আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র (শেষ পর্ব)

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী | রাষ্ট্রচিন্তক ও গবেষক


(তৃতীয় ও শেষ কিস্তি)

আগে বলে এসেছি, আফগানিস্তান আঞ্চলিক শক্তি ও পরাশক্তির স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতার বলি হচ্ছে।এ কারণেই সম্পাদিত চুক্তির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে যেন আফগানিস্তান হাত থেকে ফসকে যেতে না পারে।এখানে ভারত একটি ভয়ানক ফ্যাক্টর।আফগানিস্তানকে ভালো করে চুষবার জন্য ভারত ২০০২ সালে আমেরিকার ছত্রছায়ায় কাবুলের পুতুল সরকারের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলে। ভারতের উদ্দেশ্য ছিলো, পাকিস্তান ও চীনের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা এবং তালিবানের উত্থান রোধ করা। পাশাপাশি ভারতপ্রভাবিত সম্ভাব্য আফগানিস্তানকে মধ্য-এশিয়ায় প্রবেশ করতে রুট হিসাবে ব্যবহার করা।তালিবানের কার্যকর উত্থান হলে সব কামনা-বাসনা ভেস্তে যেতে পারে আশঙ্কায় ভারত ‍চুক্তি নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। গত ৫ তারিখ তুরস্কভিত্তিক সংবাদ-মাধ্যম Anadolu Agency এ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য প্রকাশ করে–“While the deal offers a glimmer of hope that peace may yet return to Afghanistan, India is anxious that the Taliban’s return to power may affect its $3 billion worth of investments. Pakistan, on the other hand, is aiming to regain its clout and secure its western borders by ensuring a friendly government in Kabul. New Delhi’s anxiety is not limited to losing control in Kabul; its apprehensions include that a Taliban takeover in Kabul, along with an emboldened Islamabad, could have cascading effects on the ground realities in Indian-administered Jammu and Kashmir.”

(এই চুক্তিতে যখন আফগানিস্তানে শান্তি ফিরে আসতে পারে–এমন আশার ঝলক দেখা দিচ্ছে, তালিবানের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনায় ভারত তার ৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রভাবিত হতে পারে বলে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, পাকিস্তান কাবুলের একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সরকার নিশ্চিত করে তার প্রভাব ফিরে পেতে এবং তার পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমানা সুরক্ষিত করার লক্ষ্যে সচেষ্ট। নয়াদিল্লির উদ্বেগ কাবুলের নিয়ন্ত্রণ হারানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এ উদ্বেগের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে , ইসলামাবাদের সমর্থনে কাবুলে তালিবানের সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে, তাতে ভারত-শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরে মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে।)

আফগানিস্তান নিয়ে কিন্তু ভারত, ইরান যেমন চুক্তির পক্ষ না হয়েও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তেমনি যুক্তরাষ্ট্রও চুক্তির একটি পক্ষ হয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। কারণ, চুক্তিটি হয়েছে কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অনন্যোপায় হওয়ার মধ্য দিয়ে। ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলি। আসলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দু’কারণে চুক্তিটি করেছেন যথেষ্ট ঝুঁকি নিয়ে। বিষয় হলো, প্রথমত, আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার ট্রাম্পের নির্বাচনী ওয়াদা ছিলো, দ্বিতীয়ত, ক্রমাগত সৈন্যক্ষয় ও অর্থক্ষয় এড়াতে মার্কিন জনগণের চাপ ছিলো প্রচণ্ড। অবশ্য এর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামাও চেয়েছিলেন সৈন্য প্রত্যাহার করতে। কিন্তু প্রশাসন ও পেন্টাগনের আপত্তির কারণে তা পারা যায়নি। এখানে ট্রাম্প যখন বুঝতে পারলেন এ যুদ্ধে জয়ী হওয়া অসম্ভব, সাহস ও ক্ষমতাবলে সবার আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে ‍তালিবানের সাথে চুক্তি করার সিদ্ধান্ত নেন। এমন কি তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাম্পেও পর্যন্ত রাজি ছিলেন না। কারণ, এটা ছিলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক অবমাননাকর পরাজয়। তাই চুক্তিতে পাম্পেও স্বাক্ষর করতে রাজি না হওয়ায় দূত জালমে খলীলজাদকে দিয়েই চুক্তি করে নেন ট্রাম্প। অবশ্য প্রেসিডেন্টের নির্দেশ মানতে পাম্পেও উপস্থিত ছিলেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি করেছে, কিন্তু ষড়যন্ত্রের হাত গুটিয়ে নিয়েছে—তা মেনে নেয়া কঠিন। এখন যুক্তরাষ্ট্র গোপনে ভারত ও ইরানের সাথে মিলে তালিবানের ক্ষমতায় ফিরে আসা ঠেকাতে চেষ্টা করে যাচ্ছে। পাঠক লক্ষ করবেন, চুক্তি হবার পরপর ইরান ও ভারত স্বাগত জানালেও দিন দুই বাদেই তারা সাফ বলে দেয়, তারা এ চুক্তির পক্ষে নয়। মনে রাখবেন, এ হচ্ছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির খেলা। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা যেমন ইরানের ঘোর দুশমন, তালিবান-বিরোধিতায় সেই ইরান আবার আমেরিকার বন্ধু। আফগান থেকে রেহাই পেতে পাকিস্তান আমেরিকার মিত্র, সেই আমেরিকা আবার তালিবানপ্রশ্নে ভারতের মিত্র। ইসরাঈলপ্রশ্নে তুরস্ক আমেরিকার প্রতিপক্ষ, সেই তুরস্ক আবার সিরিয়াপ্রশ্নে আমেরিকার সমর্থনযোগ্য।

