আমরা সন্ত্রাসবাদ ও নাস্তিক্যবাদ কোনটাই সহ্য করব না: আল্লামা জুনাইদ

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

unnamedবিদেশী, অমুসলিম ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের টার্গেট করে ইসলামের নামে গুলশান, শোলাকিয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক নৃশংস হত্যাকান্ড এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক জুমার খুতবায় অবৈধ হস্তক্ষেপসহ সকল প্রকার খুন, গুম, অপহর ও দুর্নীতির প্রতিবাদে দারুল উলূম হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফী’র নির্দেশে প্রতিষ্ঠানটির ছাত্র-শিক্ষদের অংশগ্রহণে এক বিশাল সন্ত্রাসবিরোধী প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ৪ আগস্ট বৃহস্পতিবার বাদ আছর অনুষ্ঠিত সন্ত্রাসবিরোধী এই প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলে শরীক ছিলেন হাটহাজারী মাদ্রাসার হাজার হাজার ছাত্রসহ প্রায় শতাধিক মুহাদ্দিস, মুফতী ও শিক্ষকবৃন্দ। প্রতিবাদ সমাবেশে তারা বলেন, দেশে কার্যকর শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যে সবার আগে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে হুমকি-ধমকি, আইন-আদালত ও বন্দুকের ভয় দেখানোর পরিবর্তে সর্বক্ষেত্রে ন্যায় ও ইনসাফের চর্চা, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, ঘুষ-দুর্নীতি উচ্ছেদসহ মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ ও রাজনৈতিক কাদাছোঁড়াছুড়ি বন্ধ করতে হবে। তারা আশংকা প্রকাশ করে বলেন, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সুবিচার প্রতিষ্ঠা ছাড়া সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কার্যকর ফল অর্জন করা কঠিন হতে পারে। দেশ ও জনগণের স্বার্থে সন্ত্রাস উৎখাত যেমন জরুরী, তেমনি নাগরিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটাকে বাদ দিয়ে অন্যায় গুরুত্বারোপ দেশে কাঙ্খিত শান্তি ও স্থিতিশীলতা অর্জিত হবে না।

হাটহাজারী ডাক বাংলো চত্বরে বিকেল ৫টায় শুরু হওয়া মিছিলপূর্ব সমাবেশে হাটহাজারী মাদ্রাসার মুহাদ্দিস, মুফতী ও শিক্ষকবৃন্দ ও ছাত্র প্রতিনিধি সন্ত্রাস, বোমাবাজি, খুন, গুম, অপহরণ, হামলা, ধর্ষণ, নাগরিক অধিকার হরণ এবং ইসলাম বিরোধী শিক্ষানীতি, জুমার খুতবায় সরকারী হস্তক্ষেপ, দাড়ি-টুপি-হিজাবসহ ইসলাম বিরোধী নানা পদক্ষেপের তীব্র প্রতিবাদ এবং ইসলাম ও দেশ নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারী দিয়ে বক্তব্য রাখেন। এক ঘণ্টার প্রতিবাদ সমাবেশ শেষে এক বিশাল সন্ত্রাসবিরোধী বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি ডাক বাংলো চত্বর থেকে বের হয়ে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়ক, হাটহাজারী বাস স্ট্যান্ড, চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি সড়ক ও কাচারী সড়ক হয়ে হাটহাজারি মাদ্রাসার গেটে এসে শেষ হয়। মিছিলে সন্ত্রাস, বোমাবাজি, জুমার খুতবায় হস্তক্ষেপ, ইসলাম বিরোধী শিক্ষা নীতি ও খুন-গুম-অপহরণের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শ্লোগান দেওয়া হয়।

দারুল উলূম হাটহাজারী মাদ্রাসার প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা হাফেজ মুহাম্মদ জুনায়েদ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন মুহাদ্দিস মাওলানা মুহাম্মদ ফোরকান আহমদ, মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরী, শিক্ষক মাওলানা নূরুল ইসলাম, মাওলানা আবু আহমদ, মুফতী আবু সাঈদ, মুফতী রাশেদুল ইসলাম, সাবেক ছাত্র মাওলানা মির মুহাম্মদ ইদরিস, ছাত্র প্রতিনিধি মাওলানা আবুল হাসান প্রমুখ। সমাবেশ পরিচালনা করেন হেফাজত আমীরের প্রেসসচিব ও মাসিক মুঈনুল ইসলামের নির্বাহী সম্পাদক মাওলানা মুনির আহমদ।

