মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী | রাষ্ট্রচিন্তক ও গবেষক


একেবারে বাংলা শিক্ষার প্রথম পাঠ ‘বাল্যশিক্ষা’য় পড়েছিলাম–সদা সত্যকথা কহিবে, কদাচ মিথ্যা বলিবে না। পাকিস্তান আমলে নেয়া সেই শিক্ষার ভার আজও বয়ে চলেছি যথাসাধ্য চেষ্টায়। ছোট্ট একটি বই–বাল্যশিক্ষা। এটাতেই ছিলো, বাংলা, অঙ্ক আর ইংরেজির বর্ণশিক্ষা। মলাট উল্টাতেই বাম পাশে ছিলো রাণী ভিক্টোরিয়ার ছবি। এরপরে পেলাম: মুসলিম বাল্য শিক্ষা। ইসলামী শিক্ষানির্ভর ছোট্ট পুস্তিকাটি ছিলো এক কথায় অসাধারণ। কঠিন-কঠিন শব্দে বাঁধা বইটির কথা মনে হলে আজও এক স্বজন হারানোর ব্যথা বুকে মোচড় দিয়ে ওঠে। ফিরে যেতে চাই সে-দিনগুলোতে।

পাঠশালার একেবারে নিচের শ্রেণীতে বসে পড়ার সময় সত্য বলার আক্ষরিক নসীহতটি সেদিন কেবল মুখস্তই করেছি, বুঝেছি সামান্য: যা শিক্ষক বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। বাসায় মা-বাবার শিক্ষা থেকে মর্মার্থ বুঝেছিলাম আরও পরে। আজ অর্ধশতাব্দির মতো সময় পরে এসে ভাবছি ” সদা সত্য কহিবার’ যে তালিম সেদিন রাষ্ট্র আমাকে দিয়েছিলো, আজ আর তা দেয় না। গ্রন্থগত শিক্ষার পাশাপাশি রাষ্ট্রের হোমরা-চোমরারা যেভাবে শ’তে নিরানব্বইটি মিথ্যা বলেন, তাতে বাল্যশিক্ষার সেই আবেদন উপহাসে পরিণত হয়েছে। এখনকার শিক্ষা, অনুশীলন, রাষ্ট্রের বিভিন্ন আচারে মিথ্যা যেভাবে বসতি গেড়েছে, মনে হচ্ছে সামনে শিক্ষা দেয়া হবে: যত পার মিথ্যা কহিবে, কদাচ সত্য কহিয়া বিপদে পড়িবে না।

সর্বসাম্প্রতিক ইসকন আর নালিশী নারী প্রিয়া সাহার বিষয়ে যা হচ্ছে, যা ঘটছে–তাতে মিথ্যার যে ছড়াছড়ি দেখছি, ভাবছি, সত্য কহিয়া বিপদে পড়িব কেন? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বহু পুরনো রোগের উদগীরণ করে প্রিয়া সাহা যে মহা-কেরেঙ্কাল বাঁধিয়েছেন, তার ছবি সাদাকালো নয়, একেবারে রঙ্গীন। তবে প্রিয়া সাহাকে একটি চরম-ধন্যবাদ দিতেই হয় তার অকপট সত্য-স্বীকারের জন্য। এখানে অন্তত তিনি মিথ্যা বলেননি। তার গরম-নালিশে দেশ যখন গরমে তেঁতিয়ে উঠলো, তিনি দেশের এক সাংবাদিককে মোবাইল-সাক্ষাৎকারে বলে বসলেন: যা বলেছেন তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক উৎসাহিত হয়ে তার অনুকরণেই বলেছেন। আত্মপক্ষ সমর্থনের এমন সরল উপস্থাপনা আমাকে অবাক করেছে। এর কারণ হলো, তিনি প্রথমত, ধর্মীয সংখ্যালঘু, দ্বিতীয়ত, তিনি আওয়ামী ঘরানার এবং ভারতপন্থী একজন এনজিও-ব্যক্তিত্ব। তার স্বামী শ্রী মলয় রায় সরকারের উচ্চপদে আসীন একজন রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা। তার কথাটিকে কেউ আমলে নিয়েছেন বলে মনে হয়নি।

প্রিয়া সাহার বক্তব্য দু’টো: এক, যা তিনি ট্রাম্পের কাছে বলেছেন আর দুই, যা তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনে সাংবাদিকের সাথে বলেছেন। প্রথমাংশকে খোলাসা করতে গিয়ে প্রিয়া সাহা দ্বিতীয়াংশে বিস্তৃতি দিয়েছেন। ট্রাম্পের কাছে দেয়া প্রিয়া সাহার আর্জি প্রকাশ্যে আসার পর জনগণে ও উচ্চ-রাষ্ট্রপদে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। প্রতিবাদ ও নিন্দায় মুখর হয় দেশ। রাষ্ট্রের মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ কেউ-কেউ বিষয়টিকে রাষ্ট্রদ্রোহ বলে মন্তব্য করলেও লন্ডন সফরে থাকা সরকার-প্রধান শেখ হাসিনা প্রিয়া সাহাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কোন পদক্ষেপ গ্রহণে মানা করলে সরকারের লোকজন তাদের ক্ষুব্ধ অবস্থান থেকে সরে আসে। এই প্রথম এ ধরনের বিষয়ে শেখ হাসিনার তরফ থেকে কাউকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ প্রদানের ঘোষণায় সচেতন নাগরিকদের অনেকেই বিস্মিত হন। কারণ, পূর্বে এর চেয়ে ঢের ক্ষুদ্র তৎপরতার কারণেও কেউই আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাননি বরঞ্চ হাজত বাস ও নির্যাতনের মুখে পড়েছিলেন। যেমন, মাহমুদুর রহমান। প্রিয়া সাহাকে হঠাৎ করে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দানের ঘোষণাকে আগাগোড়া বিবেচনায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে হয়। কেন, তা বলছি। বিবিসি বাংলা বলছে, প্রিয়া সাহা এখন বর্তমানে আমেরিকায়। সরকার-প্রধান শেখ হাসিনাও লন্ডন-সফরে। এমন অবস্থায় প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে সরকারের তরফে কট্টর অবস্থান নিলে, হামলা-মামলা হলে ট্রাম্পের কাছে দেয়া নালিশ পশ্চিমাদের কাছে সত্য বলে প্রতীয়মান হতে পারে। তখন হিতে বিপরীত হবে। তাই বুঝেশুনে শেখ হাসিনা এখনই মারমার-কাটকাট পথে যাচ্ছেন না।

দ্বিতীয় বিষয়ে বলতে হয়, প্রিয়া সাহা একজন বাংলাদেশী সাংবাদিককে আত্মপক্ষে যা বলেছেন তা ফেলনা নয়। সেখানে তিনি তার নালিশকে শেখ হাসিনার অতীত বক্তব্যের অভিব্যক্তি বলে দাবি করেছেন। চলুন তাহলে দেখি সে সম্পর্কে। এখানে একটি কথা বলে রাখা ভালো। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু-নির্যাতন নিয়ে কথা সেই পাকিস্তান আমল থেকে যখন আমরা ছিলাম পূর্ব-পাকিস্তানের নাগরিক। বাংলাদেশ হলে ‘৭৫-এর পর থেকে এ আলোচনা আবার দানা বেঁধে ওঠে। আসলে বাংলাদেশ সবসময়ই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। অভিযোগ আসে মূলত রাজনৈতিক দিক থেকে তৎকালীন পাকিস্তান ও ‘৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশ আমলকে কেন্দ্র করে। কারণ, আন্তর্জাতিক বিশ্বে সংখ্যালঘু একটি সংবেদনশীল বিষয়। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত বিষয়টিকে অস্ত্র বানিয়ে বরাবরই ব্যবহার করে আসছে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিলো, এ ভূখণ্ডকে অস্থিতিশীল হিসাবে পরিচিত করা এবং আন্তর্জাতিক ফায়দা হাসিল। বলতে দ্বিধা নেই, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ সংখ্যালঘুতত্ত্বকে নিয়মিত পণ্যে পরিণত করে রেখেছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি শ্রেণীও তাদের ফাঁদে পা দিয়ে বিষয়টিতে আগুন দিচ্ছে।

শেখ হাসিনা এখন বাংলাদেশের সরকার-প্রধান। এরশাদের আমলে (১৯৮২-১৯৯১) তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী। তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, তিনি আশির দশকে ৩ বার ভারত-সফরে গিয়েছিলেন। সালগুলো হলো: ১৯৮৭, ১৯৮৮ ও ১৯৮৯। ১৯৮৭ সালে শেখ হাসিনা কোলকাতা বিমান-বন্দরে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর বৈষম্য, নির্যাতন ও তাদের নিরুদ্দেশ হবার বিষয়ে সেখানকার সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন। বিষয়টি তখন বেশ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। ১৯৮৮ সালের ১০ই আগস্ট বুধবার সন্ধ্যায় কোলকাতাস্থ বিবিসি বাংলার সাংবাদিক তুষার পণ্ডিতের কাছে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ” বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ধর্ম ঘোষণার পর থেকে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। গত দু’মাসে বাংলাদেশ থেকে ৩৫ হাজারেরও বেশি হিন্দু ভারতে পালিয়ে গেছেন” ( দৈনিক ইনকিলাব, ১২ই আগস্ট, ১৯৮৮)। ১৯৮৯ সালের ৩রা জুন শনিবার যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, পশ্চিম জার্মানি ও নেদারল্যান্ডে দেড় মাসের সফর শেষে দিল্লী হয়ে দেশে ফেরার পথে কোলকাতা বিমান-বন্দরে সাংবাদিকদের কাছে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন ও বৈষম্য হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। ১৯৮৯ সালের সাক্ষাৎকারটির সময় শেখ হাসিনার পাশে তৎকালীন ভারতে স্বেচ্ছা-নির্বাসিত জনাব আব্দুল কাদের সিদ্দিকীও উপবিষ্ট ছিলেন ( দৈনিক ইনকিলাব, ১৫ই জুন, ১৯৮৯)। তার সাক্ষাৎকারটি ঐ বছরের ৪ জুন কোলকাতার যুগান্তর, আজকাল ও স্টেটসম্যান পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। অবশ্য শেখ হাসিনার বক্তব্যের পরপরই তীব্র প্রতিবাদ করে এক বিবৃতি দেন জাতীয় হিন্দু পরিষদের সমবায় ও স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক স্বপন কুমার সাহা। শ্রী সাহা তার বিবৃতিতে বলেন, “শেখ হাসিনা বাংলাদেশের হিন্দুদের সম্পর্কে যা বলছেন, তাতে হিন্দুদের মধ্যে নিরাপত্তার বদলে নিরাপত্তাহীনতাই সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, স্বাধীন বাংলাদেশে তার পিতার শাসনামল ছাড়া সবসময় হিন্দুরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধ্যে বসবাস করে আসছেন। শ্রী সাহা শেখ হাসিনাকে হিন্দুদের দাবার গুটি হিসাবে ব্যবহার না করারও আহ্বান জানান (দৈনিক ইনকিলাব, ১৪ই আগস্ট ১৯৮৮)।

এবার আসুন প্রিয়ার কথায়। মোবাইলে দেয়া তার বক্তব্যে তিনি যা বলেছেন ইতিহাসের নিরিখে তা পুরোপুরি মিথ্যে নয়। ক্ষমতায় আসবার আগে শেখ হাসিনা সংখ্যালঘুর বিষয় নিয়ে দেশে-বিদেশে বারবার বলেছেন। সমালোচকেরা বলেন, এটা তার রাজনীতি, টিকে থাকার হাতিয়ার। আসলে, তথ্য ঘেঁটে দেখুন, সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর যতো নির্যাতন হয়েছে বলে আওয়ামী লীগ দাবি করে, থাকে সে-সবের নিরানব্বই ভাগ ঘটিয়েছে খোদ আওয়ামী লীগই। অর্পিত সম্পত্তির ৯০ শতাংশ এখনও দখল করে আছে আওয়ামী লীগের লোকজন। সে-কথা সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত সুরঞ্জিৎ সেনগুপ্তও কয়েকবার বলেছিলেন। যাক, প্রিয়া সাহা যে দাবি করে আত্মপক্ষ সমর্থন করলেন সে-দাবির যৌক্তিকতা সম্পর্কে শেখ হাসিনা মোটেও বিস্মৃত নন, নন বলেই তিনি নেতা-কর্মীদের অতিমাত্রায় উত্তপ্ত হতে বারণ করেছেন বলে মনে হয়। কারণ, এতে সব লেজেগোবরে হয়ে যেতে পারে। তা’ছাড়া, প্রিয়ার রয়েছে প্রবল ভারত-কানেকশন। শেখ হাসিনা আজ বুঝবেন, তার নিজের পাতা জালেই তিনি কিভাবে আটকে যাচ্ছেন। প্রিয়ারা তাকে কোনভাবেই ছাড় দেবে না। আজ হোক, কাল হোক প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে কেউ না কেউ আদালতের দ্বারস্থ হবেন, তখন ডক্যুমেন্ট হিয়ারিং-এ সংখ্যালঘু নিয়ে শেখ হাসিনার বক্তব্যগুলো প্রিয়ার পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হবে। তখন কি হবে? কথাগুলো হয়তো শেখ হাসিনা ভাবছেন।

লেখার শুরুতেই বলেছিলাম আমার বাল্যকালের সত্য বলার শিক্ষা নিয়ে। ক্ষেত্রবিশেষে সত্য বলা অনেক কঠিন, বিপজ্জনকও। আশির দশকের কথা অনেকেরই মনে থাকার কথা নয়। যারা জানেন, তারা সত্য বলার বিপদ বুঝে হয়তো চুপ করে আছেন। এখন যারা সামাজিক মাধ্যমে প্রিয়াকে নিয়ে হল্লাচিল্লা করছেন, তারা জানেন না প্রিয়ার নালিশের পটভূমি কেমন করে রচিত হলো। আমি- আপনি না জানলেও ইতিহাস চুপ করে বসে থাকে না। সঠিক সময়েই সে কথা বলে। এখন দেখার বিষয়, আংশিক হলেও প্রিয়ার সত্যকথনের জবাব সরকার কেমন করে দেয়। প্রিয়াকে অবশ্যই আত্মপক্ষ সমর্থনের বিচারিক অধিকার দিতে হবে। এটা তার প্রাপ্য। আর সেই প্রাপ্যতার খেসারত দিতে গিয়ে শেখ হাসিনা বা তার সরকারকে কী পরিমাণ তেল-ঘি যে ঢালতে হয় তা সময়ই বলে দেবে। আশা করবো, নতুন-প্রজন্ম জানুক ইতিহাসের চোরাগলিতে কি কি ছড়িয়ে আছে। আল্লাহু হা-ফিয।