ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | সাঈদ মুহাম্মাদ


মাসজিদুল আকসা। মুসলিমদের প্রথম ক্বিবলা এবং তৃতীয় পবিত্রতম স্থান। মহানবী হজরত মুহাম্মাদ  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র মিরাজের স্মৃতি বিজরিত মাসজিদ।

১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে তারা এই মসজিদকে ধ্বংস করার জন্য নানা ষড়যন্ত্র করে আসছে। ইহুদিরা জেরুজালেম ও মাসজিদুল আকসা থেকে মুসলিম সংস্কৃতির সব চিহ্ন মুছে দিতে চায়।

৫০ বছর আগে আজকের দিনে (১৯৬৯ সালের ২১ অগাস্ট) অস্ট্রেলিয়ান বংশোদ্ভূত জায়োনিস্ট ইহুদি ডেনিস মাইকেল রোহানের মাধ্যমে দখলদার ইসরাইল মাসজিদুল আকসায় আগুন লাগিয়ে দেয়।

বর্তমানে আল আকসা বলতে কিবালি মাসজিদ, মারওয়ানি মাসজিদ ও বুরাক মাসজিদের সমন্বিত অংশকে বুঝায়। আল আকসার মূল মাসজিদের আয়তন ৩৫ হাজার বর্গমিটার। এর এক তূতীয়াংশেরও বেশি সে আগুনে ভস্মীভূত হয়ে গিয়েছিল।

ডেনিস রোহান মাসজিদুল আকসার কিবালি অংশের দক্ষিণ পূর্বকোণে আগুন লাগিয়ে দেয়। অল্পসময়ের ভিতরেই আগুন মসজিদের সম্মুখভাগ, ছাদ, পিলার, খিলান, কার্পেট, বিরল সজ্জা এবং মসজিদের কোরআন ও সব সামগ্রীতে ছড়িয়ে পড়ে। ইহুদিরা তখন মসজিদে কিবালির আশেপাশে থেকে পানির সবগুলো লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেয়। অগ্নিনির্বাপন গাড়িগুলো আসতেও ইচ্ছাকৃত বিলম্ব করে। এ সময়ে ফিলিস্তিনিরা মসজিদের হাউজে সংরক্ষিত পানি এবং নিজেদের কাপড় চোপড় দিয়ে আগুন নেভানোর প্রাণান্তকর চেষ্টা করেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। মসজিদের ছাদ ধ্বসে পড়ে। মাসজিদুল আকসার গম্বুজের মূল দুটি স্তম্ভ ও খিলান ধ্বসে পড়ে। মিহরাব, গম্বুজের ভিতরের কারুকার্যখচিত অংশ, জিপসাম ও কাচের অলংকৃত ৪৮ টি জানালা পুড়ে যায়।

মাসজিদুল আকসা যখন ক্রুসেডারদের দখলে ছিল সে সময়ে সুলতান নুরুদ্দিন জঙ্গি এ পবিত্র মাসজিদের জন্য একটি মিহরাব বানিয়ে ছিলেন। তার আশা ছিল বাইতুল মাকদিস যখন পুনরায় মুসলিমদের অধীনে আসবে তখন মিহরাবটি তিনি নিজ হাতে মসজিদে স্থাপন করবেন। মাসজিদুল আকসা মুক্ত হওয়ার পূর্বেই সুলতান নুরুদ্দিন জঙ্গি মৃত্যুবরন করেন। তার মৃত্যুর পর যখন সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবি জেরুজালেম বিজয় করেন তখন তিনি নুরুদ্দিন জঙ্গির মিহরাবটি মসজিদে স্থাপন করে। এই আগুনে ঐতিহাসিক মিহরাবটিও পুড়ে যায়। এই মিহরাবটি ইতিহাস ও আবেগের স্থান থেকে ক্রসেডারডের বিরূদ্ধে বিজয়ের একটি প্রতীক হিসেবে গণ্য হত।

অগ্নীকাণ্ডের পর প্রথমে ইসরাইল দাবী করল বৈদ্যুতিক শর্ট সাকির্ট থেকে আগুন লেগেছে। পরে আরব ইঞ্জিনিয়ারগণ প্রমাণ পেলেন ইসরাইলের দাবী সত্য নয়। অতি দাহ্য পদার্থ দিয়ে কেউ আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল।

পরবর্তীতে চাপের মুখে ইচ্ছাকৃত আগুন দেওয়ার ঘটনা ইসরাইল স্বীকার করে। তারা ডেনিস মাইকেল রোহানকে বিচারের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেয়। কয়েকদিন যেতেই ইসরাইল ডেনিসকে মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি বলে প্রচার করে আক্কার একটা মানসিক হাসপাতালে তাকে ভর্তি করে দেয়। পরে তাকে নিরাপদে অস্ট্রেলিয়ায় আশ্রয় দেওয়া হয়। তখন ইহুদিদের ভিতরে একটা গুঞ্জন তৈরী করা হয় যে, “ডেভিড আল্লাহর সরাসরি প্রত্যাদেশ লাভ করে মাসজিদুল আকসায় আগুন দিয়েছিল।”

ইহুদিরা যেকোন মূল্যে জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী বানাতে চায় এবং মাসজিদুল আকসার বিদ্যমান কাঠামো ভেঙ্গে কথিত টেম্পল অব সুলেমানি নির্মাণ করতে চায়। এখন তারা মাসজিদুল আকসার নিচে সুরঙ্গ তৈরী করছে এটা পুরো মাসজিদ কমপ্লেক্সের ভিতকেই নড়বড়ে করে দিয়েছে।

২১ অগাস্ট ১৯৬৯ সালে মাসজিদুল আকসা ধ্বংস করার জন্য পরিকল্পিত ভাবে ইহুদিরা আগুন লাগিয়ে দেয়। এই ঘটনার পর ওআইসি, আলকুদস ফাণ্ড এরকম কিছু সংগঠন গড়ে ওঠে। কিন্তু এই সংগঠনগুলো এমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয় যা ভবিষ্যতে এরকম ঘৃণ্য তৎপরতাগুলোকে থামিয়ে দিতে পারে।

মসজিদে কিবালি আগুনে ভস্মীভূত হওয়ার একবছর পর আল আকসা পুণ:নির্মাণ সংস্থা গঠিত হয়। এই সংস্থার তদারকীতে ১৯৮৬ সালে আল আকসার পুণ:ণির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়। পুড়ে যাওয়া নুরুদ্দীন জঙ্গির মিম্বরের স্থানে প্রথমে একটি লোহার মিম্বর বসানো হয়েছিল পরে ২০০৬ সালে জর্দান সরকার নুরুদ্দিন জঙ্গির মিম্বরের আদলে একটি মিম্বর তৈরী করে মাসজিদুল আকসায় স্থাপন করে।

মুসলিমদের প্রথম কিবলা মাসজিদুল আকসায় যেদিন আগুন দেয়া হল। তৎকালীন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মীর তাৎপর্যপূর্ণ একটি মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেন, “যে দিন মাসজিদুল আকসা ভস্মীভূত হল আমি সে রাতে ঘুমোতে পারিনি। মনে হয়েছিল আজ হয়তো ইসরাইল চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে। কিন্তু সকাল পর্যন্ত যখন কিছুই ঘটলো না তখন আমি বুঝতে পারলাম, আরবরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে।”
আরবদের সেই ঘুম কি আজো ভেঙ্গেছে?

সূত্র : আল জাজিরা