ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | এম  মাহিরজান


প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠায় আল হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশের অধীনে চলমান দাওরায়ে হাদীসের (মাস্টার্স সমমান) পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে।

আজ (শনিবার) সকালে আল হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে শুরু হওয়া বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ ঘটনাকে শত বছরের কওমী মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার ঐতিহ্যকে বিতর্কিত করার অপপ্রয়াস বলে মনে করছেন বিশিষ্ট জনেরা।

ইনসাফের সাথে আলাপকালে কওমী মাদরাসার ঐতিহ্যকে ধ্বংস করতে একটি কুচক্রী মহল প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই ঘটনা ঘটাতে পারে বলে সন্দেহের কথা জানিয়েছেন করছেন আল হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশের সদস্য ও বেফাকের সহসভাপতি মাওলানা বাহাউদ্দীন জাকারিয়া।

তিনি বলেন, কওমী মাদরাসা সমূহের শত বছরের ঐতিহ্য হচ্ছে, এখানে কোন কালেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের মত ঘটনা ঘটে না। এইবার যা ঘটেছে, তাতে আমাদের সেই ঐতিহ্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। আমি মনে করি, এটি কওমী মাদরাসার সমূহের বিরুদ্ধে চলমান বহুমুখী ষড়যন্ত্রের অংশ।

কারা ষড়যন্ত্র করতে পারে বলে আপনি মনে করেন? এমন প্রশ্নের জবাবে মাওলানা বাহাউদ্দীন জাকারিয়া বলেন, কওমী মাদরাসা সমূহ এই উপমহাদেশের ইসলামের বাতিঘর। শত বছর ধরে এই মাদরাসা সমূহ ইসলামের খিদমতে ও বাতিলের মোকাবেলায় অবদান রেখে চলেছে। এজন্য কওমী মাদরাসা সমূহ সব কালেই ইসলাম বিদ্বেষী চক্রের কাছে অপছন্দের ছিল ও আছে। তারাই এ ধরণের ঘটনা ঘটাতে পারে বা ইন্দন দিতে পারে আমার বিশ্বাস।

তাহলে কি আপনি বলতে চাচ্ছেন এটি বাহিরের কোন চক্রের কাজ? হাইয়া কিংবা বেফাকের কেউ এর সাথে যুক্ত নয়? এ প্রশ্নের জবাবে হাইয়া ও বেফাকের এই গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা বলেন, আমি বলছিনা হাইয়া কিংবা বেফাকের কেউ এর সাথে যুক্ত নয়। এমন হতে পারে আমাদের মধ্যেই কেউ এই ফাঁদে পা দিয়েছেন। যদি দিয়ে থাকেন তদন্ত তা বেরিয়ে আসবে। তবে এটি যে একটা বৃহৎ ষড়যন্ত্রের অংশ, সেটাই আমি বলতে চাচ্ছি। আমাদের কেউ যুক্ত থাকলেও তারা মূল ষড়যন্ত্রকারী নাও হতে পারে, ষড়যন্ত্রটা অনেক গভীর থেকে হচ্ছে বলে আমার বিশ্বাস।

ছাত্ররা বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন ভাবে কিছু প্রতিবাদ করছে, এই প্রতিবাদকে আপনি কিভাবে দেখেন? এর জবাবে মাওলানা বাহাউদ্দীন জাকারিয়া বলেন, আমি শুরুতেই বলেছি প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই ঘটনা কওমী মাদরাসার শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। তাই আমাদের ছাত্র ভাইরা যদি এই ষড়যন্ত্রকারীদের ফাঁদে পা দিয়ে প্রতিবাদের নামে কওমী মাদরাসার সুনাম ক্ষুণ্ণ হয়, এমন কোন কাজ করেন, তাতে ষড়যন্ত্রকারীরাই সফল হবে। তাই আমি আমার ছাত্র ভাইদের বলব, বৃহৎ স্বার্থে ধৈর্য ধরুন। কওমী মাদরাসা উম্মতের আস্থার স্থান, কওমী আলেমরা উম্মতের পথ পথপ্রদর্শক, আপনাদের দারা এমন কোন ভুল করা উচিৎ হবেনা, যাতে করে উম্মতের আস্থা উঠে যায় কওমী আলেমদের থেকে। যারা অন্যায় করেছে, তারা অবশ্যই শাস্তি পাবে।

জামিয়া নুরিয়া কামরাঙ্গীরচর ও জামিয়া ইসলামিয়া তাঁতিবাজার মাদরাসার মুহাদ্দীস মাওলানা মুসা বিন ইজহারের মতে, হাইয়াতুল উলইয়া ও বেফাকের এই ক্ষেত্রে আরো সতর্ক থাকা প্রয়োজন ছিল।

তিনি বলেন, সরকারী স্বীকৃতির আগের অবস্থা ও বর্তমান অবস্থা এক নয়। আগের কওমী মাদরাসার শিক্ষাব্যবস্থা কোন রকম প্রশ্ন ছাড়াই একমাত্র আল্লাহকে খুশি করার জন্য ছিল। দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণই ছিল মূল উদ্দেশ্য। তবে বর্তমানে সরকারী স্বীকৃতির পর কিছুটা হলেও এতে ব্যত্যয় ঘটেছে। এখন কওমী শিক্ষার্থীদের মধ্যে খুব স্বল্প মাত্রায় হলেও যে করেই হোক ভাল রেজাল্ট করার একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এজন্য অনেক শিক্ষার্থী গাইড নির্ভর পড়াশুনায় মনোযোগী হচ্ছে; যা কওমী শিক্ষার সাথে সামন্জস্যপূর্ন নয়। এসব বিষয় নজরে রেখে হাইয়াতুল উলইয়া ও বেফাকের আরো বেশি সতর্কতা অবলম্বন করার দরকার ছিল।

মাওলানা মুসা বিন ইজহার বলেন, হাইয়াতুল উলইয়া ও বেফাকের মধ্যে তুলনামূলক শিক্ষাবিদদের প্রাধান্য কম থাকায় শিক্ষা ক্ষেত্রে করণীয় অনেক বিষয়ই অবহেলিত থেকে যাচ্ছে। আমি মনে করি প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ আসার পিছনে এটিও একটি বড় কারণ। শিক্ষাবিদদের হাতে শিক্ষাবোর্ড না ছাড়লে এসব সমস্যা আরো বাড়তে পারে। মনে রাখতে হবে যে এই বোর্ডগুলোর প্রধান আমাদের সর্বজন শ্রদ্ধেয় মুরব্বি আল্লামা শাহ আহমদ শফী। বোর্ডগুলোর কতিপয় লোকের অবহেলা বা স্বেচ্ছাচারিতার দায় ওনার ওপর যাতে কেউ চাপাতে না পারে। আমি মনে করি এই ঘটনার পর বোর্ডগুলো নিয়ে কওমী অঙ্গনের মুরব্বীদের নতুন করে ভাবা উচিৎ। প্রয়োজনে পুঃনর্গঠন করে হলেও কওমী শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্রকে নৎসাত করা উচিৎ।

তিনি বলেন, প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠায় পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানানো উচিৎ। তবে সাথে সাথে এটাও বোর্ডের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করতে হবে যে, আগামীতে এধরণের ঘটনা আর ঘটবে না। ছাত্রদের মানুশিক অবস্থার দিকে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। একবার পরীক্ষা দিয়ে একই পরীক্ষা আবার দিতে বাধ্য হওয়া মোটেও সহজ নয়। এই ঘটনা ছাত্রদের মধ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলবে বলে আমার ধারণা।