান।

এসময় এক নারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, গ্রামের আরেক ব্যক্তি জহির তার প্রয়াত বাবা মায়ের স্মরণে ফকির মিসকিন খাওয়াতে চান। এজন্য তিনি হামিদকে পাঠিয়েছেন তাদেরকে দাওয়াত দিতে। এতে তারা অপমানিত হয়েছেন। “আমরা কি ফকির মিসকিন নাকি? পাল্টা প্রশ্ন ছুড়েন, ওই নারী।

পরে ভিড় থেকে আরেক ব্যক্তি জানান, তারা আগে ফকির মিসকিন থাকলেও এখন আর নেই। এখন তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশ্রয়ণ প্রকল্পের মানুষ। সরকার তাদের ঘর, বিদ্যুৎ সংযোগ, জায়গা জমি, পুকুর দেয়ার পাশাপাশি সন্তানদের লেখাপড়া-সহ উপার্জনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন বলে জানান তারা।

সেখানে একটি সংলাপ ছিল যে, আমরা গরিব হইতে পারি, কিন্তু ফকির মিসকিন না। সবশেষ তারা জানান, এইদেশে ফকির মিসকিন খুঁজতে আহে। বাংলাদেশ আর সেই দেশ নাই। তথ্য মন্ত্রণালয়ের সৌজন্যে বাংলাদেশ টেলিভিশন বিজ্ঞাপনটি প্রচার করে। এটি মূলত সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্প নিয়ে একটি উন্নয়ন মূলক বিজ্ঞাপন। যেখানে বলা হয়েছে যে এই প্রকল্পের মাধ্যমে এরইমধ্যে আড়াই লাখ পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। আরও ১ লাখ পরিবারের পুনর্বাসনের কার্যক্রম চলছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া : বিজ্ঞাপনটির বিষয়বস্তু নিয়ে এরইমধ্যে আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অনেকে ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট করতেও বাদ রাখেননি। বাংলাদেশ টেলিভিশনের নিজস্ব ফেসবুক পেইজে গিয়ে দেখা যায় ভিডিওটি গত বৃহস্পতিবার আপলোড করা হয়েছে। এবং এরইমধ্যে ৫ লক্ষ ৬০ হাজার ৫০০ বার দেখা হয়েছে। শেয়ার হয়েছে ৭ হাজার ৩শত বার। এছাড়াও অনেকে ব্যক্তিগতভাবে এই বিজ্ঞাপনটি নিজেদের অ্যাকাউন্ট থেকেও আপলোড করেছেন। এছাড়া কমেন্ট পড়েছে এক হাজারেরও বেশি। তবে বেশিরভাগ কমেন্টেই এই বিজ্ঞাপনের দাবির সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেন ইউজাররা।

এ ব্যাপারে Duronto Sebok (দূরন্ত সেবক) তার কমেন্টে বলেন, টাইম লাইনে ভিডিওটা শেয়ার ও ডাউনলোড কইরা রাখলাম। আজকে থেকে ফকির আইসা ভিক্ষা চাইলে এই ভিডিও দেখামু। প্রধানমন্ত্রী এত সুযোগ সুবিধা দেওয়ারপর ও যারা ভিক্ষাবৃত্তি করে তাদের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়ার দাবী জানাচ্ছি।

আদিব আহমদ তার কমেন্টে বলেন, সিলেট আম্বরখানা পয়েন্টে এক ফকির হাত পাতলো, কিছু খাইনি, ১০টা টাকা দেন রুটি খামু।বিচারা ফকিরকে এ ভিডিও টি দেখা লাম। বিচারা ফকির যে গালি দিছে। প্রধানমন্ত্রীকে।গালি উল্লেখ করতে পারলাম না। বিটিভি তরা বানাবে ভিডিও আর গালি খাবে প্রধানমন্ত্রী ভালই আরো নতুন নতুন ভিডিও বানা।

আরিফ হোসাইন রুদ্র তার কমেন্টে বলেন, ডাটা স্বল্পতার কারনে ভিডিওটা দেখতে পারলাম না। তবে কমেন্ট পড়ে বুঝতে পারলাম যে, বাংলাদেশে কোনো ফকির মিসকিন নেই! প্রতিদিন কয়েকবার করে যারা এসে বাসার দরজায় টোকা মেরে ভিক্ষা চায় তারা মূলত বন্ধুদেশ ভারতের বাসিন্দা। দিনে ভিক্ষা করে সন্ধ্যায় মেট্রোরেলে করে পদ্মাসেতু পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যায়।
আবার পরদিন আসে। এমনই দেশই আমরা চেয়েছিলাম। জয় বাংলা

