সিলেট হাই-টেক পার্ক নিয়ে কি ভাবছেন ব্যবসায়ী নেতারা?

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | মারজান হুসাইন চৌধুরী


বাংলাদেশের কয়েকটি যায়গায় ৪০টির মতো হাই-টেক পার্ক স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। এর মধ্যে কয়েকটি হাই-টেক পার্কের নির্মাণ কার্যক্রম শেষ হয়ছে বা শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

সিলেটেও হচ্ছে হাই-টেক পার্ক। এর প্রশাসনিক নাম ‘সিলেট ইলেক্ট্রনিক সিটি’। সিলেট শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় ১৬২.৮৩ একর জুড়ে নির্মাণ হচ্ছে এই হাই-টেক পার্ক।

সিলেট হাই-টেক পার্কে বর্তমানে ভূমি উন্নয়ন ও উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট কাজ বাংলাদেশ নৌ-বাহিনী পরিচালিত ডক-ইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড কর্তৃক বাস্তবায়িত হচ্ছে।

হাই-টেক কর্তৃপক্ষের কাজ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য জায়গা তৈরি করে দেওয়া। ২০১৯ সালের শুরুর দিকে হাই-টেক পার্কের সব কার্যক্রম শেষ হয়ে যাবে বলে দাবি করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের জনসংযোগ কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়া জানান, “এ প্রকল্প বাস্তাবায়িত হলে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।”

বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকও একই কথা বলেছেন।

সিলেট হাইটেক পার্কের পুরো নকশা

হাই-টেক পার্কটির প্রকল্প পরিচালক ব্যারিস্টার গোলাম সরওয়ার বলেছেন, “এখানে আসার সড়কটির অবস্থা খুবই খারাপ। প্রকল্প এলাকাটি নিম্নাঞ্চল হওয়ায় এখানে বালু মহল থেকে নৌ-পথে বালু এনে ভূমি উন্নয়নের কাজ করতে হচ্ছে।”

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, আইসিটি পার্ক এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক প্রকল্পসহ তিন ধরনের সুবিধা থাকবে। ইলেকট্রনিক পণ্য, যন্ত্রাংশ এবং সফটওয়্যার উৎপাদন করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানিই এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।

সিলেট হাই-টেক পার্কটি দু’ভাগে বিভক্ত থাকবে। একটি অংশে হার্ডওয়্যার এবং অপর অংশে থাকবে সফটওয়্যার।

এছাড়াও আবাসন, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, শপিং সেন্টারসহ ৪০টি স্থাপনা, সেবাপ্রতিষ্ঠান ও সুযোগ-সুবিধা থাকবে এই প্রকল্পে।

সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির (এসসিসিআই) সভাপতি খন্দকার সিপার আহমদ এবং এর অন্যতম পরিচালক মুকির হুসাইন চৌধুরী হাই-টেক পার্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর সাথে কথা বলেছেন।

সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির (এসসিসিআই) সভাপতি খন্দকার সিপার আহমদ

খন্দকার সিপার আহমদ সম্প্রতি লন্ডন সফর করেছেন। তিনি বলেন, “হাই-টেক পার্কের বিষয়ে প্রবাসীদের বিস্তারিত জানানোর জন্য আমি লন্ডন সফর করি। সেখানে এ বিষয়টি নিয়ে আমরা বৈঠক করি। এতে এমডি ও সচিবসহ প্রবাসীরাও যোগ দেন।”

“এই প্রকল্পের সুবিধার বিষয়ে অবগত হওয়ার পর প্রবাসীরা সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।” যোগ করেন তিনি।

দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রবাসীদের অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। তাই নতুন করে বড় ধরণের বিনিয়োগের বিষয়ে তাঁদের কিছুটা অনাগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে।

এবিষয়ে শিপার আহমদ বলেন, “তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা প্রবাসীরা আমাদের সাথেও আলাপ করেছেন। আর বিষয়টি আমরা অস্বিকার করছি না। এসব মূলত পার্সন টু পার্সন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। কিন্তু এটা একটা সরকারি প্রকল্প। এখানে ঝামেলা হওয়ার সুযোগ নেই।”

“এখানে কোন যায়গা বিক্রি করা হবে না, ইজারা দেয়া হবে।”

“অনেক সময় দেখা যায়, একেক যায়গায় একেকটি কল-কারখানা স্থাপনের ফলে নানান জটিলতা দেখা দেয়। কিন্তু এখানে আমরা সুনির্দিষ্ট ১৬৩ একর যায়গার মধ্যে সবকিছু করে ফেলতে পারছি।”

বিদ্যুৎ, পানি, ওয়ান স্টপ সার্ভিসের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, “এসব নিয়ে কোন ঝামেলায় পড়তে হবে না।”

সম্পূর্ণ কাজ শেষ হতে কত সময় লাগতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে খন্দকার শিপার বলেন, “বড় ধরণের কোন সমস্যা না হলে আমরা আশাবাদি ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে কাজ শেষ হবে।”

এদিকে, সিলেটের সাধারণ মানুষের দাবি হাই-টেক পার্ক প্রকল্পের কাজে যেন এই অঞ্চলের মানুষ অগ্রাধিকার পায়। বিশেষ করে এখানকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কথা যেন বিবেচনা করা হয়।

সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির (এসসিসিআই) অন্যতম পরিচালক মুকির হুসাইন চৌধুরী

এবিষয়ে সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম পরিচালক মুকির হুসাইন চৌধুরী বলেন, “বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মোটিভেশনের জন্য আমরা চিন্তাভাবনা করছি। এজন্য শীঘ্রই একটি ‘আইসিটি কর্মশালা’ করার বিষয়ে আলোচনা চলছে।”

এই প্রকল্পে সর্বোচ্চ বা সর্বনিম্ন বিনিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, “এরকম ধরাবাঁধা কোন কিছু নেই। ব্যক্তিগতভাবে অথবা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যে কেউ যেকোন পরিমাণ বিনিয়োগ এখানে করতে পারেন।”

সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির (এসসিসিআই) অন্যতম পরিচালক মুকির হুসাইন চৌধুরী

মুকির হুসাইন চৌধুরী আরও বলেন, “ইতিমধ্যে স্যামসং, হুন্দাই সহ অনেক বড় বড় কোম্পানি এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।”

এছাড়া, সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির পক্ষে এই প্রকল্পের আইটি বিষয় তিনিই দেখাশোনা করছেন বলে জানান।

সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির (এসসিসিআই) সভাপতি খন্দকার সিপার আহমদ

এদিকে, হাইটেক পার্ক ছাড়া আরও কিছু বিষয় নিয়ে আলাপ হয় এসসিসিআই’র প্রেসিডেন্টের সাথে।

এসময় সামনে আর কোন বড় প্রকল্প আসছে কি না, জানতে চাই সভাপতির কাছে।

তিনি জানান, “হরিপুরে ‘শ্রীহট্র ইকনমি জোন’ হচ্ছে। এটা হলে প্রবাসীদের আরও বেশি বিনিয়োগের সুযোগ থাকবে।”

সিলেটে মিল-কারখানা না হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “সড়ক ব্যবস্থার বেহাল দশা। ঢাকা-চট্রগ্রামের সাথে সড়কপথে যাতায়াত অনেক কষ্টের এবং ঝুঁকিপূর্ণ। ট্রেনেরও একই অবস্থা।”

প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটের এমএজি ওসমানী বিমানবন্দরে সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর দাবি করা হচ্ছে অনেকদিন থেকেই।

এই দাবির প্রেক্ষিতে গত মার্চে উদ্যোগ নেয় সরকার। তখন আমিরাত ভিত্তিক এয়ারলাইন্স ফ্লাই দুবাই’র ফ্লাইট চালু হয় এখান থেকে।

কিন্তু গত ৫ সেপ্টেম্বর থেকে কোন ধরনের পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই সিলেট-দুবাই রুটে ফ্লাইট বন্ধ করে দেয় ফ্লাই দুবাই।

বিষয়টি নিয়ে ক্ষুদ্ধ সিলেটের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে প্রবাসী ও ব্যবসায়ীরা।

খন্দকার শিপার বলেন, “সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরকে যদিও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বলা হয়। কিন্তু বিমান ছাড়া এখানে আর উল্লেখ্যযোগ্য ফ্লাইট নামে না। ফ্লাই দুবাইও সম্প্রতি ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে।”

“লন্ডন যেতে হলে সিলেট থেকে ঢাকা হয়ে যেতে হয়। এতে যাত্রিদের অনেক কষ্ট হয়ে যায়। ভোর পাঁচটার দিকে ফ্লাইট থাকে।”

“বাংলাদেশ বিমানের বহরে যুক্ত হওয়া ড্রিমলাইনার অন্তত এ রুটে দিলে ভাল হত। এবিষয়ে আমরা সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছি।”

“এটি করা হলে প্রবাসীদের আনাগোনা বাড়বে। বিনিয়োগ বাড়বে। পর্যটন শিল্পেরও বিকাশ ঘটবে।” যোগ করেন তিনি।

সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির (এসসিসিআই) সভাপতি খন্দকার সিপার আহমদ

তবে সম্প্রতি চালু হয়েছে সান্ধ্যকালীন ফ্লাইট। যদিও পুরো সপ্তাহ এই সুযোগ মিলবে না।

এবিষয়ে চেম্বার সভাপতি বলেন, “এটা ৭ দিন না করে ৫ দিন করা হয়েছে। প্রবাসীদের স্বার্থে বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের স্বার্থে ৭ দিনই ফ্লাইট দেয়া উচিৎ। এবিষয়ে আমরা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি।”

আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্যবসায় কিছুটা মন্দা বিরাজ করছে বলে দাবি করেছেন এই অঞ্চলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।

কিন্তু বিষয়টির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন ব্যবসায়ি সংগঠনের সভাপতি খন্দকার শিপার আহমদ।

তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক চলছে। যেহেতু সিলেটে বড় কল কারখানা তেমন একটা নেই, তাই এখানে এর প্রভাবও খুব একটা পড়ে না।”