আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী  |  রাষ্ট্রচিন্তক ও গবেষক


(প্রথম কিস্তি)

পরাশক্তিদের বধ্যভূমি বলে খ্যাত আফগানিস্তান নিয়ে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ষড়যন্ত্র এখন ডালপালা মেলছে সংগোপনে। ইরান, পাকিস্তান, চীন, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, ও তুর্কমেনিস্তানের মধ্যস্থলে ভূ-বেষ্টিত মালভূমির উপর দাঁড়ানো আফগানিস্তানের চিত্র সমসাময়িককালে হাজার সংঘাতের মোহনা যেন। আফগানিস্তানের পূর্বে ও দক্ষিণে পাকিস্তান, পশ্চিমে ইরান, উত্তরে তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তান এবং উত্তর-পূর্বে গণচীন। বিশ্ব-মানচিত্রে আফগানিস্তান আলোচনায় আসে ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত-আগ্রাসনের পর।

ভৌগলিকভাবে আফগানিস্তান কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে, তা তার চৌহদ্দি থেকে প্রতীয়মান হয়। গত ২৯ শে ফেব্রুয়ারী তালিবান ও আমেরিকার মধ্যে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের একটি চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে আফগানিস্তান নিয়ে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ষড়যন্ত্রের বিষয়টি সামনে আসে। এর আগেও যে ষড়যন্ত্র ছিলো না, তা নয়। তবে, আফগানিস্তানকে কাগজে নামমাত্র স্বাধীন রেখে যেসব দেশ বা শক্তি আফগানিস্তান থেকে মধু আহরণের স্বপ্নে বিভোর ছিলো, তারাই তালিবানের এ কূটনৈতিক উত্থানে বিপর্যস্ত ও বিধ্বস্ত হয়ে ষড়যন্ত্রের নতুন স্বপ্ন দেখা শুরু করেছে। এ ষড়যন্ত্রে রয়েছে, খোদ চুক্তির প্রধানপক্ষ আমেরিকা, ইরান, ভারত ও ইসরাঈল। আর ভেতর থেকে কাজ করছে, বাইরের শক্তিগুলোর মুনাফালোভীরা।

ক’দিন থেকে অনলাইনে বিভিন্ন খবর, আলোচনা ইত্যাদি দেখছিলাম আফগানিস্তান নিয়ে। আমাদের এখানে, যেখানে বস্তুনিষ্ঠ লেখালেখির জায়গাটা দখল করে আছে ফরমায়েসী আর একচোখা লেখার আধিপত্য—সেখানে পাঠকশ্রেণী যে অখাদ্য-কুখাদ্যে আক্রান্ত হবেন, তা বুঝতে সমস্যা হবার কথা নয়। বলাবাহুল্য, চুক্তি যেটি হলো, তাতে প্রধান প্রত্যক্ষপক্ষ তালিবান ও দখলদার আমেরিকা এবং তৃতীয় অলিখিত পক্ষ হলো, পাকিস্তান। সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন, পাকিস্তান না হলে হয় তো এ চুক্তি হতো না। চুক্তি সম্পাদনের দিন যারা কাতারের রাজধানী দোহায় মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী মাইক পাম্পেও’র বক্তব্য শুনেছেন, তারা বিষয়টি বুঝবেন। চুক্তির পরদিনই পাক-পরাষ্ট্রমন্ত্রী চুক্তির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের সম্পর্কে সতর্ক থাকতে বলেন। পাকিস্তানের এ সতর্কীকরণ নিছক কোন কৌশল ছিলো না। যেহেতু পাকিস্তান আফগানিস্তানের প্রতিবেশী এবং তালিবানের মিত্রপক্ষ, তাই পাকিস্তান বোঝে, ষড়যন্ত্র কোথায়-কোথায় বাস করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে পাকিস্তানের ইশারা প্রধানত ভারত বলে উল্লেখ করা হয় যা সামগ্রিক তথ্যপ্রমাণ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়।

এখন যে দু’টো বিষয় চিন্তার ভাঁজ ফেলছে, সেগুলো হলো—ষড়যন্ত্র ও আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ। চুক্তির পূর্বাপর ষড়যন্ত্র নিয়ে আমি পূর্ববর্তী লেখায় কিছু আলোচনা করেছি। তবুও বলতে হচ্ছে, ষড়যন্ত্র যা হচ্ছে, তা দু’ভাগে বিভক্ত: এক, আঞ্চলিক (Regional) দুই, আন্তর্জাতিক (International)। প্রথমত, মনে রাখতে হবে, আফগানিস্তান দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের (South East Region) একটি দেশ। দেশটির চৌহদ্দি সম্পর্কে আমি ধারণা দিয়ে এসেছি। এখানে একটি কথা বলে রাখা ভালো। আমি ‘ষড়যন্ত্র’ শব্দ উল্লেখ করেছি প্রভাব এবং স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতার দৃষ্টিতে। কথাগুলো বুঝতে মানচিত্র ও আফগানিস্তানের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর স্বার্থের বিষয় উপলব্ধিতে থাকতে হবে। তবে এই স্বার্থ ও প্রভাব কোন্ বিন্দুকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়, তা না বুঝলে লেখার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। বিন্দুটি হচ্ছে, আলোচিত দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও ভৌগলিক গুরুত্ব। আধিপত্যবাদ (Hegemony) বলুন, সাম্রাজ্যবাদ (Imperialism) বলুন অথবা সম্প্রসারণবাদ (Expansionism) বলুন—ও দু’টো বিষয় সবসময় লক্ষ্যবস্তু হয়ে থাকে। ১৯৭১ সালে ভারত তৎকালীন পাকিস্তানকে ভাগ করতে সক্রিয় হয়েছিলো, বাংলাদেশের ভেতরের সোনার খনি লুট করতে নয়; ভৌগলিক কারণে। এর পেছনে ছিলো, ভারতের নিজস্ব নিরাপত্তার স্বার্থে বিরূপরাষ্ট্র হিসাবে বিবেচিত প্রতিবেশী অংশকে বিচ্ছিন্ন করে পাকিস্তানী প্রভাব রোধপূর্বক ভারতীয় আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠা করা। আফগানিস্তানের বিষয়টিও এমনই প্রভাব ও স্বার্থের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে আছে।

এবার আসি আফগানিস্তানের আঞ্চলিক গুরুত্ব কতোখানি—তা বিবেচনা করতে। এ প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে,–“…………. Afghanistan lies at the crossroads of the Middle Eastern, Central Asian, and South Asian security environments. It was crafted not as a nation-state but as a buffer zone intended to separate the then dominant regional powers Britain, Russia, and Persia. Today, Afghanistan is more of a connector between the surrounding security environments than an insulator. It draws together various security-related issues and spills them over to all bordering regions. Furthermore, today‘s regional powers in the broader neighbourhood around Afghanistan—Iran, Pakistan, India, Russia, Uzbekistan, China, and Japan—are all involved in the country‘s affairs. The geo-political position of Afghanistan, because of the various developments in the neighbourhood, had gradually emerged as a third and major aspect governing Indo-Afghan relations.” ( analysis: India’s Involvement in Afghanistan: An Analytic Perspective of Current Interests and Future Prospects, P-289,—Dr. Naseema Akhter and Arif Hussain Malik, Sr. Associate Professor, Department of Political Science, University of Kashmir, Research Scholar, Department of Political Science, University of Kashmir, 2016 .)