মিছিল পূর্ব সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় মহাসচিব আল্লামা হাফেজ মুহাম্মদ জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, আমরা সন্ত্রাসবাদ ও ইসলামবিরোধী নাস্তিক্যবাদ কোনটাই সহ্য করব না। আমরা সন্ত্রাসবাদকে যেমন ঘৃণা করি, প্রত্যাখ্যান করি, প্রতিরোধের ও উৎখাতের আহ্বান জানাই, আমাদের একই অবস্থান ইসলাম বিদ্বেষী নাস্তিক্যবাদিদের বিরুদ্ধেও। আমরা বোমাবাজি, খুন, গুম, অপহরণ, সন্ত্রাসী হামলা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দুর্নীতি এবং বেছে বেছে বিদেশী, অমুসলিম, ইমাম-খতীবসহ অন্যান্য ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের টার্গেট করে যে খুনাখুনির ঘটনা ঘটছে, তার যেমন কঠোর নিন্দা ও প্রতিবাদ করি। তেমনি দাড়ি-টুপি-হিজাব বিরোধী অপতৎপরতা, উলামা-মাশায়েখের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, ওয়াজ ও তাফসীর মাহফিলে প্রতিবন্ধকতা, ধর্মহীন শিক্ষানীতি, স্কুল পাঠ্যবইয়ে নাস্তিক্যবাদ ও হিন্দুত্ববাদের শিক্ষাদান এবং জুমার খুতবায় হস্তক্ষেপসহ সকল ইসলামবিরোধী নীতিরও তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। তিনি বলেন, এখন দ্বিমুখী নীতিতে দেশ পরিচালিত হচ্ছে। একদিকে নাগরিক অধিকার হরণ, ঘুষ-দুর্নীতি ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম, ধর্মের বিরুদ্ধে একের পর এক অব্যাহত আঘাত হেনে মামলাবাজি ও বন্দুকের ভয় দেখিয়ে নাগরিকদের কণ্ঠকে স্তব্ধ করে গভীর ক্ষোভ ও হতাশা তৈরী করা হচ্ছে। অন্যদিকে সন্ত্রাস, বোমাবাজি ও হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে নাগরিক প্রতিরোধের কথাও বলা হচ্ছে। তিনি বলেন, সন্ত্রাসী ও জঙ্গীবাদিরা যেমন দেশের ভয়াবহ ক্ষতি করছে, তেমনি নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হরণ ও বন্দুকের ভয় দেখিয়ে দেশে লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করে ক্ষমতাসীন মহলও দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছে। তিনি বলেন, আমরা মানুষকে সকল ধরণের অন্যায়, অপরাধ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাই।

আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক দু’টি বক্তব্যের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, তিনি ২৭ জুলাই বলেছেন, ‘জুমার খুতবা নির্ধারণ করা হয়নি’। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকেও একই কথা বলা হয়েছিল। অথচ প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরও আমরা মিডিয়া পরিবেশিত খবরে জানতে পারি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রেরিত খুতবা না পড়ার কারণে ইমাম গ্রেফতার, বরখাস্ত ও নাজেহাল করা হয়েছে দেশর বিভিন্ন জায়গায়। জুনায়েদ বাবুনগরী আরো বলেন, গত ১৯ জুলাই গণভবনের এক অনুষ্ঠানে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘সন্তানদেরকে ধর্মীয় শিক্ষা দিন। তারা যাতে সঠিকভাবে ধর্মীয় শিক্ষা পায়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। কেননা সব ধর্মই শান্তির কথা বলে’। কিন্তু ২০১০ সালের ধর্মহীন শিক্ষানীতি বহাল রেখে কীভাবে সন্তানদেরকে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করা সম্ভব, সেটা বলেননি। তিনি বলেন, সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও কর্তাব্যক্তিদের বিবৃতি ও কাজের মধ্যে কোনই মিল পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, দেশ থেকে সন্ত্রাস নির্মূলের জন্যে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সুশাসন ও সুবিচার নিশ্চিত করতে হবে সবার আগে।

প্রতিবাদ সমাবেশ চলাকালীন হাটহাজারী ডাক-বাংলো চত্বরসহ সামনের সড়ক, আশেপাশের ভবনের বারান্দা ও ছাদেও ছাত্রদের পাশাপাশি উৎসুক জনতার ভিড় লক্ষ্য করা যায়।