মোরশেদ আলম। তিনি জানান, “সাইকেল চালাচ্ছিলাম, ভিডিওটা দেখে খাদে পড়ে গেলাম। উদ্ধারকারীরা আমাকে উদ্ধার করতে এসে ভিডিওটা দেখল। তারাও হাসতে হাসতে খাদে পড়ে গেল।

বিটিভিতে প্রচারিত বিজ্ঞাপনটি নিয়ে নানা ধরণের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন ফেসবুক ইউজাররা।

সাইদুল ইসলাম নীরব লিখেছেন, ভিডিওটা দেখে আমি বেহুশ হয়ে ছিলাম দুই ঘণ্টা। পরে অনেক কষ্টে কাঁপা কাঁপা হাতে একটি হাহা বিয়্যাক্ট দিলাম। এখন আমি আগের চাইতে অনেকটাই সুস্থ বোধ করছি।

আশিকুর রহমান ইমনের লেখা কমেন্টটির বাংলা অর্থ দাঁড়ায়, বাংলাদেশের তথ্য মন্ত্রণালয় বিটিভিকে আবারও নির্ভরযোগ্য করে তুলেছে। অনেকদিন পর আমার মনেহল আমি আবার ছোটবেলার আলিফ লায়লা দেখছি। ধন্যবাদ।

দেশে ফকির মিসকিন নেই এই দাবির পক্ষে দ্বিমত পোষণ করলেও দারিদ্র্য দূরীকরণে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের জন্য শুভকামনা জানাতে দেখা যায় কয়েকজনকে। তাদেরই একজন, মানজুর ই খোদা।তার ইংরেজিতে লেখা কমেন্টটির বাংলা অর্থ দাঁড়ায়, ইনশাল্লাহ খুব শিগগিরই এমন একটা সময় আসবে যেদিন আমাদের দেশ ফকির মিসকিনমুক্ত হবে। তবে দুর্ভাগ্যবশত আমার দেশে এখনও অনেক ফকির রয়েছে। যেকোনো জুম্মার দিন ঢাকার যেকোনো মসজিদের সামনে মানুষ প্রতিদিন এমন অনেককে দেখতে পান। আশা করি সরকার তাদের সবার পুনর্বাসনের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। দারিদ্র দূরীকরণে সরকার যেসব প্রকল্প হাতে নিয়েছেন এজন্য তাদের শুভকামনা। এই কমেন্টের জবাবে এহসানুর রহমান জনগণের দায়বদ্ধতার বিষয়টিও তুলে ধরেন।

তিনি লিখেছেন, আমি আপনার সঙ্গে একমত। বাংলাদেশের বয়স ৪৭ বছর। এখন দেশের মানুষকে সুযোগ সুবিধা দেয়ার সময় এসেছে। স্বাধীনতার পর পর ১৯৮০ সালে সরকারের উচিত ছিল স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতে বেশি বেশি বিনিয়োগ করা। এখন সময় এসেছে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো। হ্যাঁ, এটা আমাদের দেশ, জাতীয় সমস্যাগুলো সমাধানে এবং সরকারকে সাহায্য করতে আমাদের সবার চেষ্টা করতে হবে।

তবে বিজ্ঞাপনটির দাবির পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন হাতে গোনা কয়েকজন। তাদেরই একজন জুলফিকার হাসান পিয়াস। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি কতোটা এগিয়ে গেছে তা অর্থনীতি বোঝেন বা অর্থনীতি বিষয়ে সামান্য জ্ঞান আছে অথবা নিজের পারিপার্শ্বিক অবস্থা চিন্তা থেকে যেকোনো সাধারণ মানুষ উপলব্ধি করতে পারেন। অথচ আমাদের দ্বিধাবিভক্ত সমাজ সেখানেও খুঁজে পেয়েছে হাসির খোরাক। দু:জনক ছাড়া আর কিছুই নয়।

এই বিজ্ঞাপনের প্রচার ও বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানতে বাংলাদেশের টেলিভিশনের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে বিবিস বাংলার সানজানা চৌধুরী যোগাযোগ করা হলেও তারা এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তবে বিটিভির মহাপরিচালক এস এম হারুনুর রশিদ জানিয়েছেন, তার প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র বিজ্ঞাপনটি প্রচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এর পরিকল্পনার বিষয়ে তাদের কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। বিজ্ঞাপনটির বিষয়বস্তু বাস্তবতাকে সমর্থন করে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তর জানতে তথ্য মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হলে এবিষয়ে তারা বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।