পদ্মা পাড়ের কান্না ও আমাদের করণীয়

পদ্মা পাড়ের কান্না ও আমাদের করণীয়

সাদিক ফারহান


ভরদুপুরে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার পদ্মার তীর ধরে হাঁটছিলাম৷ সাথে আছেন লেখক-গবেষক, মাওলানা মাহমুদ হাসান ভাই এবং নন্দিত লেখক-অনুবাদক, মাওলানা মুজিব তাশফিন৷ গ্রামটি স্থানীয়দের নিকট বাঁশতলা নামে পরিচিত। ভর দুপুরেও রাস্তাঘাট প্রায় লোকে লোকারণ্য থাকে। স্থানীয়রা ছাড়াও দূর দূরান্ত থেকে বহু মানুষ প্রতিদিন এখানে আসেন, নদীভাঙনের চির-পরিচিত দৃশ্য দেখে যান৷ চারপাশে কেমন বিপন্নতার চিত্র চোখে পড়লো। স্থানীয়রা জীবিকার লোভে খুচরো ব্যবসা জমিয়েছে নদীর তীরে৷ বাদাম, আচার, সিংগারা-পুরির পাশে আমড়া নিয়ে দাঁড়ানো দেখা গেলো আধাপাকা দাড়ি রতন মিয়াকে৷ আমরা এগিয়ে যাই তার গাড়ি বরাবর। কথা বলে জানা গেলো তিনি এলাকারই বাসিন্দা৷ বাপ দাদার ঐতিহ্য হারিয়ে পেটের দায়ে আমড়া নিয়ে বসেছেন৷

আলাপে আলাপে জানা হলো এক হৃদয়-বিদারক গল্প। যার নেপথ্যে রয়েছে সর্বনাশা পদ্মার অব্যাহত ভাঙন। ইশারা করে দেখালেন নদীর দিকে প্রায় মাইল দেড়েক ভেতরে ওয়াপদা বাজার নামে এক গ্রাম ছিলো৷ জন্মের পর সেটাকেই নিজের গ্রাম হিসেবে জানতেন তিনি৷ দিন শেষে পরিবার নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাতেন সেখানে৷ বাড়ির পাশে কবরস্তানে শায়িত ছিলো তার মা বাবা৷ সময়ে সময়ে দুআ দুরুদ নিয়ে ভক্তি ভরে দাঁড়াতেন তাদের শিয়রে৷ কোন এক পড়ন্ত বিকেলে সর্বনাশা পদ্মা হুংকার ছুঁড়ে সেখানে চির-আঘাত করে বসে৷ একে একে বাড়ি-ঘর, ভিটে মাটি সব কেড়ে নেয় রতন মিয়ার৷ চোখের সামনে মা-বাবার কবর ভয়ঙ্কর অজগরের মতো গিলে নিতে দেখে লোকটি৷ অশ্রুসজল নয়নে ভাঙন থেকে বহু দূরে এসে একখণ্ড জমিতে ছোট্ট একটা ঘর তুলেছিলেন তিনি। বছরখানেকের মধ্যে দুপুরের আকাশ ভারি করে পদ্মা আবারও হামলে পড়েছিলো সেই ঘরে৷ সেই থেকে রতন মিয়া নিজ দেশে শরণার্থী হয়ে আছেন৷ নড়িয়াতে এখন আর তার আবাস নেই৷ অন্যের ঘর ভাড়ায় নিয়ে দিনভর আমড়া বেচে জীবিকা নির্বাহ করছেন বহু দিন ধরে৷ রতন মিয়ার মতো ওয়াপদা বাজারের সকলেই বিভিন্ন স্থানে চলে গেছেন। বর্ষার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে নদীর তীর থেকে বহু রতন মিয়ার ঠিকানা বদলে যায়৷ কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায় পূর্বপুরুষের যত্নে গড়া আবেগ জড়িত ভিটে মাটি৷

রতন মিয়ার সাথে আলাপ শেষে আমরা ট্রলারে চড়ে মুলফতগঞ্জের দিকে যাই৷ যেতে যেতে পাড়ে পড়ে থাকতে দেখি ইট-কাঠ আর টাইলসের সাথে থোরা থোরা আবেগ৷ শত শত রতন মিয়ার হৃদয়ের আঁসু জমে থাকতে দেখি ঢলে পড়া দালানের ছাদে৷ একসময় তারা বিকেলের সোনা রোদে এই দালানের ছাদে চেয়ার পেতে উত্তরের হাওয়া খেতেন৷ চাঁদনী রাতের মৌ মৌ আলোয় আরো কিছু কাল বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখতেন৷ ভাবতে ভাবতে আমরা আবেগতাড়িত হয়ে পড়ি৷ ট্রলারের ভটভট আওয়াজের সাথে বহু রতন মিয়ার সুপ্ত কান্নার আওয়াজ হিমহিম আবহে মিলিয়ে যায়৷ যতক্ষণে মুলফতগঞ্জ বাজারে পৌঁছি, আকাশ থেকে ঝিরিঝিরি বারিশ নেমে আসে আমাদের গায়ে৷

নদীর আক্রোশে ক্ষয়ে যাওয়া মুলফতগঞ্জ বাজারের পশ্চিম পাড় থেকে পূর্ব পাড়ে যেতে সাঁকো পেরোতে হয় আমাদের৷ অর্ধডোবা সাঁকোয় পা রেখে ভাবি, এই ভাঙনকবলিত এলাকাটার নাম নড়িয়া কেন হলো? কপালের লিখনই কি গায়ে এঁটে দিয়েছিল এর নামকরণকারী? কৌতূহল জাগে মনে। এতবছর ধরে নড়তে থাকা নড়িয়াকে মানুষ দেখছে; যেন সে একেবাড়েই নড়বড়ে, তার বিনাশ যেন অনেকটাই অবধারিত। সম্মুখপানে ছুটে চলাতেই যেন নদীর সুখ। কথায় আছে, ‘নদীর কূল নাই-কিনার নাই, নাইরে দরিয়ার পাড়ি।’ অর্থাৎ তার কোনো সুনির্দিষ্ট কিনার নেই৷ সে যেখানে ইচ্ছা, যতদূরে ইচ্ছা কিনার বানাবে, যেখানে খুশি সেখানে গিয়ে সে থামবে।

এমন দৃশ্য নড়িয়ার শুধু বাঁশতলা এলাকাতেই নয়; গোটা নড়িয়াজুড়েই এমন বহু রতনের গল্প রচিত হচ্ছে। ওয়াপদা বাজারের মতো মুলফতগঞ্জ বাজারেরও সিংহভাগ তলিয়ে গেছে গভীর জলের প্লাবনে৷ দুর্যোগের মৌসুম এলে বাড়ি বদলের হিড়িক পড়ে যায় এসব এলাকায়৷ ঘরের চালা-বেড়া সম্বল করে মানুষজন ছোটেন এক স্থান থেকে আরেক স্থানে। যে বাড়ি সমৃদ্ধ হয়েছিল তিলে তিলে, যুগ যুগ সাধনায় মুখরিত হয়ে ওঠেছিলো যে উঠোন, সান বাঁধানো পুকুরঘাট, ফলের বাগান, সারি সারি সুপারি গাছ, প্রিয় স্বজনদের কবরস্থান, সবকিছু ফেলে নতুন ঠিকানার সন্ধানে পা বাড়ায় প্রকৃতির কাছে পরাজিত একদল অসহায় লোক। এক ধরণের নিরব আতংক থাকে তাদের মনে৷ দুর্যোগ-মৌসুম এলে এদিকের মানুষেরা নদীর কাছে তাড়িত হয় বার বার। নিঃস্ব, সহায়হীন তারা নতুন ঠিকানায় গিয়ে আবার ঘর বাঁধার স্বপ্ন বুনে৷

প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাড়ি বদলের এই ঘটনা যেন শুধু বিপুল পরিমাণ সম্পদ হানি ঘটাচ্ছে তা নয়, এক একটি সম্পদশালী পরিবারকে পথে বসিয়ে দিচ্ছে একেবারে৷ পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন ভিন্ন করে দিচ্ছে। কত কান্নার জল ভাঙন রোধ করতে পারবে, জানেন না ভাঙনতীরের এই অসহায় মানুষেরা। এমনও লোকের দেখা মেলে যারা এক সময় এই তীর থেকে পদ্মার কয়েক মাইল ভেতরে নিজেদের জমিতে চাষাবাদ করেই জীবিকা নির্বাহ করেছেন। এক বর্ষা আগেও ভাবেননি তাদেরকে বাড়ি ঘর ছেড়ে চলে যেতে হবে। কিন্তু নিয়তি তাদের ঠিকানা বদলে বাধ্য করেছে৷ প্রতিবছর বর্ষা ও ঝড়ের মৌসুম এলেই এই অঞ্চলের মানুষের আতঙ্ক বাড়তে থাকে। যারা কোনভাবেই নিজের বাড়িটিতে থাকতে পারছেন না, তারা কেউ শহরে চলে যায়, কেউবা অন্যের বাড়িতে ঠাঁই নেয় সাময়িকের জন্য। খুব কম সংখ্যক ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ ধার-দেনা করে এক টুকরো জমি কিনে আবার ঘর বাঁধার সাহস করতে পারে।

স্থানীয় সচেতন বিজ্ঞজনেরা বলছে, তারা সঠিক সময়ে সঠিক পূর্বাভাস সরকারকে জানিয়েছেন। তাহলে সরকার কী করেছে নড়িয়ার মাটি-সম্পদ আর অস্তিত্ব রক্ষায়? উত্তরগুলো মানুষের কাছে মোটামুটি পরিষ্কার— কাজের কাজ কিছুই করা হয়নি। ফলে কী হয়েছে? নড়িয়া নামের একটি জনবহুল-ঘটনাবহুল-সহস্র মানুষের কোলাহলমুখর জনপদ অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। সেখানকার মানুষের টুকরো টুকরো সব সুখ-দুঃখের স্পর্শে ভরা মাটি গিলে খাচ্ছে সর্বগ্রাসী পদ্মা। মানুষ আহাজারি করছে তার প্রিয় ঘরের জন্য, এক টুকরো উঠোনের জন্য, একটি সজনে ডাটার গাছের জন্যে৷ কবরে শুয়ে থাকা প্রিয়জনের জন্যও মানুষের কষ্টের সীমা নেই৷ বাবার কবরের কথা মনে হলে হয়তো কোন বেকুব ছেলে নদীর দিকে নির্বাক চেয়ে থাকে৷ হয়তো তার চোখজুড়ে কান্নারা ভর করে৷ বিকেলের নরোম রোদে সদ্য কিশোরী হয়ে ওঠা কোন দুরন্ত বালিকা হয়তো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে পদ্মার দিকে। মনে মনে ভাবে— ‘ভালোবাসার এই প্রতিদান দিলি তুই নদী’!

স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য-কর্মকর্তা জনাব মোয়াজ্জেম হোসেন আমাদের বলেন, বহু মানুষকে কাঁদিয়ে এ সময়টি বারবার আসে নড়িয়াতে৷ এই সময়টাতে বিভিন্ন ধরণের দুর্যোগের মুখোমুখি হয় এখানকার মানুষ। হাসপাতালের ছাদে দাঁড়িয়ে দূরের ভাঙন দেখতাম আমরা৷ মাইল দেড়েক দূরের আঘাত আমাদের হৃদয়ে আছড়ে পড়তো না ততোটা প্রকট হয়ে৷ কিন্তু যেদিন হাসপাতালের দালানে কামড় বসালো ধ্বংসের দাঁত সেদিন আমরা হকচকিত হলাম৷ চোখের সামনে মুলফতগঞ্জ বাজারের জমজমাট দোকানপাট হারিয়ে গেলো কালের গর্ভে৷ কোন এক নীরব দুপুরে হঠাৎ বাজারের মধ্যবর্তী কোথাও ফাটল দেখা গেলো৷ সামান্য সময়ের ব্যবধানে সেই অংশ তলিয়ে গেলো বিপণীবিতানগুলো নিয়ে৷ তিনি আমাদেরকে স্থানীয় সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জনাব আবদুল খালেক দেওয়ানের কথা জানালেন৷ ভাঙনে হারিয়ে যাওয়া এলাকায় লোকটার আলিশান বাড়ি ছিলো, বিশাল রমরমা ব্যবসা বাণিজ্য ছিলো৷ সর্বনাশা নদীর করালগ্রাসে আজ তিনি নিস্ব হতদরিদ্রে পরিনত হয়েছেন৷

