করোনাকালের কাশ্মীর; আজাদ কাশ্মীরের প্রেসিডেন্ট মাসুদ খানের বিশেষ সাক্ষাৎকার

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | নাহিয়ান হাসান


করোনা পরবর্তী কাশ্মীরের অবস্থা, হিন্দুত্ববাদী ভারত ও পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরের মধ্যকার শান্তি ও আস্থার উন্নয়ন সূচক চুক্তি এবং ভারত কর্তৃক প্রকাশিত পুরো (ভারত ও পাকিস্তান শাসিত) কাশ্মীরের নতুন মানচিত্র প্রকাশ সহ আরো বিভিন্ন বিষয়ে তুরস্কের আন্তর্জাতিক মিডিয়া সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরের রাষ্ট্রপতি, প্রাক্তন পেশাদার কূটনীতিবিদ ও টিভি সংবাদ উপস্থাপক সরদার মাসুদ খান ওরফে ‘এজেকে (আজাদ জম্মু-কাশ্মীর) খানের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেয়। ইনসাফের পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন নাহিয়ান হাসান

সাক্ষাৎকার দানকালে হিন্দুত্ববাদী ভারত-শাসিত কাশ্মীরে করোনভাইরাস কোভিড -১৯ মহামারীর দ্রুত সংক্রমণ সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করে, পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের রাষ্ট্রপতি সরদার মাসুদ খান বলেছেন যে ভারত এই সময়কে স্থলভাগে অভিযান বাড়াতে এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনা থেকে কাশ্মীরকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য ব্যবহার করছে।

একান্ত আলাপচারিতায় ‘খান’ আরো যোগ করেন যে, পারতপক্ষে কোভিড-১৯ মহামারী এবং প্রতিনিয়ত ঘটে চলা সহিংস ঘটনাগুলি লাইন অফ কন্ট্রোল(এলওসি)বিশ্বের সবচেয়ে বিপদজনক ও ভয়ংকর সীমান্ত যা কাশ্মীরকে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে বিভক্ত করে তার অপর প্রান্তে বিপর্যয় সৃষ্টি করার ব্যাপারে তিনি উদ্বিগ্ন।

তথ্যানুসারে, ভারত শাসিত কাশ্মীরে এ পর্যন্ত ৯৩৪ জন কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবে আক্রান্তদের মধ্যে ১০ জন মারা গেছেন। অথচ উক্ত অঞ্চলে মার্চ মাস থেকে ঘটে চলা সহিংসতায় ৭৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে!

‘খান’ এছাড়াও দুর্বল ও নিম্নমানের স্বাস্থ্য অবকাঠামো এবং উক্ত অঞ্চলকে অত্যাধিক পরিমাণে সামরিককরণের ব্যাপারে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি এদিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন,৩৯০০জন কাশ্মীরীর জন্য যেখানে শুধুমাত্র একজন ডাক্তার তার বিপরীতে ৯ জন কাশ্মীরীকে পাহারা দিতে ১ জন সেনাবাহিনী!

পাঠকদের সুবিধার্থে এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের চুম্বকাংশ নিম্নে তুলে ধরা হল।

প্রশ্ন: জম্মু-কাশ্মীরের নতুন মানচিত্র প্রকাশের পর ভারত এখন মুজাফফরাবাদ এবং গিলগিত-বালতিস্তানের আবহাওয়া বুলেটিনগুলি বেতারযোগে সম্প্রচার শুরু করেছে। রাজনৈতিক দিক বিবেচনায় এর কি মানে হতে পারে?

মাসুদ খান: আপনার স্মরণ থাকার কথা যে ভারত গত বছরের ৩১ অক্টোবর এই ভুয়া মানচিত্রগুলি প্রকাশ করেছিল। আপনি বলতে পারেন এটি তাদের আজাদ কাশ্মীর ও গিলগিত বালতিস্তানকে ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্গত তবে জম্মু-কাশ্মীরের অন্তর্গত নয় এই অযৌক্তিক চিন্তাধারা জাহির করার প্রথম পদক্ষেপ। অথচ জম্মু-কাশ্মীর হল স্বতন্ত্র একটি এলাকা আর তা গিলগিত বালতিস্তান, আজাদ কাশ্মীর, লাদাখ এবং জম্মু-কাশ্মীরের সমন্বয়ে গঠিত এব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

তারা যা করেছে তা হল অপকর্ম। পাকিস্তানের রাষ্ট্র পরিচালিত মিডিয়া সংস্থাও পুরো অঞ্চলটির আবহাওয়ার পূর্বাভাস সম্প্রচার করে আসছে আর তা তারা বহু আগে থেকেই করে আসছে। ভারতের মতো সাম্প্রতিক সময়ে প্রথমবারের মতো নয় যদিও তারা এখন আবহাওয়ার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পর্যালোচনা শুরু করেছে। তাই আমি মনে করি ভারতের উদ্দেশ্য ভাল না। যেহেতু সেখানে ক্রমাগত হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বিশেষত, কট্টর হিন্দুত্ববাদী বর্তমান ক্ষমতাসীন বিজেপির মন্ত্রীরা আজাদ কাশ্মীরে আক্রমণের হুমকি দিচ্ছে এবং গিলগিত বালতিস্তানের উপর নিজেদের সার্বভৌমত্ব জোর করে চাপিয়ে দিচ্ছে।

সুতরাং বলা যায়, এটি ছিল তাদের কৌশলের একটি অংশ। তবে এটা এখন বিপরীত ক্রিয়াশীল হয়ে আবির্ভূত হচ্ছে। কারণ তারা যে পদক্ষেপ বা ভুল কৌশল অবলম্বন করেছে তা পুনরায় জম্মু-কাশ্মীরের জনগণের সংকটাপন্ন অবস্থার উপর আলোকপাত করছে।

আনাদোলু: ভারত, জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের স্বায়ত্তশাসন বিলুপ্ত করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রেখেছে এখন নয় মাস হয়ে যাচ্ছে। আপনি কাশ্মীরের সমস্যা সমাধানের জন্য ভারতের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক, নৈতিক ও রাজনৈতিক পন্থা অবলম্বনের উপর জোর দিয়েছিলেন। এখন পর্যন্ত এর অগ্রগতি কি হয়েছে?

মাসুদ খান: আপনি জেনে থাকবেন যে ৫ আগস্টের পরপরই বিশ্ব কাশ্মীরীদের দুর্দশার উপর মনোনিবেশ করেছিল। তাদের দুর্দশা ছিল মূলত তাদের উপর ‘আক্রমন করা’। বছরের পর বছর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, সংসদ, চিন্তাশীল এবং সিদ্ধান্তগ্রহীতারা বিবৃতি সমাচার দিয়ে গেছেন এবং তখন সে ব্যাপারে সহোযোগিতার একটি মজবুত ভিত্তিও ছিল। আপনি ৫০ বছর পরেও এটা স্মরণে রাখবেন যে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ একটি অনানুষ্ঠানিক অধিবেশন করেছিল যদিও এটি বলার মতো কিছুই তৈরি করে নি কিন্তু জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক এই ধরণের কার্যক্রমও এক প্রকারের অগ্রগতি বলা যায়।

কিন্তু এটা স্থগিত হয়ে গিয়েছে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন কারণে। যেমন: ব্রেক্সিট, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিশংসন প্রক্রিয়ার উপর সকলের মনোনিবেশ আর এখন সর্বশেষ কোভিড-১৯ এর লকডাউন। সুতরাং এগুলোর ফলে কাশ্মীর ইস্যু থেকে মনোযোগে বিচ্যুতি ঘটেছে। আমি আপনাকে বলতে পারি যে, আজাদ কাশ্মীরের জনগণ ও নেতৃবর্গ, পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দ ও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কাশ্মীরী ও পাকিস্তানি প্রবাসীরা খুব উদ্যোম ও দেশপ্রেম নিয়ে ভারতের নেওয়া অনৈতিক পদক্ষেপগুলোর বিরুদ্ধে জনসচেতনতা ও জনমত গড়ে তুলছে।

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচ্য বিষয় থেকে কাশ্মীর ইস্যুকে নিশ্চিহ্ন করতে ভারত কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবকে একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে। কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের আড়ালে তারা দুটি বা তিনটি পদক্ষেপ নিয়েছে। শুধু গত মাসেই আমার ধারণা মতে তারা ৪০জন যুবককে সীমান্ত ও অনুসন্ধানী অভিযানে হত্যা করেছে। সেগুলো মূলত সীমান্ত ও অনুসন্ধানী অভিযান ছিল না বরং পূর্ব পরিকল্পিত সাজানো মিথ্যা অভিযান এবং ঘরবাড়ি ধ্বংসকরণ।

