আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র (দ্বিতীয় পর্ব)

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী | রাষ্ট্রচিন্তক ও গবেষক


(দ্বিতীয় কিস্তি)

এবার আসুন আফগানিস্তানের আঞ্চলিক দেশগুলো নিয়ে আলোচনা করি। প্রথমেই বলি পাকিস্তানের কথা। বলে রাখা দরকার, পাকিস্তান আফগানিস্তানের সর্ববৃহৎ সীমান্ত-প্রতিবেশী। পাকিস্তানের সাথে মিশে আছে আফগানিস্তানের ২,৪৪০ কি.মি’র দীর্ঘ সীমান্ত। সংগতকারণে, আফগানিস্তান পাকিস্তানের জন্য সবসময়ই সংবেদনশীল। আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বড় স্বার্থ–স্থিতিশীলতা। ধরুন, আপনার লাগোয়া প্রতিবেশীর ঘরে যদি নিত্য ঝগড়া লেগে থাকে, আপনি কি স্বস্তিতে-শান্তিতে থাকতে পারবেন? তাই আপনার শান্তির স্বার্থে আপনার প্রতিবেশীর ঘর নির্বিঘ্ন থাকতে হবে। ঠিক তেমনি আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতা পাকিস্তানের জন্য পর্বশর্ত যেমনটা ১৯৭১ সালে ভারত বলেছিলো, তার প্রতিবেশীর অস্থিতিশীলতায় সে নীরব থাকতে পারে না। সে-সময় যেমন বাংলাদেশের বিপুল শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নেয়, তেমনি ১৯৭৯-তে আফগানিস্তানে সোভিয়েত-আগ্রাসনের পর এবং ২০০১-এ মার্কিন আগ্রাসনের পর থেকে পাকিস্তানেও বিপুল আফগান শরণার্থী অবস্থান নেয়। ১৯৭১ সালে যেমন ভারতের কথায় পশ্চিম পাকিস্তান পূর্বপাকিস্তানকে ব্যবহার করে ভারতকে অস্থিতিশীল করতে সচেষ্ট ছিলো, তেমনি ভারতও আফগান-মাটি ব্যবহার করে আজ পর্যন্ত পাকিস্তানকে অস্থিতিশীল করে আসছে। সূতরাং, যে যুক্তি ১৯৭১ সালে হালাল ছিলো, তা একই নিয়মে আজও হালাল। অতএব, আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতা পাকিস্তানের বড় স্বার্থ।

এবার আমরা আলোচনা করবো ইরান, রাশিয়া, ভারত ও চীনের স্বার্থ নিয়ে।স্মরণে রাখা দরকার, ইরানের সাথে আফগানিস্তানের সীমান্ত ৯৩৬ কি.মি.।আফগানিস্তানে ইরানের স্বার্থ সম্পর্কে বলা হচ্ছে,—One of Iran’s main objectives is to create an economic sphere of influence in Afghanistan, with the ultimate goal of becoming a powerful strategic focal point for the transport and shipment of goods and services linking the Persian Gulf, Central Asia and the Far East. Iran also projects influence in Afghanistan through economic initiatives and various religious programs. The bulk of Iranian investment is in the Herat region and involves infrastructure projects, road and bridge construction, education, agriculture, power generation, and telecommunications projects. Iran has helped rebuild Afghanistan’s radio and television infrastructure, and has increased its own radio and television programs in Dari. (Iran’s Ambiguous Role in Afghanistan, MARCH 2010, VOLUME 3, ISSUE 3, SAJJAN M. GOHEL)

(ইরানের প্রধান লক্ষ্যগুলির একটি হ’ল আফগানিস্তানে একটি অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি করা, যার মাধ্যমে পার্সিয়ান উপসাগর, মধ্য-এশিয়া এবং সুদূর পূর্বের সংযোগ স্থাপন করা পণ্য ও সেবা পরিবহনের জন্য একটি শক্তিশালী কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন। অর্থনৈতিক উদ্যোগ এবং বিভিন্ন ধর্মীয় কর্মসূচির মাধ্যমেও ইরান আফগানিস্তানে তার প্রভাব পরিচালনা করে। বেশিরভাগ ইরানি বিনিয়োগ হেরাত অঞ্চলে এবং অবকাঠামো প্রকল্প, সড়ক ও সেতু নির্মাণ, শিক্ষা, কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং টেলিযোগাযোগ প্রকল্পের সাথে জড়িত। ইরান আফগানিস্তানের রেডিও ও টেলিভিশন অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে সহায়তা করেছে এবং দারিতে নিজস্ব রেডিও ও টেলিভিশন সম্প্রচার বাড়িয়েছে।)

