আমার সাথে আল্লাহ আছেন, জনগণ আছে, কোন কিছু পরোয়া করি না : মেয়র আরিফ

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | মারজান হুসাইন চৌধুরী


ছবি: ইমতিয়াজ চৌধুরী

 

গত ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত হয় সিলেট সিটি কর্পোরেশন (সিসিক) নির্বাচন। নানান কারণে এই নির্বাচনটি চলে এসেছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। জাতীয় রাজনীতিতে এ নিয়ে বেশ আলোচনা সমালোচনা হয়।

চলতি বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। সংসদ নির্বাচনের এই বছরে সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় সবার নজর ছিল এইদিকে।

এছাড়া, সিসিক নির্বাচন আরেকটি কারণে ছিল আলোচনায়। সেটি হল- মেয়র প্রার্থী নিয়ে বিএনপি জামায়াতের সমঝোতা না হওয়া।

সিলেট ছাড়াও রাজশাহী ও বরিশালে সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এই বছর। ওই দুই সিটিতে ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী বিজয়ী হলেও ব্যতিক্রম শুধু সিলেট। এখানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত প্রার্থী জয়লাভ করেন।

প্রথমবারের মতো এবারের সিটি নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার করা হয়।

সবকটি সিটিতেই ক্ষমতাসীন দল ছাড়া বাকি দলগুলো নির্বাচনে ব্যপক অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ এনেছে। এমনকি নির্বাচন বর্জনের ঘটনাও ঘটেছে। যদিও আওয়ামীলীগ প্রার্থীরা নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে দাবি করেছেন।

এতকিছুর পরও সিসিক নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী তার প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমদ কামরানকে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। এ নিয়ে টানা দুইবার সিলেটের মেয়র হলেন তিনি।

দ্বিতীয় মেয়াদে ৮ অক্টোবর (সোমবার) সিসিক মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেন আরিফ।

আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর মুখোমুখি হন আরিফুল হক চৌধুরী।

দ্বিতীয় মেয়াদে মেয়রের চেয়ারে বসার পর এই প্রথম কোন গণমাধ্যমের সাথে কথা বললেন আরিফ।

এসময় নির্বাচন, নগর উন্নয়নসহ আগামী দিনের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন তিনি।

ছবি: ইমতিয়াজ চৌধুরী

সিটি নির্বাচনে ব্যপক অনিয়মের অভিযোগের পরও বিজয়ী হওয়া অতঃপর দায়িত্ব নেয়া, এবিষয়ে আপনার মন্তব্য কি?

এর উত্তরে মেয়র আরিফ বলেন, “সিটি নির্বাচনে কি হয়েছে তা সবাই দেখেছে। আপনারা (সাংবাদিকরা) এর সাক্ষী। আমি আর এই বিষয়ে নতুন করে বলতে চাই না।”

“তবে একটা বিষয় বলতে চাই, সেটা হল- ভোট ডাকাতি আর অনিয়মের যে সংস্কৃতি চালু করা হয়েছে, এটা যেন অব্যাহত না থাকে।” যোগ করেন তিনি।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামীর সাথে টানাপড়েনের বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি আরিফুল হক।

শপথ নেয়ার পর ব্যক্তিগত সফরে লন্ডন যান আরিফ। সেখানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে তাঁর দেখা হয়। তাঁর সাথে কি কথা হয়েছে? আসন্ন নির্বাচন এবং এটিকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য আন্দোলন নিয়ে কি ভাবছেন? এসব নিয়ে কথা বলতেও নারাজ তিনি।

প্রথমবার (২০১৩ সালে) মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর দুই দফায় ২৭ মাস কারাভোগ করেন আরিফ। এছাড়া মেয়র পদ থেকে তাঁকে বরখাস্ত করা হয় দু’বার। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বেশ কিছুদিন নগরভবনে বসতে পারেননি তিনি।

এবার প্রথম কাজ কি হবে জানতে চাইলে মেয়র আরিফ বলেন, “অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করাই আমার প্রথম লক্ষ্য। এছাড়া ইশতেহার অনুযায়ী সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর সমাধান ও নগরবাসীর চাহিদাগুলো পূরণ করার চেষ্টা করব।”

সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার যে চিত্র সারাদেশের নগরগুলোতে দেখা যায় সেটি এখন আর সিলেটে তেমন একটা লক্ষ্য করা যায় না। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের কথাও বলেন আরিফ।

ছবি: ইমতিয়াজ চৌধুরী

সিলেটকে পর্যটন নগরী বলা হয়ে থাকে। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য মানুষ এখানে বেড়াতে আসেন। প্রবাসী অধ্যুষিত এই এলাকার রাস্তাঘাটের অবস্থা খুব একটা ভাল না।

সিসিক মেয়র জানান, “নগরীর সব রাস্তাঘাট সংস্কার, এলইডি লাইট লাগানো ও সৌন্দর্য-বর্ধনের কাজ দ্রুত করা হবে।”

বিদ্যুৎ, টেলিফোন, ইন্টারনেটসহ সব ধরণের লাইন মাটির নিচে নেয়ার যে পরিকল্পনার কথা গতবার জানিয়েছিলেন আরিফ, সেটা এবার বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানান তিনি।

এছাড়া, নগরবাসীর সুবিধার জন্য টাউন বাস চালু এবং বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে বলেও জানান আরিফ।

ছবি: ইমতিয়াজ চৌধুরী

পুণ্যভূমি সিলেটের ফুটপাত দখলমুক্ত করা ও ভুমিদস্যুদের হাত থেকে ছড়া-খাল উদ্ধারের মতো সাহসী পদক্ষেপ নেয়ায় মেয়র আরিফের প্রশংসা করেন সাধারণ মানুষ। এই ধারা এবারও অব্যাহত থাকবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নগরীর এই অভিভাবক।

তবে ফুটপাতের নগরীতে পরিণত হওয়া সিলেটকে পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে মেয়র আরিফ যে কাজ শুরু করেছিলেন তা বেশ চ্যালেঞ্জের ছিল। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। আদালত ২৬ জন দখলদারের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানাও জারি করেন। এরপর নগরভবনে হামলার ঘটনা ঘটে। নগরীর সব রাস্তা ফের দখলে নেয় হকাররা। এতো কিছুর পরও ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা সম্ভব হচ্ছে না কেন?

এবিষয়ে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, “এর পেছনে কে বা কারা জড়িত আপনারা ভাল করে জানেন। আমি কারো দিকে তাকাই না। আমার সাথে আল্লাহ আছেন, জনগণ আছে, কোন কিছু পরোয়া করি না।”

“সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আইন, আদালত সবই আমার পক্ষে আছে। তাই ফুটপাত দখলমুক্ত করে পরিচ্ছন্ন নগরী গড়তে এবার আরও শক্তভাবে মাঠে নামব।” যোগ করেন আরিফ।

এসময় তিনি বলেন, “শহরবাসীর চিত্তবিনোদনের জন্য জল্লারপারে ওয়াকওয়ে নির্মাণ ও ধোপাদিঘিকে পার্কে পরিণত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।”

বিগত সময় সরকারের কতটুকু সহায়তা পেয়েছেন আর এবার কতটুকু আশাবাদি? প্রশ্ন ছিল আরিফের কাছে।

এর জবাবে তিনি বলেন, “আমি যেহেতু জনগনের জন্য কাজ করছি, তাই জনগণ চায় আমি যেন মেয়াদ পূর্ণ করতে পারি এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখতে পারি। এ ব্যাপারে সরকার ও মিডিয়ার সহযোগিতা আশা করছি।”

ছবি: ইমতিয়াজ চৌধুরী

বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী খ্যাত সিলেট নগরীর নয়াসড়ক ও শেখঘাট এর দুটি জামে মসজিদ নতুন করে নির্মাণ করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী দেশ তুরস্ক। গতবছরের ডিসেম্বরে তুরস্কের একটি প্রতিনিধি দল মসজিদের স্থান পরিদর্শন করে।

তুরস্ক সরকারের অর্থায়নে এটিই হবে বাংলাদেশের প্রথম কোনো মসজিদ নির্মাণ। এবিষয়ে আরিফ বলেন, “যদি মসজিদ দুটি পুনঃনির্মাণ করা হয়, তাহলে এর নির্মাণশৈলী সবার নজর কাড়বে।”

নয়াসড়কে একটি চত্বর নির্মাণ করা হচ্ছে। কাজ প্রায় শেষের দিকে। এটিকে ‘মাদানি চত্বর’ নাম দেয়া হয়েছে।

মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, “আল্লামা হোসাইন আহমদ মাদানির (রঃ) নামে চত্বরটির নামকরণ করা হয়েছে।”