দ্বিতীয়ত, তারা গভীর রাতে সকলের অগোচরে আবাসন সম্পর্কীয় অনৈতিক আইন চালু করেছে যা কিনা কাশ্মীরীদের ভূখণ্ড নিজেদের কব্জায় নেওয়ার একটি মন্দ প্রক্রিয়া! তারা কাশ্মীরীদেরকে তাদের রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার ও আবাসভূমি থেকে বিচ্যুত করে তাদের যায়গায় পুরো ভারত থেকে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের এনে সেখানে বসতি স্থাপন করে দেওয়ার হীন পায়তারা চালাচ্ছে। সুতরাং এটি একটি মন্দ পরিকল্পনা যা তারা ইতিমধ্যেই বাস্তবায়ন করা শুরু করে দিয়েছে।

আনাদোলু: আরো বিশ্লেষণ প্রয়োজন

মাসুদ খান: ইতোমধ্যে কাশ্মীরে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কয়েক হাজার অভিবাসী শ্রমিক রয়েছেন আর তাদেরকেই তারা পশ্চিম পাকিস্তানের তথাকথিত হিন্দু শরণার্থী নামে চালিয়ে দিচ্ছে।সুতরাং, আমরা এখানে এমন লক্ষ লক্ষ লোকের কথা বলছি, যারা বংশগত কাশ্মীরী ধারা পরিবর্তন করতে কাশ্মীরে বসতি স্থাপন করবে। আমি মনে করি, এখানে এখন আমার জন্য কোনো ধরণের আশাব্যঞ্জক পরিকল্পনা নেই। আমাদের লড়াই আরো কঠিনতর এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা আরো দুর্ভেদ্য হয়ে গিয়েছে তাই আমাদের আত্মরক্ষামূলক কার্যক্রমের গতি ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন এবং আমাদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করা দরকার।

বস্তুত, এটি শুধুমাত্র কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক প্রচারে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না বরং আমাদের উচিত সংসদের মাধ্যমে নাগরিক সমাজের কাছে বিষয়টি পৌঁছানো। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের আনাদোলু এজেন্সির প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত যে তারা কাশ্মীরীদের এই অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনগুলিতে জম্মু-কাশ্মীরের জনগণের জন্য বড় কণ্ঠ হয়ে কাজ করছেন। আমরা সবাই এর জন্য আনাদোলু ও আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

বর্তমানে আমরা সবচেয়ে যে বড় চ্যালেঞ্জ এবং বাধার সম্মুখীন হচ্ছি তা হল সরকার। বিশ্বমোড়ল এবং পশ্চিমা সরকারেরা এব্যাপারে একেবারে নিশ্চুপ। তারা কাশ্মীর ইস্যুতে মোটেও কথা বলছেন না। এই নিরবতাকে আমি অপরাধই বলবো। কেনোনা এটা দখলকৃত অঞ্চলের মানবতার বিরুদ্ধে স্বঘোষিত অপরাধের নামান্তর।

আনাদোলু: আবাসন আইনটি উক্ত অঞ্চলের জনসংখ্যায় কীভাবে প্রভাব ফেলবে এবং প্রভাবগুলি রোধ করার জন্য আপনার সরকার কী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে আর তা কেমন হবে?

মাসুদ খান: এই বিষয়টিকে আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছি যাতে তারা এব্যাপারে আরো বেশি কিছু জানতে পারেন। আমি তাদেরকে এই অশুভ উন্নয়নের ব্যাপারে সতর্ক করতে চাই। আপনি কি জানেন যে ভারত শুধুমাত্র এই দখলকৃত অঞ্চলের জনপরিসংখ্যানেই পরিবর্তন আনতে চেষ্টা করছে না বরং তারা তাদের হাতের মুঠোয় থাকা সভাসদে মুসলিমদের প্রতিনিধিত্বকারীদের আসন সংখ্যা হ্রাস করে সেখানে নামমাত্র রাজনৈতিক শ্রেণী তৈরি করতে যাচ্ছে। হয়তো সেই রাজনৈতিক শ্রেণী সেখানে তাদের জন্য প্রতিনিধিত্ব করবে। এক্ষেত্রে তারা সেখানে ধোঁকাবাজির আশ্রয় নিচ্ছে। এছাড়াও মুসলিমদের সংখ্যা হ্রাস করতে তারা বিভিন্ন এলাকায় সীমা নির্ধারণ প্রক্রিয়া আরোপ করছে।

