ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ ও সেক্যুলারদের অসহায়ত্ব

অক্টোবর ১, ২০১৯

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী


গত ২৬ শে সেপ্টেম্বর ২০১৯ বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ধর্মভিত্তিক রাজনীতি’ নিষিদ্ধ করার এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিল ডাকসু। বলাবাহুল্য, বর্তমান আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে সরকার ও প্রশাসনের প্রভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ছাত্রলীগের দখলে রয়েছে। ইতোমধ্যে কথিত ধর্মভিত্তিক রাজনীতির নামে ইসলামী রাজনীতি বন্ধের বিষয়টি দেশের শিক্ষিত ও সচেতনমহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। কথা উঠেছে, যেখানে জাতীয়ভাবে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ নয়, সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন এখতিয়ারে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হবে? এটা তো সম্পূর্ণ অবৈধ ও অসাংবিধানিক।

এখন কথা হলো, কেন এ উদ্যোগ? বিষয়টি জানা দরকার। উল্লেখ্য, এর আগেও কিছুকিছু আওয়ামী-সেক্যুলার ও বামপন্থী বুদ্ধিজীবী মাঝেমাঝে দাবি করে বসতেন, জাতীয়ভাবে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হোক। যদিও তারা সরাসরি ইসলামের উল্লেখ না করে কৌশলগতভাবে ‘ধর্মভিত্তিক’ ব্যবহার করেছেন কিন্তু সবার বোধে ছিলো যে, আসলে তারা ইসলামী রাজনীতির কথাই বলছেন। যেহেতু বিষয়টি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের ধর্মানুভূতির সাথে সম্পৃক্ত ও গুরুতর সংবেদনশীল তাই আওয়ামী লীগের মতো কট্টর সেক্যুলার সরকারের পক্ষেও জাতীয়ভাবে ইসলামী রাজনীতি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। আর বর্তমানে প্রচলিত গণতান্ত্রিক পরিবেশে তা সম্ভবও নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ঘটনা এক অনিবার্য বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। তা হলো, ইসলামী রাজনীতির সামনে সেক্যুলার রাজনীতির অসহায়ত্ব। প্রকৃতপক্ষে সেক্যুলার রাজনীতি হলো একটি আদর্শবিহীন রাজনীতি অথবা অভিভাবকহীন রাজনীতি। যারা সেক্যুলার বলে নিজেদেরকে পরিচিত করেন, তারা সবসময় অস্বস্থিতে ভোগেন নির্দিষ্ট কোন আদর্শিক পথচিত্র (Roadmap) না থাকার কারণে। অপরপক্ষে, যতোই দুর্বল হোক, ইসলামী রাজনৈতিক সংগঠনের ইসলাম-সম্পৃক্ত একটি লক্ষ্য থেকেই থাকে। ফলে, সাধারণে একটি ইসলামী রাজনীতির কর্মীরা যতো সহজে নিজেদের মত ও পথকে বোঝাতে পারেন, সেক্যুলার রাজনীতির কর্মীরা তা পারে না। এরা কখনও রবী ঠাকুর, কখনও ‘হাজার বছরের বহমান সংস্কৃতি’ ইত্যাদির মতো গন্তব্যহীন বিষয়ের উল্লেখ করেন যা শ্রোতারা সহজভাবে নিতে পারেন না। যেহেতু এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের সাথে ইসলামের সম্পর্ক অনস্বীকার্য, তাই ইসলামী কথাবার্তার প্রভাব অনিবার্য।