আমেরিকার আরেকটি ষড়যন্ত্রমূলক কৌশল হলো, চুক্তির অন্যতম শর্ত—আন্তঃআফগান আলোচনা। আসলে এখানেই হবে মূলযুদ্ধটা। এটাতেই নির্ধারিত হবে চুক্তি পরবর্তী আফগানিস্তানে মার্কিন স্বার্থ আদৌ সক্রিয় থাকবে কি না, বা কী আচরণ করবে। তালিবানের জন্যও এ আলোচনা বেশ চ্যালেঞ্জের। এ আলোচনার টেবিলের যুদ্ধ পাহাড়ের যুদ্ধের চেয়েও অনেক বেশি বুদ্ধিবৃত্তিক। এখানে চলবে কৌশলের তলোয়ার। মনে রাখতে হবে, এখানে যে মার খাবে, সে-ই ক্ষমতার লড়াইয়ে দারুনভাবে পরাজিত হবে। তাই, তালিবানের প্রতিপক্ষ চাইবে এখানে সর্বশক্তি নিয়োগ করে তালিবানকে পরাজিত করতে। আমেরিকা আফগানিস্তানে ইসলামী শাসনব্যবস্থার কথা স্বীকার করলেও আন্তঃআলোচনায় তা বাতিল করাতে কোন কার্পণ্য করবে বলে মনে হয় না। দেখবেন, এখানে আমেরিকা, ভারত, ইরান—সবাই এক রেখায় অবস্থান করছে। সেদিকে তালিবানকে অনেক সতর্কতার পরিচয় দিতে হবে। তালিবানের একটি পাওয়া হলো, আশরাফ ঘানী, আব্দুল্লাহ আব্দুল্লাহ ও যুদ্ধবাজ রশিদ দোস্তামের পারস্পরিক সাংঘর্ষিক অবস্থান। আন্তঃআলোচনা যদি হয়েও থাকে, তালিবান প্রতিনিধি দিতে পারলেও আপাতদৃষ্টিতে সরকারপক্ষ তা দিতে পারবে বলে মনে হয় না। এটা আমেরিকা ও তার সহযোগিদের জন্য বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। তালিবানের বিরুদ্ধে আরেকটি ষড়যন্ত্র এমন হতে পারে: তালিবান কৌশলগত সুবিধা নিয়ে ক্ষমতা নিলেও রশিদ দোস্তামদের দিয়ে মার্কিন গং উত্তরাঞ্চলীয় জোটকে পুনরুজ্জীবিত করে বিদ্রোহ সৃষ্টি করবে যাতে তালিবানকে ক্ষমতার প্রশ্নে সমঝোতায় বসতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হবে। সবকিছু মিলিয়ে আগামী সময় উভয়পক্ষের জন্যই খুব চ্যালেঞ্জময় হবে বলে মনে হয়।

সবশেষে যে বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ ঠেকছে, তা হলো, ভবিষ্যৎ শক্তিশালী আফগানিস্তান নির্মাণে তালিবান কী করতে পারে? সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে যদি তালিবান ক্ষমতায় বসতে পারে,তবে তালিবানের প্রথম কাজ হবে, চুক্তির শর্তানুযায়ী আমেরিকার কাজগুলো করিয়ে নেয়া। এরপর তালিবানকে নযর দিতে হবে, একটি প্রতিনিধিত্বমূলক সংবিধান প্রণয়ন করা যা কুরআন ও সুন্নাহর পথনির্দেশনাকে আধুনিক বিশ্বের সামনে দা’ওয়াতী, ন্যায়বিচারিক, সমস্যার সমাধানযোগ্য ও সমাজ-সংস্কারময় বক্তব্য এবং বাস্তবায়নযোগ্য দৃষ্টিভঙ্গীর মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব করবে। এরপর সবচেয়ে যে দূরহ কাজটি তাঁদের সামনে আসবে, তা’হলো, উক্ত সংবিধানকে সামনে রেখে সমগ্র আফগানিস্তানের জন্য বিস্তৃত দেওয়ানী ও ফৌজদারী আইন প্রণয়ন এবং জাতীয় অর্থনৈতিক বিধিমালা তৈরি করা যা পাশ্চাত্যের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিকল্প উন্নততর বিশ্বব্যবস্থাকে উপস্থাপিত করতে সক্ষম হবে; পাশাপাশি প্রশিক্ষিত প্রজন্ম গড়ে তুলে আদালত, বিচারক, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জাতীয় প্রতিরক্ষা-বাহিনী করে তোলা। দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও ভৌগলিক গুরুত্বকে রক্ষা করে আঞ্চলিক শক্তির সাথে স্বার্থরক্ষাকারী পরাষ্ট্রনীতি গ্রহণও তালিবানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষ করে, নারী ও সংখ্যালঘুপ্রশ্নে তালিবানের নীতি আন্তর্জাতিকভাবে কৌতুহল হয়ে থাকবে। তাই, বিষয়টিকে দা’ওয়াতী দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে।

তালিবানের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, একটি জাতীয় শিক্ষানীতি গ্রহণ ও ‍এমন এক প্রজন্ম গড়ে তোলা যাঁরা বিশ্বাস ও কর্মে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’র অনুসারী হবে এবং দ্বীনি ও সাধারণ শিক্ষায় পারদর্শী হয়ে আফগানিস্তানের আধুনিক ইমারাতে ইসলামিয়ার প্রতিনিধিত্ব করবে। এ জন্য প্রয়োজন হবে একটি অভিন্ন জাতীয় শিক্ষা-পদ্ধতি সৃষ্টি ও বিভিন্ন স্তরের শিক্ষালয় প্রতিষ্ঠা করা। সাথেসাথে এঁরা প্রযুক্তিজ্ঞানে অভিজ্ঞ হয়ে আধুনিক কলাকৌশল রপ্ত করার মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী ইসলামের সর্বজনগ্রাহ্যতার যুক্তিকে উপস্থাপন করবে এবং সমসাময়িককালের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখবে।

এখানে তালিবানের জন্য একটি বোনাস-পয়েন্ট কাজ করতে পারে ভবিষ্যতে। তা হলো, তার দুই লাগোয়া প্রতিবেশী—পাকিস্তান ও চীনের মধ্যকার সুসম্পর্ক। এ ধরনের ভৌগলিক অবস্থান সত্যিই বিরল। আমি বলবো, এটাকে কাজে লাগিয়ে তালিবান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে যদি এগুতে পারে, তবে আঞ্চলিক অপশক্তিগুলো নিষ্ক্রিয় হতে বাধ্য হবে। আমার মনে হচ্ছে, তালিবান প্রশাসনের সাথে আমেরিকার ও চীনের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক ফিলিস্তীন, উইঘুর ও কাশ্মীর সমস্যাকে সমাধানে নিয়ে যেতে এক অকল্পনীয় প্রভাব সৃষ্টি করবে। আল্লাহই সর্বাধিক ভালো জানেন।

পরিশেষে বলবো, তালিবান ক্ষমতায় আরোহণের পর বুঝতে পারবে, ঊনিশ বছর ধরে চলা পাহাড়ের যুদ্ধের চেয়েও হাজার গুণ কঠিন—আফগানিস্তানকে গঠন করার যুদ্ধ। সে-যুদ্ধে জয়ী হবার মধ্য দিয়েই বিশ্বমানচিত্রে একটি আদর্শ-রাষ্ট্র হিসাবে দাঁড়াতে পারবে—জিহাদভূমি: আফগানিস্তান।

(সমাপ্ত)