সুতরাং আমরা যা করছি তা হল, আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানাচ্ছি যে ভারতের সাথে সরাসরি যোগাযোগের কোনো মাধ্যম নেই যদিও প্রতিবাদ করা হচ্ছে এবং পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক বিবৃতি জারি করা হয়েছে। তবুও আমরা নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি ও জাতিসংঘের মহাসচিব বরাবর চিঠি লিখে যাচ্ছি।

পাকিস্তান সরকার যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি আমরা তার প্রশংসা করি। তবে আমি মনে করি এটি যথেষ্ট নয়। আমি মনে করি এর প্রচারণা আরো বিস্তৃত হওয়া উচিত। এখানে শুধুমাত্র সরকারী কর্মকর্তা বা রাজনৈতিক নেতারা নয় বরং আন্তর্জাতিক নাগরিক সমাজ, কাশ্মীরি প্রবাসী এবং পাকিস্তানি প্রবাসীদের সরাসরি জাতিসংঘের সেক্রেটারি-জেনারেল, নিরাপত্তা কাউন্সিলের সভাপতি, মানবাধিকারের হাই কমিশনার এবং রেড ক্রসের আন্তর্জাতিক কমিটির সভাপতি বরাবর যোগাযোগের বিষয়টি আলোকপাত করার লক্ষ্যে সরাসরি চিঠি লিখতে হবে। যোগাযোগের মাধ্যমরূপী এই চিঠিগুলোই বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। সেগুলো স্মারকলিপিও হতে পারে আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করা বার্তাও হতে পারে।

কাশ্মীর আবাসন নীতি এবং নুরেমবার্গ আইন:

মাসুদ খান: যেহেতু আমি আবাসন নীতি নিয়ে কথা বলছি সেহেতু আমি আপনাকে এই আবাসন নীতিমালার সাথে হিটলার কর্তৃক ১৯৩০ সালে উত্থাপিত নুরেমবার্গ আবাসন নীতির তুলনাও দিতে চাচ্ছি।কারণ সেই আইনগুলো ইহুদিদেরকে বিচ্ছিন্ন করতে এবং তাদের জার্মান পরিচয় ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল এবং পরে তাদেরকে এককেন্দ্রিক শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যেখানে তাদেরকে জ্বালিয়ে দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। কাশ্মীরীদের জন্যেও ঠিক একই ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে তারা। তাই প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে তাদেরকে তাদের ভূখণ্ডেই বহিরাগত করে দেওয়া হয়েছে। তাদের জাতিগত অবস্থানকে হ্রাস করা হচ্ছে। তাদের উপর এত চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে যে সেখানকার লোকজন দেশান্তরিত হতে শুরু করেছে এবং বিশ্বের কিছু অংশে তারা রাষ্ট্র পরিচয়হীন অভিবাসী হয়ে পড়ছেন। আর আমরা দেখছি যে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এমনটাই হচ্ছে এখন।

আমি আগেই হুঁশিয়ার করেছিলাম যে সেখানে কিছু খারাপ কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে তাই নিজেদের পদক্ষেপগুলো একীভূত করুন এবং দৃঢ়তার সাথে প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করুন। অন্যথায় অনেক দেরী হয়ে যাবে। যদি আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায় করতে না পারি তবে আমরা কাশ্মীরের একটি পরিবর্তিত দৃশ্য দেখতে পাব।

আনাদোলু: দ্বিপক্ষীয় আস্থা বাড়াতে ২০০৪-২০০৮ সাল পর্যন্ত কাশ্মীরের দুই অংশের লোকদের সাথে দেখা ও ব্যবসায়ের সুযোগ দেওয়ার জন্য অনেক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল যা (সিবিএম) নামে খ্যাত। এখন এই সিবিএমগুলির অবস্থান কী? সেগুলো পূনরুজ্জীবিত করার কোনও সুযোগ আছে কি?

মাসুদ খান: কাশ্মীরে আক্রমণের ফলে দ্বিপক্ষীয় আস্থা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখা কার্যক্রমগুলোকে স্থগিত করা হয়েছে। যেহেতু কাশ্মীরের শ্রীনগর ও দিল্লির মাঝে কোনো আস্থা নেই সুতরাং ইসলামাবাদ আর দিল্লির মাঝেও কোনো ধরনের আস্থা বাকি নেই। তাদের সাথে করা আমাদের দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক চুক্তিতে আমরা শিথিলতা করছি। তাই বলা যায়, গত বছরের আগস্টে ভারতের নেওয়া পদক্ষেপ সিবিএম চুক্তির জন্য ছিল বড় ধরনের আঘাত।

তারা যোগাযোগের সমস্ত মাধ্যম ব্লক করে দিয়েছে, এখন যা ঘটছে তা হল ভারত প্রতিনিয়ত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে সহিংসতা ছড়াচ্ছে এবং তারা বেসামরিক নাগরিকদেরকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে ভারী অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করছে। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে রেখেছে এবং তাদের সামরিক স্থাপনাগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার নাগালে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে রেখেছে। তাই, আমি মনে করি আস্থা বিনির্মান প্রক্রিয়াটি দিন দিন ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।

আপনি যে প্রশ্ন করেছেন এই আস্থা বিনির্মান প্রক্রিয়া (সিবিএম) পুনরুজ্জীবিত করা যেতে পারে কিনা? আমি বলতে চাই,আপনি কি জানেন? আস্থা বিনির্মান প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করার জন্য আপনার সঠিক ধরনের পরিবেশ থাকতে হবে। অথচ এই মুহূর্তে আমাদের কোনো ধরনের কূটনৈতিক প্রক্রিয়া বিদ্যমান নেই।

বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো সিবিএম নেই। তবে ইদানীং ভারত বলতে শুরু করেছে যে এটি একটি অভ্যন্তরীণ বিষয়। তাই কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের সাথে আলোচনার কিছু নেই। তারা বলছে যে তারা আজাদ কাশ্মীর আক্রমণ করতে যাচ্ছে। এখন আপনিই বলুন কীভাবে আমরা এই জাতীয় বিষাক্ত পরিবেশে তাদের সাথে আস্থার উন্নতি সাধন করতে পারি? আমরা যতই আস্থার উন্নতি সাধন, সংলাপ এবং কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডের কথা বলি না কেনো ভারতের এজাতীয় কর্মকাণ্ডের ফলে আস্থার অবনতিই ঘটতে থাকবে।

ইতিমধ্যে ভারত অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরে এই ধ্বংসযজ্ঞ চলছে। ভারত যুদ্ধ, দ্বন্দ্ব, আক্রমণ ও ধ্বংসযজ্ঞের শব্দকোষ ব্যবহার করছে। ঠিক এই মুহুর্তে জম্মু ও কাশ্মীরে গণহত্যা চলছে অথচ এজাতীয় পরিবেশে বিশ্বাস বা আস্থা কোনোটাই বাড়ানো যায় না। কীভাবে একজন খুনি এবং একজন নিহত ব্যক্তির মধ্যে একটি আস্থার সম্পর্ক তৈরি হতে পারে? আমরা কী ধরনের আস্থা বাড়ানোর কথা ভাবছি?

এছাড়াও কথা প্রসঙ্গে আজাদ কাশ্মীরের প্রেসিডেন্ট মাসুদ খান বলেন, কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবের আড়ালে কাশ্মীরী যুবকদেরকে ঠান্ডা মাথায় হত্যার গতিকে তারা আরো তরান্বিত করেছে। শুধু তাই নয়, তারা সেখানকার আবাসন আইনেও ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করেছে।

ভারত তার অঞ্চলে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পারে এই আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন,আজাদ কাশ্মীরের জনগণ ও তার প্রশাসন যেকোনো ধরনের ছলচাতুরীমূলক অভিযানের মোকাবিলা করতে প্রস্তুত রয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা জানি না সেটি কি ধরনের আক্রমণ হবে তবে এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি যে সেটা পারমাণবিক যুদ্ধ হতে পারে না। কেনোনা ভারতীয়রা পারমাণবিক যুদ্ধে না জড়িয়ে অন্য কোনোকিছু করতে চেষ্টা করবে। সুতরাং, আমরা সম্ভাব্য সকল পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুত।

আনাদোলু এজেন্সিকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরের রাওয়ালকোটে জন্ম গ্রহণ করা পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরের এই রাষ্ট্রপতি, প্রাক্তন পেশাদার কূটনীতিবিদ ও টিভি সংবাদ উপস্থাপক ‘এজেকে (আজাদ জম্মু-কাশ্মীর) খান’ তুরস্কের রাষ্ট্রপতি রজব তাইয়েব এরদোগান, তুরস্কের সমাজ এবং চিন্তাশীলদেরকে এই ক্লান্তিকর দুঃসময়ে জম্মু ও কাশ্মীরের জনগণের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ধন্যবাদ জানান।