ঈদে মীলাদুন্নবী; ইতিহাস ও পর্যালোচনা

নভেম্বর ১০, ২০১৯

আবু জোবায়ের


১২-ই রবিউল আউয়াল ঈদে মীলাদুন্নবী। মুসলিম বিশ্বের কিছু মানুষের কাছে তা অন্যতম একটি উৎসবের দিন। তাঁরা অত্যন্ত জাঁকজমক, ভক্তি ও মর্যাদার সাথে দিনটি পালন করেন। বাংলাদেশের বৃহত্তর চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও সিলেট অঞ্চলেও দিনটি বেশ জাঁকজমকের সাথেই পালিত হয়। দেশের অন্যান্য এলাকায় তুলনামূলক কিছুটা কম গুরুত্বে তা পালিত হয়। কিন্তু মুসলিমদের একটি বড় অংশ ঈদে মীলাদুন্নবীর উৎপত্তি ও বিকাশের ইতিহাস এবং তা উদযাপনের শরয়ী হুকুম সম্পর্কে অবগত নন।

মীলাদ শব্দের অর্থ; জন্ম সময়। সুপ্রসিদ্ধ আরবি অভিধান লিসানুল আরবে লিখা হয়েছে: “ميلاد الرجل اسم الوقت الذي ولد فيه” অর্থাৎ: লোকটির মীলাদ যে সময়ে সে জন্মগ্রহণ করেছে সেসময়ের নাম। কিন্তু মুসলিমরা ঈদে মীলাদুন্নবী বলতে শুধুমাত্র রাসূলুল্লাহ সা. এর জন্মের সময়ের আলোচনা করাকে বুঝে না বরং তাঁর জন্ম দিনকে বিশেষ পদ্ধতিতে উদযাপন করাকেই বুঝে।

প্রচলিত ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপন মূলত অনৈসলামিক একটি কাজ। বিশেষ করে যেখানে থাকে গানের আসর, নৃত্য ও মদের আড্ডা। যেখানে একত্রিত হয় নারী ও পুরুষ। যেখানে পেশ করা হয় শিরক যুক্ত কবিতা ও গজল।

মুসলিম বিশ্বের সকল আলেম ও গবেষক একমত যে, ইসলামের প্রথম শতাব্দীগুলোতে ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপন করার কোন প্রচলন ছিলনা। নবম হিজরী শতকের অন্যতম আলেম, গবেষক ও ঐতিহাসিক আল্লামা ইবনে হাজার আল আসকালানী রহ. ( মৃত্যু: ৮১২ হি.) লিখেছেন: মাওলিদ পালন মূলত: বিদ’আত। ইসলামের সম্মানিত প্রথম তিন শতাব্দীর সালফে সালেহীনদের কোন একজনও এ-কাজ করেননি। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিক আল্লামা আবুল খাইর মোহাম্মদ ইবন আবদুর রহমান আস-সাখাবীও (মৃত্যু: ৮২৯ হি.) উক্ত মত ব্যক্ত করেছেন।

হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মিশরের শিয়া ইসমাঈলিয়া খলিফা আল-মুয়িজ্জু লি দীনিল্লাহ ( মৃত্যু: ৩৬২ হি.) সর্বপ্রথম ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপন উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের সূচনা করেন। তবে শিয়াদের প্রতি সাধারণ মুসলিমদের ঘৃণার কারণে তাদের আবিষ্কৃত এই উৎসব মিশরের বাইরে অন্যান্য ইসলামী রাষ্ট্রে প্রসারতা পায়নি।

তার দুই শতাব্দী পর ইরাক অঞ্চলের ইরবিল প্রদেশের শাসক আবু সাঈদ কূকবুরী ( মৃত্যু: ৬৩০ হি.) ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপনের ব্যাপক প্রচলন ঘটান। তার মাধ্যমেই এই উৎসব সুন্নি জগতে এবং সমগ্র মুসলিম বিশ্বে জনপ্রিয় উৎসবে পরিণত হয়।

সুতরাং ঈদে মীলাদুন্নবী খায়রুল কুরুনের পরে আবিষ্কৃত হয়েছে। দীনে নব উদ্ভাবিত বিষয়। যা বিদ’আত। প্রত্যাখ্যাত। নাজায়েয।

আরো যেসব মৌলিক কারণে প্রচলিত ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপন করা যাবেনা—

প্রথমত:

ইসলাম পরিপূর্ণ দ্বীন। কুরআন হাদীসের কোথাও ঈদে-মীলাদুন্নবী পালন করার কথা বলা হয়নি। সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈনরা কখনো এটি পালন করেননি। তাই এটি বিদ’আত ও গুমরাহী। হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত: ‘من احدث في امرنا هذا ماليس فهو رد’ অর্থাৎ আমাদের এই দীনে যে নতুন কোন বিষয় প্রচলন করবে তা প্রত্যাখ্যাত হবে।
তিনি অন্যত্র বর্ণনা করেন: واياكم ومحدثات الامور فان كل محدثة بدعة و كل بدعة ضلالة

সাবধান! ধর্মে নতুন প্রবর্তিত বিষয় থেকে সর্বদা দূরে থাকবে। কেননা নব আবিস্কৃত প্রতিটি বিষয় হল বিদ’আত; প্রতিটি বিদ’আতই হলো পথভ্রষ্টতা।

দ্বিতীয়ত:

ঈদে মীলাদুন্নবী হল খৃষ্টানদের বড় দিন, হিন্দুদের জন্মাষ্ঠমী ও বৌদ্ধদের বৌদ্ধ-পূর্ণিমার অনুসরণ। অথচ ধর্মীয় বিষয়ে তাদের আচার-অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করা ঈমানের দাবী।

তৃতীয়ত:

প্রসিদ্ধ মতে ১২- ই রবিউল আউয়াল নবী সা. এর মৃত্যু দিবসও। তাই এই দিন বরং এই মাসটিতেই জন্মদিনের কোন আনন্দ-উৎসব করা চরম মূর্খতা এবং নবীর শানে বেয়াদবি ছাড়া কিছুই নয়।

চতুর্থত:

আল্লাহ ও রাসূল সা. কর্তৃক নির্ধারিত ইসলামের দুই ঈদের সাথে তৃতীয় আরেকটি ঈদ সংযোজন করা— ইসলামকে বিকৃত করার অপপ্রয়াস।

রাসূল সা. এর ভালোবাসা, ঈমানের অপরিহার্য অংশ। যে ব্যক্তি তাকে ভালোবাসে না সে ঈমানদার হতে পারে না।
শুধু একদিনের মিছিল, গান-বাজনা ও মিষ্টি বিতরণ রাসূল সা. এর প্রতি প্রকৃত কোন ভালোবাসা নয়।
বরং তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন, তার সুন্নাতকে জীবনে বাস্তবায়িত করা, তাঁর আনিত দীন প্রচার ও প্রসার করা এবং তার প্রতি বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠানো; তাঁর প্রতি প্রকৃত ভালবাসার আলামত।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সকলকেই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি প্রকৃত ভালবাসা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁদের অনুগত থাকার তাওফীক দান করুন! আমীন।