চলে গেলেন প্রখ্যাত সুরকার রবিন ঘোষ

93508_182চলে গেলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুরকার-সঙ্গীত পরিচালক ও নায়িকা শবনমের স্বামী রবিন ঘোষ। আজ শনিবার সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে রাজধানীর গুলশানের একটি ক্লিনিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৮২। রবিন ঘোষ নিউমোনিয়াসহ নানান জটিল রোগে ভুগছিলেন বেশ কয়েক দিন ধরে। চার মাস আগে গুরুতর অসুস্থাবস্থায় তাকে ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। সে সময় বেশ কয়েক দিন হাসপাতালে থাকার পর সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেন। কিন্তু দু’তিন দিন আগে শরীর খারাপ হওয়ায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শনিবার সকালে নাস্তা করা শেষে তিনি স্বাভাবিকভাবে মৃত্যু বরণ করেন। রবিন ঘোষের স্ত্রী শবনম বলেন, ‘আগের দিন রাত ১০টায় আমার সাথে শেষ দেখা। তখন পর্যন্ত সবই স্বাভাবিক ছিলো। কিন্তু ঘুম থেকে উঠে ক্লিনিকে যাবার আগেই তিনি চলে গেলেন। শেষ কথা, শেষ দেখা আর হলো না। ভীষণ কষ্ট পেয়েছি।’

শনবনম জানান রবিন ঘোষের ইচ্ছেনুযায়ীই তাকে বিএফডিসিতে নেয়া হচ্ছে না। শনিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত রবিন ঘোষের মৃত দেহ তার গুলশানের বাসাতেই রাখা হয়। এরপর ওয়ারীতে তাকে দাহ করা হয়। রবিন ঘোষের জন্ম ইরাকে। একজন সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে গড়ে উঠার পেছনে প্লে-ব্যাক সিঙ্গার আহমেদ রুশদীর ভূমিকা ছিলো অনন্য। এটা রবিন ঘোষ নিজেও স্বীকার করতেন। রবিন ঘোষ সবচেয়ে বেশি গানের সুর করেছেন পাকিস্তানের চলচ্চিত্রে। যা পাকিস্তানের চলচ্চিত্রে ইতিহাস হয়ে আছে। তবে সেখানে যাবার আগে ঢাকাতেই তিনি একজন সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন। উর্দু এবং বাংলা ভাষার চলচ্চিত্রের গানের সঙ্গীত পরিচালণা করতেন তিনি।

বরেণ্য এই ব্যক্তিত্ব প্রসঙ্গে কিংবদন্তী শিল্পী ফেরদৌসী রহমান বলেন, ‘যখন থেকে এদেশে ছায়াছবির জগত শুরু তখন থেকেই আমরা একসঙ্গে কাজ করছি। রবিন আমাদের বাসায় আসতো, সঙ্গে গীতিকারও আসতেন। তো আমরা একসঙ্গে গানের কাজ করতাম। খুব ভালো সুর আসতো তার মনের ভেতর থেকে। রবিন ঘোষ একজন চমৎকার মেজাজের মানুষ , অত্যন্ত ভদ্র একজন মানুষ ছিলো। পাকিস্তানেতো ইতিহাস সৃষ্টি করে এসেছে সে। সেখানে যথেষ্ট সম্মানও পেয়েছে। কিন্তু এদেশ তাকে কোনই কাজে লাগাতে পারেনি। একজন গুনী , দক্ষ সঙ্গীত পরিচালককে এদেশ যথাযথভাবে সম্মানও জানাতে পারেনি, কাজেও লাগাতে পারেনি। এটা সত্যিই আমার খুব দুঃখ থেকে বলা।’ ফেরদৌসী রহমানের কণ্ঠে ‘আমি রূপনগরের রাজকন্যা রূপের জাদু এনেছি’ গানটিই প্রথম ব্যাপক শ্রোতাপ্রিয়তা পায়। এই গানের অনবদ্য সুর করেছিলেন রবিন ঘোষ। অন্যদিকে শাহনাজ রহমতুল্লাহর কন্ঠে ‘ফুলের কানে ভ্রমর এসে চুপি চুপি বলে যায়’ গানটিও আকাশচুম্বী শ্রোতাপ্রিয়তা পায়। এই গানেরও সুর সৃষ্টি করেছেন রবিন ঘোষ।

শাহনাজ রহমতুল্লাহ বলেন,‘ রবিন ঘোষ ছিলেন একজন কিংবদন্তী, একজন সুরের জাদুকর। তিনি চলে গেছেন, প্রচণ্ড অভিমান নিয়েই চলে গেলেন। আমরা তাকে সম্মান দিতে পারিনি-এ যে কতো কষ্টের , কতো লজ্জার তা বলে বুঝাতে পারবো না। দুঃখ হয় এই যে কেউ তার কোন খোঁজ খবরও নিতো না, কোথাও কোন অনুষ্ঠানে ডাকা হতো না। তাকে সত্যিই আমরা মূল্যায়ণ করতে পারিনি।’

Shabnam-Didid-222_1
শবনমের সাথে রবিন ঘোষ

রবিন ঘোষের সুরে পাকিস্তানের অসংখ্য চলচ্চিত্রে গান গেয়েছেন রুনা লায়লা। তাকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। রুনা লায়লা বলেন, ‘মাত্র কয়েকদিন আগেও শবনম বউদির সঙ্গে কথা হলো। তখনই শুনেছি দাদা অসুস্থ। ভেবেছিলাম দেখতে যাবো। কারণ তার পরিবারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা ছিলো বন্ধুত্বের, পারিবারিক। কিন্তু শেষ দেখাটা আর হলোইনা। এদেশের সঙ্গীত জগত একজন মিউজিক্যাল জিনিয়াসকে হারালো। এই শূণ্যতা কোনভাবেই পূরণ হবার নয়। তার আত্মার শান্তি কামনা করছি।’ ১৯৯৮ সালে দেশে আসার আগ পর্যন্ত রবিন ঘোষ পাকিস্তানের চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। এদেশে আসার পর নীরবে নিভৃতে সময় কাটাতেন রবিন ঘোষ ও তার স্ত্রী নায়িকা শবনম। তাদের একমাত্র সন্তান রনি ঘোষ। প্রয়াত পরিচালক এহতেশামের হাত ধরেই ১৯৬১ সালে ‘রাজধানীর বুকে’ চলচ্চিত্রে প্রথম কাজ করেন। ১৯৬৩ সালে ‘তালাশ’ চলচ্চিত্রের জন্য পাকিস্তানের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা নিগার এ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। এরপর তিনি ‘চাহাত’ ‘আয়না’ ‘আম্বার’ ও ‘দোরিয়ান’ চলচ্চিত্রের জন্য একই সম্মাননা লাভ করেন।
তিন বছর আগে পাকিস্তান টেলিভিশন থেকে রবিন ঘোষ শবনমকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়।