আয়াসোফিয়া-কে মসজিদে রূপান্তর নিয়ে ২৬ বছর আগের প্রতিশ্রুতি যেভাবে পূরণ করলেন এরদোগান

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | নাহিয়ান হাসান মাহির


কুয়েতের সোসাইটি ম্যাগাজিন নিজস্ব টুইটার অ্যাকাউন্টে ১৯৯৪-১৯৯৮ সালে গ্রেটার ইস্তাম্বুলের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তুরস্কের বর্তমান প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগানের তৎকালীন একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে।

১৯৯৪ সনে ম্যাগাজিনটির এপ্রিল (১০৯৭তম) সংখ্যায় এরদোগানের প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটিতে তিনি বলেছিলেন, ‘যত বাধাবিপত্তি আসুক না কেনো আয়াসোফিয়া-কে গীর্জায় রূপান্তরিত করতে দেওয়া হবে না। আয়াসোফিয়া-কে পুনরায় গীর্জায় রূপান্তরিত করা নিছক কল্পনা মাত্র।’

ওই সাক্ষাতকারে এই কথার ব্যাখ্যায় এরদোগান বলেছিলেন, ‘আয়াসোফিয়া-কে মুসলমানদের জন্য ওয়াকফ করা হয়েছে এবং এটি এমনই(মুসলমানদের জন্য ওয়াকফকৃত) থাকবে।’

তিনি বলেন,“এব্যাপারে সকলেই অবগত যে, সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ ইস্তাম্বুল বিজয়ের সময় কোনো গীর্জা দখল করেননি, এমনকি আয়াসোফিয়া-কে তিনি নিতান্তই নিজের অর্থ সম্পদের বিনিময়ে ক্রয় করে মসজিদে রূপান্তর করে মুসলিম উম্মাহর জন্য ওয়াকফ করে দিয়েছিলেন। আর তিনি (সুলতান ফাতিহ)বলেছিলেন, ‘এটিকে অন্য উদ্দেশ্য যদি কেউ ব্যবহার করতে চায়, তবে তার উপর আল্লাহর এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহী ওয়া-সাল্লাম এর লা’নত’।”

সাক্ষাৎকারটিতে এরদোগান আরো বলেছিলেন, ‘ওয়েলফেয়ার লিডার নাজমুদ্দিন এরবাকান ঘোষণা করেছিলেন তিনি আয়াসোফিয়া-কে পুনরায় নামাজের জন্য উন্মুক্ত করে দিবেন। আর এটি ছিল তার প্রতিশ্রুতি এবং ঘাড়ে চেপে থাকা কল্যাণমূলক কাজের একটি অংশ, যা তিনি তার সুযোগ মতো বাস্তবায়ন করতে চান।’

১৯৯৪ সালের প্রতিশ্রুত সেই অঙ্গীকারের পথেই হেঁটে ছিলেন এরদোগান। মাঝখানে দীর্ঘ ২৬টি বছর শেষে ২০২০-এ তিনি পূর্ণ করলেন তাঁর প্রতিশ্রুত অঙ্গীকার। ৮৬ বছর পর তুর্কি জাতির জন্য উন্মুক্ত করলেন পাঁচশত বছরের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক আয়াসোফিয়া মসজিদ।

গেল শুক্রবার (১০জুলাই) তুরস্কের শীর্ষ আদালত ১৯৩৪ সনের ক্ষমতাসীন কামাল আতাতুর্কের সিদ্ধান্ত বাতিল ঘোষণা করলে প্রেসিডেন্ট এরদোগান সেদিনই আয়াসোফিয়াকে পুনরায় মসজিদ হিসেবে উন্মুক্ত করে দেওয়ার ফরমানে স্বাক্ষর প্রদান করেন। এই একটি দিনের জন্য তুর্কি জাতিকে অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ ৮৬টি বছর। মাটিতে বিলিন করতে হয়েছিল হাজারও যুবকের টগবগে রক্ত। আর কত শত মায়ের চোখের জল ঝরেছিল, ইতিহাস পাঠে হয়ত কোনদিন কেউ জানবে না। তবে সুবহে সাদিকের এই দিনটির জন্য কালের সাক্ষীতে অমর হয়ে থাকবেন এরদোগান।

শুক্রবার এরদোগান ব্যক্তিগত টুইটার একাউন্টে নিজের স্বাক্ষরিত ফরমানটির একটি অনুলিপি প্রকাশ করেছিলেন। ফরমানটিতে, আয়াসোফিয়া-কে পুনরায় মসজিদ হিসেবে বৈধতা পাওয়ায় তা ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর এবং এবং অতিদ্রুত নামাজের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি উল্লেখ করেন: আয়াসোফিয়া জামে মসজিদে আমরা আপনাদের মোবারকবাদ জানাচ্ছি।

শুক্রবার তুর্কি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে এরদোগান বলেন, পুনরায় জামে মসজিদ হিসেবে আয়াসোফিয়ার এই রূপান্তর ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। এব্যাপারে ইতিহাস কালের সাক্ষী হয়ে থাকবে এবং ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল পাতায় এটিও লেখা থাকবে।

ভাষণ দানকালে তিনি আরো বলেন, জামে মসজিদ হিসেবে আয়াসোফিয়ার ফিরে আসা হল, বিশ্বের সকল মুসলিমদের প্রতি একটি বার্তা যে, আমরা পূর্ণ শক্তি নিয়ে আবার ফিরে আসব এবং আমাদের পবিত্র জায়গা সমূহ আমরা রক্ষা করব।

এসময় তিনি বলেন, আয়াসোফিয়া-কে মসজিদ থেকে জাদুঘরে রূপান্তরের সিদ্ধান্তটি যেমন ইতিহাসকে লাঞ্চিতকরণ ও আইনের চূড়ান্ত লঙ্ঘন, ঠিক তার বিপরীতে মুসলমানদের জন্য আয়াসোফিয়াকে মসজিদ হিসেবে উন্মুক্তকরণ হল পবিত্র মসজিদে আকসা তার সার্বভৌমত্ব ফিরে পাওয়ার সুসংবাদের ইঙ্গিত।