করোনা আতঙ্কে কাছে যায়নি ডাক্তার-নার্স; ঢামেকে কানাডাফেরত ছাত্রীর মৃত্যু

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনাভাইরাস সন্দেহে ডাক্তার ও নার্সদের অবহেলার কারণে কানাডা ফেরত এক শিক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

শনিবার (১৪ মার্চ) দুপুরে গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল জটিলতায় মৃত্যু হয় নাজমা আমিন (২৪) নামের ওই ছাত্রীর।

তার পরিবারের দাবি, রোগীর করোনাভাইরাস ছিল সন্দেহ থেকে ডাক্তাররা অবহেলায় করায় ওই তরুণীর মৃত্যু হয়েছে। নাজমা ছিলেন কানাডার সাসকাচোয়ানের রেজিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী। তিনি গত সোমবার ঢাকায় ফিরে এসে পেটের ব্যথার কথা পরিবারকে জানান।

তার পরিবারের সদস্যরা গণমাধ্যমকে বলেন, নাজমা মোটেও খেতে পারছিলেন না, প্রতিবার যখন তিনি খাওয়ার চেষ্টা করলেন তখন তার বমি বমি ভাব ও পেটের ভীষণ ব্যথা হয়েছিল। সেই সমস্যা নিয়ে শুক্রবার রাতে তাকে মুহাম্মদপুরের বাড়ির কাছে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, তাকে নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট (আইসিইউ) এ রাখা দরকার। এরপর ঢামেকে ভর্তি করা হয়।

নাজমার চিকিৎসা নিয়ে বাবা আমিন উল্লাহ বলেন, তার মেয়েকে ঢামেকে একটি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে স্যালাইন, অক্সিজেন সহায়তা এবং ওষুধ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারপরে সকাল আটটায় নার্সদের শিফট পরিবর্তন হয় এবং নার্সদের একটি নতুন ব্যাচ এসেছিল।

সকাল সাড়ে এগারোটার দিকে এক নার্স আমিনকে জিজ্ঞাসা করলেন নাজমার কী হয়েছে। লক্ষণগুলি বর্ণনা করতে গিয়ে আমিন উল্লেখ করেছিলেন— মেয়েটি সম্প্রতি কানাডা থেকে এসেছিল। এই দৃশ্যত সহজ তথ্য নাজমার পরিস্থিতি মারাত্মক করে তুলেছিল। কানাডার কথা উল্লেখ করার সঙ্গে সঙ্গে ওয়ার্ডের নার্সরা চিৎকার করতে লাগল, সে কানাডা থেকে এসেছে! তারও জ্বর হয়েছে!

আমিন উল্লাহ জানান, মেয়েটির করোনাভাইরাস রয়েছে বলে তারা ডাক্তারদের কাছে ছুটে এসেছিল। তখন পুরো ওয়ার্ডটি বিশৃঙ্খলার কবলে পড়ে এবং ডাক্তার এবং নার্সরা মেয়েটির কাছাকাছি আসতে অস্বীকার করেন। এর ফলে এক পর্যায়ে চিকিৎসার অভাবে তাঁর মৃত্যু হয়।

সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এ বি এম জামাল বলেন, যখন কানাডা-ফেরত মেয়েটির আসার খবর জানাজানি হয়, তখন ওয়ার্ডটি আতঙ্কে পড়ে যায়। তবে তিনি আরও জানান, এর পরেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যায়।

ঢামেকের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন বলেছেন, রোগীর ওয়ার্ডে দায়িত্বরত স্টাফদের ভাইরাস প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা ছিল না। তারা উদ্বিগ্ন ছিলেন, হয়তো রোগীর সংস্পর্শে আসলে করোনাভাইরাসে নিজেরাও আক্রান্ত হবেন। এছাড়া কোনও করোনা ভাইরাস পরীক্ষার কিট ছিল না এবং এমনকি তাঁর শরীরে ভাইরাস রয়েছে কিনা তাও নিশ্চিত করতে পারেনি।

তিনি আরও বলেন, মেয়েটির করোনা পরীক্ষার করার জন্য সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (আইইডিসিআর) ফোন করা হয়েছে। সেখান থেকে প্রতিনিধি এসে তার শরীর পরীক্ষা করে এবং করোনা নেগেটিভ পাওয়া যায় অর্থাৎ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত নন মেয়েটি। এদিকে রোগীর কোন পর্যবেক্ষণ ছাড়া প্রায় এক ঘন্টা সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। তাই মেয়েটির অবস্থা অবনতির দিকে চলে যায়।

হাসপাতাল সূত্র জানা যায়, দুপুর প্রায় সাড়ে বারোটার দিকে একজন চিকিৎসক এগিয়ে গেলেন, গ্লাভস এবং মুখোশ পরে রোগীর কাছে যান। অ্যান্টিবায়োটিকযুক্ত ইনজেকশন পুশ করেন। তখন অনেক দেরি হয়ে যায়। অ্যান্টিবায়োটিক পুশ হওয়ার পরই নাজমা মারা যান।

Leave a Reply