কুরআনের হেদায়েত সবার জন্য | মাওলানা আব্দুল মালেক

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | ইসলাম ডেস্ক


মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক

الحمد لله وسلام على عباده الذين اصطفى وأشهد أن لا إله إلا الله وأشهد أن محمدا عبده ورسوله، أما بعد…

সংক্ষেপে তিনটি কথা আরয করছি।

প্রথম কথা, মসজিদের সাথে আমাদের সম্পর্ক কেবল রমযান কেন্দ্রিক হওয়া উচিত নয়। মসজিদের সাথে আমাদের সম্পর্ক হবে দায়েমী। দুনিয়াতে জান্নাতের নমুনা মসজিদ।

দ্বিতীয় কথা, কুরআন মাজীদের সাথে আমাদের সম্পর্ক যেন হয় দায়েমী। একবার একজনকে দেখেছি, তাঁর ভক্তদেরকে বলছেন, তিলাওয়াত করতে না পারলে কুল হুওয়াল্লাহ দুই শ বার পড়েন। এ কথাটা শুনে আমার বড় কষ্ট লেগেছে। সূরা ইখলাস দু শ বার কেন চার শ বার পড়। এক হাজার বার পড়। কিন্তু এটা পুরো কুরআন শেখার বিকল্প কীভাবে হয়? না পড়তে পারলে শিখেন- এ কথা বলতে হবে। মুসলমানকে কুরআন শিখতে হবে। পড়তে পারতে হবে।

আমরা রমযানে তারাবীতে কুরআন শুনলাম। কুরআন শুধু শোনা- এটা কোনো মুমিনের শান হতে পারে না। মুমিনকে কুরআন শোনানোর যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। এক সূরা, দুই সূরা, এক পারা, দুই পারা এভাবে পরিমাণ বাড়াতে হবে। পুরা কুরআন যেন তিলাওয়াত করতে পারে, দেখে দেখে পুরা কুরআন পড়তে পারে এমন যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। এজন্য আমরা এই রমযান থেকেই মেহনত শুরু করি। প্রয়োজনে আলিফ বা তা ছা থেকে শুরু করি।

কুরআন শেখা ফরয। সহীহ-শুদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত শেখা সবার উপর ফরয। শেখার জন্যে এখন আপনাদের কোনো ওযর নেই যে, আমরা কুরআন শেখার জন্যে কোনো রাস্তা পাইনি। দশ বছর আগের বৌনাকান্দি আর এখনকার বৌনাকান্দিতে কত পার্থক্য! দশ বছর আগের হযরতপুর আর এখনকার হযরতপুরে কত পার্থক্য! পুরা কুরআন সূরা ফাতেহা থেকে নাস পর্যন্ত দেখে দেখে সহীহ-শুদ্ধভাবে পড়তে পারার যোগ্যতা যুবকদের সবাইকে অর্জন করতে হবে। অর্জন করার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। আর বুড়োরা ছোট ছোট সূরা দিয়ে শুরু করবেন। আর বড় বড় সূরা অংশ বিশেষ করে শিখতে হবে। শিখতে শিখতে কবরে যাব। শেখা বন্ধ করে কবরে যাওয়ার চেয়ে শিখতে শিখতে কবরে যাওয়া কি ভালো না?
হযরত হারদুঈর ঘটনা। তাঁর সাথে সম্পর্ক রাখতেন এমন এক জেনারেল শিক্ষিত লোক। হয়ত ডাক্তার হবেন। তিনি নাযেরা শিখেছেন। আগ্রহ হল, পুরা কুরআন হিফয করবেন। তার বুঝ হল, আমি যদি হিফয শেষ করতে নাও পারি, হিফয করতে করতে কবরে যাই…। ঠিক যখন তার এক পারা দুই পারা করে (সম্ভবত) আঠার পারা হিফয হল, তখন আল্লাহ্র পক্ষ থেকে ডাক এসেছে। তিনি কবরে চলে গেছেন। তো এখন আল্লাহ্র পক্ষ থেকে কী আশা করতে পারি। শুরু করা তো আমার সাধ্যের ভেতরে আছে। শেষ করানো আল্লাহ্র কাজ। কুরআন শেখার ক্ষেত্রে এ কথা বড় অন্যায় যে, নামাযে তো কেবল আমার চার সূরা দরকার। আচ্ছা, কুরআন কি শুধু নামাযের জন্য, না যিন্দেগীর জন্য?

তৃতীয় বিষয় হল, বুযুর্গদের একটি উক্তি আছে। বড় চমৎকার। পুরা বাস্তবসম্মত কথা- رب تال للقرآن والقرآن يلعنه অনেক মানুষ আছে এমন যে, সে কুরআন তিলাওয়াত করে আর কুরআন তাকে লানত করে। অর্থাৎ সে নিজেই কুরআনের ভাষায় নিজকে লানত করে চলেছে। কুরআন তিলাওয়াত করতে করতে সে হয়ত পড়ছে فَنَجْعَلْ لَعْنَتَ اللهِ عَلَى الْكَاذِبِينَ মিথ্যাবাদীদের উপর আল্লাহ্র লানত। ও লোক মিথ্যাবাদী। সে তিলাওয়াত করছে অথচ মিথ্যা ছাড়ছে না। সে হয়ত পড়ছে- أَلَا لَعْنَةُ اللهِ عَلَى الظَّالِمِينَ অত্যাচারীদের উপর আল্লাহর লানত অথচ সে নিজেই মানুষের উপর যুলম করে। যেখানেই তার ক্ষমতা থাকে সেখানেই সে যুলুম করে। এভাবে সে নিজেই নিজেকে কুরআনের ভাষায় লানত করে।

তিলাওয়াত শব্দটা বড় তাৎপর্যপূর্ণ। তিলাওয়াত শব্দের মধ্যে এই কথাও আছে যে, যা পড়বে সে অনুসারে চলবে। তালা-ইয়াতলু- পেছনে পেছনে চলা। পড়ব আর যা পড়ছি ওটার পেছনে পেছনে চলব। কুরআনের হেদায়েতগুলো মেনে চলব। তিনটা কথা বলা হল আল্লাহ আমাদেরকে আমল করার তাওফীক দান করুন।

দ্বিতীয় মজলিস

আমরা যদি চিন্তা করি, এই রমযানে আমাদের দেশে কত খতম হয়েছে; তারাবীতে, তাহাজ্জুদে, নফলে; মসজিদের তারাবীতে, ব্যক্তিগত তারাবীতে…। আর যদি সারা বিশ্বের কথা ধরা হয় তাহলে তো বলতে হবে, খতম অনবরত চলতে থাকে। হারামে তারাবী চলছে। আরো পশ্চিমে আরো পরে তারাবী শুরু হবে। চব্বিশ ঘণ্টা সব জায়গায় ঘুরে ঘুরে তারাবী চলতে থাকে।

আমাদেরকে যে কথাটি মনে রাখতে হবে তা হল, তিলাওয়াত কুরআনের একটি হক, একমাত্র হক নয়। তিলাওয়াত অনেক গুরুত্বপূর্ণ হক তবে কুরআনের আরো বড় বড় হক রয়েছে। কুরআনের সব হককে যদি এক কথায় বলতে চাই, তাহলে কুরআনের ভাষায়-

وَ قَالَ الرَّسُوْلُ یٰرَبِّ اِنَّ قَوْمِی اتَّخَذُوْا هٰذَا الْقُرْاٰنَ مَهْجُوْرًا.

আর রাসূল বলবেন, হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় এ কুরআনকে পরিত্যক্ত করে রেখেছিল। -সূরা ফুরকান (২৫) : ৩০

মক্কার মুশরিকরা যখন দাওয়াত কবুল করেনি তখন হয়ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই শেকায়েত করেছেন- সেটা এখানে উদ্ধৃত হয়েছে, অথবা আখেরাতে শেকায়েত করবেন- সে কথা এখানে উদ্ধৃত হয়েছে। কুরআনকে ছেড়ে দেওয়ার অর্থ কী, কীভাবে হয়? যত কিছু কুরআন ছেড়ে দেওয়ার অধীনে আসে তত কিছু হিজরানে কুরআনের আওতায় আসে।

এর বিপরীত হল, কুরআনকে গ্রহণ করা। কুরআনের হক আদায় করা এবং যথাযথভাবে আদায় করা। যদি আমরা কুরআন তিলাওয়াতের হকের কথা বলি তাহলে শুধু তিলাওয়াতই আল্লাহ ফরয করেছেন- তা নয়। حَقّ تِلَاوَتَه… তিলাওয়াতের হক আদায় করে তিলাওয়াত করা জরুরি। তিলাওয়াতের হক আদায় করার জন্য কমপক্ষে তিনটা বিষয় দরকার। ১. তিলাওয়াত বিশুদ্ধ হতে হবে। ২. বুঝে বুঝে তিলাওয়াত করতে হবে। ৩. তিলাওয়াত মোতাবেক আমল করতে হবে। তাহলে এটা হবে হক আদায় করে তিলাওয়াত করা।

হক আদায় করে কুরআন তিলাওয়াত করতে হবে- এ কথার উপর এ আয়াত যে দালালাত করে এটা এ আয়াতের দালালাতুন নস। الدلالة بالطريقة الأولوية। দালালাতুন নস অনেক সময় ইবারাতুন নস থেকে অধিক শক্তিশালী হয়। আবলাগ হয়। কথাটা তালিবুল ইলম ভাইদের জন্য বলে রাখলাম।

এই আমরা তিলাওয়াত শুনলাম, এটা যদি বুঝে শুনে হয়- চাই সেটা নির্ভরযোগ্য কোনো অনুবাদনির্ভর হোক- যদি আমরা খেয়াল করি তাহলে দেখব যে, কুরআনের কত বিধান পরিত্যক্ত হয়ে আছে।

প্রথম ঈমানের বিষয়টা ধরি। যেসব করণীয় সম্পর্কে কুরআন আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছে এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিষয় ঈমান। কুরআনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঈমান সম্পর্কে যত আয়াত আছে আমরা আমাদের সমাজে তালাশ করে দেখি- কোন্ ঈমান আল্লাহ ফরয করেছেন আর সমাজে আছে কী? কত আকীদা কুরআন ফরয করে দিয়েছে আর আমাদের সমাজের বড় অংশ সে আকীদার কাছেধারেও নেই। কুরআনের তালীমগুলোকে ব্যাপকভাবে চর্চা করা দরকার।

هُدىً لِلنَّاسِ কুরআন তো সবার জন্যে হেদায়েত। যাদের দিলে আল্লাহ্র ভয় নেই আখেরাতের ভয় নেই, তারা এখান থেকে হেদায়েত গ্রহণ করে না। এটা তাদের দুর্ভাগ্যের বিষয়। কিন্তু আল্লাহ তো দিয়েছেন সবার জন্যে। হেদায়েত গ্রহণ করে, উপকার গ্রহণ করে কেবল মুত্তাকীরা- هُدًى لِلْمُتَّقِينَ । যদিও শুধু মুত্তাকীদের জন্য দেননি। দিয়েছেন সবার জন্যে।

প্রয়োজন কুরআনে কারীমের সকল হেদায়েতের ব্যাপক চর্চা। বিশেষত ফরযে আইন শ্রেণির হেদায়েতগুলোর তো অত্যাবশ্যকভাবে ব্যাপক চর্চা দরকার। এমনিভাবে যে শ্রেণির মানুষের জন্য যে হেদায়েতগুলো বিশেষভাবে দেওয়া হয়েছে সে শ্রেণির মানুষের মাঝে ওই হেদায়েতগুলো বিশেষভাবে প্রচার-প্রসার করা দরকার।

মুসলিম বিশ্বের যত দেশ আছে সব দেশের সরকারকে, প্রশাসনের লোকদেরকে কুরআন মাজীদ কী কী কথা বলেছে? বিচারকদেরকে কী বলেছে? আইনের লোকদেরকে কী বলেছে?

যত অ্যাডভোকেট আছে সবাইকে কুরআন এক কথা বলে দিয়েছে-

وَ لَا تَكُنْ لِّلْخَآىِٕنِیْنَ خَصِیْمًا.

খেয়ানতকারীদের পক্ষে ওকালতী করতে যেও না। যে হকের উপর আছে তার পক্ষে তুমি সাফাই গাও। তাকে আইনি সহযোগিতা দাও। যে হকের উপর নেই, যে খেয়ানত করছে, তার পক্ষে তুমি দাঁড়াতে পারো না।

তারা কি কুরআন পড়ে না? কুরআনের তরজমা পড়ে না? হয়ত না। হয়ত এমনও লোক থাকবে, যারা কুরআন ধরেও দেখে না। কিন্তু এ সকল বিধান সকলেই জানে।

পুরো মুসলিম বিশ্বে যত আদালত আছে, কোর্ট আছে, বিচারপতি ও বিচারক আছে, সবাইকে কুরআন বলে দিয়েছে-

اَفَحُكْمَ الْجَاهِلِیَّةِ یَبْغُوْنَ وَ مَنْ اَحْسَنُ مِنَ اللهِ حُكْمًا لِّقَوْمٍ یُّوْقِنُوْنَ.

যারা ওহীর ইলম থেকে বঞ্চিত তোমরা কি তাদের বিধান চাচ্ছ? অথচ তোমরা দাবি কর তোমরা মুমিন। তোমরা মুসলিম। তাদের তাহযীব তামাদ্দুন, তাদের আইন ও সংবিধান কীভাবে তোমাদের আইন হয়? এর ভিত্তিতে কীভাবে তোমরা ফায়সালা কর? তুমি যদি মুমিন হয়ে থাক তবে কুরআনের চেয়ে ভালো বিধান তোমাকে কে দিবে? এর চেয়ে বড় আইন কে দেবে? কার কাছে যাচ্ছ? তোমার রব তো আল্লাহ। তোমার খালিক মালিক আল্লাহ। আল্লাহ্র বান্দাদের উপর হুকুমত করবে, আল্লাহ্র বান্দাদের ঝগড়া মিটাবে, মামলা মোকাদ্দমার ফায়সালা করবে, বিচার করবে, সেই বিচারের নীতি তুমি কার থেকে নেবে? তোমার খালিক থেকে নাও। তোমার মালিক থেকে নাও। যিনি মাবুদ তার কাছ থেকে নাও। সবকিছু কুরআনে আছে।

وَ مَنْ لَّمْ یَحْكُمْ بِمَاۤ اَنْزَلَ اللهُ فَاُولٰٓىِٕكَ هُمُ الظّٰلِمُوْن.

আল্লাহ্র নাযিল করা বিধান মোতাবেক তুমি ফায়সালা করছ না, তুমি যালিম না হয়ে আর কী হবে?

তুমি মুমিন। তোমার হেদায়েতের জন্য আল্লাহ কুরআন দান করেছেন, এর মধ্যে সবকিছু আছে। একজন বিচারকের জন্যে যা কিছু দরকার, একজন সরকার প্রধানের যা কিছু দরকার সব হেদায়েত ও নির্দেশনা এবং মূলনীতি দেওয়া আছে। একজন আইনজীবীর যা দরকার হয় আছে। একজন ব্যবসায়ীর যা দরকার হয় আছে। সামাজিক রীতিনীতির জন্য যা দরকার সব আছে। একটা ভালো সমাজের জন্যে যা দরকার সব আছে। যত শ্রেণির মানুষ এবং মানব জাতির যত ধরনের সমস্যা হতে পারে সবকিছুর হেদায়েত এবং সমাধান কুরআনে আছে। আল্লাহ তো তোমাকে ইলমে ওহী দান করেছেন। কুরআন-সুন্নাহর মাধ্যমে এই উম্মতকে আল্লাহ ধনী বানিয়ে দিয়েছেন। তুমি কেন অন্যের দুয়ারে হাত পাতবে?!

কুরআনে কারীম সকল ক্ষমতাধর শাসকগোষ্ঠীকে সম্বোধন করে নমুনা দিয়ে দিয়েছে-

اَلَّذِیْنَ اِنْ مَّكَّنّٰهُمْ فِی الْاَرْضِ اَقَامُوا الصَّلٰوةَ وَ اٰتَوُا الزَّكٰوةَ وَ اَمَرُوْا بِالْمَعْرُوْفِ وَ نَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ وَ لِلّٰهِ عَاقِبَةُ الْاُمُوْرِ.

যাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজের নির্দেশ দেবে ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। আর সকল কাজের পরিণাম আল্লাহ্র এখতিয়ারে। -সূরা হজ¦ (২২) : ৪১

কুরআন তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছে সেই নির্দেশও, যা আল্লাহ তাআলা দাউদ আলাইহিস সালামকে দিয়েছিলেন। তাঁকে আল্লাহ তাআলা নবুওতও দান করেছিলেন এবং বাদশাহীও দান করেছিলেন। বাদশাহী কী এবং কেন তা জানিয়েছেন আল্লাহ তাআলা তাঁকে। এবং সেই হেদায়েত কুরআনে নাযিল করে কিয়ামত পর্যন্ত আনেওয়ালা সকলের জন্য বিধান করে দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে-

يٰدَاوٗدُ اِنَّا جَعَلْنٰكَ خَلِیْفَةً فِی الْاَرْضِ فَاحْكُمْ بَیْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَ لَا تَتَّبِعِ الْهَوٰی فَیُضِلَّكَ عَنْ سَبِیْلِ اللهِ اِنَّ الَّذِیْنَ یَضِلُّوْنَ عَنْ سَبِیْلِ اللهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِیْدٌۢ بِمَا نَسُوْا یَوْمَ الْحِسَابِ.

হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি। অতএব তুমি লোকদের মধ্যে সুবিচার কর এবং খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না, কেননা তা তোমাকে আল্লাহ্র পথ হতে বিচ্যুত করবে। যারা আল্লাহ্র পথ হতে ভ্রষ্ট হয় তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। কারণ তারা বিচারদিবসকে ভুলে আছে। -সূরা ছদ (৩৮) : ২৬

কুরআন খতম তো সবাই করেছে, সব দেশের প্রশাসনের সব লোকেরা করেছে, আদালতের সব লোকেরা করেছে, পার্লামেন্টের সব লোকেরা করেছে। কুরআন কিন্তু সবাইকে সম্বোধন করে করে বলেছে, পথনির্দেশ দিয়েছে, দিয়ে যাচ্ছে। কুরআন বলেছে, সুদ ছাড়ো, ঘুষ ছাড়ো, ধোঁকা ছাড়ো। ভেজাল ছাড়ো। দুর্নীতি ছাড়ো। মাপে কম দিও না। ওয়াদা পুরা করো। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করো না।…

যুবকদেরকে কেমন পাক্কা ঈমানদার হতে হবে সে বর্ণনা আল্লাহ সূরা কাহফে দিয়েছেন-

اِنَّهُمْ فِتْیَةٌ اٰمَنُوْا بِرَبِّهِمْ وَ زِدْنٰهُمْ هُدًی ، وَّ رَبَطْنَا عَلٰی قُلُوْبِهِمْ اِذْ قَامُوْا فَقَالُوْا رَبُّنَا رَبُّ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ لَنْ نَّدْعُوَاۡ مِنْ دُوْنِهٖۤ اِلٰهًا لَّقَدْ قُلْنَاۤ اِذًا شَطَطًا.

তারা ছিল একদল যুবক, যারা নিজ প্রতিপালকের প্রতি ঈমান এনেছিল এবং আমি তাদেরকে হেদায়েতে প্রভূত উৎকর্ষ দান করেছিলাম। আমি তাদের অন্তর সুদৃঢ় করে দিয়েছিলাম। এটা সেই সময়ের কথা যখন তারা (রাজার সামনেই) দাঁড়াল এবং বলল, আমাদের প্রতিপালক তিনিই, যিনি আকাশম-লী ও পৃথিবীর মালিক। আমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকে মাবুদ বলে কখনোই ডাকব না। তাহলে তো আমরা চরম অবাস্তব কথাই বলব। -সূরা কাহ্ফ (১৮) : ১৩-১৪

কোন্ শ্রেণীর মানুষ আছে, যে বলবে, আমার কথা কুরআনে নেই। বাচ্চাদের কথা বলুন, মা-বাবা তাদেরকে কীভাবে লালন পালন করবে সে কথা কুরআনে আছে। মৃত্যু এসে গেছে, কবরে কীভাবে সোপর্দ করবেন, কবরে গিয়ে তার কী হালত হবে। সব এসে গেছে কুরআনে। কুরআন হল যিন্দা কিতাব। কুরআন এমন জিনিস না যে, এটা গিলাফে ভরে তাকে রেখে দিবেন। কুরআন এমন কিতাব নয় যে, শুধু তিলাওয়াত করে ক্ষান্ত থাকবেন।

তিলাওয়াত করার সময় আপনাকে কুরআন বলতে থাকবে। শুধু তিলাওয়াত করে চলে যাবেন এটা হবে না। গাফেল হয়ে কেউ কুরআন তিলাওয়াত করে চলে যাবে এটা হতে পারে না। কুরআন তাকে সজাগ করে দিবে। দিল খুলে, দিলের কান খুলে যে তিলাওয়াত করে, কুরআন তাকে গাফেল থাকতে দেয় না। আল্লাহ তাআলা এজন্যই মুমিনের দায়িত্বে কুরআন তিলাওয়াত জরুরি করে দিয়েছেন। কুরআন তিলাওয়াত ঈমানী দায়িত্ব। এর দ্বারা মুমিনের ঈমান জাগ্রত হয়। ঈমানী তাকাযা জাগ্রত হয়। এই জিনিসটা আমরা খেয়াল করার চেষ্টা করি। যার সাধ্যে যতটুকু আছে, কুরআনের হেদায়েতগুলোকে বাস্তবায়নের চেষ্টা করি।

কুরআনকে আমরা যিন্দা কিতাব হিসাবে গ্রহণ করি। শুধু তিলাওয়াত করে খতম করব। এটা অনেক বড় সওয়াবের বিষয়। কিন্তু হক আদায় করে তিলাওয়াত শুধু খতম করা আর সওয়াব হাসিল করার নাম নয়। সবাই সবার সাধ্যের ভেতরে কুরআনের হেদায়েতগুলোকে বাস্তবায়নের চেষ্টা করি। …وَ عِبَادُ الرَّحْمٰنِ এ আয়াতে আল্লাহ তার বান্দাদের গুণাবলী বলে দিয়েছেন। قَدْ اَفْلَحَ الْمُؤْمِنُوْنَ এখানে আল্লাহ মুমিন বান্দাদের গুণাবলি বলে দিয়েছেন। উলুল আলবাব- কারা কুরআনে বলে দেওয়া হয়েছে। মুত্তাকী কারা- বলে দেওয়া হয়েছে।

গতকাল সূরা মাআরিজে তিলাওয়াত হল, মুসল্লি কেমন হবে। মুসল্লি এমন হবে, মুসল্লির সিফাত এই হবে। মুসল্লির মধ্যে চারিত্রিক পবিত্রতা থাকতে হবে। মুসল্লিদের গুণাবলি ওখানে বর্ণনা করা হয়েছে। মুসল্লিদের সম্পদে, যা আল্লাহ্র দেয়া, তাতে বঞ্চিতদের হক থাকে। কুরআনে বর্ণিত এ সকল সিফাত খুঁজে খুঁজে নিজের মধ্যে আনার চেষ্টা করি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ভরপুর তাওফীক নসীব করেন।

আমর বিল মারুফ নাহি আনিল মুনকার ও জিহাদের কত আয়াত কুরআন মাজীদে আছে। এসব আজ অবহেলিত। ইসলামী খেলাফত নেই। এ কথা আমরা বলি। এখন সরকারও বলে- দেশে ইসলামী খেলাফত নেই। ইসলামী হুকুমত নেই। ইসলামী হুকুমত না থাকার কারণে খেলাফত বিষয়ক যত ইসলামী বিধান আছে সব মাফ!! নাউযু বিল্লাহ!

ইসলামী হুকুমত কীভাবে হবে? ইসলামী হুকুমত কি আসমান থেকে নাযিল হয়, যেমন ঈসা আ.-এর উম্মতের জন্যে আসমান থেকে তৈরি খাবার এসেছে? যাকে আল্লাহ ক্ষমতা দিয়েছেন সে যদি তার হুকুমতকে ইসলামী তরীকায় পরিচালনা করে তাহলে ইসলামী হুকুমত আসে। সে আমর বিল মারুফ নাহি আনিল মুনকারের চূড়ান্ত বিভাগ খুলবে। সে জিহাদের বিধান বাস্তবায়ন করবে। হুদূদ (ইসলামী দ-বিধি) বাস্তবায়ন করবে। তার অফিস আদালত সবকিছু কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক হবে। তাহলে ইসলামী হুকুমত অস্তিত্ব লাভ করবে। মুসলিম দেশের সরকার যদি বলে, আমাদের দেশে ইসলামী হুকুমত নেই। এজন্য এ সকল বিধান প্রযোজ্য না- এর চেয়ে হাস্যকর কথা আর কী আছে!

সকল মুসলিম দেশের প্রশাসনকে ডেকে ডেকে কুরআন বলে, তোমরা আমর বিল মারুফের কাজ কর। নাহি আনিল মুনকারের কাজ কর। ইবাদত নিজে কর। ইবাদতের পরিবেশ কায়েম কর। সালাত কায়েম কর। যাকাত আদায়ের ব্যবস্থা কর। নিজে যাকাত দাও। তোমার অধীনস্থরা যাকাত দিচ্ছে কি না সেটা তদারকি কর। শরীয়ত যে সকল হদ নির্ধারণ করে দিয়েছে সে হদগুলো কায়েম কর। চুরির কী শাস্তি? ফাহেশার কী শাস্তি? মদ্যপানের কী শাস্তি? কোন্টার কী শাস্তি সেটা বাস্তবায়ন কর। নিজের থেকে পণ্ডিতি করো না। শরীয়ত যেটা নির্ধারণ করে দিয়েছে সেটা বাস্তবায়ন কর। সেটা বাস্তবায়ন করবে, সুফল পাবে। নিজের থেকে পণ্ডিতি করলে একে তো শরীয়তের বিধান লংঘন হবে, শরীয়তের বিপরীতে আরেক আইন দাঁড় করানোর মত কুফরী কাজ হবে, অপর দিকে ফায়দা কিচ্ছু হবে না। ক্ষতি আর ক্ষতি হবে।

মাদরাসার মধ্যে কুরআনের পরিবেশ, ঘরের মধ্যে কুরআনের পরিবেশ- এটা যে আল্লাহ্র কত বড় নিআমত- এটা বুঝতে পারে সে, যার পুরো ঘর এক দিকে আর সে কুরআন শিখেছে, কুরআনী যিন্দেগী, ঈমানী যিন্দেগী বোঝা শুরু করেছে এবং সেটা একটু বাস্তবায়ন করতে চায়। কিন্তু পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের জন্য পারে না। তখন বোঝা যায় পরিবেশটা কুরআনী হওয়া, পুরো পরিবারটা কুরআনী হওয়া কত বড় নিআমত।

একটা ঘরে পর্দার পরিবেশ নেই। হঠাৎ একজন পর্দার বিধান জেনেছেন। আল্লাহ তার ঈমানী শক্তি জাগ্রত করে দিয়েছেন। মনে করুন, তিনি তার মায়ের কাছে বসা। এমন সময় তার কাছে আসতে চায় তার ভাবি বা এমনও হতে পারে, আপনার ভাবি ওখানে আর আপনি কোনো দরকারে ওখানে যেতে চান। তখন তাকে সরে যেতে হবে বা আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে। এটা অনেক বড় একটা বাধা। কিন্তু যদি আপনিও পর্দার বিধান মানেন সেও পর্দার বিধান মানে তাহলে বিষয়টা সহজ। আপনার ভেতর যদি পর্দার বিধানের গুরুত্ব থাকে, আপনি যদি দ্বীন-ঈমান শিখে থাকেন তাহলে এই বাধার উপর আপনি খুশিই হবেন।

আমি আমার ভাতিজাদের ঘটনা শুনিয়েছি। যখন রিয়াদ থেকে এসেছি, তারা একেবারে ছোট। আমি ঘরে ঢুকেছি। গ্রাম দেশে একটা ঘরের দুইটা পাশ থাকে। একটাকে বলে আতীনা। সামনের অংশ আর ভেতরের অংশ। আমি সামনের অংশ থেকে ভেতরের অংশে গিয়েছি। এখন বের হব। বাইরে উঠান। উঠান আবার দুই ধরনের, ভেতরের উঠান, বাইরের উঠান। আমি ভেতরের উঠানে যাব, আম্মার সাথে দেখা করার জন্য। যাওয়ার আগে আমি আওয়াজ দিব। কিন্তু আমি আওয়াজ দেওয়ার আগেই ভাতিজারা আমার ভাব দেখে বুঝতে পেরেছে আমি ওইদিকে যাব। তখন দুজনই দুই হাত বাড়িয়ে দিয়ে আমাকে নিষেধ করছে, এদিকে আসবেন না, আসবেন না; আম্মা ওখানে আছেন। কে তাদেরকে এটা শিখিয়েছে? এটা শিখিয়েছে তাদের পরিবেশ।

আমাকে বাধা দিয়েছে এতে আমি খুশি। আমাকে যদি এক ঘণ্টা বা দুই ঘণ্টাও দেরি করতে হয়, তাও আমি খুশি। কিন্তু যদি কারো কাছে এই বিধানের গুরুত্ব না থাকে তাহলে সে এক-দুই ঘণ্টা তো দূরের কথা বাধা দেওয়ার উপরেই নারাজ হয়ে যাবে। মাদরাসার তালিবুল ইলম যারা, তাদের পুরা পরিবারটাই যদি এমন মাদরাসী হয় তাহলে এক অবস্থা। আর যদি এমন হয়, পরিবারের মধ্যে সে একজনই মাদরাসায় পড়ছে তাহলে দেখুন কী দুর্দশা! ভাবীরা নারাজ। কারণ, তার সামনে এসে পড়লে সে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। সে হয়ত মায়ের কাছে বসা। হঠাৎ ভাবী না জানিয়ে সামনে এসে পড়লেন। তখন সে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকল এবং উঠে চলে গেল। এতে উনারা নারায। কারণ, পর্দার বিধানের গুরুত্ব এখনো তাদের অন্তরে বসেনি।

এখন তো অনেকে পর্দার বিধানকেই ভাগ করে ফেলেছে। খাস পর্দা আর আম পর্দা। শরীয়তে দুই ধরনের পর্দা নাই। শরীয়তে আছে পর্দার বিধান। কেউ পুরা মানে আর কেউ কিছুটা মানে। ঘরে পর্দা আছে, খাস পর্দা নাই- এর মানে হল, পর্দা নেই। এজন্য খালা শাশুড়ি, মামী শাশুড়ি কত ধরনের শাশুড়ি যে আছে। এই সব শাশুড়িরা পর্দার বিধানের আওতায়। এসব শাশুড়ির সাথে পর্দা করতে হবে। আসল শাশুড়ি তো হলেন আপনার স্ত্রীর মা। হাঁ, আপনি অন্যদের খোঁজ-খবর নেন ভায়া হয়ে। আপনার স্ত্রীর মাধ্যমে। সরাসরি তাদের সাথে কথাও বলতে যাবেন না। দেখা দেওয়া তো দূরের কথা। এ সমস্ত কথা কে মানে? এগুলো তিক্ত কথা। কঠিন কথা। এগুলোর পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এমন পবিত্র পরিবেশই কুরআনী পরিবেশ।

ঘরকে কবরস্তান বানাবেন না। কবরস্তানে কেউ কুরআন পড়ে না। ঘরকে কুরআনের আলোয় আলোকিত করুন। রেডিও ছেড়ে, মোবাইল ছেড়ে কুরআন তিলাওয়াত দিয়ে দিন শুরু করেছেন। সূরা ইয়াসীনের তিলাওয়াত শোনার মধ্য দিয়ে দিন শুরু করেছেন। ভালো কথা, কিন্তু এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবেন না। সূরা ইয়াসীনের অর্থের প্রতি খেয়াল করুন। সূরা ইয়াসীনকে বলা হয়েছে কলবুল কুরআন। এ সূরায় পুরো কুরআনের হেদায়েতের সারসংক্ষেপ চলে এসেছে। অর্থ বুঝে বুঝে সূরা ইয়াসীন শুনুন এবং সে মোতাবেক আপনার দিনটা পরিচালিত করুন। আপনার ঘরটা, দোকানটা পরিচালিত করুন। তাহলে সূরা ইয়াসীন শোনা সার্থক। এক ধাপ আরো অগ্রসর হোন, সূরা ইয়াসীনের তিলাওয়াত শিখুন; নিজে তিলাওয়াত করুন। আরও সূরা শিখুন। পূর্ণ কুরআনের সহীহ তিলাওয়াত শিখুন, তিলাওয়াত করুন এবং কুরআনের ইলম ও আমল গ্রহণ করুন। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাওফীক নসীব করুন- আমীন। কুরআনের হেদায়েত সবার জন্য
মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক

الحمد لله وسلام على عباده الذين اصطفى وأشهد أن لا إله إلا الله وأشهد أن محمدا عبده ورسوله، أما بعد…

সংক্ষেপে তিনটি কথা আরয করছি।

প্রথম কথা, মসজিদের সাথে আমাদের সম্পর্ক কেবল রমযান কেন্দ্রিক হওয়া উচিত নয়। মসজিদের সাথে আমাদের সম্পর্ক হবে দায়েমী। দুনিয়াতে জান্নাতের নমুনা মসজিদ।

দ্বিতীয় কথা, কুরআন মাজীদের সাথে আমাদের সম্পর্ক যেন হয় দায়েমী। একবার একজনকে দেখেছি, তাঁর ভক্তদেরকে বলছেন, তিলাওয়াত করতে না পারলে কুল হুওয়াল্লাহ দুই শ বার পড়েন। এ কথাটা শুনে আমার বড় কষ্ট লেগেছে। সূরা ইখলাস দু শ বার কেন চার শ বার পড়। এক হাজার বার পড়। কিন্তু এটা পুরো কুরআন শেখার বিকল্প কীভাবে হয়? না পড়তে পারলে শিখেন- এ কথা বলতে হবে। মুসলমানকে কুরআন শিখতে হবে। পড়তে পারতে হবে।

আমরা রমযানে তারাবীতে কুরআন শুনলাম। কুরআন শুধু শোনা- এটা কোনো মুমিনের শান হতে পারে না। মুমিনকে কুরআন শোনানোর যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। এক সূরা, দুই সূরা, এক পারা, দুই পারা এভাবে পরিমাণ বাড়াতে হবে। পুরা কুরআন যেন তিলাওয়াত করতে পারে, দেখে দেখে পুরা কুরআন পড়তে পারে এমন যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। এজন্য আমরা এই রমযান থেকেই মেহনত শুরু করি। প্রয়োজনে আলিফ বা তা ছা থেকে শুরু করি।

কুরআন শেখা ফরয। সহীহ-শুদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত শেখা সবার উপর ফরয। শেখার জন্যে এখন আপনাদের কোনো ওযর নেই যে, আমরা কুরআন শেখার জন্যে কোনো রাস্তা পাইনি। দশ বছর আগের বৌনাকান্দি আর এখনকার বৌনাকান্দিতে কত পার্থক্য! দশ বছর আগের হযরতপুর আর এখনকার হযরতপুরে কত পার্থক্য! পুরা কুরআন সূরা ফাতেহা থেকে নাস পর্যন্ত দেখে দেখে সহীহ-শুদ্ধভাবে পড়তে পারার যোগ্যতা যুবকদের সবাইকে অর্জন করতে হবে। অর্জন করার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। আর বুড়োরা ছোট ছোট সূরা দিয়ে শুরু করবেন। আর বড় বড় সূরা অংশ বিশেষ করে শিখতে হবে। শিখতে শিখতে কবরে যাব। শেখা বন্ধ করে কবরে যাওয়ার চেয়ে শিখতে শিখতে কবরে যাওয়া কি ভালো না?

হযরত হারদুঈর ঘটনা। তাঁর সাথে সম্পর্ক রাখতেন এমন এক জেনারেল শিক্ষিত লোক। হয়ত ডাক্তার হবেন। তিনি নাযেরা শিখেছেন। আগ্রহ হল, পুরা কুরআন হিফয করবেন। তার বুঝ হল, আমি যদি হিফয শেষ করতে নাও পারি, হিফয করতে করতে কবরে যাই…। ঠিক যখন তার এক পারা দুই পারা করে (সম্ভবত) আঠার পারা হিফয হল, তখন আল্লাহ্র পক্ষ থেকে ডাক এসেছে। তিনি কবরে চলে গেছেন। তো এখন আল্লাহ্র পক্ষ থেকে কী আশা করতে পারি। শুরু করা তো আমার সাধ্যের ভেতরে আছে। শেষ করানো আল্লাহ্র কাজ। কুরআন শেখার ক্ষেত্রে এ কথা বড় অন্যায় যে, নামাযে তো কেবল আমার চার সূরা দরকার। আচ্ছা, কুরআন কি শুধু নামাযের জন্য, না যিন্দেগীর জন্য?

তৃতীয় বিষয় হল, বুযুর্গদের একটি উক্তি আছে। বড় চমৎকার। পুরা বাস্তবসম্মত কথা- رب تال للقرآن والقرآن يلعنه অনেক মানুষ আছে এমন যে, সে কুরআন তিলাওয়াত করে আর কুরআন তাকে লানত করে। অর্থাৎ সে নিজেই কুরআনের ভাষায় নিজকে লানত করে চলেছে। কুরআন তিলাওয়াত করতে করতে সে হয়ত পড়ছে فَنَجْعَلْ لَعْنَتَ اللهِ عَلَى الْكَاذِبِينَ মিথ্যাবাদীদের উপর আল্লাহ্র লানত। ও লোক মিথ্যাবাদী। সে তিলাওয়াত করছে অথচ মিথ্যা ছাড়ছে না। সে হয়ত পড়ছে- أَلَا لَعْنَةُ اللهِ عَلَى الظَّالِمِينَ অত্যাচারীদের উপর আল্লাহর লানত অথচ সে নিজেই মানুষের উপর যুলম করে। যেখানেই তার ক্ষমতা থাকে সেখানেই সে যুলুম করে। এভাবে সে নিজেই নিজেকে কুরআনের ভাষায় লানত করে।

তিলাওয়াত শব্দটা বড় তাৎপর্যপূর্ণ। তিলাওয়াত শব্দের মধ্যে এই কথাও আছে যে, যা পড়বে সে অনুসারে চলবে। তালা-ইয়াতলু- পেছনে পেছনে চলা। পড়ব আর যা পড়ছি ওটার পেছনে পেছনে চলব। কুরআনের হেদায়েতগুলো মেনে চলব। তিনটা কথা বলা হল আল্লাহ আমাদেরকে আমল করার তাওফীক দান করুন।

দ্বিতীয় মজলিস

আমরা যদি চিন্তা করি, এই রমযানে আমাদের দেশে কত খতম হয়েছে; তারাবীতে, তাহাজ্জুদে, নফলে; মসজিদের তারাবীতে, ব্যক্তিগত তারাবীতে…। আর যদি সারা বিশ্বের কথা ধরা হয় তাহলে তো বলতে হবে, খতম অনবরত চলতে থাকে। হারামে তারাবী চলছে। আরো পশ্চিমে আরো পরে তারাবী শুরু হবে। চব্বিশ ঘণ্টা সব জায়গায় ঘুরে ঘুরে তারাবী চলতে থাকে।

আমাদেরকে যে কথাটি মনে রাখতে হবে তা হল, তিলাওয়াত কুরআনের একটি হক, একমাত্র হক নয়। তিলাওয়াত অনেক গুরুত্বপূর্ণ হক তবে কুরআনের আরো বড় বড় হক রয়েছে। কুরআনের সব হককে যদি এক কথায় বলতে চাই, তাহলে কুরআনের ভাষায়-

وَ قَالَ الرَّسُوْلُ یٰرَبِّ اِنَّ قَوْمِی اتَّخَذُوْا هٰذَا الْقُرْاٰنَ مَهْجُوْرًا.