রাশিয়া তৎকালীন সোভিয়েত য়ুনিয়নের সময় আফগানিস্তানের সাথে সীমান্ত থাকলেও এখন অবশ্য নেই। তবুও আফগানিস্তানে সৈন্য প্রেরণের কারণে রাশিয়া এখনও আফগানিস্তানপ্রশ্নে আলোচিত। বিশেষ করে, দখলদার মার্কিন সৈন্য বিতাড়নে রাশিয়ার পরোক্ষ ভূমিকা আলোচিত হয়ে আসছে। আফগানিস্তানে রাশিয়ার স্বার্থ ও প্রভাব নিয়ে এশীয় অঞ্চলে বরাবরই কথা ওঠে। আসলে বর্তমান আফগানিস্তান নিয়ে রাশিয়ার দৃষ্টিভঙ্গী হলো,–While regionalization of Russia’s policy on Afganistan is a trend of the 2010s, it’s three other main features have endured throughout the 21st century. First, for Russia, Afganistan is not so much an issue of interest but mainly an important part of a larger, complex regional setting. Second, the main focus of Russia’s regional policy is on central Asia, not Afganistan. Third, Russian’s main interest in Afganistan and surrounding region is not geo-economics. Russian investment even in the economic development of central Asia is relatively limited. …………. Russia’s main concern’s about Afganistan are security related, and driven by a combination of genuine security interest and geopolitics. ( Russian’s Afgan Policy In the Regional And Russia-West contexts, P-10, Ekaterina Stepanova, May 2018, NIS Center)

(২০১০’র দশকে যখন রাশিয়ার আফগান-নীতিকে আঞ্চলিকীকরণ করার একটা প্রবণতা ছিলো, তাদের আরও তিনটি প্রধান লক্ষ্য পুরো একবিংশ শতাব্দী জুড়ে বিকশিত হয়েছে। আফগান-ইস্যু রাশিয়ার জন্য খুব একটা আগ্রহের বিষয় নয়, অবশ্য বৃহত্তর ও জটিল আঞ্চলিক বিন্যাসের অংশ হিসাবে আফগানিস্তান রাশিয়ার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক নীতিতে রাশিয়ার প্রধান-দৃষ্টি মধ্য-এশিয়ার দিকে, আফগানিস্তান নয়। তৃতীয়ত, আফগানিস্তান ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে রাশিয়ার প্রধান আগ্রহ ভূ-অর্থনৈতিক নয়। মধ্য-এশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নে রাশিয়ার বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে কম।………..আফগানিস্তান নিয়ে রাশিয়ার মূল-উদ্বেগটা কিন্তু নিরাপত্তা বিষয়ে এবং সেটা নিরাপত্তাগত স্বার্থ ও ভূ-রাজনীতির সমন্বয়ে পরিচালিত।)

আফগানিস্তানের আঞ্চলিক প্রতিবেশী ভারতের স্বার্থ ও প্রভাব নিয়ে অনেক বলা হয়েছে। মনে রাখা দরকার, ভারত কিন্তু আফগানিস্তানের সরাসরি সীমান্ত-প্রতিবেশী নয়। কিন্তু ২০০১ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন হামলার সুযোগে ভারত তার বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য প্রবেশ করে। তথ্য থেকে দেখা যায়, দুই স্তরের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ভারত আফগানিস্তানে প্রবেশ করে এবং বিশাল অর্থনৈতিক বিনিয়োগে লিপ্ত হয়। প্রথম স্তরের উদ্দেশ্য হলো:

১.পাকিস্তানের প্রভাব প্রতিহতকরণ (Countering Pakistan)।

২.চীনের প্রভাব রোধ করা (Containing Chinese influence)।

৩.ইসলামী উগ্রবাদ রোধ করা (Containing Islamist Extremism)।

দ্বিতীয় স্তরের উদ্দেশ্য হলো, আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে তেলসমৃদ্ধ মধ্য-এশিয়ায় প্রবেশ করা। এ জন্য ভারতের পরিভাষায় আফগানিস্তান A Bridge to Central Asia বা মধ্য-এশিয়ার সেতুবন্ধন।বলা হচ্ছে,– “Afghanistan is also viewed as a gateway to the Central Asian region where India hopes to expand its influence. Afghanistan is the gateway of oil rich Central Asian Republics (CARs) but India does not have direct land passage towards CARs; it has to depend on Afghanistan to access CARs. The penetrating influence of India has advantage for India that it acts like a bridge to enter into CARs.”

( analysis: India’s Involvement in Afghanistan: An Analytic Perspective of Current Interests and Future Prospects, P-289, Dr. Naseema Akhter and Arif Hussain Malik, Sr. Associate Professor, Department of Political Science, University of Kashmir, Research Scholar, Department of Political Science, University of Kashmir, 2016 .)

(আফগানিস্তানকে মধ্য-এশীয় অঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসাবেও দেখা হয়, যেখানে ভারত তার প্রভাব বাড়ানোর আশা করে। আফগানিস্তান তেল সমৃদ্ধ মধ্য-এশীয় প্রজাতন্ত্রগুলোর প্রবেশদ্বার (সিএআর)। তবে ভারতের সিএআর-এর দিকে সরাসরি ঢোকার পথ নেই। তাই, ভারতকে তেলসমৃদ্ধ মধ্য-এশীয় অঞ্চলে ঢুকতে আফগানিস্তানের উপর নির্ভর করতে হবে। সূতরাং, আফগানিস্তানে ভারতের প্রভাব মধ্য-এশীয়াতে ঢুকতে ভারতকে সেতু-বন্ধনের বাড়তি সুবিধা দেবে।)

পাঠক, এবার আমরা চূড়ান্ত আলোচনার দিকে পা বাড়াবো। আশা করি উপরের পর্যালোচনা থেকে আফগানিস্তানের লোভনীয় অংশ ও পার্শ্ববর্তী আঞ্চলিক-শক্তিমূহের স্বার্থচিত্র সম্পর্কে আমরা অবগত হলাম। আগেই বলেছি, প্রাকৃতিক সম্পদ ও ভৌগলিক গুরুত্ব একটি ভূখণ্ডের জন্য কাল হতে পারে। এখানে মনে রাখতে হবে, আমেরিকা যদিও দূরের দখলদার কিন্তু আমেরিকা জানে আফগানিস্তানের গর্ভে কী লুকিয়ে আছে আর কিইবা তার আঞ্চলিক গুরুত্ব। আল কায়েদা, উসামা বিন লাদেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ইত্যকার যেসব কথা বলে আমেরিকা আফগানিস্তান ও ইরাকে ঢুকেছে—সেগুলো একটা ধোঁকা; আসল বিষয় হলো, প্রাকৃতিক সম্পদ লুট ও ভৌগলিক গুরুত্বে আধিপত্য অর্জন। কিন্তু আফগানিস্তান ও ইরাকে আমেরিকা অনেকটা ব্যর্থই বলা চলে। তবে আমেরিকার জন্য সবচেয়ে কলঙ্কের বিষয় হলো—আফগানিস্তান। এই প্রথম পরাশক্তি আমেরিকা কোন রাষ্ট্র নয়, তাদের-ই কথায় একটি সন্ত্রাসীগোষ্ঠী তালিবানের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে চুক্তির মাধ্যমে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হলো। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আজ স্বীকার করতে বাধ্য হলেন এই বলে: And I’ll say this for the Taliban, they’re great fighters, you know that obviously they’re great fighters.(আমি তালিবানদের ক্ষেত্রে এ কথাই বলবো, তাঁরা মহান যোদ্ধা, আপনারা অবশ্যই সকলে জানেন, তাঁরা দুর্দান্ত যোদ্ধা।)

বলাবাহুল্য, গত ২৯শে ফেব্রুয়ারী কাতারের রাজধানী দোহাতে আমেরিকা তালিবানের সাথে এক ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করলো। ‍চুক্তির পর থেকেই প্রকাশ পেতে শুরু করলো ষড়যন্ত্রের নানা ডালপালা। ষড়যন্ত্র অবশ্য আগে থেকেই ছিলো, তবে প্রকাশ পায়নি প্রকটভাবে। আগে ষড়যন্ত্র হয়েছে চুক্তির স্বাক্ষর বানচাল করতে, আর এখন হচ্ছে চুক্তির বাস্তবায়ন ঠেকাতে। সবকিছুর কারণ ঐ দুই বিষয়। প্রশ্ন হলো, কারা ষড়যন্ত্র করছে? সে উত্তর এখন প্রচুর জানাশোনা হয়ে গেছে। এদের প্রথম পরিচয়—এরা আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তি যারা আফগানিস্তানের সম্পদ লুট করার দীর্ঘমেয়াদী সুযোগ চায় এবং আফগানিস্তানের বুকে ঘাঁটি গেড়ে আঞ্চলিক আধিপত্য অর্জন করতে চায়। এদের মধ্যে আছে আমেরিকার নেতৃত্বে পাশ্চাত্য এবং ভারত ও ইরান। গত ২০১৪ সালে তৎকালীন আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আফগান-সম্পদ লুন্ঠনের একটি অভিযোগ করেন সাংবাদিকদের কাছে। প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করে বলেন: ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে যুদ্ধ করছে দেশটির মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা মহামূল্যবান সম্পদ অধিকারের জন্য। এর পেছনে অন্য কোনো কারণ নেই। তিনি বলেন, আফগানিস্তানে মার্কিনীদের তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ আসলেই লোক দেখানো। মার্কিনীরা সবকিছু করছে নিজেদের স্বার্থেই। দখলদার বাহিনী দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠনের সুযোগ খুঁজছে। মার্কিন দখলদার অপশক্তি চাপ দিয়ে লোক দেখানো চুক্তির মাধ্যমে কারজাইয়ের কাছ থেকে খনিগুলোর মালিকানা দখল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে (দৈনিক সংগ্রাম, ১৪ মার্চ, ২০১৪)।

(চলবে)

Comments are closed.

%d bloggers like this: