ভালোবাসা আল্লাহ প্রদত্ত এবং তা হতে হবে আল্লাহরই জন্য

123images-of-loveমুফতি মুহাম্মদ জাকারিয়া  ● মানুষের মধ্যে পরস্পর প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসা স্বভাবজাত অর্থাৎ আল্লাহ প্রদত্ত। এ বিশ্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য তিনি মানুষের প্রকৃতিতে তা দিয়ে রেখেছেন। স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, সন্তানের প্রতি মাতাপিতার ভালোবাসা, আত্মীয়স্বজন পরস্পরের প্রতি ভালোবাসাÑ এসবই মানুষের অন্তরে আল্লাহর দেয়া বিশেষ দান। শুধু মানুষ নয় সকল সৃষ্টির মধ্যেই এ ভালোবাসা বর্তমান। একজন নারীর প্রতি পুরুষের ভালোবাসা বা পুরুষের প্রতি নারীর ভালোলাগাও স্বভাবজাত। এর মধ্যে দোষের কিছু নেই। কিন্তু সীমা অতিক্রম করলেই গুনাহ হয়। কাউকে ভালো লাগলে বা পছন্দ হলে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হলো সে কোন না কোনভাবে তার অভিভাবককে অবহিত করবে। এক ব্যক্তি রসূল (সা.)-কে কোন এক মেয়েকে বিয়ের কথা জানালে তিনি বলেনÑ ‘তুমি কি তাকে দেখেছ?’ লোকটি জবাবে না বললে তিনি বলেন ‘আগে মেয়েটিকে দেখ তারপর সিদ্ধান্ত নাও’। বিয়েসাদীর ব্যাপারে ইসলাম পাত্র-পাত্রীর পছন্দকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে। বিবাহিত এ জীবন অত্যন্ত পবিত্র ও আল্লাহর কাছে খুবই পছন্দনীয়। এর বাইরে যে জীবন তা অত্যন্ত ঘৃণ্য ও পরিণতি জাহান্নাম। বিবাহের মাধ্যমে একজন নারী তার দীর্ঘদিনের পরিচিত পরিবেশ পিতামাতা আত্মীয়স্বজন সবাইকে ছেড়ে সম্পূর্ণ অপরিচিত এক পরিবেশে একজন পুরুষকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের মধ্যে যে ভালোবাসা ও মুহব্বত তা আল্লাহরই দেয়া। স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে নিয়ে ভাবনা, ঘুরতে যাওয়া, মোবাইলে দীর্ঘক্ষণ কথা বলা, কাজের ফাঁকে খোঁজখবর নেয়া খুবই স্বাভাবিক পরস্পরের প্রতি গভীর ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ। এরপর ২-৩ বছরের মধ্যে যখন কোলজুড়ে সন্তান আসে তখন সব আকর্ষণ চলে যায় সন্তানের প্রতি। তখন আর জিজ্ঞেস করে না যে কেমন আছ বা খেয়েছ কি? বরং জিজ্ঞেস করে বাবু কেমন আছে? ও কি খেয়েছে? মোবাইলটা একটু দাও তো ওর কথা শুনি। স্ত্রী সন্তানের মুখের সামনে ধরলে একটু আঁ উঁ করে তাতেই সে তৃপ্ত হয়, তারপর স্ত্রী সন্তানের কাছ থেকে নিয়ে বলে আচ্ছা রাখি। এরপর দাদা-দাদী হলে তো আকর্ষণ আরও নিম্নগামী হয়ে চলে যায় নাতি-নাতনিদের প্রতি। নাতি-নাতনিদের নিয়ে তাদের চমৎকার সময়গুলো অতিবাহিত হয়। এরই নাম ভালোবাসা। এতে রয়েছে আনন্দ, সুখ ও সওয়াব। স্বামী-স্ত্রী যখন বৃদ্ধাবস্থায় উপনীত হয় তখন তাদের সে জীবনটা আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে এবং একে অপরের প্রয়োজনটা আরও তীব্রভাবে অনুভব করে। আগে হয়তো ভাবি কেমন আছে ভাইকে জিজ্ঞেস করলে এক নাগাড়ে বলে যেত আর বলো না বিয়ের পর থেকে প্যানপ্যানানি শুরু হয়েছে তা আর থামে না। আর ভাবিকে জিজ্ঞেস করলে সে বলতো, আর বলো না একেবারে জ্ঞানবুদ্ধিহীন মানুষ, আমি হয়ে তাই ঐ সংসার করছি আর কেউ হলে কবেই সংসার ভেঙে যেত। অথচ আজ অসুস্থ স্বামীর পাশে সারা রাত কাটিয়ে দিচ্ছে তার সেই স্ত্রী এবং স্বামীর মঙ্গল চিন্তায় বড় কাতর হয়ে বলে আমি না থাকলে তোমার উপায়টি কি হবে? আবার স্বামী তার অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাচ্ছে, সেবা-যতœ করছে, ঔষধ-পথ্য দিচ্ছেÑ এসবই আল্লাহপ্রদত্ত ভালোবাসারই নামান্তর। এগুলো সবই ফিতরাতি ভালোবাসা, আল্লাহ মানুষের প্রকৃতিতে তা দিয়ে রেখেছেন। এর বাইরেও রয়েছে ভালোবাসা যেমন: ‘আপনারা আমাকে ভালোবাসেন, এখানে রক্তের বা আত্মীয়তার কোন সম্পর্ক নেই, সম্পর্ক হচ্ছে দ্বীনের’। হাদিসের ভাষায় আল্লাহরই জন্য কেউ কাউকে ভালোবাসলো এবং আল্লাহরই জন্য কেউ কারও সঙ্গে শত্রুতা করলো সে তার ঈমানকে পূর্ণতা দান করলো। ইসলামে ভালোবাসার ভিত্তি হলো ফিতরাত ও ঈমান। ইসলাম স্বভাব-প্রকৃতির ধর্ম। ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহর সকল সৃষ্টিই সদাচরণের দাবিদার এবং এ সদাচরণ হতে হবে আল্লাপ্রদত্ত পন্থায়। লালসাবৃত্তি চরিতার্থের জন্য সব কাজই ইসলামে অপছন্দ এবং তা অত্যন্ত ঘৃণ্য ও গুনাহের শামিল।