কেবল দেওয়ান সাহেবই নন মূলত প্রতিটি মানুষের স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার সঙ্গে ঝুঁকি হ্রাসের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দুর্যোগে বারবার লণ্ডভণ্ড হলে স্বাভাবিকভাবে বাঁচার কোন সুযোগ মানুষের থাকে না। তাছাড়া দুর্যোগ যে শুধু ঘরবাড়ি কিংবা জমিজমা কেড়ে নেয় তা নয়, প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে৷ এই প্রাকৃতিক সম্পদও বহু মানুষের জীবিকার প্রধান মাধ্যম। কিন্তু নানা ধরণের উদ্যোগ নিয়েও ক্ষতি কমিয়ে আনা কিংবা আতংক নিরসন করা সম্ভব হচ্ছে না নড়িয়াতে। ঠিক দশথেকে বিশ বছর আগে নড়িয়ার মানুষ যেভাবে আতঙ্কগ্রস্থ ছিলেন এখনও সেভাবেই আছেন৷ তাদের জীবন ততটা নিরাপদ হয়েছে বলে মনে হয় না।

উপজেলা হাসপাতালের কার্যক্রম সীমিত আকারে হলেও চলছে৷ আমরা ভাঙা অংশের দিকে এগিয়ে গেলাম৷ দেখলাম বালুর বস্তা ফেলে ফেলে হাসপাতাল রক্ষার কাজ চলছে৷ স্থানীয়রা জানালো, এই বস্তা ফেলায় কোন উপকার পাচ্ছেন না তারা৷ ব্যয়বহুল অথচ ভঙ্গুর প্রতিরক্ষা উদ্যোগ তেমন কোন ফল বয়ে আনছে না তাদের জন্যে৷

নড়িয়ায় পদ্মার ভাঙনের নানা কারণের অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা যায় নদীর মাঝ দিকে থেকে জেগে ওঠা চরগুলোকে প্রশ্রয় দেয়া৷ এর ফলে নদীর মূল স্রোত দক্ষিণ প্রান্ত থেকে উত্তর প্রান্তে অর্থাৎ নড়িয়ার তীরে আছড়ে পড়ছে৷ নড়িয়া ভাঙছে তীব্রস্রোতে৷ এ সমস্যার প্রতিকারে জেগে ওঠা মাত্রই চরগুলোকে মিশিয়ে দেয়া উচিত৷ বিবিধ সিন্ডিকেটের ছত্র-ছায়ায় চরে আবাস বা ফসল গড়ে তুলতে গিয়ে নদীর স্বাভাবিক গতিধারা রোধ করলে এর ফলাফল আরো ভয়াবহ হবে সন্দেহ নেই৷

দ্বিতীয় কারণ হিসেবে বলতে হয়, জনপ্রতিনিধিদের বেমালুম নির্লিপ্ততা৷ দেখেও না-দেখার ভান মূলত আমাদের ভেতর সন্দেহ সঞ্চার করে; ভাঙনের দোহাই দিয়ে সরকার থেকে আসা খড়কুটো কুটে খাচ্ছে এসব বদমায়েশরা৷ জবাবদিহিতার সংস্কৃতি বিলোপ পেয়েছে এদেশ থেকে বহু আগেই৷ ফলে এরা চায় নড়িয়ার চলমান ভাঙন স্থায়ী হোক— সাথে স্থায়ী হোক এদের পেট-পূজা৷ ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে অবশ্যই নড়িয়ার এমন নির্দমনীয় ভাগ্য বরণ করতে হতো না৷