আর রাসূল বলবেন, হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় এ কুরআনকে পরিত্যক্ত করে রেখেছিল। -সূরা ফুরকান (২৫) : ৩০

মক্কার মুশরিকরা যখন দাওয়াত কবুল করেনি তখন হয়ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই শেকায়েত করেছেন- সেটা এখানে উদ্ধৃত হয়েছে, অথবা আখেরাতে শেকায়েত করবেন- সে কথা এখানে উদ্ধৃত হয়েছে। কুরআনকে ছেড়ে দেওয়ার অর্থ কী, কীভাবে হয়? যত কিছু কুরআন ছেড়ে দেওয়ার অধীনে আসে তত কিছু হিজরানে কুরআনের আওতায় আসে।

এর বিপরীত হল, কুরআনকে গ্রহণ করা। কুরআনের হক আদায় করা এবং যথাযথভাবে আদায় করা। যদি আমরা কুরআন তিলাওয়াতের হকের কথা বলি তাহলে শুধু তিলাওয়াতই আল্লাহ ফরয করেছেন- তা নয়। حَقّ تِلَاوَتَه… তিলাওয়াতের হক আদায় করে তিলাওয়াত করা জরুরি। তিলাওয়াতের হক আদায় করার জন্য কমপক্ষে তিনটা বিষয় দরকার। ১. তিলাওয়াত বিশুদ্ধ হতে হবে। ২. বুঝে বুঝে তিলাওয়াত করতে হবে। ৩. তিলাওয়াত মোতাবেক আমল করতে হবে। তাহলে এটা হবে হক আদায় করে তিলাওয়াত করা।

হক আদায় করে কুরআন তিলাওয়াত করতে হবে- এ কথার উপর এ আয়াত যে দালালাত করে এটা এ আয়াতের দালালাতুন নস। الدلالة بالطريقة الأولوية। দালালাতুন নস অনেক সময় ইবারাতুন নস থেকে অধিক শক্তিশালী হয়। আবলাগ হয়। কথাটা তালিবুল ইলম ভাইদের জন্য বলে রাখলাম।

এই আমরা তিলাওয়াত শুনলাম, এটা যদি বুঝে শুনে হয়- চাই সেটা নির্ভরযোগ্য কোনো অনুবাদনির্ভর হোক- যদি আমরা খেয়াল করি তাহলে দেখব যে, কুরআনের কত বিধান পরিত্যক্ত হয়ে আছে।

প্রথম ঈমানের বিষয়টা ধরি। যেসব করণীয় সম্পর্কে কুরআন আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছে এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিষয় ঈমান। কুরআনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঈমান সম্পর্কে যত আয়াত আছে আমরা আমাদের সমাজে তালাশ করে দেখি- কোন্ ঈমান আল্লাহ ফরয করেছেন আর সমাজে আছে কী? কত আকীদা কুরআন ফরয করে দিয়েছে আর আমাদের সমাজের বড় অংশ সে আকীদার কাছেধারেও নেই। কুরআনের তালীমগুলোকে ব্যাপকভাবে চর্চা করা দরকার।

هُدىً لِلنَّاسِ কুরআন তো সবার জন্যে হেদায়েত। যাদের দিলে আল্লাহ্র ভয় নেই আখেরাতের ভয় নেই, তারা এখান থেকে হেদায়েত গ্রহণ করে না। এটা তাদের দুর্ভাগ্যের বিষয়। কিন্তু আল্লাহ তো দিয়েছেন সবার জন্যে। হেদায়েত গ্রহণ করে, উপকার গ্রহণ করে কেবল মুত্তাকীরা- هُدًى لِلْمُتَّقِينَ । যদিও শুধু মুত্তাকীদের জন্য দেননি। দিয়েছেন সবার জন্যে।

প্রয়োজন কুরআনে কারীমের সকল হেদায়েতের ব্যাপক চর্চা। বিশেষত ফরযে আইন শ্রেণির হেদায়েতগুলোর তো অত্যাবশ্যকভাবে ব্যাপক চর্চা দরকার। এমনিভাবে যে শ্রেণির মানুষের জন্য যে হেদায়েতগুলো বিশেষভাবে দেওয়া হয়েছে সে শ্রেণির মানুষের মাঝে ওই হেদায়েতগুলো বিশেষভাবে প্রচার-প্রসার করা দরকার।

মুসলিম বিশ্বের যত দেশ আছে সব দেশের সরকারকে, প্রশাসনের লোকদেরকে কুরআন মাজীদ কী কী কথা বলেছে? বিচারকদেরকে কী বলেছে? আইনের লোকদেরকে কী বলেছে?

যত অ্যাডভোকেট আছে সবাইকে কুরআন এক কথা বলে দিয়েছে-

وَ لَا تَكُنْ لِّلْخَآىِٕنِیْنَ خَصِیْمًا.

খেয়ানতকারীদের পক্ষে ওকালতী করতে যেও না। যে হকের উপর আছে তার পক্ষে তুমি সাফাই গাও। তাকে আইনি সহযোগিতা দাও। যে হকের উপর নেই, যে খেয়ানত করছে, তার পক্ষে তুমি দাঁড়াতে পারো না।

তারা কি কুরআন পড়ে না? কুরআনের তরজমা পড়ে না? হয়ত না। হয়ত এমনও লোক থাকবে, যারা কুরআন ধরেও দেখে না। কিন্তু এ সকল বিধান সকলেই জানে।

পুরো মুসলিম বিশ্বে যত আদালত আছে, কোর্ট আছে, বিচারপতি ও বিচারক আছে, সবাইকে কুরআন বলে দিয়েছে-

اَفَحُكْمَ الْجَاهِلِیَّةِ یَبْغُوْنَ وَ مَنْ اَحْسَنُ مِنَ اللهِ حُكْمًا لِّقَوْمٍ یُّوْقِنُوْنَ.

যারা ওহীর ইলম থেকে বঞ্চিত তোমরা কি তাদের বিধান চাচ্ছ? অথচ তোমরা দাবি কর তোমরা মুমিন। তোমরা মুসলিম। তাদের তাহযীব তামাদ্দুন, তাদের আইন ও সংবিধান কীভাবে তোমাদের আইন হয়? এর ভিত্তিতে কীভাবে তোমরা ফায়সালা কর? তুমি যদি মুমিন হয়ে থাক তবে কুরআনের চেয়ে ভালো বিধান তোমাকে কে দিবে? এর চেয়ে বড় আইন কে দেবে? কার কাছে যাচ্ছ? তোমার রব তো আল্লাহ। তোমার খালিক মালিক আল্লাহ। আল্লাহ্র বান্দাদের উপর হুকুমত করবে, আল্লাহ্র বান্দাদের ঝগড়া মিটাবে, মামলা মোকাদ্দমার ফায়সালা করবে, বিচার করবে, সেই বিচারের নীতি তুমি কার থেকে নেবে? তোমার খালিক থেকে নাও। তোমার মালিক থেকে নাও। যিনি মাবুদ তার কাছ থেকে নাও। সবকিছু কুরআনে আছে।

وَ مَنْ لَّمْ یَحْكُمْ بِمَاۤ اَنْزَلَ اللهُ فَاُولٰٓىِٕكَ هُمُ الظّٰلِمُوْن.

আল্লাহ্র নাযিল করা বিধান মোতাবেক তুমি ফায়সালা করছ না, তুমি যালিম না হয়ে আর কী হবে?

তুমি মুমিন। তোমার হেদায়েতের জন্য আল্লাহ কুরআন দান করেছেন, এর মধ্যে সবকিছু আছে। একজন বিচারকের জন্যে যা কিছু দরকার, একজন সরকার প্রধানের যা কিছু দরকার সব হেদায়েত ও নির্দেশনা এবং মূলনীতি দেওয়া আছে। একজন আইনজীবীর যা দরকার হয় আছে। একজন ব্যবসায়ীর যা দরকার হয় আছে। সামাজিক রীতিনীতির জন্য যা দরকার সব আছে। একটা ভালো সমাজের জন্যে যা দরকার সব আছে। যত শ্রেণির মানুষ এবং মানব জাতির যত ধরনের সমস্যা হতে পারে সবকিছুর হেদায়েত এবং সমাধান কুরআনে আছে। আল্লাহ তো তোমাকে ইলমে ওহী দান করেছেন। কুরআন-সুন্নাহর মাধ্যমে এই উম্মতকে আল্লাহ ধনী বানিয়ে দিয়েছেন। তুমি কেন অন্যের দুয়ারে হাত পাতবে?!

কুরআনে কারীম সকল ক্ষমতাধর শাসকগোষ্ঠীকে সম্বোধন করে নমুনা দিয়ে দিয়েছে-

اَلَّذِیْنَ اِنْ مَّكَّنّٰهُمْ فِی الْاَرْضِ اَقَامُوا الصَّلٰوةَ وَ اٰتَوُا الزَّكٰوةَ وَ اَمَرُوْا بِالْمَعْرُوْفِ وَ نَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ وَ لِلّٰهِ عَاقِبَةُ الْاُمُوْرِ.

যাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজের নির্দেশ দেবে ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। আর সকল কাজের পরিণাম আল্লাহ্র এখতিয়ারে। -সূরা হজ¦ (২২) : ৪১

কুরআন তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছে সেই নির্দেশও, যা আল্লাহ তাআলা দাউদ আলাইহিস সালামকে দিয়েছিলেন। তাঁকে আল্লাহ তাআলা নবুওতও দান করেছিলেন এবং বাদশাহীও দান করেছিলেন। বাদশাহী কী এবং কেন তা জানিয়েছেন আল্লাহ তাআলা তাঁকে। এবং সেই হেদায়েত কুরআনে নাযিল করে কিয়ামত পর্যন্ত আনেওয়ালা সকলের জন্য বিধান করে দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে-

يٰدَاوٗدُ اِنَّا جَعَلْنٰكَ خَلِیْفَةً فِی الْاَرْضِ فَاحْكُمْ بَیْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَ لَا تَتَّبِعِ الْهَوٰی فَیُضِلَّكَ عَنْ سَبِیْلِ اللهِ اِنَّ الَّذِیْنَ یَضِلُّوْنَ عَنْ سَبِیْلِ اللهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِیْدٌۢ بِمَا نَسُوْا یَوْمَ الْحِسَابِ.

হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি। অতএব তুমি লোকদের মধ্যে সুবিচার কর এবং খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না, কেননা তা তোমাকে আল্লাহ্র পথ হতে বিচ্যুত করবে। যারা আল্লাহ্র পথ হতে ভ্রষ্ট হয় তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। কারণ তারা বিচারদিবসকে ভুলে আছে। -সূরা ছদ (৩৮) : ২৬

কুরআন খতম তো সবাই করেছে, সব দেশের প্রশাসনের সব লোকেরা করেছে, আদালতের সব লোকেরা করেছে, পার্লামেন্টের সব লোকেরা করেছে। কুরআন কিন্তু সবাইকে সম্বোধন করে করে বলেছে, পথনির্দেশ দিয়েছে, দিয়ে যাচ্ছে। কুরআন বলেছে, সুদ ছাড়ো, ঘুষ ছাড়ো, ধোঁকা ছাড়ো। ভেজাল ছাড়ো। দুর্নীতি ছাড়ো। মাপে কম দিও না। ওয়াদা পুরা করো। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করো না।…

যুবকদেরকে কেমন পাক্কা ঈমানদার হতে হবে সে বর্ণনা আল্লাহ সূরা কাহফে দিয়েছেন-

اِنَّهُمْ فِتْیَةٌ اٰمَنُوْا بِرَبِّهِمْ وَ زِدْنٰهُمْ هُدًی ، وَّ رَبَطْنَا عَلٰی قُلُوْبِهِمْ اِذْ قَامُوْا فَقَالُوْا رَبُّنَا رَبُّ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ لَنْ نَّدْعُوَاۡ مِنْ دُوْنِهٖۤ اِلٰهًا لَّقَدْ قُلْنَاۤ اِذًا شَطَطًا.

তারা ছিল একদল যুবক, যারা নিজ প্রতিপালকের প্রতি ঈমান এনেছিল এবং আমি তাদেরকে হেদায়েতে প্রভূত উৎকর্ষ দান করেছিলাম। আমি তাদের অন্তর সুদৃঢ় করে দিয়েছিলাম। এটা সেই সময়ের কথা যখন তারা (রাজার সামনেই) দাঁড়াল এবং বলল, আমাদের প্রতিপালক তিনিই, যিনি আকাশম-লী ও পৃথিবীর মালিক। আমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকে মাবুদ বলে কখনোই ডাকব না। তাহলে তো আমরা চরম অবাস্তব কথাই বলব। -সূরা কাহ্ফ (১৮) : ১৩-১৪

কোন্ শ্রেণীর মানুষ আছে, যে বলবে, আমার কথা কুরআনে নেই। বাচ্চাদের কথা বলুন, মা-বাবা তাদেরকে কীভাবে লালন পালন করবে সে কথা কুরআনে আছে। মৃত্যু এসে গেছে, কবরে কীভাবে সোপর্দ করবেন, কবরে গিয়ে তার কী হালত হবে। সব এসে গেছে কুরআনে। কুরআন হল যিন্দা কিতাব। কুরআন এমন জিনিস না যে, এটা গিলাফে ভরে তাকে রেখে দিবেন। কুরআন এমন কিতাব নয় যে, শুধু তিলাওয়াত করে ক্ষান্ত থাকবেন।

তিলাওয়াত করার সময় আপনাকে কুরআন বলতে থাকবে। শুধু তিলাওয়াত করে চলে যাবেন এটা হবে না। গাফেল হয়ে কেউ কুরআন তিলাওয়াত করে চলে যাবে এটা হতে পারে না। কুরআন তাকে সজাগ করে দিবে। দিল খুলে, দিলের কান খুলে যে তিলাওয়াত করে, কুরআন তাকে গাফেল থাকতে দেয় না। আল্লাহ তাআলা এজন্যই মুমিনের দায়িত্বে কুরআন তিলাওয়াত জরুরি করে দিয়েছেন। কুরআন তিলাওয়াত ঈমানী দায়িত্ব। এর দ্বারা মুমিনের ঈমান জাগ্রত হয়। ঈমানী তাকাযা জাগ্রত হয়। এই জিনিসটা আমরা খেয়াল করার চেষ্টা করি। যার সাধ্যে যতটুকু আছে, কুরআনের হেদায়েতগুলোকে বাস্তবায়নের চেষ্টা করি।

কুরআনকে আমরা যিন্দা কিতাব হিসাবে গ্রহণ করি। শুধু তিলাওয়াত করে খতম করব। এটা অনেক বড় সওয়াবের বিষয়। কিন্তু হক আদায় করে তিলাওয়াত শুধু খতম করা আর সওয়াব হাসিল করার নাম নয়। সবাই সবার সাধ্যের ভেতরে কুরআনের হেদায়েতগুলোকে বাস্তবায়নের চেষ্টা করি। …وَ عِبَادُ الرَّحْمٰنِ এ আয়াতে আল্লাহ তার বান্দাদের গুণাবলী বলে দিয়েছেন। قَدْ اَفْلَحَ الْمُؤْمِنُوْنَ এখানে আল্লাহ মুমিন বান্দাদের গুণাবলি বলে দিয়েছেন। উলুল আলবাব- কারা কুরআনে বলে দেওয়া হয়েছে। মুত্তাকী কারা- বলে দেওয়া হয়েছে।

গতকাল সূরা মাআরিজে তিলাওয়াত হল, মুসল্লি কেমন হবে। মুসল্লি এমন হবে, মুসল্লির সিফাত এই হবে। মুসল্লির মধ্যে চারিত্রিক পবিত্রতা থাকতে হবে। মুসল্লিদের গুণাবলি ওখানে বর্ণনা করা হয়েছে। মুসল্লিদের সম্পদে, যা আল্লাহ্র দেয়া, তাতে বঞ্চিতদের হক থাকে। কুরআনে বর্ণিত এ সকল সিফাত খুঁজে খুঁজে নিজের মধ্যে আনার চেষ্টা করি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ভরপুর তাওফীক নসীব করেন।

আমর বিল মারুফ নাহি আনিল মুনকার ও জিহাদের কত আয়াত কুরআন মাজীদে আছে। এসব আজ অবহেলিত। ইসলামী খেলাফত নেই। এ কথা আমরা বলি। এখন সরকারও বলে- দেশে ইসলামী খেলাফত নেই। ইসলামী হুকুমত নেই। ইসলামী হুকুমত না থাকার কারণে খেলাফত বিষয়ক যত ইসলামী বিধান আছে সব মাফ!! নাউযু বিল্লাহ!

ইসলামী হুকুমত কীভাবে হবে? ইসলামী হুকুমত কি আসমান থেকে নাযিল হয়, যেমন ঈসা আ.-এর উম্মতের জন্যে আসমান থেকে তৈরি খাবার এসেছে? যাকে আল্লাহ ক্ষমতা দিয়েছেন সে যদি তার হুকুমতকে ইসলামী তরীকায় পরিচালনা করে তাহলে ইসলামী হুকুমত আসে। সে আমর বিল মারুফ নাহি আনিল মুনকারের চূড়ান্ত বিভাগ খুলবে। সে জিহাদের বিধান বাস্তবায়ন করবে। হুদূদ (ইসলামী দ-বিধি) বাস্তবায়ন করবে। তার অফিস আদালত সবকিছু কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক হবে। তাহলে ইসলামী হুকুমত অস্তিত্ব লাভ করবে। মুসলিম দেশের সরকার যদি বলে, আমাদের দেশে ইসলামী হুকুমত নেই। এজন্য এ সকল বিধান প্রযোজ্য না- এর চেয়ে হাস্যকর কথা আর কী আছে!

সকল মুসলিম দেশের প্রশাসনকে ডেকে ডেকে কুরআন বলে, তোমরা আমর বিল মারুফের কাজ কর। নাহি আনিল মুনকারের কাজ কর। ইবাদত নিজে কর। ইবাদতের পরিবেশ কায়েম কর। সালাত কায়েম কর। যাকাত আদায়ের ব্যবস্থা কর। নিজে যাকাত দাও। তোমার অধীনস্থরা যাকাত দিচ্ছে কি না সেটা তদারকি কর। শরীয়ত যে সকল হদ নির্ধারণ করে দিয়েছে সে হদগুলো কায়েম কর। চুরির কী শাস্তি? ফাহেশার কী শাস্তি? মদ্যপানের কী শাস্তি? কোন্টার কী শাস্তি সেটা বাস্তবায়ন কর। নিজের থেকে পণ্ডিতি করো না। শরীয়ত যেটা নির্ধারণ করে দিয়েছে সেটা বাস্তবায়ন কর। সেটা বাস্তবায়ন করবে, সুফল পাবে। নিজের থেকে পণ্ডিতি করলে একে তো শরীয়তের বিধান লংঘন হবে, শরীয়তের বিপরীতে আরেক আইন দাঁড় করানোর মত কুফরী কাজ হবে, অপর দিকে ফায়দা কিচ্ছু হবে না। ক্ষতি আর ক্ষতি হবে।

মাদরাসার মধ্যে কুরআনের পরিবেশ, ঘরের মধ্যে কুরআনের পরিবেশ- এটা যে আল্লাহ্র কত বড় নিআমত- এটা বুঝতে পারে সে, যার পুরো ঘর এক দিকে আর সে কুরআন শিখেছে, কুরআনী যিন্দেগী, ঈমানী যিন্দেগী বোঝা শুরু করেছে এবং সেটা একটু বাস্তবায়ন করতে চায়। কিন্তু পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের জন্য পারে না। তখন বোঝা যায় পরিবেশটা কুরআনী হওয়া, পুরো পরিবারটা কুরআনী হওয়া কত বড় নিআমত।

একটা ঘরে পর্দার পরিবেশ নেই। হঠাৎ একজন পর্দার বিধান জেনেছেন। আল্লাহ তার ঈমানী শক্তি জাগ্রত করে দিয়েছেন। মনে করুন, তিনি তার মায়ের কাছে বসা। এমন সময় তার কাছে আসতে চায় তার ভাবি বা এমনও হতে পারে, আপনার ভাবি ওখানে আর আপনি কোনো দরকারে ওখানে যেতে চান। তখন তাকে সরে যেতে হবে বা আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে। এটা অনেক বড় একটা বাধা। কিন্তু যদি আপনিও পর্দার বিধান মানেন সেও পর্দার বিধান মানে তাহলে বিষয়টা সহজ। আপনার ভেতর যদি পর্দার বিধানের গুরুত্ব থাকে, আপনি যদি দ্বীন-ঈমান শিখে থাকেন তাহলে এই বাধার উপর আপনি খুশিই হবেন।

আমি আমার ভাতিজাদের ঘটনা শুনিয়েছি। যখন রিয়াদ থেকে এসেছি, তারা একেবারে ছোট। আমি ঘরে ঢুকেছি। গ্রাম দেশে একটা ঘরের দুইটা পাশ থাকে। একটাকে বলে আতীনা। সামনের অংশ আর ভেতরের অংশ। আমি সামনের অংশ থেকে ভেতরের অংশে গিয়েছি। এখন বের হব। বাইরে উঠান। উঠান আবার দুই ধরনের, ভেতরের উঠান, বাইরের উঠান। আমি ভেতরের উঠানে যাব, আম্মার সাথে দেখা করার জন্য। যাওয়ার আগে আমি আওয়াজ দিব। কিন্তু আমি আওয়াজ দেওয়ার আগেই ভাতিজারা আমার ভাব দেখে বুঝতে পেরেছে আমি ওইদিকে যাব। তখন দুজনই দুই হাত বাড়িয়ে দিয়ে আমাকে নিষেধ করছে, এদিকে আসবেন না, আসবেন না; আম্মা ওখানে আছেন। কে তাদেরকে এটা শিখিয়েছে? এটা শিখিয়েছে তাদের পরিবেশ।

আমাকে বাধা দিয়েছে এতে আমি খুশি। আমাকে যদি এক ঘণ্টা বা দুই ঘণ্টাও দেরি করতে হয়, তাও আমি খুশি। কিন্তু যদি কারো কাছে এই বিধানের গুরুত্ব না থাকে তাহলে সে এক-দুই ঘণ্টা তো দূরের কথা বাধা দেওয়ার উপরেই নারাজ হয়ে যাবে। মাদরাসার তালিবুল ইলম যারা, তাদের পুরা পরিবারটাই যদি এমন মাদরাসী হয় তাহলে এক অবস্থা। আর যদি এমন হয়, পরিবারের মধ্যে সে একজনই মাদরাসায় পড়ছে তাহলে দেখুন কী দুর্দশা! ভাবীরা নারাজ। কারণ, তার সামনে এসে পড়লে সে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। সে হয়ত মায়ের কাছে বসা। হঠাৎ ভাবী না জানিয়ে সামনে এসে পড়লেন। তখন সে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকল এবং উঠে চলে গেল। এতে উনারা নারায। কারণ, পর্দার বিধানের গুরুত্ব এখনো তাদের অন্তরে বসেনি।

এখন তো অনেকে পর্দার বিধানকেই ভাগ করে ফেলেছে। খাস পর্দা আর আম পর্দা। শরীয়তে দুই ধরনের পর্দা নাই। শরীয়তে আছে পর্দার বিধান। কেউ পুরা মানে আর কেউ কিছুটা মানে। ঘরে পর্দা আছে, খাস পর্দা নাই- এর মানে হল, পর্দা নেই। এজন্য খালা শাশুড়ি, মামী শাশুড়ি কত ধরনের শাশুড়ি যে আছে। এই সব শাশুড়িরা পর্দার বিধানের আওতায়। এসব শাশুড়ির সাথে পর্দা করতে হবে। আসল শাশুড়ি তো হলেন আপনার স্ত্রীর মা। হাঁ, আপনি অন্যদের খোঁজ-খবর নেন ভায়া হয়ে। আপনার স্ত্রীর মাধ্যমে। সরাসরি তাদের সাথে কথাও বলতে যাবেন না। দেখা দেওয়া তো দূরের কথা। এ সমস্ত কথা কে মানে? এগুলো তিক্ত কথা। কঠিন কথা। এগুলোর পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এমন পবিত্র পরিবেশই কুরআনী পরিবেশ।

ঘরকে কবরস্তান বানাবেন না। কবরস্তানে কেউ কুরআন পড়ে না। ঘরকে কুরআনের আলোয় আলোকিত করুন। রেডিও ছেড়ে, মোবাইল ছেড়ে কুরআন তিলাওয়াত দিয়ে দিন শুরু করেছেন। সূরা ইয়াসীনের তিলাওয়াত শোনার মধ্য দিয়ে দিন শুরু করেছেন। ভালো কথা, কিন্তু এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবেন না। সূরা ইয়াসীনের অর্থের প্রতি খেয়াল করুন। সূরা ইয়াসীনকে বলা হয়েছে কলবুল কুরআন। এ সূরায় পুরো কুরআনের হেদায়েতের সারসংক্ষেপ চলে এসেছে। অর্থ বুঝে বুঝে সূরা ইয়াসীন শুনুন এবং সে মোতাবেক আপনার দিনটা পরিচালিত করুন। আপনার ঘরটা, দোকানটা পরিচালিত করুন। তাহলে সূরা ইয়াসীন শোনা সার্থক। এক ধাপ আরো অগ্রসর হোন, সূরা ইয়াসীনের তিলাওয়াত শিখুন; নিজে তিলাওয়াত করুন। আরও সূরা শিখুন। পূর্ণ কুরআনের সহীহ তিলাওয়াত শিখুন, তিলাওয়াত করুন এবং কুরআনের ইলম ও আমল গ্রহণ করুন। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাওফীক নসীব করুন- আমীন।


সৌজন্যে: আলকাউসার