১৪ই ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। এ দিবসের সঙ্গে নগ্নতা-বেয়াহাপনা-অশ্লীলতার কোন সম্পর্ক নেই বরং রয়েছে ধর্মের প্রতি বিশেষ অনুরাগ। তৃতীয় শতাব্দীতে ভ্যালেন্টাইন নামে একজন খ্রিষ্টান ধর্মযাজককে ধর্ম প্রচারের অপরাধে তার বিরুদ্ধে যুবকদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগ এনে তাকে কারারুদ্ধ করা হয়। পৌত্তলিক রোমক সম্রাটের পক্ষ থেকে তাকে খ্রিষ্টধর্ম পরিত্যাগ করে পৌত্তলিক ধর্ম গ্রহণের কথা বলা হলে তিনি তা অস্বীকার করেন। এ অপরাধে তাকে মৃত্যুদ- দেয়া হয় এবং সে দিনটি ছিল ১৪ই ফেব্রুয়ারি। ভক্তরা তাকে অসম্ভব ভালোবাসতেন এবং কারারুদ্ধাবস্থায় অনেকে তার কাছে চিঠি লেখে। পরে খ্রিষ্টানদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়লে খ্রিষ্টীয় ধর্মযাজক ১৪ই ফেব্রুয়ারিকে ভালোবাসা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। এর মধ্যে ছিল মজলুমের প্রতি ভালোবাসা ও সহানুভূতি এবং জালেমের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষ। কিন্তু আজকে যা হচ্ছে তার সঙ্গে কোন অবস্থাতেই সে দিনের ঘটনার মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। ভালোবাসা প্রকাশের নামে যুবক-যুবতীদের একসঙ্গে খোলামেলা চলাফেরা ও মেলামেশা আমাদের ধর্ম ও সংস্কৃতি সমর্থন করে না। গাছতলায় বসে ছেলেমেয়েদের বাদাম খাওয়া ও আড্ডা দেয়া কোন পিতামাতারই পছন্দ নয়। কোরআনে বলা হয়েছে , যে দুশ্চরিত্র নারীর জন্য দুশ্চরিত্র পুরুষ এবং দুশ্চরিত্র পুরুষের জন্য দুশ্চরিত্র নারী। অবাধ মেলামেশার কারণে আজ আর নারী-পুরুষ নিজেদের নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে না এবং পরকীয়া ব্যাপকভাবে দেখা দিয়েছে। ফলে দাম্পত্য কলহ, খুন-খারাবি ও বিবাহবিচ্ছেদ মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। এছাড়া অবৈধ মেলামেশার কারণে অনেক সময় অবৈধ সন্তানের জন্ম হচ্ছে এবং অনেক সময় নবজাতককে ডাস্টবিনে পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। অসভ্যতা ও বর্বরতার শেষ সীমানায় আমরা পৌঁছে যাচ্ছি। ধর্মীয় বোধ-উপলব্ধি প্রসারের মাধ্যমেই আমরা পারি এ অবস্থা থেকে মুক্তিলাভ করতে। আল্লাহ আমাদের সঠিক পথে পরিচালিত করুন। আমিন।

(লেখক: খতিব, বাইতুন নূর জামে মসজিদ)