আরো একটি ব্যাপার লক্ষ্য করা যায়৷ সেটা হলো, বিরোধী পক্ষ বা নিরপেক্ষ জনপ্রতিনিধিদের জাতে ওঠার তাড়না৷ নদীতে স্থায়ী বাঁধ পড়ে গেলে একদল দঙ্গল নিয়ে মাইক বাজিয়ে হেডলাইন হবার চান্স বন্ধ হবে এদের৷ মূলত আর্তপীড়িত মানুষের আবেগকে পূজি করে এরা সামনে আসতে চায়৷ নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে এরাও কার্যকর কিছু করতে আগ্রহ বোধ করছে না৷

নদী কেবল মানুষের ঘর ভাঙে না, ভাঙে মন, ভাঙে হৃদয়। ভোট দিয়ে, ট্যাক্স দিয়ে জনগণ তাদের ধন মান রক্ষার দায়িত্ব সরকারকে দিয়েছে। দেশের কোথায় কোন নদী ভাঙবে, কতটুকু ভাঙবে, কতদিন ভাঙবে- তাতে কী কী ক্ষতি হবে, কত মানুষ ঘর ও সম্পদ হারাবে তা অবধারিতভাবেই সরকারকে হিসাব করে ব্যবস্থা নিতে হবে। যে মানুষগুলো সব হারিয়েছে, মন যাদের একেবারে মরে গেছে, তাদের কাছে সরকারের এতটুকু তৎপরতা একটু শান্তি ও স্বস্তির বিষয় হবে বলে মনে করি৷ ত্রাসের রাজনীতির বাইরে টিকে থাকার জন্য জনতার হৃদয়ে ঠাঁই করে নেয়ার রাজনীতিতে আসা উচিত৷

এ পর্যন্ত নড়িয়া পৌর এলাকাসহ বাঁশতলা, সাধুর বাজার, ওয়াপদা, মুলফতগঞ্জ বাজার,কেদারপুর ও চরনড়িয়াসহ আরো অনেক এলাকার বাড়িঘর, দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে চলে গেছে৷ মুলফতগঞ্জ একটি প্রাচীন বাজার৷ এই বাজারসহ তিনটি বাজার বিলীন হয়ে গেছে৷ তিনশ’রও বেশি দোকানপাট নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে৷ এছাড়া একটি কমিউনিটি ক্লিনিক, দু’টি সরকারি বিদ্যালয় ভবন, উপজেলা স্বাস্থ্য-কমপ্লেক্সের তিন তলা দালান, গাড়ির গ্যারেজ, মসজিদ, মন্দির, ব্রিজ, কালভার্ট, রাস্তা ও ফসলি জমি নদী গর্ভে চলে গেছে৷ পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ ভাঙনের শিকার হয়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন৷

উপজেলা স্বাস্থ্য-কমপ্লেক্সের ভেঙে পড়া ভবনের পাশে দাঁড়িয়ে আমরা শেষবারের মতো শঙ্কিত বোধ করলাম, কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে কাল ভোরেও অস্তিত্ব হারাতে পারে এই অঞ্চলের সর্ব-সাধারণের রোগমুক্তির কেন্দ্র এই উপজেলা স্বাস্থ্য-কমপ্লেক্স৷ ভাঙনকবলিত এই হাসপাতালের কোন কেবিনে হয়তো আজও জন্ম নিচ্ছে কোন হতভাগা বালিকা৷ বড় হয়ে এই মেয়ে নিশ্চয়ই ভাঙনকালীন তার জন্মের গল্পটা শুনবে। বয়োজ্যেষ্ঠদের কেউ হয়তো প্রমত্তা নদীর দিকে হাত তুলে দেখিয়ে বলবে, ‘ওই যেখানে এখন পদ্মা উত্তাল হয়ে ওঠে, ঠিক সেখানটায় একটা হাসপাতাল ছিল; ওই হাসপাতালেই তোমার জন্ম হয়েছিল।’ শহর থেকে ফেরার পথে কোন বাবা থই থই জলরাশি দেখিয়ে হয়তো পাশের ভদ্দরলোককে বলবে, ‘এর নাম বাহাদ্দির বাজার। এখানে ছিলো আমার শ্বশুরবাড়ি। এই বাড়িতেই জন্ম হয়েছিল আমার মেয়ের, যে মেয়েটি এখন কলেজে পড়ছে।