আগেই বলেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন সঙ্গতকারণে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে। এরা মূলত সেক্যুলার রাজনীতি-চর্চার দাবি করে। এই সেক্যুলার রাজনীতির আড়ালে ওরা যে এমন-এমন অপকর্ম: নারীঘটিত, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও বিরোধীপক্ষকে দমন-নির্যাতনের মতো নিন্দনীয় কাজে লিপ্ত হয়েছে তা এখন খবরের কাগজের প্রথম পাতায়; অনলাইনের দুয়ারে-দুয়ারে। এর মূলকারণ হলো, সেক্যুলার রাজনীতির আদর্শহীনতা ও অসারতা। অপরপক্ষে ইসলামী রাজনৈতিক দলের কর্মীরা যতোই দুর্বল হোক, অন্তত স্পষ্ট হারামের পথে ডাকবে না। তাঁরা আদর্শের কথা বলবে যেখানে গন্তব্য স্থিতিশীল। এই মুখোমুখি অবস্থানে সেক্যুলার রাজনীতি চরমভাবে বিপর্যস্ত ও পরাভূত। মূলত, ইসলামী রাজনীতির সাথে সম্মুখযুদ্ধে কালিমালিপ্ত পরাজয়ের অতীত অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ আশঙ্কা থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির নামে ইসলামী রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এটা সম্পূর্ণ একটি কাপুরুষোচিত পদক্ষেপ এবং সেক্যুলার রাজনীতিচর্চার অসহায়ত্বের প্রমাণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা থেকে আরেকটি বিষয় উঠে এসেছে। তা হলো, সেক্যুলারদের অসহায়ত্ব। ওরা ক্ষমতার অপব্যবহার আর অনৈতিকতা ছাড়া ছাত্রছাত্রীদেরকে আর কিছুই উপহার দিতে পারেনি। বরঞ্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও শিক্ষাব্যবস্থা সেক্যুলার চর্চার নযীর দেখাতে গিয়ে নাস্তিকতাবাদের উত্তোরণ ঘটিয়েছে। এ থেকে সুস্থ মানসের পরিবর্তে অসুস্থ মানস তৈরি হয়ে সমাজে বিস্তর অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। স্বঘোষিত নাস্তিক ড. আহমদ শরীফ, হুমায়ুন আজাদের মতো ব্যক্তিরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জন্ম নিয়ে জাতীয় জীবনে কী পরিমাণ অনাসৃষ্টি করেছে, তা জাতির অভিজ্ঞতায় আজও দেদীপ্যমান। এরা জাতিকে কল্যাণকর কিছু তো দিতে পারেইনি, উপরন্তু নাস্তিকতার প্রসার ঘটাতে গিয়ে জাতীয় জীবনে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। সুতরাং সেক্যুলারিজমের পথ ধরে যে নাস্তিকতার উদগীরণ ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অংশে, তা জাতির অনুভূতি ও আকাঙ্খার সম্পূর্ণ বিপরীত ছিলো। ফলে, তাদের দর্শন ও দৃষ্টিভঙ্গি জনগণ কর্তৃক নিন্দিত ও প্রত্যাখ্যাত হয়। নাস্তিকতার এ ব্যর্থতা প্রকারান্তরে সেক্যুলারদের মৌলিক ব্যর্থতা। কারণ, সেক্যুলারিজম নাস্তিকতার প্রসবকারিণী। এরা বুঝতে পেরেছিলো, দেশে ইসলামপন্থীদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ ও তাঁদের জাতীয় তৎপতার কারণেই সেক্যুলারিজম বা নাস্তিকতা চরমভাবে মার খায়। ইসলামপন্থীদের আদর্শের প্রচারের মুখে ভেসে যায় সেক্যুলারদের তাবৎ প্রচেষ্টা। ফুটে উঠে ওদের চরম অসহায়ত্ব। এ অসহায়ত্ব ও কাপুরুষত্বকে ঢাকতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করা হলো।

পরিশেষে বলবো, মূলত সেক্যুলারদের আদর্শহীন রাজনীতির গ্লানিকর পরাজয়ের আশঙ্কা থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ সিদ্ধান্ত। নয় তো তারা এটাকে চ্যালেন্জ হিসাবে গ্রহণ করে ইসলামী রাজনীতিচর্চার সুযোগ দিক, তারা প্রমাণ করুক, তাদের সেক্যুলার রাজনীতির অবস্থান থেকে তারা টিকে থাকার সামর্থ্য রাখে। আমরা স্পষ্ট বলতে চাই, মূলধারার ইসলামী রাজনীতির যে দলই হোক না কেন, তারা যতো দুর্বলই হোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস জয় করেই ঘরে ফিরবে। এ আমাদের খোদা-প্রদত্ত আত্মবিশ্বাস। ইসলামী রাজনীতির চর্চা হলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনৈতিকতা, দুর্নীতি আর দুরাচারের সমাপ্তি ঘটবে। সবার মনে রাখতে হবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কোন সেক্যুলারের বদান্যতায় বা জায়গায় নয় বা রবী ঠাকুরের ব্রাহ্মণ্যবাদী দর্শনের ভিত্তিতেও নয়, এটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইসলামপন্থী নবাব সলিমুল্লাহ মরহুমের উদ্যোগে ও জায়গায় এ অঞ্চলের মুসলমানদের শিক্ষার অগ্রসরতার জন্য। সুতরাং আজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ করা মানে এ অঞ্চলের মুসলিম সমাজের মান, মর্যাদা ও বিশ্বাসের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা।