‘জাদুর চুলা’য় রান্না! (ভিডিও)

জাদুর চুলা

সুস্বাদু খাবার খেতে যতটা মজা, সে খাবার প্রস্তুত করাটা যে কত কঠিন কাজ তা কেবল একজন রাঁধুনীই ভালো জানেন। রান্নার পেছনে যেমন রাধুনীকে দিতে হয় যথেষ্ট সময়; ঠিক তেমনই মনোযোগের ব্যাঘাত ঘটলে তা আর সুস্বাদু থাকে না। তাই রান্না নিয়ে প্রায় প্রতিটি নারীকে (রাঁধুনী) থাকতে হয় একটু বেশি সচেতন।

আবার দেখা যায়, অনেক সময় খাবারের মাসলা-পাতি ঠিকঠাক থাকলেও একটু অসচেতনতার কারণে চুলার তাপ কম বেশির ফলে সুস্বাদু খাবারটি আর খাওয়ার যোগ্য থাকে না। শহর কিংবা গ্রাম; গৃহিনীদের রান্নার প্রধান উপকরণ চুলা ও জ্বালানি। আর এই জ্বালানি নিয়েই ভুগতে হয় অধিকাংশ গৃহিনীকে। শহুরে রাঁধুনীদের বড় বিপদে পড়তে হয় যখন চুলায় অর্ধসেদ্ধ ভাত থাকা অবস্থায় গ্যাস শেষ হয়ে যায়। আর গ্রামের রাঁধুনীদের জ্বালানি কাঠের চুলায় ধোঁয়া, কালি আর চোখের পানির মধ্যদিয়েই প্রস্তুত করতে হয় পরিবারের সদস্যদের তিনবেলার খাবার।রান্না ঘরের এমন ধকলে যদি কোনো রাধুনী মনে মনে আলাদিনের চেরাগের দৈত্যের সন্ধানও করেন, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। হয়তো তারা এমনও ভাবেন, ‘আহা যদি পাতিলে পানি আর চাল রেখে দিলেই ভাত হয়ে যেত, কতই না ভালো হতো!’ তবে রাঁধুনীদের এমন ভাবনা পুরোটা পূরণ না হলেও অনেকটাই পূরণ হচ্ছে!ভাবুন তো, যদি এমন হত, এক ঘণ্টার রান্না ১০ মিনিটে শেষ, রান্নার পাশে দিতে হচ্ছে না বেশি সময়। চুলা বন্ধ কিন্তু রান্না চলছে! হয়তো সবাই ভাববে, এটা রূপকথার আলাদিনের দৈত্যের পক্ষেই সম্ভব। কিন্তু না, বাস্তবেই এটা সম্ভব। বিজ্ঞানের যথার্থ ব্যবহার করে সেটা করা সম্ভব হচ্ছে। জার্মান ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশনের (জিআইজেড) সহায়তায় উদ্ভাবন করা হয়েছে এক বিশেষ ধরনের কুকার (চুলা)। যে কুকারে অনবরত জ্বালিয়ে সময় ও জ্বালানি খরচ করে রান্না করার প্রয়োজন হয় না। জিআইজেড সাসটেইনবল এনার্জি ফর ডেভেলমেন্ট (এসইডি) শীর্ষক কর্মসূচির মাধ্যমে জ্বালানি সাশ্রয়ী বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে সংস্থাটি উদ্ভাবন করেছে ‘রিটেইনড হিট কুকার’। কোনো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি কিংবা ইলেক্ট্রনিক মেশিনারিজের ব্যবহার হয়নি এই কুকারে। গৃহস্থালীর ব্যবহার্য এমন কিছু বর্জ্য যা পরিবেশের সঙ্গে মিশে যায় না বা কখনো নষ্ট হয় না সেগুলো দিয়েই এই কুকার তৈরি করা হয়েছে। জিআইজেড’র এসইডি প্রকল্পের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা (সিনিয়র অ্যাডভাইজার) আ.ন.ম জোবায়ের এই কুকারটি উন্নয়ন ও পরীক্ষামূলক ব্যবহার করেন। বর্তমানে এই কুকারটি গ্রাহক পর্যায়ে পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু হয়েছে।

কি জাদু রিটেইনড হিট কুকারে

গরম পানির ফ্ল্যাক্স কিংবা খাবার গরম রাখা হটপটের সঙ্গে সবাই মোটামুটি পরিচিত। রিটেইনড হিট কুকার ঠিক তেমন ধরনের একটি পাত্র। কাপড়ের তৈরি এই পাত্রটি দেখতে সাধারণ ব্যাগের মত। এই বিশেষ ব্যাগটির প্রধান কাজ হল ভেতরের তাপ বাইরে বের হতে না দেওয়া কিংবা বাইরের তাপকে ভেতরে প্রবেশ করতে না দেওয়া। তাপ ইনসুলেটেড (তাপ কুপরিবাহী) উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই বিশেষ কুকারটি। আর এসব উপকরণের মধ্যে রয়েছে নষ্ট হয়ে যাওয়া ককসিট, ফোম, জ্যাকেটের সিনথেটিক তুলা, খড়, ধানের তুষের মত উপকরণ। অনেকটায় বালিশের মত করে একটি কাপড়ের খোলসে পুরে দেওয়া হয় এসব উপকরণ। তারপর নির্দিষ্ট আকার দিয়ে তৈরি করা হয় এই কুকারটি।

যেভাবে রান্না হয়

 একেবারে জ্বালানি ছাড়া রান্না সম্ভব নয় এই কুকারে। এই কুকারে রান্নার শুরু করতে হয় সাধারণ গ্যাস, বিদ্যুৎ কিংবা কাঠের লাকড়ির চুলা থেকেই। যেমন যদি এই কুকারে ভাত রান্না করতে হয়, তাহলে প্রথমে পরিমাণ মত চালের সঙ্গে পরিমাণ মত পানি দিয়ে তা যে কোনো চুলাতে রেখে তাপ দিতে হবে। এরপর যখন পাতিলের পানি টগবগ করতে থাকবে ঠিক তখনই চুলা থেকে পাতিলটা উঠিয়ে নিয়ে তা এই কুকারের মধ্যে রেখে দিতে হবে। এরপর নির্দিষ্ট সময় পর রান্না হয়ে যাবে ঝরঝরা ভাত। ঠিক একই প্রক্রিয়ায় মাংস, মাছ, ডালসহ অন্যান্য তরকারিও প্রস্তুত করা সম্ভব এই কুকারে।

তাপ দেওয়া ছাড়া কেন কীভাবে রান্না হয় এই কুকারে সেই প্রশ্নই সবার মনে কাজ করে। তবে বিজ্ঞানের সহজ একটি ব্যাখার মাধ্যমে সেটা স্পষ্ট হয়। যে কোনো রান্নার প্রধান উপকরণ হল পানি। পানি ছাড়া কোনো খাবার পুড়িয়ে খাওয়ার বিকল্প নেই। কিন্তু এই পানি সর্বোচ্চ ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রায় উত্তপ্ত হতে পারে। এরপর পানি ফুটতে শুরু করে বাষ্পে পরিণত হতে থাকে। অর্থাৎ পানিকে এরপর যত তাপই দেওয়া হোক না কেন পানির তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের চেয়ে আর বাড়ানো সম্ভব না। তাই ভাত, মাছ, ডাল কিংবা মাংস যত খাবারই সেদ্ধ করা হোক না কেন সেগুলো শুধুমাত্র ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পানিতেই সেদ্ধ হয়। তবে একেক খাবার সেদ্ধ হতে একেক রকম সময় লাগে। এখন যদি পানিকে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উন্নীত করে আর কোনো তাপ না দিয়ে দীর্ঘ সময় এই তাপমাত্রা ধরে রাখা যায় তাহলে যেকোনো খাবারই সেদ্ধ করা সম্ভব ওই পানিতে। আর রিটেইনড হিট কুকারের কাজ হল ১০০ ডিগ্রি সেলিয়াস তাপমাত্রার পানিতে দীর্ঘক্ষণ একই তাপমাত্রা বজায় রাখা। আর এতে করে ওই পানিতে যে খাবার থাকে তা রান্না হয়ে যায়।

২০১৪ সালে পরীক্ষামূলকভাবে রিটেইনড হিট কুকারের উন্নয়ন করেন প্রকৌশলী আ.ন.ম জোবায়ের। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রান্নার প্রক্রিয়া থেকে লব্ধ জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে এই কুকার তৈরি করেন জোবায়ের। পরে আরো কিছু সংস্কার, ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে গ্রাহক পর্যায়ে ব্যবহার উপযোগী করে তোলেন তিনি।

প্রকৌশলী জুবায়েরের বলেন, ‘জিআইজেড মূলত বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি সাশ্রয় বিভিন্ন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও তার ব্যবহারে সহায়তা করে আসছে। এরই অংশ হিসেবে আমার উপর দায়িত্ব পড়ে এমন একটা চুলা উদ্ভাবনের যেটাতে জ্বালানি ও সময় দুটোই সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি পরিবেশেরও তেমন ক্ষতি হবে না।’

জোবায়ের বলেন, ‘অনেকটাই অফিসিয়াল অ্যাসাইনমেন্টের মত এই ধারণাটা নিয়ে আমি কাজ শুরু করি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রান্নার প্রক্রিয়াগুলো স্ট্যাডি করি। এরপর আমি রিটেইনড হিট কুকার তৈরি করি। প্রথমে এটি আমার নিজের বাসায় পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু করি। ফলাফল ইতিবাচক পাওয়ায় বিষয়টি আমি অফিসকে জানাই। তারপর এটাকে টেকনোলজিক্যালি আরো উন্নত করি।’

তিনি বলেন, ‘সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও ল্যাবের মাধ্যমে আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি এই কুকারের মাধ্যমে প্রায় ৫০ ভাগ জ্বালানি সাশ্রয় করা সম্ভব। এতে রাঁধুনীর সময় বাঁচে প্রায় ৭০ ভাগ। অর্থাৎ সাধারণ একটা চুলায় যদি কোনো খাবার প্রস্তুত করতে ৩০ মিনিট সময় লাগে, তাহলে এই কুকারে লাগবে মাত্র ১০ মিনিট।’

জোবায়ের বলেন, ‘মনে করুন সাধারণ চুলায় ভাত রান্না করতে সময় লাগে ৩০ মিনিট। একজন রাঁধুনীকে ভাত রান্না শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুরো সময়টা সেখানে ব্যয় করতে হচ্ছে। কিন্তু সাধারণ চুলায় প্রথমে ভাত রান্না বসিয়ে দিয়ে ৮-১০ মিনিট পর পানি ফুটতে শুরু করলে যদি পাতিলটা রিটেইনড হিট কুকারে বসিয়ে দেন, তাহলে ৩০ মিনিট পর পাতিলের চাল সেদ্ধ হয়ে ভাত রান্না হয়ে যাবে। কুকার রান্না করতে ৩০ মিনিট সময় নিলেও রাধুনীকে সময় দিতে হচ্ছে মাত্র ১০ মিনিট। বাকি সময়টা সে অন্য কাজে ব্যয় করতে পারবেন।’

প্রকৌশলী জোবায়ের জানান, পরীক্ষায় দেখা গেছে রিটেইনড হিট কুকারে খাবার ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত গরম থাকে। এই কুকারের মধ্যে যে পাত্র থাকে তা প্রতি ঘণ্টায় মাত্র ৫ ডিগ্রি করে তাপমাত্রা হারাতে থাকে। এতে করে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে খাবারে ব্যাকটেরিয়া আক্রমণের অনুকূল তাপমাত্রা অর্থাৎ ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে প্রায় ১০ ঘণ্টা সময় লাগে। কুকারটি একদিকে চুলা অন্যদিকে হটপট হিসেবেও ব্যবহার করা সম্ভব।’

জোবায়ের বলেন, ‘বর্তমানে তিনটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এই কুকার তৈরি ও বাজারজাত করছে। একইসঙ্গে একটি এনজিও এই কুকার নিয়ে কাজ করছে। চলতি মাসেই ইউএনএইচসিআর (ইউনাইটেড নেশন হাইকমিশনার ফর রিফ্যুজিস) আমাদের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে। চুক্তি অনুযায়ী প্রায় ১৫ হাজার কুকার রোহিঙ্গা রিফ্যুজি ক্যাম্পে আমরা সরবরাহ করব।’

প্রকৌশলী জোবায়ের আরো বলেন, ‘এই চুলায় রান্না যে না দেখবে, তাকে বিশ্বাস করানো কঠিন যে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার পানিতে রাখা চাল এই কুকারের মধ্যে রেখে দিলে তা কীভাবে ভাত রান্না হবে। গ্রামের অনেক মহিলার কাছে এটা জাদুর চুলা হিসেবে পরিচিত হয়েছে।’

ভিডিও