(……….. আফগানিস্তান মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য-এশীয় এবং দক্ষিণ-এশীয় নিরাপত্তা-বলয়ের চৌরাস্তাতে অবস্থিত। এটি একটি জাতি-রাষ্ট্র হিসাবে নয়, বরং তৎকালীন প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তি ব্রিটেন, রাশিয়া এবং পারস্যকে পৃথক করার উদ্দেশ্যে নিরাপত্তা-অঞ্চল হিসাবে তৈরি হয়েছিল। আজ, আফগানিস্তান একটি অন্তরক-ভূমির চেয়ে আশেপাশের নিরাপত্তা-বলয়ের মধ্যে অধিকতর সংযোগকারী একটি দেশ। এখানে সুরক্ষা-সংক্রান্ত বিভিন্ন ইস্যু একত্রিত হয়ে তা সমস্ত সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বিস্তৃত হয়। তদুপরি, আজকের আফগানিস্তানের আশেপাশের বিস্তীর্ণ প্রতিবেশী অঞ্চলের আঞ্চলিক শক্তি — ইরান, পাকিস্তান, ভারত, রাশিয়া, উজবেকিস্তান, চীন এবং জাপান, সকলেই দেশটির সাথে জড়িত। আফগানিস্তানের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান, আশেপাশের প্রতিবেশী দেশগুলোর বিভিন্ন পরিবর্তনের কারণে ক্রমে ভারত-আফগান সম্পর্কে আধিপত্যকারী তৃতীয় এবং প্রধান দৃষ্টিভঙ্গী হিসাবে আবির্ভূত হয়।)

প্রথমেই আসা যাক, আফগানিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদ বা Natural Resource নিয়ে। নেটতথ্য থেকে জানা যায়, আফগানিস্তানে ছোট আকারে মণি, সোনা, তামা ও কয়লা উত্তোলনের ইতিহাস থাকলেও প্রণালীবদ্ধভাবে খনিজ আহরণ ১৯৬০-এর দশকের আগে শুরু হয়নি। ১৯৭০-এর দশকে দেশটির উত্তরাঞ্চলে প্রাকৃতিক গ্যাসের উল্লেখযোগ্য মজুদ আবিষ্কৃত হয়। এছাড়া পেট্রোলিয়াম ও কয়লাও এখানে পাওয়া যায়। দেশটিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে তামা, লোহা, বেরাইট, ক্রোমাইট, সীসা, দস্তা, গন্ধক, লবণ, ইউরেনিয়াম ও অভ্রের মজুদ আছে। তবে সোভিয়েত আক্রমণ এবং তৎপরবর্তী গৃহযুদ্ধের কারণে আফগানিস্তান এই খনিজ ও জ্বালানি সম্পদের সদ্ব্যবহার করতে পারেনি। অদূর ভবিষ্যতে এগুলি নিষ্কাশনের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। বহু শতাব্দী ধরে আফগানিস্তান দুষ্প্রাপ্য ও অর্ধ-দুষ্প্রাপ্য পাথরেরও একটি উৎসস্থল, যাদের মধ্যে আছে নীলকান্তমণি, চুনি, নীলা ও পান্না।…. ২০০৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপসংস্থা (United States Geological Survey বা USGS) প্রাক্কলন করে যে, উত্তর আফগানিস্তানে গড়ে ২৯০ শত কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত খনিজ তেল, ১৫.৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস এবং ৫৬ কোটি ব্যারেল প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে প্রাপ্ত তরল আছে।

আরেকটি সূত্রে জানা যায়– “ইংল্যান্ডের সানডে টাইমস পত্রিকার এক খবরে বলা হয়, ইতোপূর্বে অজানা ছিল বর্তমান বাজার মূল্যে এমন এক ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের নতুন খনি আবিষ্কার করেছে পেন্টাগণ। পেন্টাগণ কর্মকর্তারা বলছেন, অংকটি এখানে মুখ্য নয়। আসল কথা হলো, কি বিপুল পরিমাণ খনিজ সম্পদ এখানের মাটির নিচে লুকিয়ে আছে সেই খবর। অবশ্য আফগানিস্তানের এই বিপুল খনিজসম্পদের খবর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সে দেশের ব্যবসায়ী মহলের জানা ছিল সোভিয়েট রাশিয়া-আফগান যুদ্ধের আগ থেকে। ১৯৭০ ও ১৯৮০’র দশকে সোভিয়েট ইউনিয়নের পরিচালিত জরিপে দেশটিতে (ইউরেশিয়া অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে বিশাল) লোহা, তামা, সোনা, রূপা, উচ্চমানের ক্রোম, ইউরেনিয়াম, বেরিল, বেরিট, সীসা, জিংক, ফ্লোরোশপার, বক্সাইট, এমারল্ড, টাইটালাম ও লিথিয়ামের সন্ধান পাওয়া যায়। ১৯৮৪ সালে মাইনিং জার্নালে এই জরিপ রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। ২০০২ সালে ক্রেমলিন এই বিষয়টি খোলামেলাভাবে স্বীকার করে নেয়।……..১৯৫০’র দশকের আগে কোনো বিদেশী অপশক্তি ও তার দোসরদের কেউ দেশটির মাটির নিচে কি আছে সে সম্পর্কে জানারও সুযোগ পায়নি। সারা আফগানিস্তানে ছড়িয়ে থাকা হিন্দুকুশ পর্বতশ্রেণী এই সম্পদের ভাণ্ডার। গত ৪০ বছরে দেশটিতে যে গুটিকয়েক খনি আবিষ্কার হয়েছে তার সবই অবিশ্বাস্য রকমের বিশাল। এর অনেকগুলোর খবর দীর্ঘদিন গোপন রাখা হয়। এখানে আছে মূল্যবান পাথরের খনি। রাজধানী কাবুলের ৪০ কিলোমিটার দূরে হেলমান্দ প্রদেশের আইনাকে প্রাপ্ত তামার খনি তা ইউরেশিয়া অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে বড়। আর বামিয়ান প্রদেশের হাজিজাকে রয়েছে উন্নতমানের লোহার আকরিক। এখানকার মজুত ৫০ কোটি টন বলে প্রাথমিক হিসাবে জানা গেছে। এর অদূরেই পাওয়া গেছে কয়লার বিশাল ভাণ্ডার।

আফগানিস্তানকে বলা হয় তেল-গ্রাসের ট্রানজিট রাষ্ট্র। ১৯৬০’র দশকে সোভিয়েট ইউনিয়ন বিপুল গ্যাস মজুদের সন্ধান পায় এখানে। তবে দেশটির খুব কম মানুষই এ খবর জানতো। এই গ্যাস পরিবহনের জন্য প্রথম পাইপ লাইন নির্মাণ করে সোভিয়েটরা। তখন এই লাইনের মাধ্যমে বছরে আড়াই বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস নিয়ে যাওয়া হতো উজবেকিস্তানে। সে সময় সোনা, ফ্লুরাইট, বেরিট ও খুবই বিরল ধরনের মার্বেল খনি আবিষ্কৃত হয় এখানে। কাবুলের পূর্ব দিকে প্যাগমেটাইটের যে খনি আবিষ্কৃত হয়েছে তা সত্যিই বিস্ময়কর। রুবি, বেরেলিয়াম, এমারল্ড, কুনজাইট এবং হিডেনাইটের যে খনি পাওয়া গেছে তেমনটা বিশ্বের কোথায়ও দেখা যায় না। মূল্যবান পাথরের এসব খনি শত-শত মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত। পাহাড়ে পাথরের সাথে মিশে আছে বেরেলিয়াম, থোরিয়াম ও টেনটালামের মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ। বিমান ও মহাকাশ যান নির্মাণে এসব পদার্থ ব্যবহার করা হয়।

বিশ্বের ভূ-রাজনীতিতে আফগানিস্তানের গুরুত্ব, এর অবস্থানের কারণে। ২০০১ সালে মার্কিন বাহিনীর আফগানিস্তান দখলকে অনেকে এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করেন। কাস্পিয়ান সাগর অববাহিকা থেকে আরব সাগর পর্যন্ত ভূখণ্ডের উপর কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য মার্কিন অপশক্তি দেশটিতে সামরিক অভিযান চালায় বলে তারা মনে করেন। বেশ কয়েকটি ট্রান্স-আফগান তেলগ্যাস পাইপ লাইন নির্মাণেরও পরিকল্পনা নেয়া হয়। এর মধ্যে ৮০০ কোটি ডলার ব্যয়ে এক হাজার ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ তুর্কমেনিস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতকে সংযুক্তকারী পাইপ লাইন প্রকল্পও রয়েছে।”(দৈনিক সংগ্রাম, ১৪ই মার্চ, ২০১৪)

(চলবে)

Comments are closed.